রবিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৩

আমার কবিতা : কাঠবিড়ালির লাফ





আমার কবিতা----কাঠবিড়ালির লাফ---৫৬
-----------------------------------------------------------

ঢেঁকির শব্দ আসছে।

আলতা পরা পা। ফাটা গোড়ালি। ঢেঁকিতে পাড় দিচ্ছে। ঢেঁকির গর্ত থেকে গুঁড়ো চাল তুলে নিচ্ছে শীর্ণ একটি হাত।

ঢেঁকির শব্দ আসছে।

আমার ছোটবেলার শব্দ। ঢেঁকির শব্দ। এই পৌষ মাসে। হয়তো বা সারাবছর ঢেঁকিঘরে ঝুল কালি অন্ধকার। পৌষ মাস এলেই, শব্দ আর শব্দ। কথার শব্দ থেকে ঢেঁকির শব্দ।

সেই ঢেঁকি ঘরেই তো গোপন প্রেমের সন্ত্রাস। লুকোচুরি খেলা। সেই ঢেঁকি ঘরেই তো ঢেঁকির দখল কারা আগে পাবে----মা বললো---যা জেনে আসবি।

আমাদের ঢেঁকি ছিল না। দত্তদের ঢেঁকিতে পিঠের চাল গুড়ি করা হবে। পাড়ার প্রায় সব ঘর থেকেই এই দত্তদের ঢেঁকি।

লাইন দাও।

প্রায় সারা বছর ঢেঁকি ঘর আমাদের খেলাঘর। পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন জমজমাট মেয়েলি গল্পে। কথায়। হাসিতে। বেদনায়।

এই হাসি-কান্না -বেদনা আজকের বাংলা কবিতায়, তরুণ কবিতায় ধরা পড়লো না।

তরুণ কবিতায় কি এসেছে ঢেঁকির শব্দ? উত্তর আসবে, আজকের তরুণ প্রজন্মের আগেই ঢেঁকি লুপ্ত হয়ে গেছে।

প্রযুক্তি আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। সময়, নীতি নৈতিকতা, আদর্শ, মূল্যবোধ, প্রেম ভালবাসাও কেড়ে নিয়ে মানুষকে বিধ্বস্ত করে যায়। সেই ধ্বস্ত ছবিও খুঁজে পাই না আজকের কবিতায়।

প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর কোথায় আছে?

কত দূরে আছে?

ধারালো কলমের অভাবে শিল্প সাহিত্য রাজনীতিতে মরচে ধরে।

শিরদাঁড়াতেও জং ধরেছে।

মেধা ও মননে দাসত্ব। রাজার চেয়ার মুছে দিচ্ছে কবি। কবিতায় কেমন করে আসবে ঘাসের শুকিয়ে যাওয়া শিকড়। ফ্যাকাসে মাটির হাহাকার?

গজিয়ে ওঠা শপিং মলের সামনের ছোট দোকান মাঝারি দোকান বন্ধ হয়ে যায়। উপোসি হয়ে ওঠে অজস্র নিম্নবিত্ত মানুষ।

সেই দিকে যাবে না আমার কবিতা?

কার জন্য কবিতা? কাদের জন্য কবিতা?

বুকের হাপর ওঠানামা করে।

আগুন নেই।

তরুণ অগ্নি নেই।

কোন্ আগুনে সেঁকে নিতে পারি আমার দুহাত?

ঢেঁকির শব্দ আসছে।

পিঠে পরবের হাওয়া বইছে। টুসু পরবের হাওয়া বইছে। কোন্ টুসু? টুসুও যে বিকৃত হয়ে উঠলো। তার গানে গানে। লোক জীবনের সরলতা, দুঃখকথা পাথরচাপা পড়ে গেছে।

মেশিন এসেছে।

মেশিন আসতেই কাজের গতি এসেছে। দ্রুততা এসেছে। এ যেমন ঠিক তেমনি মানুষকে করে তুলেছে যন্ত্র নির্ভর।

হৃদয় যন্ত্র নির্ভর হয়ে উঠবে?

এ যে আমারই দেশ, ভুলে গেলে চলবে না। এখানে যেমন লাল শালুকের ফুটে ওঠা হৃদয় আছে তেমনি আছে অন্তর বেদনা, দারিদ্র, অসহায়তা, বঞ্চনা প্রতিমুহূর্তে। অশিক্ষা তো আছেই। আছে মানুষের কাছে মানুষের অপমান।

আলো মঞ্চ হাততালি ক্যামেরা ও ঝাঁ-চকচকে মুখের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় কুঁচকে যাওয়া চামড়া।

পিঠের ভিতরে নারকেলের পুর। চাঁছির পুর। যেন বা পিঠের ভিতরে ঠুসে দেওয়া হয়েছে আমারই দেশকে। যত ইচ্ছে যেমন ইচ্ছে কামড়েকুমড়ে খাও।

ঢেঁকির শব্দ আসছে।

মেশিনের শব্দ আসছে।

ঢুকে পড়ছে আমার গলা। বিনা রক্তপাতে হত্যাকাণ্ড ঘটে চলেছে এ সময় এদেশে।

আমার মহাভারতে।

-----২৮ পৌষ ১৪২৯
-----১৩---১---২০২৩
-----নির্মল হালদার






আমার কবিতা---কাঠবিড়ালির লাফ--৫৭
---------------------------------------------------------

পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন পিঠে গড়ার দিন। ঘরে ঘরে টুসুর জাগরণ। টুসু গান। সেই গানের সৌরভ শীতের হাওয়ায় হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ে ঘর থেকে বাইরে।

জেগে ওঠে অন্ধকার থেকে গাছপালা। রাতের বাদুড়। লক্ষ্মী পেঁচা।

পিঠের গন্ধ নারকেল নাড়ু তিল নাড়ুর গন্ধ বাতাস থেকে বাতাসে। রাত্রিবেলায়।

পিঠে গড়া হয়ে গেলে গোয়াল থেকে খড় এনে মা পিঠের হাঁড়িতে বাঁধতো। দরজায় বাঁধতো। খড়ের বেড়া ঠাকুরের কাছেও।

সেই বাঁধন তো আমার অন্তরেও।

সেই বাঁধন খড়ের বাঁধন। কঠিন বাঁধন। সহজে ছিঁড়বে না। মাটি থেকে ধানের জন্ম। আর ধানের অংশ খড়।

খড়ের বাঁধনে বাঁধা হয়ে আমার স্রোত। মাটির স্রোত।

আমি যেন ছুঁয়ে থাকতে পারি।

----২৯ পৌষ ১৪২৯
----১৪---১---২০২৩
-----নির্মল হালদার





আমার কবিতা---কাঠবিড়ালির লাফ---৫৮
---------------------------------------------------------

অশোকনগর দুবার গেছি। একবার কবি অনির্বাণ দাসের কাছে। সঙ্গে ছিল ইপিল। আরেকবার গেলাম অপূর্ব সাহার কাছে। প্রথমে ছিল উদ্দামতা। পরেরবার অপূর্বর কাছে কবিতা সংগ্রহের কাজে। আমার কবিতা সংগ্রহের দুটি খন্ডের কাজ অপূর্ব করেছে। তৃতীয় খন্ডের ও কাজ অপূর্বর কাছেই।

তার কাছে আমার ঋণ আমি যতই কবিতা লিখি শোধ করা যাবে না। আমার কাছে তো আমার কোনো বই নেই। সে কিন্তু সংগ্রহে রাখে আমার সমস্ত বই। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাও তার নিজের কাছে রাখে। এ বিষয়ে সে আমাকে চমকে দেয়। হাংরিদের কোন্ কোন্ কাগজে আমার লেখা প্রকাশিত হয়েছে, সে বলে দিতে পারে। তার একটা সাধ আছে ----"ক্ষুধার্ত নির্মল" নামে আমার একটি কবিতা সংকলন করবে।

সত্যি সত্যিই আমি ক্ষুধার্ত।

জল জঙ্গল জমির দিকে আমি হাঁ করে চেয়ে থাকি। মানুষের দিকে চেয়ে থাকি। পলাশ রাঙা ঠোঁটের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে আমার বেলা বয়ে গেল।

অপূর্ব চুপি চুপি হাসে।

সেই কবে আলাপ হয়েছিল প্রেসিডেন্সি কলেজের হোস্টেলে। সে তখন বাংলা পড়ে। তখন তার সঙ্গে আমার নৈকট্য গড়ে ওঠেনি। আমি পুরুলিয়া থেকে গিয়ে বেশিরভাগ দিন হিন্দু হোস্টেলে চিরঞ্জীবের ঘরে। তখন তন্ময়। অচ্যুত। তাদের সঙ্গেও তাদের ঘরে আড্ডা। কবিতা। রাজনীতি। কলেজের ক্লাসের সময় ক্যান্টিন। অদ্রীশ। ব্রাত্য।

মনে পড়ে, একদিন হোস্টেলের দোতলার বারান্দা থেকে চিরঞ্জীব আমাকে দেখিয়ে দিলো--ওই তো অপূর্বদা।

সেদিন কথা বলেছিলাম কিনা আজ আর মনে নেই। মনে নেই, তার সঙ্গে কবে থেকে আত্মীয়তা দীর্ঘায়িত হলো।

এই আত্মীয়তাও দীর্ঘ এক কবিতা। কাব্য নাটকও বলতে পারি। অপূর্ব সারা বছরের বেশিরভাগ দিন আমার সঙ্গে বিরতিতে থাকে। আমি তার বিরতি ভেঙ্গেচুরে তার তৈরি করা নাট্যরূপ ছিঁড়ে ফেলি না। সে অশোকনগর ও বারাসাত এবং ইস্কুল সামলে-সুমলে হাতে পায় না সময়। সম্পর্ক বাঁধনের সময়।

কখনো কখনো দু একদিন বাদে বাদে আমাকে ফোন। আমার মনে প্রফুল্ল জাগে।

আমার এবং আমার পরিবারের আগাগোড়া অপূর্বর চেনা। যেমন সে চিনেছে, বাংলা সাহিত্য। তার সম্পাদনায় মাঝেমধ্যে প্রকাশিত হয়ে থাকে " থির বিজুরি "। খুব অন্যরকম পত্রিকা। গদ্য প্রধান। গভীর। অপূর্ব নিজেকে আড়াল রাখতেই ভালোবাসে। ভিড় থেকে দূরেও থাকে। নিজের যেটুকু কাজ করে যায় নিঃশব্দে।

আমার কোনো বই প্রকাশের আগে আমার চিন্তা, উৎসর্গ করবো কাকে! তো আমি অপূর্বর সঙ্গে আলোচনা করি।

কিছুই তো পারলাম না, এর ওপর তার ওপর নির্ভর করে করে আমার এগিয়ে যাওয়া। এগিয়ে তো যেতেই হবে, অপূর্ব যখন আছে। তাকে বলেওছি, প্রকাশিত অপ্রকাশিত আমার খাতা আমার ডাইরি উত্তমের কাছে। সে যেন আমার মৃত্যুর পর খেয়াল রাখে।

আলো বাতাস খেয়াল রাখে আমাদের। অপূর্ব তো রাখবেই, এ জন্যেই সে অপূর্ব। আর আমি অধম নির্মল হালদার।

আজও একটি কবিতাও লিখতে পারেনি।

-----৩০ পৌষ ১৪২৯ মকর সংক্রান্তি
------১৫----১----২০২৩
------নির্মল হালদার





আমার কবিতা---কাঠবিড়ালির লাফ---৫৯
----------------------------------------------------------

১+১=১ হলেই একটি কবিতা।

একজনের সঙ্গে আরেকজনের শরীর ও মন মিলেমিশে গেলেই, একটি কবিতা।

১+১ =২ হয়ে গেলে সৃষ্টির দিকে যাবে না একটি প্রাণও। যে কারণে নদী যায় সাগরের দিকে। মিলনের দিকে। মাটির কাছেও আসতে হয় সবাইকে। মাটি মিলনের ভূমি।

মাটি সবাইকে ধারণ করতেও পারে।

আকাশেও একটি তারার পাশে আরেকটি তারা। মিলনের আকুতিতে জ্বলে ওঠা। আলো হয়ে ওঠা।

মিলনই হলো, মহাপৃথিবীর কবিতা। মিলনের দিকে যেতে হবেই। একের পাশে এক কখনোই দুই নয়। এখানে মিলন শারীরিক সহবাস নয়। এখানে মিলন, বেঁচে থাকার পাশে বেঁচে থাকা। আর বেঁচে থাকা তো একটাই। সমগ্র পৃথিবীতে একই মাটিতে একটাই নিঃশ্বাস।

সকলের নিঃশ্বাসের সঙ্গে সকলের নিঃশ্বাস যোগ হয়ে ওঠে সারাদিন।

পশু পাখি কীট পতঙ্গ গাছপালা নদী পাহাড় সমুদ্রর শ্বাস-প্রশ্বাস একইসঙ্গে বইছে। একইসঙ্গে মানুষের চলাচলের শব্দ এই জলে হাওয়ায়। মাটিতে। ধূলায়। শুধু মিলন লাগি।

শুধু কি ব্যাঙের সঙ্গে ব্যাঙের মিলন, বর্ষাকালে? ব্যাঙের সঙ্গে মেঘের মিলন। বৃষ্টির মিলন। পাখির ডাকেও থাকে গাছপালার কাছে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। ফুল ফলের কাছে যাওয়ার বাসনা।

যে যেখানেই থাকুক, মিলনের কাছে আগমনের তীব্রতা জেগে আছে চরাচরে। ১+ ১=২ হয়ে গেলে দুর্ঘটনা ঘটবেই, শিল্প আর হবেনা। আমরা তো শিল্প চাই, শিল্পের প্রাণ চাই।

প্রেম থেকেই তো আমার মা দুপুর গড়িয়ে গেলেই, সলতে পাকাতো। সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালাবে। প্রদীপের শিখা উঠে যাবে উর্ধ্বমুখে।

এই ঊর্ধ্বমুখী শিখা , অনির্বাণ শিখা হয়ে ওঠে প্রাণের কাছে।

প্রাণ প্রতিমার কাছে।

-----১ মাঘ ১৪২৯
-----১৬--১--২০২৩
-----নির্মল হালদার




আমার কবিতা---কাঠবিড়ালির লাফ---৬০
----------------------------------------------------------

পাতা ঝরে গেলে বিরহী হয়ে ওঠে গাছ। বিরহ চেয়ে থাকে সকলের দিকে। সকল সুখ দুঃখের দিকে। সকল আনন্দের দিকে।

জল শুকিয়ে গেলে বিরহী হয়ে ওঠে নদী। বিরহ চেয়ে থাকে সকলের দিকে। সকল সুখ দুঃখের দিকে। সকল আনন্দের দিকে।

মেঘ না জমলে বিরহী হয়ে ওঠে আকাশ। বিরহ চেয়ে থাকে সকলের দিকে। সকল সুখ দুঃখের দিকে। সকল আনন্দের দিকে।

পাহাড়ের বিরহ হাজার হাজার বছরের। বিরহ অপেক্ষা করে। অপেক্ষা চেয়ে থাকে সকলের দিকে। সকল সুখ-দুঃখের দিকে। সকল আনন্দের দিকে।

পাখা থেকে পালক ঝরে গেলে পাখি চেয়ে থাকে চরাচরের দিকে।

চরাচরে শূন্যতা। চরাচরে পূর্ণতা।

দুজনেই কুশীলব। নীরব। চেয়ে থাকে সকলের দিকে।সকলের সুখ-দুঃখের দিকে। সকল আনন্দের দিকে।

কুশীলব ছাড়াও মঞ্চ একটি চরিত্র। চেয়ে থাকে সকলের দিকে। সকল সুখ-দুঃখের দিকে। সকল আনন্দের দিকে।

কুশীলব ছাড়া মঞ্চে আলো অন্ধকারের খেলা। আলো অন্ধকার জেগে থাকে।

আলো অন্ধকার প্রকৃতির বিরহ।

প্রকৃতি চেয়ে থাকে সকলের দিকে।

------২ মাঘ ১৪২৯
----১৭---১---২০২৩
----নির্মল হালদার







আমার কবিতা : কাঠবিড়ালির লাফ





আমার কবিতা---কাঠবিড়ালির লাফ---৫১
---------------------------------------------------------

সামাজিক মাধ্যমগুলিতে বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে, কে কোথায় কম্বল বিলি করছে।
কে কোথায় কম্বল বিলি করবে
কবে করবে কোন্ গ্রামে , এই বিজ্ঞাপনও দেখা যাচ্ছে। অহরহ।

শোনা যাচ্ছে, রাতের শহরে রাস্তায় থাকা মানুষদের কম্বল দিয়ে গেছে কোনো কোনো সংস্থা। কোনো কোনো ব্যক্তিও মন্দিরের বারান্দায় শুয়ে থাকা মানুষদের দিয়ে গেছে শীতবস্ত্র।

পুরুলিয়াতে তীব্র শীত।

উত্তুরে হাওয়া বইছে। জাঁকালো হয়ে পড়ছে ঠান্ডা। লেপ-তোষকের শীত সবার জন্য নয়।

ভালোবাসার উষ্ণতাও সকলের দিকে যায় না। কেবল হাহাকার। অভাব । অসহায়তা। দারিদ্র। প্রেম বিলাতে কে আর আছে এদেশে?

সকাল সাতটার আগে রাস্তায় রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে আগুন পোহাচ্ছে অনেকে। হাসি তামাশাও চলছে তার সঙ্গে।

আমি কাছে এগিয়ে গেলাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেঁকে নিয়েছি আমার দুটো হাত। ইচ্ছে করছিল, পা দুটো সেঁকে নিই।

হু হু হাওয়া।

বুকের পাঁজর কাঁপিয়ে দেয়।

ইবার জাড় যা পড়লো ----আর বাঁচবো না ভাই। ই বুড়া বয়সেও কাজ করতে ঘর থেকে বাইরে
আসতেই হলো।
একজন পথচারী আরেকজনকে বলতে বলতে চলেছে কাজের দিকে।

কোথায় কাজ?

এদেশের শীত আর বর্ষা অসহায় করে দেয় অজস্র মানুষকে। সমাধান করতে কে আর এগিয়ে আসে? ব্যক্তি মানুষের উদ্যোগ থেকেও সমাধান করা যায় না। দল থেকে নির্দল থেকেও সমাধান করবেনা কক্ষনো।

মানুষের অসহায়তা শাসক দলের কাছে শোভা। ঐশ্বর্য। যা দেখিয়ে দেখিয়ে ভোট চাইবে।

আমি চা চাইছি এই সকালে। এক কাপ চা না হলে বুকের গুরগুরানি থামবে না।

চায়ের দোকানে দু তিনজন মজুর শ্রেণীর লোক। সামনেই আলুর গোদাম। বর্ধমান ও হুগলি জেলা থেকে আলু আসবে। ট্রাক থেকে বস্তা বস্তা আলু নামাবে এই মজুররা। তাদের খালি গা। হাঁটু অব্দি জড়িয়ে আছে একটা ধুতি। পোক্ত চেহারা।

চা দোকানে এসে দাঁড়ালো উলুক ঝুলুক চেহারার একজন।

শীতে কেঁপে কেঁপে উঠছে। আর চা দোকানীর দিকে হাত বাড়িয়ে ইশারায় চাইছে চা।

দোকানী তরুণ এক যুবক। সে ধুর ধুর করে বলছে, সকালেই ঝামেলা বাবা। এই ক্ষ্যাপাকে আগে তো দেখি নাই! কোথা থেকে এলো রে?

ক্ষ্যাপার দিকে চেয়ে এক মজুর সবার দিকেই একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়---ইয়ার কি জাড় লাগছে নাই ভাই!
তখন আরেক মজুর বলে----
তোর গায়ে তো চাদর নাই, তুই কি দিবি দে----
ই দোকানেতো চুলাও নাই যে বলবো, আগুন পুহা, টুকু আগুন পুহা-----

আমি নিঃশব্দ নীরব।

আমার গায়ের চাদরটা আমি খুলে দিতে পারলাম কই!

মনে পড়ে গেল, পাবলো নেরুদার একটা কথা, যে মানুষ তার পায়ের ছেঁড়া চটিটা রাস্তায় ফেলে দিয়ে আসতে পারবে, সেই প্রকৃত মানুষ।

------২১ পৌষ ১৪২৯
-----৬---১---২০২৩
-----নির্মল হালদার






আমার কবিতা---কাঠবিড়ালির লাফ--৫২
--------------------------------------------------------

অপেক্ষা। কার জন্য অপেক্ষা?

একটা সময় ছিল যখন মহারাজ আমার কাছেই থাকতো। সে কাজে চলে যেত সকালে। ঘরে ফিরতো রাত্রিবেলা। তখন তার জন্য একটা অপেক্ষা আমার ছিল।

আজ কার জন্য অপেক্ষা?

কিছুদিন আগেও বাপি আমার কাছে ছিল। সেও পুরুলিয়া শহরের কাজ ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। এই বাপিও সকালবেলা কাজে বেরিয়ে রাত্রিবেলা ফিরতো। অপেক্ষা ছিল আমার।

আজ কার জন্য অপেক্ষা?

সিঁড়িতে পায়ের শব্দ হলেই, মনে হয় আমার, মহারাজ এলো বুঝি। মহারাজ না হলে, বাপি নিশ্চয়ই আসবে।

কোনো একটা কণ্ঠস্বর পেলেই , মনে হয় আমার, এই তো বাপি আসছে। এখুনি জানতে চাইবে---কী করছেন? আমি তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু বলবো---আয়। আজ এত দেরি হলো?

মহারাজ রাত্রি বেলা ঘরে এসেই, দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়াতো। আমি জিজ্ঞেস করতাম, খাবার খেয়েছিস? সে বেশিরভাগ দিন বলতো----না। খেয়ে আসিনি। আমি বলতাম, টাকা নিয়ে যা হোটেল থেকে খাবার নিয়ে আসবি।

মহারাজ কোথায় থাকে কোন্ দেশে?

মহারাজ ও বাপি দুজনেই গ্রামের ছেলে। কর্ম সূত্রে পুরুলিয়া শহরে এসে আমার কাছে বাসা বেঁধেছিল।

মন বেঁধেছিল কি?

কত সহজেই ওরা চলে গেছে। আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। মহারাজ কোনো যোগাযোগ রাখে না। অথচ ওর জন্যে মাঝেমধ্যেই মন আমার পোড়ে।

সবার মন কি পোড়ে?

বিকেলের পর থেকেই শুরু হয় আজও শুরু হয়, একটা অপেক্ষা। আমার এই অপেক্ষা কি পাহাড়ের মত? অনেকেই আসবে, চলেও যাবে?

পাহাড়কে জড়িয়ে কেউ তো থাকে না। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে দু-একটা গুল্ম লতা, গাছের চারা থাকলেও কতটুকু ছায়া দেয়?

বাপিদের গ্রামে একটা পাহাড় আছে। প্রতিদিন সে দেখতে পায়। অপেক্ষা কি দেখতে পায়? নাকি অপেক্ষা দেখা যায় না?

অপেক্ষার তো অভিব্যক্তি আছে, কেউ কি দেখতে পায় না? নাকি আমার নিজের অপেক্ষা নিজেকেই দেখতে হয়? অপেক্ষার ধূসর এক রঙও আছে। কে দেখতে পায় মহারাজ না বাপি? এক সময় বাবনও ছিল আমার কাছে। সেও স্ত্রী পুত্র সংসার এবং চাকরিতে ব্যস্ত। মনে হয়, ব্যস্ত মানুষরা পাহাড় দেখতে পেলেও পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকে না। পাহাড় তো আর সুগন্ধি ফুল নয়।

অথচ পাহাড়ের কাছে দাঁড়ালেই, একটা বুনো গন্ধ। স্পর্শ নিতে পারলেই টের পাওয়া যায়। এবং গন্ধটা খুব জ্যান্ত।

জ্যান্তরাই তো অপেক্ষা করে।

পাহাড়ও এক জ্যান্ত অপেক্ষা।

মহারাজ চলে যাওয়ার পর অনেকদিন কেঁদেছি। সেই কান্না শুনতে পায়নি কেউ। আর চোখের জলের ভাগ তো কাউকেই দেওয়া যায় না। বাপি তো তবু মাঝেমধ্যে আমার কাছে এসে থাকে। কিন্তু মহারাজ? তার সাড়া শব্দ আমার কাছে একদম নেই। কখনো কখনো তার নিঃশ্বাস শুনতে চেয়েছি মধ্য রাতে। সে যখন কাছে ছিল, তখন ঘুম ভাঙলেই শুনতে চেয়েছি তার শব্দ। আজও ঘুম ভাঙ্গলে ছুঁতে চাই বাপির ঘুমন্ত শরীর। পাশে আছে তো? আমার এই জিজ্ঞাসা আমাকে তোলপাড় করলেও আমাকে একাই থাকতে হয়। প্রতিদিন।

প্রতিটি দিনও শুরু হয় অপেক্ষা দিয়ে। কার অপেক্ষা?কি জন্যে অপেক্ষা? কেনই বা অপেক্ষা? আমি জানি, মহারাজ আসবে না আর। বাপি আসবে না আর। বাবন তার সংসারে।

তারপরেও এখনো সম্পর্ক করতে করতে এগিয়ে যাই।নিজেকে জড়িয়ে ফেলি। ওদিক থেকে হয়তো বা আমার সঙ্গে জড়াচ্ছে না কেউ। অথচ আমি জড়িয়ে-মড়িয়ে অপেক্ষা করছি মুকেশের জন্য। সে কবে আসবে জাজপুর থেকে, পথ চেয়ে বসে আছি। কিরাতের জন্যেও অপেক্ষা থাকে আমার। অনেকদিন অনেকে আসছে না, শুরু করলাম ডাকতে----এসো এসো----এসো আমার ঘরে।

অপেক্ষা অপেক্ষা।

অপেক্ষা ছাড়া যে বাঁচাও যাবে না।

গ্রীষ্ম তো চেয়ে থাকে বৃষ্টির দিকে।
মেঘের পথের দিকে।
গ্রীষ্ম কি চেনে মহারাজ? বাপি? বাবন?

এদের মুখ মাঝেমধ্যে আবছা হয়ে গেলেও আমার চোখ আমি মুছে নিই। আমার মন আমি মুছে নিই।

অপেক্ষা, একটা কাজও। নিঃশব্দের কাজ। লোকে দেখতে পায় না। লোকে অবশ্য অনেক কিছুই দেখতে পায় না। যেমন আমাকে দেখে , আমার বাইরেটা দেখে। ভেতর অব্দি দেখতে পেলে আমার অপেক্ষাও দেখতে পেতো।

কত কতদিন সোমদত্তার খবর নেই। কী করছে কোথায় আছে কিছুই জানি না। সে কি আসবে না আমার কাছে আর? শব্দ করবে না? শব্দ পাঠাবেও না?

আজ আকাশটা নীল হয়ে আছে। শ্যাম বর্ণ রাখাল হয়ে কার জন্য অপেক্ষা করছে?

রাধা কি আসবে আজ একটি কবিতা হয়ে?

-----২২ পৌষ ১৪২৯
-----৭---১---২০২৩
-----নির্মল হালদার







আমার কবিতা---কাঠবিড়ালির লাফ ---৫৩
----------------------------------------------------------

শিশুদের পড়াবো। এই বাসনা থেকে ঘরের তিনটি শিশু নিয়ে আমার স্কুল খুলেছি। বেলা বারোটা থেকে প্রায় দেড়টা পর্যন্ত।

প্রথাগত শিক্ষার বাইরে ওদের কিছু শেখাতে চাই। কিন্তু কী শেখাবো? মটরশুঁটির ভেতরে কটি দানা থাকে না জানলেও চলবে ওদের। শিমের ভেতরে কটি বীজ থাকে শিশুরা না জানলেও বড় হয়ে যাবে। কোন্ নক্ষত্রের পাশে কোন্ নক্ষত্র আমি তো নিজেই জানি না। আমি কী শেখাবো ওদের! মাছের সাঁতার, ঘন্টা মিনিটে কত বেগ আমার জানা নেই। পাখি কত বেগে উড়তে পারে আমার জানা নেই একটুকুও।

তাহলে আমার স্কুল কেন?

আমি সময় কাটাতে স্কুল খুলেছি?

শিশুর মন পড়তে স্কুল খুলেছি?

নিজের ধৈর্য পরীক্ষা করতে স্কুল খুলেছি? নাকি নতুন করে আরেকবার বর্ণপরিচয় ধারাপাত পড়তে চাই?

অ-এর পরে আ মনে থাকলেও মনে নেই চন্দ্রবিন্দুর আগে কোন্ অক্ষর আছে!

ওদের কী শেখাবো?

ওরা জানে আকাশের রঙ নীল। মাটির রঙ জানে না। আমাকে প্রশ্ন করলে, চুপ থাকতে হবে। একটা কিছু বানিয়ে বলে দিলে, নিজের কাছেই নিজে অপরাধ করবো। ছোট হয়ে যাব শিশু মনের কাছে। ওরা আমার কাছে ভুল শিখুক, এ আমি চাই না।

আমি স্কুল খুলেছি।

নদীর জল বহমান। নদীর জল থেকে মানুষ উপকার পেয়ে থাকে। চাষবাস থেকে শুরু করে নদীর জলে স্নান। নদীর জল পানও করে মানুষ। নদী থেকে মাছ ধরা। এবং মাছ বিক্রি করে জীবিকা, এ কথা তো অন্য পাঁচজনেও বলবেন।

আমাকে নতুন কিছু শেখাতে হবে।

কিন্তু আমি কী জানি?

সরষে ফুল হলুদ রঙের। আর কোন্ কোন্ গাছের ফুল হলুদ হয় না বললে, অসমাপ্ত থেকে যায় আমার শিক্ষাও।

তাহলে কি বলবো, আসলে শিশুদের স্কুল খুললেও আমি আমার জন্যেও স্কুল খুলেছি?

আমাকেও পড়তে হবে ইতিহাস ভূগোল বিজ্ঞান। আমাকে খুঁজতে হবে অঙ্ক। আকাশের রহস্য। মেঘের চরিত্র জেনে মাটির হালচাল জেনে নিতে হবেই।

কার কাছে?

বই বই বই। অসংখ্য বইয়ের কাছে আমার শিক্ষা। এর পরের প্রশ্ন, আমি শিক্ষিত হতে চাই কিনা নাকি বিশ্বস্ত সূত্রে সবকিছু জেনে নিলেই হবে?

পালক প-টা পরিষ্কার লিখতে পাচ্ছে না। তাকে দেখিয়ে দিতে হবে, প -টা কীভাবে টানলে বোঝা যাবে, এইটা প। ড় ঢ় এর তফাৎ কোথায় কেন , আমি জানলে ওরাও জানবে।

আমি ওদের গাছ চেনাতে চাইলে, আমাকে চিনতে হবে আগে। আমি বটপাতা চিনলেও আমি কি জবা গাছের পাতা চিনি?

বট-অশ্বত্থ নাম দুটো একসঙ্গে উচ্চারণ করলেও দুটো গাছের পাতার গড়ন যে আলাদা কেমন করে বোঝাবো?

শিশুদের নিয়ে যেতে হবে গাছের নিকটে।

গাছ কোথায় আছে? কত দূরে?

আমার শহরে গাছ আছে তো?

সমস্ত জানতে হবে। তারপরে স্কুল।
শিশুদের স্কুল।

আমারও স্কুল।

পাহাড় জঙ্গলে কারা থাকে? পশু পাখি তো থাকেই, মানুষও থাকে একথা না বললে অসম্পূর্ণ থেকে যায় ইতিহাস।

রাজা--রাজড়ার ইতিহাস তো পরের কথা, আগে মানুষের ইতিহাস ওদের বলবো কখনো কোনোদিন। ওরা বড় হোক।

না, বড় নয়। আগে মানুষ হোক।

বড় হওয়া মানে তো কাউকে ছোট করে বড় হওয়া। আগে মানুষ হতে হবে। প্রকৃত মানুষ।

পালক ইনো নোলক এই তিন শিশুর কাছেও আমি শিখি। ওদের কাছেই শিখতে ইস্কুল খুলেছি। ওদের সঙ্গেই যাব কাকের বাসায়। ওই বাসাতেই কোকিলের ছানা।

ওদের বলছি, হাতের লেখা অভ্যাস করো। আমাকেও অভ্যাস করতে হবে। হবে না?

বদভ্যাসও ত্যাগ করতে হবে। ওদের বলার আগেই , যত্রতত্র থুথু ফেলবো না। গাছের পাতা ছিঁড়বো না কোনোভাবেই। অযথা ঢিল ছুঁড়বো না কুকুরের দিকে।

শিশুদের যা বলবো তা যেন নিজে না করি। মনে রাখতে হবে অবশ্যই।

যোগ বিয়োগ গুন ভাগ আমার কি শেখা আছে?

কবিতাও তো একটি অঙ্ক। আমি একেবারেই জানি না। যে কারণে লিখতে পারলাম না আজও একটি কবিতা।

-----২৪ পৌষ ১৪২৯
-----৯---১---২০২৩
-----নির্মল হালদার






আমার কবিতা---কাঠবিড়ালির লাফ--৫৪
---------------------------------------------------------

পায়রা উড়ে গেলে হাওয়া ছড়িয়ে যায়। শুধু পায়রা কেন যে কোনো পাখি উড়ে গেলেই, হাওয়া ছড়িয়ে যায়। আমি তবে পায়রার কথাই বলবো, ওরা প্রতিদিন আমাদের ছাদে এসে মুড়ি খেয়ে যায়।

সকালে এবং দুপুরে।

যেদিন সকালে উঠতে আমার দেরি হয়, ওরা ডেকে ডেকে আমাকে ঘুম থেকে ওঠায়। আমি তড়িঘড়ি উঠে ওদের খাবার দিয়ে আসি। অনেক সময় খাবার দিয়ে আসবার পর কোনো কাজে ছাদে উঠলে দেখতে পাই, মুড়ি খুঁটছে পায়রার দল। আমাকে দেখতে পেয়ে উড়ে গেল। তখন আমার মনে পড়ে যায় বিনয় মজুমদার---

মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়।

এইখানে "প্রকৃত "শব্দটি লক্ষ্য করার মত। "প্রকৃত" কেন? "প্রকৃত" বলতে কবি কি অর্থ বলতে চাইছেন?

আমরা তো অনেক সময় অনেক জায়গাতে "প্রকৃত মানুষ" শব্দবন্ধটি ব্যবহার করে থাকি। সবাই নিজের মতো করে "প্রকৃত মানুষ" কেমন হয় কেমন হবে, আমরা জানি।

এখানে তো "প্রকৃত সারস "।

আমি চুপ করে বসে থাকি।

প্রকৃত সারসের রহস্য উন্মোচন করতে চাইলেও করে উঠতে পারি না।আমি  আমার  বন্ধু দুর্গা দত্তের কাছে আমার প্রশ্ন রাখতেই, সে বললো----প্রকৃত সারস হলো, নিহিত এক নির্জনতা। নিহিত এক আনন্দ। নিহিত এক উন্মুক্ত পৃথিবী। সেই পৃথিবীর নির্জনতা আনন্দ এবং উন্মুক্ত উড়াল ধস্ত হয়ে পড়ে মানুষ নিকটে গেলে।

পায়রা, আমার চেনা পায়রার দল, লোকালয়ে থাকলেও তাদের বসবাস নিভৃত নির্জনে। যতই তারা লোকালয়ে খাদ্যের সন্ধানে আসুক, তারাও নির্জনতা প্রিয়। মাটিতে ঘোরাফেরা করলেও তারাও আকাশের দিকে চোখ রাখে।

মুক্তির বন্ধন, বন্ধনের মুক্তি ওরাও জানে। ওরাও জানে, মানুষ বড় বাক সর্বস্ব। বাচাল। সেই বাচালতা থেকেই মানুষ ছিঁড়ে ছিঁড়ে ফেলে নির্জন নীরবতা।

নীরবতাও এক ধ্যান।

নীরবতাও এক কবিতা।

----২৫ পৌষ ১৪২৯
----১০--১--২০২৩
----নির্মল হালদার






আমার কবিতা---কাঠবিড়ালির লাফ---৫৫
----------------------------------------------------------

ভালোবেসে ভুল করেছি।

চারদিক থেকে হা হা হা------

আমি তো উচ্চারণ করিনি। আমি তো মনে মনে বলেছি, ভালোবেসে ভুল করেছি। তবুও শুনতে পেলো? কারা শুনতে পেলো?

চারদিক থেকে হা হা হা

সময় যে কি আমার কাছে স্পষ্ট হয় না। শুধু আমার শরীরে বিঁধছে, হা হা হা।

আমি যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে উঠি। অথচ চিৎকার করতে পাচ্ছিনা। আমি বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলেও কেউ আমার পা টেনে ধরছে। দম বন্ধ লাগছে আমার। মনে হচ্ছে, আমার চারপাশে কিছু নেই , শুধু হা হা হা। হা হা হা। হা হা হা।

ভয়ঙ্কর।

একটা শাল গাছ আঁকড়ে ধরলে যন্ত্রণা থেকে উপশম পাবো, এই মনে করে কল্পনা করি শাল গাছের।

ধূলি ঝড় ওঠে। 

আমাকে ঢেকে ফেলে ধুলোবালি ময়লা। অন্ধকার। আমি হোঁচট খেয়ে পড়ে যাই।

কোথায় পড়ে যাই টের পাই না। আমার কাছে এসে দাঁড়ায় না কোনো কণ্ঠস্বর। কেবলই আমার চারপাশে ঘুরপাক খায় আমার নিঃশব্দ উচ্চারণ : ভালোবেসে ভুল করেছি।

কাকে ভালোবেসেছি? কাকে ভালোবেসেছিলাম? কার রঙে রঙিণ হয়ে রঙের ফোয়ারা উড়িয়েছি?

আজ যদি বলি, ভালোবেসে ভুল করেছি? ভালবাসা থেকে আমার পিঠ দেয়ালে ঠেকেছে? 

আমার কপাল থেকে রক্ত ঝরে। রক্তের রঙ ? আমার কাছে পরিষ্কার লাগছে না। নিজের বুক চিরে দেখতে ইচ্ছে করছে, কে কে আছে ভেতরে। যদি আজও কেউ থাকে, তাকে দেখাতে হবে তার নিজের পথ।

এতই সহজ কি?

এত সরল কি?

আমার সারা শরীরে ঘাম। আমি উদ্বেগে উদ্বেগে ছটফট করি। আমার  সামনে এসে দাঁড়ায় এক নদী। আমাকে ডুব দিতে বলে। একটা নয় তিনটে ডুব।

আমি ডুব দিয়ে উঠতেই দেখতে পাই , একটি কচি পাতা আরেকটি কচি পাতার সঙ্গে জড়িয়ে ভেসে ভেসে যায়।

এও কি মিলন?

আমার মনে পড়ে গেল, বেহুলা লখিন্দর। ওরা তো ছিল যৌবন। ওরা তো ছিল সময় উত্তীর্ণ প্রেমের চুড়ান্ত এক রূপ।

আমিও যৌবন। কতটুকু?

আমার মনে পড়ে গেল রবীন্দ্রনাথ ও রাণুর প্রেম। আবার এও ঠিক মনে পড়লে হবেনা। কারণ একটাই, সৌন্দর্যকে ধরে রাখতে হলে শোষন চাই। গাছ যেমন  মাটি থেকে শুষে নেয় সমস্ত রস।

আমি কোনো কিছুই শুষে নিতে পারিনি এ আমার দোষ। আমাকেতো বলতেই হবে-----

দোষ কারো নয় গো মা
আমি স্বখাত সলিলে ডুবে মরি শ্যামা।

-----২৬ পৌষ ১৪২৯
-----১১---১---২০২৩
------নির্মল হালদার







আমার কবিতা : কাঠবিড়ালির লাফ





আমার কবিতা----কাঠবিড়ালির লাফ----৪৬
------------------------------------------------------------

গোলবেড়া কোন্ দিকে?
পুরুলিয়া এক নম্বর ব্লক নাকি দু'নম্বর ব্লক? বাস রাস্তা আছে?

কী আছে না আছে কিছুই জানিনা! জানি শুধু, নিশ্চিতভাবেই জানি, অনেক ঘরেই সজনে গাছ আছে। দেখতেও পাচ্ছি, শীতের হাওয়ায় ঝরে যাচ্ছে সজনে ফুল।

সজনে ফুল কারোর পূজায় লাগে না। এই কারণেই, অভিমান থেকে সজনে ফুল ঝরে ঝরে মাটির কাছে নিবেদিত হয়।

মাটি প্রথম দেবী। মাটি ধরিত্রী।

অনেক অনেক গ্রাম। অনেক অনেক মানুষ। যে যার মত বেঁচে থাকার চেষ্টা। করে। নিজস্ব ঘরানায়।

অনেকের জমিতেই পড়ে আছে কাটা ধান। দেখতে পাই, ধানের নতুন মুখ। খড়ের চিকন রূপ।

পায়রা এসে খুঁটে খুঁটে চলে যাচ্ছে। হাওয়া এসে গন্ধ নিয়ে চলে যাচ্ছে। মাথার উপরে ঘুরছে বক। কোনো বুড়ি যাচ্ছে ঘরের দিকে। মাথায় কাঠ-কুটোর বোঝা।

এই বোঝা আমারও মাথায়।

এখান থেকেই তো কবিতার শুরু।

বুড়ির মাথা থেকে বোঝার ভার আমার মাথায় নিয়ে আমিও তো চলেছি। কোথায় থামবো, আমার জানা নেই। কোথায় তৃষ্ণা মিটবে, আমার জানা নেই।

হেঁটে যেতেই হবে।


কাঠবিড়ালির এক একটি লাফ এক একটি শব্দ।নিঃশব্দ। আমাকে তুলে নিয়ে বসাতে হবে আমার জমিতে।

জমি যদি না থাকে?

বুকের অন্দরে সঞ্চয় করে রেখে যাওয়াই আমার প্রধান কাজ। আমার বুকের অন্দরই প্রকৃতির অন্তর।

আমি নিজেই তো শীত গ্রীষ্ম বসন্ত। বর্ষা হেমন্ত শরৎ আমি নিজেই। রঙে রসে, ফুলেফলে পাতায় পাতায় কাব্যের সুষমা।

এইতো আজকেই দোলবেড়ার মাসির সঙ্গে এক বছর পর দেখা হলো। বাজারে। আমাকে দেখে, মাসির এক মুখ হাসি।

আমি জানতে চাইলাম---কিগো মাসি, এতদিন যে আসো নাই? কী হয়েছিল তোমার? উত্তরে মাসি আমাকে বললো----আমার ঘরে তো সবজি নাই। বেটারা চাষও করে নাই। চাষমোড় থেকে সবজি কিনে বাজারে বিক্রি করি। একথা বলতে বলতেই, মাসি আমার ব্যাগে দু তিন আঁটি সজনে ফুল ঢুকিয়ে দিয়েছে ।

সকালবেলা।

সকাল বেলার শুভ্রতা। উপহার না বলে বলতে চাই, সৌন্দর্য। আরো বলতে পারি, সজনে ফুলের মত শব্দ। নীরবতাও বলতে পারি।

আমার কবিতা হয়ে ওঠে।

গোলবেড়ার মাসির হাত ধরে যে কবিতা এসেছে সকাল বেলা। আমারই কাছে।

সজনে ফুলের মত পবিত্র ও সুন্দর।

-----১৪ পৌষ ১৪২৯
-----৩০---১২---২০২২
-----নির্মল হালদার






আমার কবিতা---কাঠবিড়ালির লাফ---৪৭
---------------------------------------------------------

তুই নেই।
আছে নিত্য দিনের বাজার।
আছে বেচাকেনা। ধুলো ময়লা কালি।
আছে কোলাহল।

তুই নেই।
জবা ফুলের রেণু উড়ছে।

আমারই রক্ত কণা উড়ছে।

তুই নেই।
আকাশ আকাশেই আছে।
মানুষও আছে মানুষের জায়গায়।
সততা অসততা নিয়ে।
প্রেমে ও অপ্রেমে।

নিত্যদিনের বাজারে আমাকে যেতেই হয়, যত না দরকার থাকে, তার চেয়ে বেশি মনের টানে যাই।

নেশার টান।

অনেকের সঙ্গে দেখা হবে।

আজ কি কথা বলছে আলু বেগুন পটল মুলো, কি কথা বলছে উচ্ছে থেকে মটরশুঁটি শোনার আগ্রহ থেকে আমি যাই।

যেমন, রাতের এক একটি নক্ষত্রের সঙ্গে এক একটি কীটপতঙ্গের কথা হয়। সেইসব কীটপতঙ্গ দিনের বেলা অপেক্ষা করে, কখন কোন্ তারা ফুটে উঠবে।

আমার কাছে সেরকমই প্রতিদিনের শাকসবজি।ফুলকপির সঙ্গে এক রকম কথা বললে, বাঁধাকপির সঙ্গে আরেকরকম কথা। ধনে শাকের সঙ্গেও আমি কথা বলি, সবুজ স্বরে। কচি গলায়।

ওই মাহাত বুড়ির সঙ্গে কথা হয় না আমার। তাকে দেখি না যে এমনটা নয়। কিন্তু কথা হয়না। মুদি বুড়ির সঙ্গে দু একটা কথা বলি। তার কাছে টমেটো বা পালং শাক না কিনলেও দু একটা কথা বলে, আনন্দ পাই।

শুধু মাহাত বুড়ির সঙ্গেই কথা হয়না। তো এই মাহাত বুড়ি আজ হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বললো---- আমার কাছ থেকে কিছু না কিনো বাবু, মু-য়ে যে রা কাড়ো নাই-----।

সঙ্গে সঙ্গে আমি থমকে গেছি। সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত কোলাহল স্তব্ধ হয়ে গেছে। যেন বা একইসঙ্গে আকাশ ও মাটি আমাকে বলছে--মু--য়ে যে রা কাড়ো নাই।

আমার মনে হলো, এ অভিমান যেন চরাচরের। মনে হলো, এ অভিমান যেন একটি কবিতা।

দিক থেকে দিকে ছড়িয়ে পড়ছে এই অভিমান---- মু-য়ে যে রা কাড়ো নাই----।

এ অভিমান আমি রাখবো কোথায়?

-----১৬ পৌষ ১৪২৯
----২--১--২০২৩
-----নির্মল হালদার






আমার কবিতা----কাঠবিড়ালির লাফ---৪৮
-----------------------------------------------------------

৮৪--তে মাধ্যমিক পাশ করেই এক ঝাঁক তরুণ আমার কাছে। নাকি তাদের কাছে আমি?

আমার তখন ডামাডোল অবস্থা। একদম একা হয়ে গেছি। সৈকত চলে গেছে পুরুলিয়া ছেড়ে কলকাতা। হতাশা থেকে হতাশায় আমি। অবসাদেও ভুগছি। তখনই উজ্জ্বল রায়। পুরুলিয়া জিলা স্কুল। মাধ্যমিক পাশ করে গেছে। সন্দেশে গলি দিয়ে স্কুলে তার যাওয়া আসা। ক্লাস ইলেভেন। সায়েন্স। আমি তখন দুপুরের পর পরেশের সবজি দোকানে সময় কাটাই। উজ্জ্বলকে দেখতাম। একদিন তার রাস্তা আটকে আলাপ। সেই আলাপ থেকে আলাপ তার আরো অন্যান্য সহপাঠীদের সঙ্গে। প্রথমেই আলাপ হয়েছিল রামাশিসের সঙ্গে। অমিতাভের দিওয়ার দেখতে গিয়ে। আমার সঙ্গে আলাপ হতেই রামাশিস উজ্জ্বলকে বলেছিল----এই লোকটার সঙ্গে তোর আলাপ হলো কি করে? লোকটা তো ফুটবল মাঠে মারপিট করে।

মারপিট এখনো করি। হাতে নয়। মুখে। কবিতার মাধ্যমেও আক্রমণ করে থাকি কুৎসিত ব্যবস্থাকে। কদর্য প্রশাসনকে। বন্ধুদেরও গালাগাল করে থাকি। গালাগাল না করলে আমার রক্ত শান্ত হয়ে ওঠে না।কেন না, আমি একই সঙ্গে সাপের মুখে চুমু ব্যাঙের মুখে চুমু খেতে পারি না। তার ফলে, অনেকের কাছেই আমি শত্রু হয়ে গেছি। উজ্জ্বল রামাশিস ও ময়ূখের কাছে আমি অবশ্যই বন্ধু। আজও আমি বন্ধু। আরো বন্ধু হয়ে গেলাম সাধন সন্দীপ স্বরূপের কাছে। ওরাও তখন মাধ্যমিক পাশ করে ক্লাস ইলেভেন। আর্টস। ভিক্টোরিয়া স্কুল।

একসঙ্গে এক ঝাঁক তরুন।

বিকেল হলেই বটতলা। এবং বটতলা হয়ে গেল ছাতিমতলা।

আমার তখন ঘর নেই। শুধু বাহির। বাহির আর বাহির।সকাল দিকেও কারো কারো সঙ্গে ছাতিম তলায়।

আমাদের সঙ্গে একই সারিতে মুটে মজুর। তারা এখান থেকে নানা জায়গায় কাজে চলে যেতো। একইসঙ্গে চা বিড়ি। রামাশিস অবশ্যই চারমিনার। আর চায়ের পর চা। বাবলুর চা। ছাতিমতলা সংলগ্ন তার চায়ের গুমটি।

রঙ্গ রসিকতা। কথার পরে কথা। কবিতা। গান। কুইজ। প্রায় সবারই কোনো না কোনো দিন জন্মদিন উদযাপন। ছাতিমতলাতেই।

সেই ছাতিমতলার ছেলেরা কে কোথায় আছে আমার সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই । শুধু উজ্জ্বল। রামাশিসের সঙ্গে কখনো সখনো দেখা হয়। চা হয়। সে এখনো প্রাণবন্ত। দুবাইয়ে থাকে ময়ূখ। চাকরির সুবাদে এ দেশ ও দেশ ঘুরে বেড়ায়। তার সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয়। সে ছোট ছোট গল্প ও গদ্য পাঠিয়ে থাকে আমাকে।

সাধন কোথায় থাকে?

সাধন সন্দীপের পরে আলাপ হয়েছিল মিন্টু ও রূপকুমারের সঙ্গে। মিন্টুর মতো স্মার্ট ছেলে আমি কম দেখেছি। কথাবার্তায় আচরণে সে ছিল সব সময় এগিয়ে। রূপকুমার আবার শান্ত স্বভাবের। মৃদু ভাষী।

আমি আবার খুব কথা বলি। কম কথাও বলি। এখানে বলতে চাই অন্য এক কথা---------রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে ভালবাসি। কিন্তু শুনবো কোথায় কার কাছে?

ময়ুখের বাড়িতে দেখেছি, সে অঙ্ক করতে করতে টেপ রেকর্ডার থেকে গান শোনে। তাকে কোনোদিন আমার জড়তা থেকে বলতে পারিনি গান শোনাও। শুনেছিলাম, সাধনদের বাড়িতে টেপ রেকর্ডার আছে।একদিন তাকেই বললাম, তোমাদের বাড়ি যাবো। গান শোনাতে হবে। তারপর প্রায় দিন বিকেলে সাধন আমাকে তাদের বাড়ি নিয়ে যেত। তারপর যন্ত্রে বেজে চলতো গান। আমার পছন্দের রবীন্দ্র সংগীত।

আজও বেজে চলেছে ------
আজি বিজন ঘরে নিশীথ রাতে
আসবে যদি শূন্য হাতে-----

------১৮ পৌষ ১৪২৯
-----৩--১--২০২৩
----নির্মল হালদার





আমার কবিতা----কাঠবিড়ালির লাফ---৪৯
-----------------------------------------------------------
( উৎসর্গ : দুর্গা দত্ত ও রামানুজ মুখোপাধ্যায় )

নানা রূপে ঔদ্ধত্যের প্রকাশ।

কথাবার্তা থেকে আরম্ভ করে আচরণেও ঔদ্ধত্য। ঔদ্ধত্যকে অশ্লীলতাও বলতে পারি। সামাজিক ঔদ্ধত্য ব্যক্তি মানুষের ঔদ্ধত্য কখনো কখনো মৌলবাদের দিকে চলে যায়। ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। সন্ত্রাস ছড়ায়।

আমাদের দেশে ব্রাহ্মণ্য বাদও ধারাবাহিক সন্ত্রাস। কত রকম নিয়ম-কানুন। বিধি নিষেধ। নিয়মের আবার ছাড়ও আছে, মূল্য ধরে দিতে হয়। আসলে, শোষণ। সন্ত্রাস এবং শোষণ। যা সমগ্র ভারতবাসীকে ধ্বংস করার পক্ষে যথেষ্ট।

এখনো দেখা যায়, কারোর বাড়িতে কোনো ফলন হলে প্রথম ফলনটি মন্দিরে দিয়ে আসতে হয়। অথবা ব্রাহ্মণের ঘরে। বিশেষ করে গ্ৰামাঞ্চলে।

বাড়িতে কুল গুরু এলে তাকে পা ধোওয়াতে হবে। নিয়ম হয়ে আসছে যুগের পর যুগ। সেই পা ধোওয়া জল মুখে নিতেও হবে।

সভ্যতা কি এই?

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আজ কোন্ দিকে চলেছে?

প্রণাম করার রীতিও ব্রাহ্মণ্যবাদের আরেকটি রূপ। পায়ের তলায় থাকতে হবে। বরাবর। রাজাও প্রনাম করবে ব্রাহ্মণকে।

মানুষটির প্রতি আমার ভক্তি নেই শ্রদ্ধা নেই, আমি চিনিনা জানিনা, প্রণাম করতে হবে। এই অলিখিত নিয়ম যুগের পর যুগ মানুষকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। অন্য কোনো দেশে প্রণাম করার রীতি নেই। সম্ভাষণ আছে নমস্কারে। করমর্দনে। আলিঙ্গনেও। কপালে চুম্বন এঁকেও স্বাগতম জানানো হয়। ভালোবাসা জানানো হয়।

প্রকৃতি থেকে বিযুক্ত ক'রে মানুষকে শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটা প্রয়াস, ব্রাহ্মণ্য বাদ।

উপবীত একটি চাবুক। ভয় দেখানোর চাবুক। অদৃশ্য উপবীত ভয়ঙ্কর চাবুক। একথা তো কোনো না ভাবে রবীন্দ্রনাথও বলে গেছেন।

-----১৯ পৌষ ১৪২৯
-----৪---১---২০২৩
------নির্মল হালদার





আমার কবিতা--কাঠবিড়ালির লাফ--৫০
--------------------------------------------------------

কাকা কাকা
কাকা কাকা
কাকা কাকা

সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে একটা ডাক---- কাকা কাকা-----

সেই ২০০৯ --এ শুরু হয়েছে, আজও সেই ডাক---- কাকা কাকা----

আলো নেই অন্ধকার নেই শুধু একটা ডাক। একটানা।

সাড়া দিতেও পারি না। কে যেন আমার গলা টিপে ধরেছে। আমি গোঙাচ্ছি। আমি ছটফট করতে করতে ঘেমে উঠছি খুব।

সাড়া দিতে পাচ্ছিনা।

সময় নেই অসময় নেই শুধু একটা ডাক সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে----- কাকা কাকা----

সিঁড়ির কি শেষ নেই? কোত্থেকে শুরু হয়েছে সিঁড়ি?ডাকটা ঘরের কাছে এসে দরজার কাছে এসে একবারও দাঁড়ায় না। কেবল সিঁড়ি দিয়ে উঠছে ডাক--- কাকা কাকা---

আমি পৌষের সিম ফুলের রঙে বসতে পাচ্ছিনা। পেঁয়াজের জমি কাছে এসেও সরে সরে যায়।

গাঁদা ফুলের গাছগুলি অন্ধকার লাগছে কেন? নদী পাড়ে বালি না মরীচিকা? ঝর ঝর করে ঝরে পড়ছে নিম ফল। অথচ এই শীতে একটিও নিম ফল নেই।আমলকির ডালে ডালে হাওয়া নেই। আছে শুধু একটা ডাক---- কাকা কাকা...

কেন এই ডাক? আমার কাছে কি কোনো প্রাপ্তি আছে? দেবার মত আমার কাছে কিইবা আছে আর?

ডাকটা যে যৌবনের কণ্ঠস্বর থেকে আসছে, আমি স্পষ্ট এ বিষয়ে। কাকেই বা প্রশ্ন করবো, এই ডাক কি আমার সন্তানের?

আমি জানি, আমার কোনো সন্তান-সন্ততি নেই। আমি জানি, আমার কোনো উত্তরাধিকার নেই।

তারপরও একটা ডাক---কাকা কাকা-----। অন্ধকার সিঁড়ি ভেঙ্গে, একটানা।

আমি সাড়া দিতে না পেরে গোঙাচ্ছি , দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার। হঠাৎ মনে হলো, একটা টেবিলের ওপারে আমার চেনা একজন। আমার আত্মীয় একজন। তার মুখ স্পষ্ট নয় একেবারেই। আমাকে বলছেও না কিছু। আমি তাকে ছুঁতেও পাচ্ছিনা। মনে হলো, অন্ধকার আমাকে গ্রাস করছে। আবার সেই ডাক-----কাকা কাকা----

এইখানে আমার কবিতা শুরু।

সমাপ্তি নেই।

-----২০ পৌষ ১৪২৯
----৫--১---২০২৩
----নির্মল হালদার







আমার কবিতা : কাঠবিড়ালির লাফ




আমার কবিতা : কাঠবিড়ালির লাফ ---৪১
---------------------------------------------------------

হাত পাততেই ছোলা সেদ্ধ।

কোনো ভূমিকা করিনা। সোজাসুজি হাত পেতে দিই। তৎক্ষণাৎ বালতি থেকে এক মুঠো ছোলা আমার হাতে এসে যায়।

রোজ রোজ নয়। যেদিন দেখতে পাই বাজারে। সে অবশ্য বাজারে আসে প্রতিদিনই। তার থলিতে থাকে মুড়ি। বালতিতে থাকে ছোলা সেদ্ধ। ছোট্ট এক ঠোঙায় ছোলা সেদ্ধ আর মুড়ি মাত্র পাঁচ টাকা।

সবজি বিক্রি করতে আসা মহিলা পুরুষ প্রায় সবাই নিয়ে থাকে।

সে আমাকে অনেকবারই বলেছে তার নাম তার গ্রাম।আমি ভুলে যাই। আজ স্বপন চক্রবর্তীর সঙ্গে মোবাইলে কথা বলতে বলতে দেখলাম, সে আসছে। আমি কথা বলতে বলতেই, হাত পেতেছি। এবং আমার হাত পাতা নিয়ে স্বপনকে বললামও। তখনই মনে হলো, নামটাও জানিয়ে দেওয়া দরকার। আমি জিজ্ঞেস করতেই, তার মুখে এক চিলতে হাসি। সে জানালো, তার নাম, মানিক কুমার। বাড়ি----সটরা --মিশিরডি।

পুরুলিয়া শহর থেকে দূরত্ব ১৫ কিলোমিটার। মানিক ভোরের আঁধারে ঘুম থেকে উঠে মুখ হাত ধুয়ে বাসে উঠে পড়ে। শহরেই তার খদ্দের। যেটুকু রোজগার হয় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে।

আমাকে সে চেনে না। কোথায় থাকি কি করি কিছুই জানে না। জানে শুধু, আমি হাত পাতি।

শুধু কি মানিকের কাছে হাত পাতি? যে পেয়ারা বিক্রি করছে তার কাছে গিয়েও হাত পাতি। নিজের জন্য নয়, একটা পেয়ারা পালককে দিলে দেখতে পাবো খুশি।

এখুনি অনেকেই প্রশ্ন করবেন, নির্লজ্জের মত বেহায়ার মত আমি হাত পাতি কেন? আমি কোনো উত্তরই দিতে পারবো না। কেউ কেউ আমার আচরণে ক্ষুন্ন হয়ে আমাকে নিষেধ করবেন, হাত পাততে। আমি কিন্তু নিষেধ না শুনে, সিঁয়াকুল চাইবো আরেকজনের কাছে। হাত পাততে পাততেই ধুলোবালি পাবো। মাটি পাবো।

ভালোবাসা কি পাবো না?

যদি হাত পাতলে মুখ ঝামটা আসে? আসতেই পারে। আসেও। আমার হাত পাতাই থাকে।

আমার হাতে বৃষ্টিও পড়ে। শুধু কি আর বৃষ্টি, মেঘ বৃষ্টি একই সঙ্গে আমার হাতে পড়ে।

আকাশটা পড়লে আমার হাতে ধরতে পারবো বৈকি। যদি গাছপালার ছায়া পড়ে, মানুষের ছায়া পড়ে, নিজের মতো করে ধরবো। পুঁটলিতে বাঁধবো না।

বাঁধাবাঁধির  স্বভাব করলে আরেক বিপদ। মানিক আমাকে যেটুকু ছোলা সেদ্ধ হাতে দেয় আমি সঙ্গে সঙ্গে মুখে নিয়ে থাকি। একেও যদি কেউ বাঁধাবাঁধি বলে বলতেই পারে। তবে মানিক কি বলবে আমি জানিনা। জানতেও চাই না, আমার হাত পাতা নিয়ে তার ভাবনা। আমি বরং বলতে চাই, একদিন তার বাড়ি যাবো। সবার সঙ্গে কথা বলতে বলতে দেখতে পাবো নিশ্চয়ই, মানিকদের ঘরে ও বাইরে ছোলা থেকে অঙ্কুর প্রকাশিত হয়ে আকাশের দিকে।

অঙ্কুর যেন বলছে-----এই নাও এই নাও আমার সম্পর্ক।

আমারও আকাঙ্ক্ষা।

----২৮ অঘ্রাণ ১৪২৯
----১৫---১২---২০২২
-----নির্মল হালদার






আমার কবিতা: কাঠবিড়ালির লাফ --৪২
-------------------------------------------------------

অভাব তো থাকেই।

কারো কারো সঙ্গে অভাব থাকে।
সকলের সঙ্গে থাকে না।

পুরুলিয়ার সবার সঙ্গেই জলের অভাব। বারো মাস।

মাঘের শেষ থেকে ফাগুনের আরম্ভেই জলের অভাব শুরু হয়ে যায়। শুকিয়ে ওঠে বাঁধ-কুয়া। একটাই তো নদী কাঁসাই, আশ্বিন কার্তিক থেকেই , জল নেই।

জল নেই।

কাঁসাইয়ের কাছাকাছি গ্রামে যাদের বসবাস, তারা চুঁয়া খুঁড়ে জল নিয়ে আসে। গ্রামে গ্রামে টিউকল থাকলেও সব জল পান করার পক্ষে উপযুক্ত নয়।হয়তো বা কোনো স্কুলের টিউকলের জল পানযোগ্য। হয়তো বা পাশের গ্রামের টিউকলের জলে ভাত সেদ্ধ হয় ডাল সেদ্ধ হয়, সেই জল মাথায় করে মেয়েরা নিয়ে আসে।

আসা-যাওয়ার পথ অনেকটাই।

রোদে পুড়ে ঘেমে নেয়ে জল নিয়ে আসে মেয়েরা।

কোথাও কোথাও অকেজো টিউকল। মেরামত করলেও জল ওঠে না।

জল তো চাই।

মানুষের প্রথম চাহিদা জল। সেই জল কোথায় কিভাবে পাবে, সরকারি তরফে তার কোনো চেষ্টা দেখতে পাই না।

স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও পুরুলিয়া জেলাতে জলের অভাব লেগেই আছে। সমাধান করতে দল নির্দল কেউ নেই।

একদিন সারা বিশ্বেই জলের সংকট দেখা যাবে। ধনী দেশগুলি সমুদ্রের জল শোধন করে পানযোগ্য করে তুলবে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি জলের অভাবে ধুঁকবে শুধু। 

নানা জায়গায় নদীকেও বেঁধে ফেলা হচ্ছে। চাষবাসের কারণ দেখিয়ে বেঁধে ফেলা হচ্ছে। ফলে,উচ্ছেদ হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। তার সঙ্গে ক্ষতি হচ্ছে নদীর বহমানতা।

অভাব তো দেখা দেবেই।

গ্রীষ্মকাল এলেই জলের সংকট। পুরুলিয়ার মানুষ চেঁচামেচি করে। কিন্তু সংকট যে গভীরে, খোঁজ করে না। কোনো শাসক দল চায়না অভাব মিটে যাক। অভাব থাকলেই অভাবের কথা ব'লে, অভাব থেকে মুক্তি দেবে ব'লে, ভোট আদায় করে শাসক ও বিরোধীদল।

তাই, পুরুলিয়া যেখানে ছিল সেখানেই থাকবে। এক কলসি জল নিয়ে ছেঁড়া -কামড়াও থাকবে এই জেলাতে।

সেদিন দেখছিলাম এই শীতেও এক মহিলা রাস্তার কলের কাছে করুণ মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কখন এক কলসি এক বালতি জল পাবে তার অপেক্ষায়।

অসহায় লাগছিল নিজেকেই।

এই আমার কবিতা।

আজকের বাংলা কবিতা আঙ্গিক ও ছন্দের চর্চা করে। বিষয় নিয়ে চর্চা করে না। কোনো আলোচনাও নেই।

ব্যক্তিগত জীবন বাদ দিয়েও বিষয় তো সময় ও সমাজ এবং মানুষ যেদিকে আজকের কবিদের চোখ পড়ে না।

কবিদের অজস্র চোখ, অসহায়তা দেখার আরেকটা চোখ নেই শুধু।

------২৯ অঘ্রাণ ১৪২৯
-----১৬---১২---২০২২
------নির্মল হালদার






আমার কবিতা :  কাঠবিড়ালির লাফ --৪৩
---------------------------------------------------------

----এই নাকা --- নাকা, কিরে শুনতে পাচ্ছিস না? কাল কোথায় গেছলি?

------ঘরে কাজ ছিল। বউ গেছলো লক্ষীর ভান্ডারের টাকা তুলতে। ব্যাংকে গেছলো। আমাকে থাকতে হয়েছিল ঘরে।

----ভালোই লক্ষ্মীর ভান্ডার পেয়েছিস তোরা। আমরা কার ভাণ্ডারে যাব রে? আমাদের দিদিও নেই দাদাও নেই। অবশ্যই তুই আছিস। জুতাটা পালিশ করে দে ভাই।

-----জুতাটা তো ছিঁড়ে গেছে, ফেলে দাও।
-
---নারে ভাই না, ফেলা যাবে না। নতুন কেনার টাকা জোগাড় হলে, এই জুতোটা ফেলবো। এখন দে তো ভাই, একটুকু সাফ করে।

----১০ টাকা দিবে।

-----দিব রে দিব, বিনা পয়সায় করাবো না ভাই কোনো কাজ।

আমাদের সবজি বাজারের একদিকে নাকার জুতো সেলাই, পালিশ। পাড়ার সবাই তাকে পছন্দ করে। সবাইকে চেনে। সকলের ঘরও চেনে। কেউ তাকে গাদা জুতো দিয়ে গেলে, সে যা করার করে, ঘরে পৌঁছে দেয়। আমি অনেক সময় তাকে পয়সা দিতে না পারলেও পরে দিয়ে দি। নাকা বেপাড়ার বাসিন্দা হলেও আমাদের পাড়ার একজন সদস্য।

কখনো কোনোদিন নাকা আবদার করে চা খেতে চাইলে, আমি দোকানে গিয়ে চায়ের দাম মিটিয়ে দিই। 

সম্পর্কের দাম তো মেটানো যায় না। যাবেও না। তার সঙ্গে সবারই সুসম্পর্ক। যা সম্ভব হয়েছে তারই জন্য। সে সবার সঙ্গেই হাসিমুখে কথা বলে।

আমি তো অনেক সময় পাড়ার কোনো বিষয় তার কাছেই জানতে পারি। আমি জানি, আমি না জানলেও নাকা জানবেই।

তার সঙ্গে আমার কোনো কথা হয় না, তার কাছে দাঁড়াইও না প্রয়োজন বাদে। তবে সামান্য বেলার দিকে ঘরের বাইরে গেলেই, ওর বসার জায়গার দিকে একবার লক্ষ্য করি।

একটা সময় দেখেছি, নাকা লটারির টিকিট বিক্রি করছে ঘুরে ঘুরে। আমি কোনোদিনই ভাগ্য ফেরাতে তার কাছ থেকে টিকিট নিইনি। তার জায়গাতে পড়ে থাকতো তার জুতো সেলাই ও পালিশের সরঞ্জাম।

কোনো না কোনোভাবে নাকার সঙ্গে পাড়ার সবারই সম্পর্কের বুনন হয়েছে। বুননের কারিগর আমার মনে হয়, প্রকৃতি দেবী।

অদৃশ্য।

আমার কাজকর্ম করে এসে দেখি, আমার জুতো পড়ে আছে। সে জুতো সেলাই করতে করতে আমার দিকে চেয়ে বলে----আরেকবার ঘুরে এসো। তারিনীদা অফিস যাবে, তাই তাড়াতাড়ি করছি।

আমি কিঞ্চিৎ বিরক্তির সঙ্গে তাকে বললাম, কি যে করিস তুই। আমার বেলাতেই দেরি!

জুতো মেরামত করতে দিয়ে গেলে, পালিশ করতে দিয়ে গেলে, অন্য এক জুতো জোড়া পরে যাও তুমি।

জুতো জোড়া নাকার কাছেই থাকে।

নাকাকে একবার বলছিলাম, আমাকে জুতা মেরামতির কাজ শিখিয়ে দিস ভাই। আমারও দু পয়সা হবে। নাকা হাসতে হাসতে বলেছিল, ধুর‌্  ই সব কাজ তুমি পারবে নাই। তুমি যে কাজটা করো সেটা কি আমি পারি?

মনে মনে বললাম, আমার আবার কি কাজ! সারাদিন তো চেয়ে থাকা। আকাশের দিকে চেয়ে দেখতে পাই, রঙ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও লাগছে ছেঁড়া ছেঁড়া।

রাস্তার দিকে চেয়ে দেখতে পাই, খাল ডোব। উঁচু-নিচু ।

নাকা ও নাকা ---------তুই ভাই যে সমস্ত জায়গা ছিঁড়ে গেছে, রঙ চটে গেছে, সেলাই করে দে। পালিশ করে দে।

আমার মনে হয়, তুই একমাত্র পারবি অবশ্যই পারবি, রাস্তার খালডোব মেরামত করতে।

অব্যক্ত থেকে যায় আমার বেদনা।

ছেঁড়া জুতোতে পেরেক ঠুকছে নাকা। মেরামতির কাজে সে হাত লাগাবে না? নাকা ও নাকা-----নিজের সঙ্গেই বকবক করছি খুব, আমার মাথায় তুই আবার পেরেক ঠুকে দিস না।

-----১ পৌষ ১৪২৯
----১৭---১২---২০২২
----নির্মল হালদার






আমার কবিতা : কাঠবিড়ালির লাফ ---৪৪
---------------------------------------------------------

ডুমুরশোলের পাশেই সুঁদরাডি। ওই যে কাঁসাইয়ে নতুন ব্রিজ হয়েছে, সবাই চেনে কিনা কে জানে। ওই ব্রিজ পার হলেই ডুমুরশোল। গায়ে গা লাগিয়ে আছে সুঁদরাডি। এই গাঁয়েই বসবাস শক্তিপদর।

তার জমিতে এখন ফুলকপি বাঁধাকপি। লঙ্কা। বিলাতি। শীতের এই সবজি নিয়ে শক্তি বাজারে আসে। আলুও লাগিয়েছে। তবে বিক্রি করবে না। ঘরের জন্যই থাকবে।


কার্তিক মাসের লাগানো ফসল এই পৌষ মাসে বড় হয়েছে। খদ্দেরের সামনে দাঁড়াবার মত চেহারা হয়েছে।

ফসলের চেহারা তৈরি করতে অনেক সার লাগে। আজকাল যা সারের দাম, চাষবাসে পয়সা নাই। ফসলের দাম বাজারে মেলে না। নিজের মজুরিটা যদি ছেড়েও দিই, তবুও বলবো, লাভ নাই লাভ নাই। শক্তি যখন এ সমস্ত কথা আমাকে বলছিল, দেখছিলাম এক একটা বাক্য শেষ হলেই, দীর্ঘশ্বাস পড়ছে।

দীর্ঘশ্বাসের বাতাস আমাকে ধাক্কা মারলেও  আমার কবিতা নিয়ে আমি একই জায়গায় থেকে যাব।

আমারও মজুরি নেই।

ফসল কি ফলাই? কবিতা যদি ফসল হয়ে থাকে কার উপকারে লাগে? 

আমিও কি কারোর উপকারে লাগি?

 শক্তিকেই কি মনে রাখি সারা বছর? এই যে এখন দেখা হচ্ছে ব'লে, কাছে দাঁড়াই। দুটো কথা বলতে।  শক্তির নিঃশ্বাস শুনি। মনে হয়, তার ফলানো ফুলকপি বাঁধাকপি থেকে নিঃশ্বাস উঠছে। কাঁচা লঙ্কার গন্ধও  আমাকে করে তুলছে আপন।

আমি শক্তিকে আপন করতে পারি বা না পারি, শক্তির ফসল আমাকে আপন ক'রে আত্মীয়তার কথা বলে।

আমার সঙ্গে আত্মীয়তার যোগ হলেও আমি কোনো লাভ দিতে পারি না শক্তিকে। সে ফসলের পিছনে যা খরচ করে, সবটুকু ওঠেনা। ফাগুনের প্রথমদিকেই শেষ হয়ে যাবে ফসল। তখন শক্তিকে কাঠের কাজ করতে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে হবে।

জমির মাঝখানে একটা ডোবা। ৫/৬ টি ঘর ডোবার জল থেকেই চাষ বাস করে। ডোবা ও শুকিয়ে যাবে ফাগুনের শুরুতেই ‌।

মুখ শুকিয়ে যায় শক্তির । শক্তির মতো অসংখ্য ছোট ছোট চাষি প্রায় সারা বছর দিনমজুরের কাজ ক'রে পেট চালায়।

পেট যে বড় শত্রু।

শক্তির একটি ছেলে একটি মেয়ে। ছেলে ক্লাস সেভেনে পড়ে। ছেলে টিউশনির কথা বললেই, শক্তি ভয় পায়।

শীতের সময়টা প্রাইভেট শিক্ষককে বেতন দিতে পারলেও বাকি সময়ে কে দেবে? সঙ্গে আছে আরো চিন্তা, কপিতে পোকা লাগলে সব গেল। সব গেল। 

পোকা তো আর পরিশ্রম বোঝেনা। সে তো আসবেই আহার খুঁজতে। এবং আহার করবেও। সে তো দারিদ্র বোঝে না।

কবিও কি বোঝে?

কবিরা তো মধ্যবিত্ত। নিম্নবিত্ত। চাষিরা তো সমস্ত শ্রেণীর ঊর্ধ্বে। এ কারণেই, এদেশে চাষিরাও আত্মহত্যা করে।

আজ শক্তির বিক্রি করতে নিয়ে আসা লঙ্কা থেকে একটি লাল লঙ্কা হাতে তুলে মনে মনে করছিলাম, এই লাল লঙ্কা দেশলাই কাঠির আগুন হলে, শক্তিকে বলতাম-----

সদর দুয়ারে আগুন লাগাও।

সমস্ত দলিল দস্তাবেজ, হিসেব-নিকেশ, আমাদের কবিতা পুড়ে যাক। পুড়তে পুড়তে  পুড়িয়ে ফেলুক রাজা ও রাজ্যপাট।

শক্তিদের বুক থেকে তারার আলো ফুটতে ফুটতে শালুক ফোটাবে।

------৩ পৌষ ১৪২৯
-----১৯---১২---২০২২
-----নির্মল হালদার






আমার কবিতা---কাঠবিড়ালির লাফ---৪৫
----------------------------------------------------------
( উৎসর্গ : স্বপন চক্রবর্তী )

আলু ক্ষেত। সরষে ক্ষেত। পাশাপাশি মুলো। ফুলকপি বাঁধাকপি।

কাঁসাইয়ের পাড়।

থেকে থেকে পৌষ মাসের মৃদু হাওয়া। শীতের শিরশিরানি। মধ্য গগনে সূর্যদেব। তাপ ছড়িয়ে পড়ছে চরাচরে।

কাঁসাইয়ের জলে কুচো কুচো মাছের খেলা। জলে জলে মাছের নিঃশ্বাস বয়ে যাচ্ছে। বয়ে যাচ্ছে সাবানের ফেনা। গা ধোওয়া জল। এবং গায়ের তাপ।

শীতের জড়তাও চলে যাচ্ছে। স্নান করছে নারী পুরুষ।শিশুরাও।

নদীর ওপারে ঝরে ঝরে যায় শীতের পাতা। পলাশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে চেয়ে আছে। কিছুদিন পরেই তাদের বসন্ত দিন।

কাকতাড়ুয়া একদম একা। তার কাছে যেতেও পারলাম না। কথা বললে, সে নিশ্চয়ই কথার উত্তাপ থেকে একাকীত্ব কাটিয়ে উঠতো।

আমি তো গেলাম না।

সারি সারি ফসলের ক্ষেত। সারি সারি কল্যাণ। এই কল্যাণ তো ছড়িয়ে পড়ছে গ্রাম থেকে শহর।

জনপদ থেকে জনপদ।

অশ্বত্থ গাছের নিচে ছেঁড়া ছেঁড়া ছায়া। আমি অবিন ও বাপি রোদ ও ছায়া গায়ে জড়িয়ে কখনো জলের দিকে, কখনো রাস্তার দিকে চেয়ে চেয়ে দু একটা কথার দিকে চলে যাচ্ছি।

কোথায় বা যাব?

আজ অযোধ্যা ফেরত অপূর্ব সাহা তার বন্ধুদের নিয়ে আমার কাছে এসেছিল। তার সঙ্গে অনেক অনেক দিন পরে দেখা। আবেগী হয়ে উঠেছিলাম। চোখ ভিজে গেছলো। আমার কাব্য জীবনে তার ভূমিকাও তো কম নয়। আমার বন্ধুরাই আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।

এই শীতে শ্যাম ভাইয়ার কাছ থেকে উপহার পেলাম একটা লেপ। সারা বছরই তার কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়ে থাকি।

সহযোগিতা ও সাহচর্য থেকেই আমার চলাচলের রাস্তা। হেঁটে যাই। হেঁটে যেতে হবে।

ওই তো একটা পাখি , কাবাডি কাবাডি কাবাডি করে ডাকছে। কোথায় খেলবো কাবাডি? আকাশে?মাটিতে?

এই দুপুরে খেলা যায়?

কাবাডি কাবাডি কাবাডি শুনতে পাই উপর থেকে।চেয়ে দেখি, কেউ কোথাও নেই। শুধু কাবাডি কাবাডি কাবাডি-------

আমার চেতনায় স্পন্দন জাগিয়ে যায়।

------১৩ পৌষ ১৪২৯
-----২৯---১২---২০২২
-----নির্মল হালদার




আমার কবিতা: কাঠবিড়ালির লাফ




আমার কবিতা: কাঠবিড়ালির লাফ ---৩৬
--------------------------------------------------------

বছরের যে কোনো সময় পুরুলিয়া জেলা থেকে অসংখ্য যুবক কাজ করতে চলে যায় ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে।

ছোটবেলায় শুনেছি, পুব খাটতে যাচ্ছে। পুব অর্থে পুব দেশ। সামনেই বর্ধমান জেলা পুরুষ মহিলা একইসঙ্গে ধান কাটার কাজে ধান রোয়ার কাজে, ইঁট ভাটার কাজে দলকে দল চলে যায়।

সেই কাজ সেই যাওয়া এখনো চলছে সমানে।

এই খাটতে যাওয়া শ্রমিকদের পরিযায়ী শ্রমিক নামে চিহ্নিত করা হয়েছিল অতিমারির কালে।

অতিমারি কতটা অতিমারি ছিল, সে বিতর্ক আপাতত থাক। এখন বলতে চাইছি, শ্রমিকদের কথা। পরিযায়ী বলে যাদের অপমান করা হয়েছিল।

এদেশের বিভিন্ন মানুষ নানা পেশাতে কাজ করতে চলে যায় নানান রাজ্যে। এবং অন্য রাজ্য থেকেও পশ্চিমবঙ্গে কাজ করতে আসে হরেককিসিমের পেশার মানুষ।

সবাইকে তাহলে  পরিযায়ী বলতে হয়।

পাখিরাও  পৃথিবীর যেকোনো দেশ থেকে এদেশে আসে। শীতের সময়। তাদেরও পরিযায়ী বলা হয়ে থাকে। আমি আমার জায়গা থেকে, পাখিকেও পরিযায়ী বলতে চাই না। পাখির কোনো দেশ নেই সীমান্ত নেই।

মুকেশ মাহাত পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি থানার এক গ্রাম থেকে উড়িষ্যার জাজপুরে সিকিউরিটির কাজ করতে গেছে। 

সে তো তার শ্রম দিয়ে সময় দিয়ে কাজ করছে। সে চাইবেও তার সম্মান। মাস শেষ হলে বেতন টুকুই তার কাছে সব নয়। যদি মালিকপক্ষের তরফ থেকে দেখা যায় কোনো রকম শোষণ শাসন তা অপমান বৈ কিছু নয়।

এই অপমান শুধু মুকেশের নয়, সমস্ত রকম শ্রমিকদের অপমান।

এ অপমান আমারও গায়ে লাগে।

যেহেতু আমরা একই দেশের মানুষ। যেকোনো শ্রমিকের কাছে অপমান এলে, আমার কাছেও তা শব্দ করে ওঠে।

আমার মুখ কালো হয়ে যায়।

এই কালো রঙ অপমানের রঙ চাপা পড়ে না। ভুলতে চাইলেও ভোলা যায় না কোনোভাবেই।

শুধু ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করতে করতে শিল্প সৃষ্টির দিকে যাওয়া। মুকেশও ফটোগ্রাফি চর্চা করে। তার ক্যামেরায় ধরা পড়ে নিসর্গ প্রকৃতি। যা যেকোনো রোগের মহোষৌধ। অথবা উপশম করে বলা যায়।

ক্যামেরা কেনার মত মুকেশের ক্ষমতা নেই। সে শুধু মোবাইল ক্যামেরা থেকে একটার পর একটা ছবি ধরে রাখে। নিজের জন্য। আমাদেরও জন্য।

মুকেশের শ্রম ও সৃষ্টির কাছে আমি নত হই।

-----২২ অঘ্রাণ ১৪২৯
-----৯---১২---২০২২
-----নির্মল হালদার






আমার কবিতা : কাঠবিড়ালির লাফ ---৩৭
---------------------------------------------------------

আজ সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। আমার মনও ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। অসহায় লাগছে খুব।

নিজেকে উজ্জীবিত করতে সবজি বাজারে গেলাম। কোথায় আর উজ্জীবন? আমার চেনা সবজিওয়ালা শংকরের পাশেই এক যুবক পালং শাক বিক্রি করছে। তাকে আমি আগে কখনো দেখিনি। এই প্রথম। সে আমার কাছে বললো----আমি যদি একটা কম্বল তাকে দিতে পারি।

কোনো কথা না বলে তাকে বললাম, আমি চেষ্টা করবো অবশ্যই। তবে আমি ভেতরে ভেতরে অসহায় হয়ে উঠেছি। গভীরভাবে।

আমার তো কোনো ক্ষমতা নেই। কার কাছেই বা চাইবো? যেটুকু কম্বল চাদর পেয়েছিলাম, শেষ হয়ে গেছে। নতুন করে কোন্ বন্ধুকে বলবো---আমাকে কম্বল দাও। চাদর দাও। অসংখ্য মানুষের শীত করছে। রাস্তায় রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে আগুন পোহাচ্ছে অনেক মানুষ।

আমি ক'জনের কাছে পৌঁছে দিতে পারবো শীতবস্ত্র?

অঘ্রাণ শেষের হাওয়ায়  ঠান্ডা লাগছে খুব। তারই সঙ্গে আকাশের মুখ ভার। এক ফোঁটা রোদ নেই কোথাও। সেই কারণে শীতটা জোরালো লাগছে।

যুবকের পাশে আরেকজন বিক্রি করছিল ফুলকপি। সেও আমার কাছে চাইলো, একটা কম্বল।

মুহূর্তের মধ্যে আমার মনে হলো, আমার অসহায়তা আমি দেখাতে পারবো না আর। আমি কি তবে পালিয়ে যাব?

কোথায় পালাবো কার কাছে পালাবো? আমার সৃষ্টির কাছে গেলে আমি কি মনে জোর পাবো? আমার সৃষ্টি যদি আমাকে আরো দুর্বল করে?

কবিতাও তো কখনো কখনো অসহায়।

----বেলা ----১২--৩১
----২৪ অঘ্রাণ ১৪২৯
----১১---১২---২০২২
----নির্মল হালদার







আমার কবিতা : কাঠবিড়ালির লাফ --৩৮
--------------------------------------------------------

প্রকৃতি নীরব।

আমার শুধু রব।

আমি কথা বলি। চিৎকার করি।

প্রকৃতি তার নীরবতা নিয়ে নিজেকে পরিবেশন করে। আমি নিজেকে সাজাই। নিজের আত্মপ্রচারও করে থাকি। প্রকৃতির অনেক রঙ। বৈচিত্র অনেক। ফুলে ফলে নিঃশব্দ।

আমি শব্দ করি।

প্রকৃতি আমাদের আত্মীয়। সেই আত্মীয়তা আমি কি অনুভব করি? আমি কি টান অনুভব করি, জল জঙ্গল জমির প্রতি?

আমি একা একা বাঁচতে চাই। যতই আমার আত্মীয়-স্বজন থাকুক, পরিবার থাকুক, আমি আসলে বিচ্ছিন্ন হয়ে একা বাঁচতে চাই।

হরিতকির পাশে দাঁড়িয়ে আছে জারুল। কোনো বিরোধ নেই। কুসুম হেলে পড়ছে নিমের গায়ে। কোনো বাদ -বিবাদ নেই।

বটের শিকড় তলে তলে পলাশের শিকড়ে নিজেকে জড়ায়। আর আমি নিজের শিকড় থেকে ছিন্ন হয়ে একা একা শীর্ণ হয়ে উঠি।

এইতো আমার চরিত্র।

প্রকৃতি খোলামেলা। প্রকৃতি সজীবও। প্রকৃতির কাছে পশু পাখি কীট পতঙ্গের ঠাঁই।

পাহাড় নদী সমুদ্র আমি দেখতে যাই। আমি কি টান অনুভব করি? প্রকৃতি হলো প্রেমের জয়গান। নীরব।

আমি রব।

এই রবের কাছে প্রেমের জয়গান কখনো এসে দাঁড়ায় না। কখনো এসে দাঁড়াবে না শিকড়ের সুর।

একটা গাছের শিকড় অন্য গাছের শিকড়ের সুর শুনতে শুনতে বৃহৎ পরিবারের সদস্য হয়ে ওঠে। আর আমি চিৎকার করি----- সব আমার। সমস্ত আমার। নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারি না। অপরের দুঃখকে নিজের দুঃখ বলতেও আমি অপারগ। কারণ, নিজের সুখ দুঃখ বেদনা নিজের কাছে বড় হয়ে ওঠে। অন্যের জন্য সংবেদনশীল হয়ে ওঠার সাধনা আমার নেই। পাহাড়ের কাছে কেমন করে দাঁড়াবো? পাহাড় তো অনেক বড় বিষয়। অনেক বড় অপেক্ষা।

নীরব। 

নীরব একটি কবিতা।

-----২৫ অঘ্রাণ ১৪২৯
-----১২---১২---২০২২
-----বেলা-১২--৮
-----নির্মল হালদার






আমার কবিতা : কাঠবিড়ালির লাফ --৩৯
--------------------------------------------------------

বিপত্তারিণীর ব্রতর  দুব্বা ঘাস বাঁধা লাল সুতো আমার বন্ধুকে প্রতিবছর পাঠাতো তার বড় বৌদি। সে কিন্তু সেই ব্রতর লাল সুতো হাতে বাঁধতোনা। এক বছর দেখা গেল, ব্রতর সুতো আমার বন্ধুর কাছে পৌঁছোলো না। তারপর, বন্ধুর সঙ্গে বৌদির দেখা হতে বন্ধু জানতে চাইলো, এবছর সুতো পাঠাও নি কেন? বৌদির উত্তর ছিল--- তুমিতো পরো না। সেই উত্তরে বন্ধু বলেছিল----আমি বিশ্বাস না করলেও তুমি তো আমার কল্যান কামনা করেই পাঠাও। তোমার বিশ্বাসের সঙ্গে আমি তো কোনো তর্ক করিনি।

সত্যি সত্যি বিশ্বাসের সঙ্গে তর্ক চলেনা। তর্ক চলতে পারে তার সঙ্গেই, যে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারবে, কোনটা সংস্কার কোনটা কুসংস্কার।

সবার সঙ্গে তর্কও কি চলে?

তর্ক করে কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়ার অর্থ এক রকমের মৌলবাদ।

এদেশের সংস্কার কুসংস্কার অশিক্ষা অসচেতনতাকে দূর করতে হলে শিক্ষার প্রয়োজন। কোন্ শিক্ষা? সেও ভাবনাচিন্তার বিষয়।

আমাদের এদেশের কাঠামো পুরুষতান্ত্রিক। বিশেষ করে উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত সমাজ পুরুষতন্ত্রের নানা শিকলে বাঁধা। তা  ক ' জন মেয়ে জানে? শাঁখা-নোয়াও তো পুরুষতন্ত্রের এক একটি শিকল। যা ছিঁড়ে আমাদের মেয়েরা পারে কি নিজেকে মেলে ধরতে ?

সংস্কার যে নির্জীব কে বা কারা বোঝাবে? ঐতিহ্য যে সজীব কে বা কারা বোঝাবে? ঐতিহ্যের সজীবতার সঙ্গে সৌন্দর্য থাকে নান্দনিকতা থাকে।

একটি ঘটে আম পল্লব স্থাপিত করা হলে, সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটে। প্রকৃতির সঙ্গে সংযুক্তির প্রকাশও।

জটিলতা এই, কোনো প্রশ্ন নেই। কেন সিঁদুর পরবো কিজন্যে পরবো----প্রশ্নটা আসে না। প্রশ্নটা এলে একটা পথ পাওয়া যায়।

যে মেয়েটি সমস্ত জেনে শুনে বুঝে নিজের সিঁথি ও কপালে সিঁদুর বিন্দু লাগায়, সে নিশ্চয়ই নান্দনিকতা বোধে  ঋদ্ধ হয়েছে। যেমন, বর কনে বিদায়ের সময়
একটা রীতি আছে, কনে এক আঁচল চাল মায়ের আঁচলে দিয়ে বলবে----তোমার দুধের ঋণ শোধ করলাম।

আসলে, এওতো পুরুষতন্ত্রের রীতি। তুমি তোমার পিতৃ পুরুষের গোত্র ছেড়ে আমার ঘরে এসো। তুমি তোমার মাতৃপুরুষের বাঁধন ছিঁড়ে এসো----।

এও যে পুরুষতন্ত্রের প্রকাশ , এও যে এক শাসন শোষণ, এ বুঝতে পেরেই সেদিন দেখলাম একটি মেয়ে যে কনে হয়ে চলে যাচ্ছে শ্বশুরবাড়ি, সে উচ্চারণ করলো না মায়ের দুধের ঋণ শোধ করলাম। বরং এই রীতির প্রতিবাদ করে উঠলো উচ্চকণ্ঠে।

সঙ্গে সঙ্গেই আমার মনে হলো, আমাদের সমাজের পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি সোচ্চার কবিতা।

সারাদেশের মেয়েদের পক্ষ থেকে একটি সোচ্চার কবিতা।

-----২৬ অঘ্রাণ ১৪২৯
----১৩---১২---২০২২
-----নির্মল হালদার






আমার কবিতা : কাঠবিড়ালির লাফ ---৪০
---------------------------------------------------------

শীতকাল।

আমাদের ছাদ নেই, একটু উঠোন। রোদ এলেও তাড়াতাড়ি চলে যায়। সকাল সকাল তাই, রোদে দিতে হয় লেপ কাঁথা। বিছানা বালিশ। রোদ খাওয়ালে রাতের সময় গায়ে নিলেই, বেশি বেশি ওম।

আমাদের ছাদ নেই।

শীত তো আছে।

 কাল বেলার দিকে আলম চাচা এসেছিল। আলম চাচা এক ধুনুরি। পাড়ায় পাড়ায় ঘরে ঘরে পুরনো লেপের তুলো ধুনে দিয়ে যায়। লেপ হয়ে ওঠে নতুন।

আমাদের ঘরে কটা লেপ ছিল?

ঘর তো ছিল একটাই। সদস্য ছিল অনেক। গরমের সময় দেখেছি, মা ও বৌদি কাঁথা বুনছে।সেই কাঁথা বোনার ছুঁচ ছিল বেশ লম্বা। ফোঁড় তুলতে তুলতে কাঁথার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত।

নানা রঙের সুতো।

ছেঁড়া শাড়ির সুতো।

সেই সমস্ত সুতোতে জড়িয়ে থাকতো সংসারের খুঁটিনাটি। হলুদের দাগ। চোখের জলের দাগ। অভিমানও লুকিয়ে থাকতো ছেঁড়া শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে।

ছেঁড়া শাড়ি জুড়ে জুড়ে এক একটা কাঁথা।

কারা কাঁথা ব্যবহার করে, কারা লেপ ব্যবহার করে, আলম চাচা টের পেতো কিনা জানিনা। তবে শীত এলেই,হাঁক পাড়তো-------লেপ ধুনবে----? তূলা ধুনবে---?

উঠোনে বসেই খোঁজখবর, কে কেমন আছে? ছোট মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেল নাকি? অমুকের ছেলে স্কুলে যাচ্ছে?

আলম চাচার আন্তরিক কণ্ঠস্বর শীতের হাওয়ায় ঘুরে ঘুরে আমার কাছে আজও এসে দাঁড়ায়।

আমার শীত করে।

আলম চাচা তুলো ধুনছে। উড়ে উড়ে বেড়ায় শাদা শাদা ফুলের মত তুলো। আমরা ছোটরা হৈচৈ করে তুলো ধরতে যাই। এক মজার খেলাতে মেতে উঠি।

আলম চাচা হাসে। তার শাদা দাড়িতেও লেগে আছে তুলো।

মা ও জেঠি চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ছোটদের উদ্দেশ্যে বলে----তোরা চলে আয় চলে আয়। আলমকে কাজ করতে দে।

কে শোনে কার কথা!

কাজের ফাঁকে মায়ের কাছে জল খোঁজে আলম চাচা।মা দিয়ে যায় এক ঘটি জল।

সেই জলে কি দেখেছিলাম, আকাশের মত কাঁথার ছবি?

আলম চাচার কাছে জেঠি জানতে চায়, এ বছর ধান হয়েছে কেমন? বছর দিন যাবে তো? গেল বার তুমি বলেছিলে, তোমার ছেলেটা গামছা বুনছে। তোমরা কি গামছা বিক্রি করো বাজারে? তাহলে আমাদেরও দিয়ে যাবে একটা।

সেই গামছাটা কই?

শীত এসে গেছে।

আলম চাচা কই?

তুলো উড়ছে বনে জঙ্গলে। নির্জনে। স্মৃতিরাও উড়ছে। স্মৃতিরা সজীব।

পুরনো ওই জীবন আমাদেরই।

-----২৭ অঘ্রাণ ১৪২৯
-----১৪ ---১২---২০২২
-----নির্মল হালদার








আমার কবিতা : কাঠবিড়ালির লাফ




আমার কবিতা : কাঠবিড়ালির লাফ--৩১
-------------------------------------------------------
তেঁতুল তলে তাস পিটছে একদল যুবক। সঙ্গে গান বাজছে মোবাইল থেকে। গাছের মাথায় উড়ে এসে বসলো একটা বক। এই গাছেই বকের বাসা। তেঁতুল তলে পড়েও থাকে মাছের কঙ্কাল।

ঝিরিঝিরি হাওয়া।

একটা কাক ডাকতে ডাকতে কোথায় যে গেল! তেঁতুল গাছ থেকে ঝরে পড়লো শুকনো পাতা।

ছেলা গুলার কোনো কামকাজ নাই। দিনভর তাস খেলা জুয়া খেলা------এক সাইকেল আরোহী প্রায় বৃদ্ধ, গজর গজর করে চলে গেল। একটা কুকুর এসে তেঁতুল গাছের ছায়াতে। বসে পড়লো জড়োসড়ো হয়ে।

শব্দ তুলে চলে গেল ধান বোঝাই একটা ট্রাক্টর। তার পিছনে পিছনে এক মহিলার মাথায় এক বোঝা ধান।

ঝরেও পড়ছে ধান।

খুঁটে খেতে উড়ে এলোনা একটিও পাখি। শুকনো পাতা এদিক ওদিক উড়ে বেড়ায়। আকাশ ঘোলাটে। রোদের তেজ নেই।

রাস্তার দু দিকটাই ঢালু। বাঁদিকে একটা ডোবা। তার পিছনে ভেড়া আর ছাগল চরে বেড়ায়। বাবলা গাছের নিচে লিকলিকে বাঁশ হাতে এক বুড়ি। ধূসর।

চরাচর জুড়ে ধূসরতা।

দীপক হেঁটে আসছে। গায়ে সস্তার গেঞ্জি। বারমুডা।হাতে পায়ে খড়ি উঠছে। এই অঘ্রাণ শীতেও গায়ে তেল পড়ে না।

দীপক রঙের কাজ থেকে রাজমিস্ত্রির সঙ্গে লেবারের কাজ । যখন যা পায়। তবে সে রঙের কাজ করতেই পছন্দ করে।

মাধ্যমিক পাশ করে এগারো ক্লাসে ভর্তি  হয়েছিল। দুম করে ছেড়ে দিলো ছ সাত মাস বাদে। বন্ধুরা জানতে চাইলে জানায়---- তার বাবা বলেছে, ঢের হয়েছে লেখাপড়া---ইবার কাজে বেরাতে হবে। এক পয়সা না এলে এক ফোঁটা নুনও আসবেক নাই।

মাঈয়ের  কথা আর কাকে বলবে? মাঈ শুধু বলবে---শাগ সিজা আর চাল সিজাতেই হামার দিন বিতায় গেল।তরাও চাল সিজা খাঁয়েই জীবন ঘুচাবি?

কথাটা দীপকের মনে আঘাত লেগেছে। সেতো মাঝেমধ্যে মাছ ধরে আনে। শরাবন--ভাদরের জল জমে থাকা ধান ক্ষেত থেকে " ঘুগি " পেতেও মাছ ধরেছে। ঘরে তেল না থাকলে, "মাছ পুড়া"।

সেই মাছের সন্ধানেই  ঘর থেকে বাইরে এসেছে দীপক। হাতে বঁড়শি।

গাঁয়ে লোকজন নেই। ধান কাটার কাজে  সবাই ব্যস্ত। সেও গেছলো ওই বেলা। তাদের যৎ সামান্য ধান হয়।তিন চার দিন কাটতেই ফুরায়। আজ ছিল শেষ দিন।এক বেলাতেই হয়ে গেছে। দীপক ও তার বউ গেছলো ধান কাটতে।

দু পহরা খেয়ে এই এখন   লায়েক বাঁধে বঁড়শি ফেলেছে দীপক। 

বাঁধের মাঝে দু তিনটে বাঁশ হেলে দাঁড়িয়ে আছে। বকও  দাঁড়িয়ে আছে বাঁশগুলোর মাঝে। জলের দিকে তার সজাগ দৃষ্টি। কখন মাছ উঠবে।

দীপকও চেয়ে আছে জলের দিকে! কখন মাছ উঠবে!শব্দ উঠবে!

প্রাণ উঠবে!

কবিতা।



---১৪ অঘ্রাণ ১৪২৯
----১---১২---২০২২
----নির্মল হালদার





আমার কবিতা: কাঠবিড়ালির লাফ --৩২
-------------------------------------------------------
লম্বা চওড়া মাঠ।

কোথাও ঘাস কোথাও ঘাস নেই।

জলা জমিও আছে। কাছাকাছি ছোট্ট একটি পুকুর। দুপুরের দিকে কোনো বালক এসে ছিপ ফেলে।পুকুরপাড়ে একটা খেজুর গাছ। তার ছায়া জলে কাঁপে।

ধান উঠে যাওয়া জমিতে লাঙল দেয় অনিল মাহাত।সবজির চাষ। পাশের জমিতে ধনে শাক সবুজের ইশারা করে। তার নিচের জমিতে ফুল কপি।বাঁধাকপি। মন জুড়ানো পালং শাক।

চার-পাঁচটা জমির মাঝে একটা কাঁচা কুয়ো। বারো মাস জল থাকে। এই কুয়োর জল জমি থেকে জমি।চাষের কাজে লাগে।

এদিকে আসে না লক্ষণ সিং।

বছরে একবার তিন মাসের জন্য বেলগাড়া। ভেড়া চরাতে বিহারের ছাপরা থেকে দক্ষিণবঙ্গের এই গাঁয়ে।

লক্ষণের মালিক মহাদেব ঠাকুর বেলগাড়াতে এসে তিন মাসের জন্য জমির "ঠিকা" নিয়ে রাখে। জমির মালিক বাবলু মন্ডল  লক্ষণকে একটা ছোটখাটো মাটির ঘরও দিয়েছে। লক্ষণ রাতের বেলা রান্না করে খায়। ভাড়া গুনতে হয় না। অফলা জমির জন্য বাবলু মন্ডল যা টাকা পায়, মনে করে অনেক টাকা।

লক্ষণ সিংকে নিয়ে বাবলু মন্ডল মদ খেতেও বসে।লক্ষণ পানভোজন করেনা। তার নেশা বলতে, বাঁ হাতে খৈনি টিপবে।

খৈনি টিপতে টিপতে তার বাঁ হাতের তালুর রঙ পাল্টে গেছে।

বাবলু মন্ডলের অফলা জমিতে ভেড়া গুলি চরতে চরতে অন্য কোথাও চলে যায় না। জমিতে ঘাস।পুকুরে জলও আছে। আর আছে লক্ষণ সিংয়ের হাতে একটা লম্বা বাঁশের লাঠি।

ভেড়ারা ভয় করে লাঠির আঘাত।

লক্ষণের কাছে আমি যাই। আধো আধো বাংলায় সে আমাকে বিহার মুলুকের গল্প শোনায়। তার মুখ চকচক করে। তার একটি ১২-১৩ বছরের ছেলেও আছে। স্কুলে যায়। তার জন্যই লক্ষণের মন খারাপ করে। কখনো কখনো। বেলগাড়ার পরে হয়তোবা যেতে হতে পারে ঝাড়খণ্ডের দিকে। প্রায় সারা বছর ভেড়া নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা।

লক্ষণ চিনে ফেলে নতুন নতুন মাটি। ঘাস পাতা।মানুষজন। লক্ষণ চিনে ফেলে প্রকৃতির আবহাওয়া।

ভেড়াগুলি যেন হারিয়ে না যায় এই কারণে ভেড়ার গায়ে গায়ে লাল রঙের ছাপ নীল রঙের ছাপ।

একটু আগেই লক্ষণ ডেকে উঠলো--- এ মুনিয়া --মুনিয়া ইধার আ---। 

একটা ভেড়া প্রায় দৌড়োতে দৌড়োতে লক্ষণের কাছে এসে গা ঘেঁষে দাঁড়ালো।

আমিও জানতে চাইলাম, সমস্ত ভেড়ার নাম আছে নাকি? সে বললো----কসুর তো করি সবারই নাম দেবার। কিন্তু বাবু ভাই, ৫৯ টা ভেড়া আছে, সবার নাম দিতে পারি নাই। এই যে মুনিয়াকে দেখছেন, ইয়ার জনম দেখেছি। আমার কাছেই ই বড় হয়ে উঠলো।আমার কাছে তাই আদর নিতে আসে। এই ভেড়াদেরও কেউ নাই আমি ছাড়া। এক আধবার গায়ে গলায় হাত বুলিয়ে দিলে ওরা আমাকে ছেড়ে যাবে না।একটা ভেড়া দলছুট হয়ে গেলে খুঁজে পাবো না আর। মালিকও আমাকে রাখবে না।

কী খাবো বাবু ভাই? 

লক্ষণের মজুরি কত আমার জানা নেই।

লক্ষণের চোখের কোলে ছায়া পড়লো। ওই ছায়া বিষণ্ণ। আমি তাকে অন্য কথার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি------লক্ষণ, তোমাদের গ্রামে আমি একবার যাবো। আমাকে কী খাওয়াবে? লক্ষন বলে--- আপনারাতো বাবু লোক, গরীব খানা আপনাদের  পসন্দ্ হবে না। বুটের ছাতু তো  ঘরেই থাকে, যিতনা  খুশি খেতে পারেন।

আমি দেখতেও পেলাম, লক্ষণের গ্রামের বাড়ি। মাটির বাড়ি। খোলার চালা। উঠোনে বাঁধা আছে একটি গাই। রোগা পাতলা। একটি পাথরের জাঁতাও আছে। বুট পেশাইয়ের জন্য।

লক্ষণের ছেলে আমাকে দেখেই, নিচু মুখ। কাছে ডাকলেও আসে না। আমি জানতে চাইলাম, ইস্কুল কতদূর?

আমার এটুকুই যাওয়া।

যেতে যেতে  চেয়ে দেখবো , কোন্ গাছে কী ফল? যদি আমার কাছে টুপ্ ক'রে পড়ে?


লক্ষণের কাঁধে সব সময় একটা কম্বল। ওই কম্বলেইতো বাঁধা আছে কত রকমের তাপ উত্তাপ। জল হাওয়া। ওই কম্বলেই তো বিহার মুলুকের কবিতা।

-----বেলা ১২--২০
----১৬ অঘ্রাণ ১৪২৯
-----৩---১২---২০২২
----নির্মল হালদার





আমার কবিতা : কাঠবিড়ালির লাফ --৩৩
--------------------------------------------------------

একটি জবা ফুল আমার দিকে চেয়ে আছে। সকাল থেকে চেয়ে আছে। জবা ফুল তার সমস্ত রঙ নিয়েই আমার দিকে চেয়ে আছে। তার ফুটে ওঠা যেন আমার জন্যই।

আমার দিকে চেয়ে থাকবে।

এই চেয়ে থাকা বিমুর্ত?

ফুটে আছে অনেকগুলি গাঁদা ফুল। কেউ কেউ আমার দিকে চেয়ে আছে। বাকিরা ডালের সঙ্গে নুয়ে পড়েছে মাটির দিকে।

যারা চেয়ে আছে আমার দিকে তাদের চেয়ে থাকা বিমুর্ত বলবো?

ফুল চেয়ে আছে আর পাতা?

পাতাও তো চেয়ে আছে কাঁপতে কাঁপতে। এই চেয়ে থাকা বিমুর্ত?

গাছের ডালেরও কাজ থাকে, সেও মাটিতে ঝুঁকে থাকার চেষ্টা করে। শিকড়ের শব্দ শোনার চেষ্টা করে। এই ভূমিকাকে কী বলবো?

বাঁক নিতে নিতে নদীও চেয়ে দেখে নেয়, পারে পারে কতটুকু ফসল রেখে এলো। তার চাওয়া-পাওয়া ও চেয়ে থাকাকে জাদু বাস্তবতা বলবো?

তা বলতেও পারি। না বলতেও পারি। নদী আপন মনে বয়ে যাবে। জবাফুল গাঁদা ফুলের ক্ষেত্রেও একই কথা-----ফুটে ওঠাটাই তাদের কাছে সার্থকতা। পাতা ও ডালের যা কাজ, তারা করবেই।

আমি দর্শক। আমি আমার মত করে দেখে যাব শুধু। আমার দেখাগুলি শিল্পে জায়গা না পেলেও আমি আমার দৃষ্টিকে ধন্যবাদ জানাবো।

আমি দেখতে না পেলেও কত পশুপাখি কীট পতঙ্গ, কত গাছপালা বেড়ে উঠছে। এবং কে যে কার দিকে চেয়ে আছে, আমি জানি না। আমার জানা আছে, আকাশ সবার দিকে চেয়ে থাকে।

বৃষ্টির শব্দ আছে। রোদেরও শব্দ আছে। দুজনের দুটি শব্দ দুরকম। পায়ের শব্দ আছে। হৃদয়ের শব্দ আছে। শব্দ দুটি আলাদাও।

কী করে আলাদা করবো? নাকি শব্দ তার নিজের জায়গায় থাকবে, আমি শুধু শব্দ শুনবো?

শব্দের গায়ে রঙ লাগাবো?

এই প্রাণময় চরাচরে যে যেমনভাবে আছে থাকুক, আমার ভূমিকা দর্শকের।

আমি শ্রোতাও।

ঝড়ের শব্দ শুনতে শুনতে প্রদীপ জ্বালাই।

-----বেলা - ১২--৪৩
-----১৭ অঘ্রাণ ১৪২৯
-----৪---১২---২০২২
-----নির্মল হালদার




আমার কবিতা : কাঠবিড়ালির লাফ--৩৪
--------------------------------------------------------
গোটা চারেক পুকুর আমাকে ছাড়বে না। আমি কাছে না গেলে, তারাই আমার কাছে এসে আমাকে জ্বালাতন করে। পুকুর গুলোর ধারে ধারে যে সমস্ত গাছপালা আছে, তাদের মধ্যে একটা পুকুরের একটা অর্জুন গাছ আমার কাছে আসবেই। আমি সাড়াশব্দ না করলেও অর্জুন গাছের ফল আমার কাছে বেজে বেজে ওঠে। ঝুমঝুমির মত। পুকুরের কাছে আমাকে আসতেই হয়। কুশল জানতেই হয়, কেমন আছো?আজও কি  পানায় পানায় ভরে আছে জল? পদ্মফুল কি ফোটে?

সান বাঁধানো ঘাটে কলসি নামানোর একটা দাগ আছে তো?

আরেকটা পুকুর তো আমার কাছে এসে দুষ্টু দুষ্টু কথা বলে, আমাকে বলবে----ঝাঁপিয়ে পড়্। ঝাঁপিয়ে পড়্।

আমি দুহাত জোড় করে জানাই, আমাকে মার্জনা করো। তোমাতে ডুব দিয়ে আমি পেরে উঠব না।

যতই যা বলি শোনে না।

রাত্রিবেলা আমার পাশে এসেই নিচু স্বরে বলবে, তোকে ঝাঁপ দিতেই হবে।ভালবাসতে হবে আগের মতই।

আমার চাদরটা আমি মাথা অব্দি টেনে নিই। নিলে কি হবে, আরেকটা পুকুর আমাকে ডাকবে, এসো এসো--- আমার কাছে আসতে হলে দিনরাত্রি লাগে না। যে কোনো সময় আমার জল তোমাকে দিতে পারি। তুমি স্নান করলে আমার অবগাহন। তোমাকে জানিয়ে রাখি, আমি এখনো ভেতরে ভেতরে সজীব। দেখছো তো আমার পাড়ের অশ্বত্থ গাছটা, নতুন পাতা এসেছে। পাখিরা আমার কাছে আসে যায়। আসা-যাওয়া করে আলো বাতাস।

তুমি আসবে না?

এ সমস্ত কথা বলে আমাকে নরম করার চেষ্টা করে।আমি চুপচাপ থাকি। ওদের সঙ্গে অনেক আগেই সব কথা ফুরিয়েছে।

নতুন করে কি বলবো আর!


তখনই দেখলাম, আমার কাছে একটা পালক। কোন্ পাখির পালক? জিজ্ঞেস করার আগেই, পুকুর পালিয়েছে।

চারটে পুকুরে হাঁস না নামলেও দুটো পুকুরে হাঁসেরা সাঁতার কাটে। পাখিরা জলে ছোঁ মেরে চলে যায়। পুকুর পাড়ের গাছে নানান পাখি।

একদিন তো ‌গুগলি -শামুক আমার কাছে হাজির।আমাকে বলে, কী গো আমাদের ভুলে গেলে? শ্যাওলা এসেও জড়িয়ে পড়ে আমার গায়ে।

কী করবো এই পুকুরদের নিয়ে? নাছোড়বান্দা। আমি জটিলতায় পড়েছি। হঠাৎ হঠাৎ দিন-দুপুরে রাত দুপুরে আমার কাছে এসে ছোট ছোট ঢেউ তুলবে।

আমি নীরব থাকি। কাগজের নৌকা ভাসে। 

দেখতে পাই, ঘরের চৌকাঠ ডিঙিয়ে রুই কাতলা মাগুর ঢুকে পড়ছে আমার ঘরে। তারা একই সঙ্গে রব করে-- ছাড়লে চলবে না। আমাদের সঙ্গে রেখেই হাঁটাচলা করো। ঘাম ঝরালে আমাদের গায়ে ফেলো। গায়ে গা লাগিয়ে ভালো থাকতে হবে।

ভালো থাকা যায় নাকি?

কুলুঙ্গি এসে দাঁড়ায় মাঝেমধ্যে। কুলুঙ্গি এসে দাঁড়ালেই, একটা প্রদীপ জ্বলছে। অথবা লক্ষীর একটা ফটো। কিংবা লক্ষীর ঝাঁপি।

ভুলে যাব বললেও ভুলে থাকা যায় না। মন কেমন করে। আমি ঝাঁপিয়ে পড়ি সমুদ্রে।

কাউকেই তো কিছু দিতে পারিনি, যদি আমার চোখের জল সমুদ্রকে দেওয়া যায়, তবে সমুদ্রে নুন বাড়বে খানিকটা।

সমুদ্র ফিরিয়ে দিলে আলাদা কথা। আপাতত গোটা চার পুকুরকে নিয়ে আমি নাস্তানাবুদ। বিকেল হলেই একটা যৌথস্বর---

বেলা যে পড়ে এলো জলকে চলো গো...

------১৮ অঘ্রাণ ১৪২৯
-----৫--১২---২০২২
-----নির্মল হালদার





আমার কবিতা : কাঠবিড়ালির লাফ ---৩৫
----------------------------------------------------------

ও শক্তি, শক্তি কোথায় গেলি রে?
সূর্যের সাড়াশব্দ পাচ্ছি, তোর সাড়াশব্দ এখনও নেই।
শক্তি ও শক্তি কোথায় গেলিরে?

ও পদ্ম পদ্ম কোথায় গেলিরে?
কাক ডেকে গেছে অনেকক্ষণ।
আমিও ডাকছিরে, পদ্ম পদ্ম -----

রাস্তা ফুঁড়ে উঠে এলো দুজনেই।

পদ্ম আমাকে দেখেই বলে, চল্ চল্-----। ওদের দুহাতে ঝাড়ু আর বেলচা।

পদ্ম আর শক্তি সকাল হলেই, আমাদের মহল্লায়।রাস্তাঘাট সাফসুতরো করে।


দুজনেই অমলিন।

পৌরসভার কাজ বাদেও অনেক বাড়িতেও তারা কাজ করে দেয়।

আমার তো মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে পদ্ম আর শক্তিকে বলবো----আকাশেও আবর্জনা আছে। বাতাসও দূষিত। পরিষ্কার করে দে।

দুজনেই  যুবক। শিরদাঁড়াও কঠিন। আশা করতেই পারি, তারা আগুন জ্বালবেই। সাফ করবেই চারপাশের জঞ্জাল।

আরো মনে হয়, পদ্ম আর শক্তি দুজনেই পুণ্যের কাজ করছে, পারাপারের রাস্তাটা পরিষ্কার করে দিয়ে সহজ করছে।

মেথর নামে তারা পরিচিত। কেউ কখনো ওদের নাম জানতে চায়না। ওরা নোংরা ঘাঁটে। নালা নর্দমা পরিষ্কার করে। ওদের ছোঁয় না কেউ।

ওদের বুকেও আনন্দ বেদনা আছে। স্বপ্ন তো আছেই।আরো আছে ভালোবাসা। 

যা প্রকাশিত হয় না।

আমার কেবলই মনে হয়, পদ্ম আর শক্তির রাস্তা পরিষ্কারের পর দেখতে পাবো, রাস্তাতে পড়ে আছে অনেক কবিতা। অনেক কথা ও কাহিনী।

রাস্তাতেই থাকার কথা নিঃশব্দ চরণের কবিতা।

-----১১---৩১
----১৯ অঘ্রাণ ১৪২৯
----৬---১২---২০২২
-----নির্মল হালদার





শনিবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৩

আমার কবিতা : কাঠবিড়ালির লাফ




আমার কবিতা : কাঠবিড়ালির লাফ ---২৬
---------------------------------------------------------

এক সময় চিঠিও ছিল আমার জীবনে কবিতা। প্রতিদিন চিঠি না পেলে দমবন্ধ দম বন্ধ অবস্থা।প্রতিদিন চিঠিও লিখেছি। বন্ধু , আধা বন্ধুদেরও লিখেছি চিঠি। আত্মীয়দের কাছে ছোটবেলাতে লিখলেও বড় বেলাতে আর লিখিনি।

সেই চিঠিও ছিল আমার কাছে প্রাণ বায়ু। আমার কবিতা।

খুব সাধারন চিঠি। সেই সব চিঠিতে পেয়েছি সুখ দুঃখ বেদনার মত আলো বাতাস। অন্ধকার।

আজ মনে হয়, সেইসব চিঠির ভাষাও ছিল কবিতার ভাষা।

আত্মীয় বন্ধুদের মুখও এক একটি কবিতা। আজ হারিয়ে গেছে ধুলো হাওয়ায়।

অমলিন কবিতাও হারিয়ে গেছে।

পারিবারিক কবিতা থেকে আড্ডার কবিতা, ভাব --অভাবের কবিতা । অজস্র কবিতার জন্য আমার অপেক্ষা ছিল সকাল থেকে সন্ধ্যে অব্দি।

যেকোনো ভালোলাগা চিঠি মানেই একটি কবিতা। সেই ভালো লাগা চিঠি পোস্টম্যান দিতে এলে তাকে মনে হয়েছে, দেবদূত।

খাম পোস্ট কার্ড ইনল্যানড ছিল কবিতা লেখার কাগজ। ছবি আঁকার ক্যানভাস। মনোজ দত্ত এক সময় আমাকে পোস্ট কার্ডে পাঠিয়েছে একটার পর একটা ছবি।

সেও হারিয়ে গেছে।

অনেক বন্ধুও আজ নেই। থেকেও নেই সুশান্ত সরকার। ছোটন। তার প্রতিটি চিঠি থেকেই পেয়েছি , কবিতার জল হাওয়া।

কেমন আছে ছোটন সাত সমুদ্রের পারে?

আজকের অনেক তরুণ বন্ধুদের কাছে প্রস্তাব রেখেছি চিঠি লেখার জন্য। মোবাইলে লিখে আমাকে পাঠালে গদ্য লেখার অভ্যেসের সঙ্গে বাংলা বানান বাংলা বাক্য বাংলা শব্দ জেনে যাবে যেমন, তেমনি একজন আরেকজনের ভালো-মন্দ জানতে পারবে।

একজনও লেখেনি।

মোবাইলের আগমনের পরেও কেউ কারোর খবর রাখে না।

কেমন করে আসবে কবিতা?

কবিতার পথ সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে মানুষের সংকীর্ণতা থেকে।

আমনের সঙ্গে হাতে হাতে চিঠি বিনিময় হয়েছে এক সময়। আমি তাকে তিনটে চিঠি দিলে সে একটা প্রত্যুত্তর করতো।

তাকে তিন পাতা চিঠি লিখলে সে একপাতা লিখতো আমাকে। খুব খোলামেলা চিঠি তার কাছ থেকে পাইনি। আমি তার কাছে অকপট ছিলাম।

সর্বত্র অসাড় অনুভূতি।

কীভাবে কেমন করে জাগাবো?

কবিতাই বা কীভাবে জাগবে?

পানা ফুলও সৌন্দর্য রচনা করে পুকুরে। বাংলা কবিতায় পানা ফুল কী আছে? পানা ফুলের রঙ চিঠির খুদে খুদে অক্ষর।

কতজন কত রকম রঙে চিঠি লিখতো। রঙও আবেগের প্রকাশ। রামানুজ মুখোপাধ্যায় অবশ্যই রঙের একজন। সে মাঝে মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে চিঠি লেখে আমাকে। চিঠি লেখা তার কাছে প্রিয় বিষয়।

রামানুজের চিঠির সুললিত ভাষা কবিতা হয়ে ওঠে। সে কবিতা লিখলেও প্রধানত প্রবন্ধ লেখাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তার লেখা অবশ্যই  প্রবন্ধ নয়। গদ্য। সে গদ্য মুক্ত গদ্য নয়,  তথ্যসমৃদ্ধ গদ্যই সে লেখে। কিন্তু একাডেমিক নয়।

আমাদের জীবনে  চিঠিও একাডেমিক নয়। আজকের কবিতা? হয়তো আগামী দিনে কবিতার নিচে থাকবে টিকা। তখন কবিতা বোঝার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারমশাইদের আমন্ত্রণ করতে হবে। মনে হয়, সেই সময় আসতে দেরি নেই।

এখানে আজ আর  চিঠি নেই।

হেমন্তের অরণ্যে পোস্টম্যান নেই।

শুধু আজ সকালে আমার হোয়াটসঅ্যাপে আমার বান্ধবীর লেখা আপনাদের জানাই------

সকালবেলা একটা পাখি ডেকে ডেকে চলে গেল। কাকে ডেকে গেল?

এই একটি প্রশ্ন একটি কবিতা হয়ে আমার কাছে। সাতসকালে। 

আমি উত্তরে কী লিখব?

-----৯ অঘ্রাণ ১৪২৯
-----২৬---১১---২০২২
-----নির্মল হালদার





আমার কবিতা : কাঠবিড়ালির লাফ --২৭
----------------------------------------------

কাল সন্ধেবেলা অবিনকে বললাম, তোদের বাড়িতে নেমন্তন্ন করবি? কোনোদিন দুপুরে?
সে জানালো, ধান কাটা চলছে।
মা খুব ব্যস্ত। এখন বাদ দাও।

আমি যে খুব খাই দাই, এ কথা বলবে না নিন্দুকেও।কিন্তু আমার ইচ্ছে করে, একটু স্বাদ পাল্টানো গেলে নতুন মুখও দেখতে পাবো। অবিনদের বাড়িতে আমার আসা-যাওয়া থাকলেও রোজ তো আর যাইনা। আর ওদের গ্রাম গেলে শীতের কাঁসাই দেখতে পাবো। কথা হবে, আশ্রমের বাবাজীর সঙ্গে। কাঁসাই পারে দেবাশিস বাবাজীর কালীমন্দির হরিমন্দির। আশ্রম। গাছপালা।সব মিলিয়ে একটা ইশারা। কাছে যেতে ইচ্ছে করে খুব।

মনের বাসনা মনে থেকে যায়।

অবিন "না" করেছে।

অবিনের এই "না" আমাকে বেদনাবোধ থেকে আনন্দের দিকে নিয়ে যায়।

অবিনের এই  "না" আমার কাছে "হ্যাঁ"। আমি "নিষেধ"থেকে পেয়ে যাই আমার "প্রবেশ"। 

অবিনের বাবা আমাকে বলছে----হালদার চলো হে আমাদের সঙ্গে ধান কাটতে। অবিনের হাসি। তার দাদাও তার কচি ছেলেকে কোলে নিয়ে হেসে উঠলো। আমি অবিনের বাবাকে বললাম------ চলো তবে। অবিনের মা বলে---না খেয়ে কোথাও যাবে না। আমার কাছে জানতেও চাইলো----বেগুন পোড়া খাও? আমি লাফিয়ে উঠি। বেগুন পোড়া আমার খুব প্রিয়।অবিনদের বাড়িতে কাঠের উনুনে বেগুন পুড়বে।স্বাদেও হবে চমৎকার।

বেলা পড়ে আসছে।
আমি ধানক্ষেতের আলে বসে আছি। অবিনের মা ধানের আঁটি বাঁধছে।

জীবনকেই বাঁধছে নিজের বাঁধনে।

আমার কবিতা।


-----১০ অঘ্রাণ ১৪২৯
-----২৭---১১---২০২২
-----বেলা ১২--৪৬
------নির্মল হালদার





আমার কবিতা--কাঠবিড়ালির লাফ--২৮
-------------------------------------------------------
একটা শালুক ফুটে আছে।

ছোট্ট এক ডোবা।

উড়ন্ত পাখির ছায়া পড়ছে জলে। হাওয়ায় হাওয়ায় কেঁপে উঠছে জল। স্থির হয়ে পড়ছে জল। ডোবার পাড়ে শুকর ছানাদের চলাফেরা।

ডোবাটি আছে বলেই, কয়েকটা একচালা ঘর।ঝকঝকে । মাটির দেওয়াল তকতকে। একটা ঘরের দেওয়ালে ঝুলছে তীর ধনুক। উঠোনো লাফালাফি করছে মুরগি। উঠোন থেকে একটু দূরেই একটা মহুল গাছ। তার ছায়ায় বসে আছে একটা শুয়োর। একটা হাঁড়িও উল্টে আছে।

কোনো মানুষের সাড়াশব্দ নেই। যে যার কাজে গেছে। 

স্তব্ধতা।

আমাকে আসতে বলেছিল মড়িরাম মুর্মু। সে কোথায়? কার কাছেই বা জানতে পারবো কেউ তো নেই।

দরজা খোলাই আছে।

একটা কুকুর এসে আমার পায়ের কাছে শুঁকতে লাগলো। চলেও গেল  কোথায় কে জানে। দেখতে পেলাম না আর।

মাদল ঝুলছে। একটা বারান্দায় চালার কাঠে বাঁধা মাদলের দুই মুখেও নীরবতা।

স্পর্শের দাগ আছে?

কত কত পূর্ণিমার রাতে মাদল বেজেছে সারারাত। তার শব্দ তার মাধুর্য এই দুপুরেও যেন আমার বুকে ।

একটা মহুল পাতা খসে পড়লো। সোজাসুজি মাটিতে না পড়ে, ঘুরতে ঘুরতে হাওয়া যে তাকে কোথায় নিয়ে গেল, আমি তো আর পাতার পিছনে পিছনে গেলাম না।

জল তেষ্টা পেয়েছে।

আমার দৃষ্টি খুঁজে বেড়াচ্ছে কোনো মানুষ। না, চারদিকে কেউ নেই। গৌউর বাবু আমাকে বলেছিলেন, ধান কাটার মরসুম এ সময় গেলে কাউকেই পাবেন না।

মড়িরাম পট আঁকে। গাঁয়ে গাঁয়ে পটের গান ক'রে দু'চার পয়সা রোজগার করার চেষ্টা।

আজকাল আর গান শোনেনা কেউ। ওই যে হাতের মুঠোয় একটা যন্ত্র থাকে। তা থেকেই গান। দিনরাত।

দু' একটা ঘরে এ্যাজবেস্টারের ছাউনি। মনে হয়, সরকারি অনুদান থেকে এ সমস্ত ঘর। দেওয়ালও পাকা।

পাকা ঘরের পিছন দিকে একটা পেয়ারা গাছের আভাস। কাছে গেলে হয়তো মিলতেও পারে দু-একটা পেয়ারা। পেয়ারা চিবোতে পারলে তেষ্টা মিটবে?

পিপাসার তো শেষ নেই।

হেমন্তের হাওয়া। শিরশিরে শীতলতা। আমি রোদের দিকে যাই। দুটো হাত বুকের কাছে এনে উত্তাপ নেওয়ার চেষ্টা করি।

ঘর ছাড়িয়ে রাস্তার দিকে। যদি পায়ের শব্দ পাই? শুনতে পাবো। রাস্তায় পায়ের ছাপ। সাইকেলের টায়ারের দাগ। গরুর গাড়ির চাকার দাগ। রাস্তার ধারে বুয়ান গাছের ঝোপ। এ ডাল থেকে ও ডালে তক্ষক।

মনে হলো, আমাকে একবার দেখে চেনার চেষ্টা ক'রে লুকিয়ে গেল কোথাও।

একটা মৃদু শব্দ আসছে। চেয়ে দেখি, একটা গরু-বাছুর। শীর্ণ।

মড়িরাম কোথায়?

আমি হাঁটতে হাঁটতে একটু এগিয়ে যেতেই আরেকটি ডোবা। চুপচাপ। ডোবার পিছন দিকে ধান ক্ষেত।

ধান কাটা হয়ে গেছে। পড়ে আছে ধানের গোড়া।আলপথে একটা শাড়ির একটা অংশ।

আমি ঢিল  ছুঁড়ি। ডোবার জলে ছোট ছোট ঢেউ ওঠে।দু-একটা শুকনো পাতা ভেসে ভেসে এদিক-ওদিক।

ডোবার পাড় থেকে দেখতে পাই, দূরে বন সৃজন প্রকল্পের গাছপালা। ধূসর।

আমি আবার মড়িরামের ঘরের দিকে। কাছে যেতেই হঠাৎ যেন চোখে পড়লো ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে ছবি।

একবার তো ঘুরে গেলাম, দেখতে পাইনি তো! তবে কী এখুনি কেউ এসে আঁকাআঁকি করে গেল এইসব ছবি?যেন আদিম মানুষের আঁকা।

মুহূর্তের মধ্যে দেখতে পাই, একটা হরিণ ছুটছে। তার শিঙে লটকে আছে ডালপালা লেগে থাকা পূর্ণিমার চাঁদ।

----বেলা-১--১১
-----১১ অঘ্রাণ ১৪২৯
-----২৮---১১---১৪২৯
-----নির্মল হালদার
 



আমার কবিতা : কাঠবিড়ালির লাফ--২৯
-------------------------------------------------------

অন্ধকার।

অন্ধকার থেকে জেগে উঠলো একটা হাট। কোনো কোলাহল নেই। শুধু একটি মুখ। পিছন থেকে দেখতে পাচ্ছি------ অমরেশ মাজী।

আর কোনো মুখ নেই।

সবজি বিক্রেতাদের মুখও দেখতে পাচ্ছি না। আবছা আলো আঁধারে শুধু অমরেশের মুখ। ৪০ বছর আগের অমরেশ। অমরেশ মাজী।

আমি ছুটে যাই। পিছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরি। সে আমাকে দেখে না। সে  ২৫০ করলা কিনতেই ব্যস্ত।

বিক্রি করছে কে?

কোনো বিক্রেতার মুখ দেখতে পাচ্ছি না। শুধু অমরেশ, অমরেশের মুখ। ৪০ বছর আগের সেই মুখ। গালে হালকা দাড়ি। চোখ মুখ শান্ত। লাবণ্যময়।

কোত্থেকে এলো অমরেশ? তাকে তো আমি ডাকিনি।মনেও করিনি তাকে। তবে কী ভাবে কার কাছে এলো? আমার ঘরে না এসে একটা হাটে এসেছে।আমার সঙ্গে তবে কি দেখা করতো না?

সেই অমরেশ, ৪০ বছর আগের অমরেশ চেহারা একটুও পাল্টায়নি। সেই অমরেশ বার্ণপুরের কাছের কোনো গ্রাম থেকে এসেছিল আমাদের শহরে লেখাপড়ার সূত্রে। আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল সিনেমা হলে।

সিনেমা দেখতে গিয়ে অনেকের সঙ্গে আলাপ হয়। কার সঙ্গেই বা বন্ধুতা হয়? অমরেশের সঙ্গে শুধু বন্ধুত্বই হলো না, ঘনিষ্ঠতা হলো।

সেই ঘনিষ্ঠতা যে ঝালাই করবো আজ সময় হলো না।

তাদের হোস্টেলে আসা যাওয়া তো করেইছি, আহার নিদ্রাও হয়েছে। কবিতা পাঠ করেছি রাতের পর রাত। হোস্টেলের বাকি ছেলেরা ঘুমিয়ে গেছে, শুধু অমরেশ আর আমি। আমাদের জাগরণে দেখতে পেয়েছি রাতের নক্ষত্রের মতো শ্রোতা। সে শুধু আমার কবিতার
শ্রোতা নয়। অমরেশের সবুজ কবিতাও শান্ত হয়ে শোনে।

সেই রাত্রি কোথায়?

তুমি কোথায় অমরেশ?

আজকের হাট কি ছিল মুহূর্তের হাট? হাটেও কি মরীচিকা আসে? ভোরের অন্ধকার থেকে আমার যে তেষ্টা পেয়েছে খুব।

স্বপ্ন আমাকে আক্রান্ত করে। স্বপ্ন থেকে স্মৃতি আমাকে আক্রান্ত করে। আমি কবিতার দিকে যাই।

আমি অমরেশের দিকে যাই।

কোনো যোগাযোগ নেই। তার কোনো ঠিকানা নেই আমার কাছে। কেন তবে অমরেশ? কেন তবে একটি হাট? কোনো বেচাকেনা নেই, শুধু অমরেশ। আমাকে আক্রমণ করতে করতে স্মৃতির দিকে নিয়ে যায়।কবিতার দিকে নিয়ে যায়। সেই কবিতা যদি চোখের জলের শব্দ করে?

তুমি কি শুনতে পাবে অমরেশ?
 

-----বেলা --১
-----১২ অঘ্রাণ ১৪২৯
-----২৯--১১---২০২২
----নির্মল হালদার
 




আমার কবিতা : কাঠবিড়ালির লাফ---৩০
---------------------------------------------------------
---কোথায় যাবি রে?
---ইউনিভার্সিটি
----তাহলে তোর সঙ্গে বিকেলে দেখা হচ্ছে তো?
----না দেখা হবে না। বিকেলে ঘর যাব। ঘর থেকে সেরখাডি। আজ ছো-নাচ আছে।

বাঁশি ছো-নাচও করে।

বাঁশির প্রকৃত নাম শ্যামাপদ মাহাত। বাড়ি---- বরাবাজার থানার রাজডিতে। সিধু কানু বিরসা ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করছে। তার পিএইচডির বিষয়---বাংলা গল্প উপন্যাসে লোকসাহিত্য। লোকজীবন। ছো-নাচে জড়িয়ে আছে তার আবেগ। সব সময় দলের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে নাচতে পারে না। তার কারণ, লেখাপড়া।

বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান শ্যামাপদ। তার বাবা বাউল সঙ্গ করে। তার বাবার পথ অনুসরণ ক'রে তার মা-ও গেরুয়া পোশাক ব্যবহার করে থাকে। দু'জনেই 
এক আধটু বাউল গান।

মাহাতরা ভূমিপুত্র। জমির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক থাকবেই। শ্যামাপদদেরও যৎসামান্য ধান জমি আছে।বছর দিন যায় না। শ্যামাপদর বাবা রোগ অসুখে ভুগতে ভুগতে চাষবাসের কাজে আর মন দিতে পারে না। শ্যামাপদ নিজেই যতটুকু পারে চাষের কাজ থেকে ধানটুকু তোলে। তাদের অন্য কোনো রোজগার নেই। শ্যামাপদ পুরুলিয়া শহরে থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশন করে। তার আগ্রহ দেখতে পাই, কবিতার দিকে। প্রবন্ধের দিকে। আরো একটি আগ্রহ অবশ্যই আছে, আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ায়।

শ্যামাপদর বেঁচে থাকার লড়াই, ছো-নাচের পরিশ্রমের মতো। তার সঙ্গে তার আবেগ। যে আবেগের সঙ্গে মিলেমিশে আছে পুরুলিয়ার জল মাটি হাওয়া। এ জন্যই সে লেখাপড়ার পাশাপাশি লড়াই করতে পারে। সে বলেও, আমি বাঁচলে ছো-নাচও বাঁচবে।

সে বাঁশি হলেও সে ধামসাও। সে মাদল। সে ধূলা ওড়ানো নাচের ছন্দ। সে এক জ্যান্ত শিল্প।

সেই জ্যান্ত শিল্পের আরেক নমুনা, রামকৃষ্ণ মাহাত।পটে আঁকা ছবির মত একটি গ্রামে থাকে। পুরুলিয়ার কাশীপুরের শিউলি বাড়ি। সে  তার মা ও বোনকে নিয়ে থাকে। তার বাবা নেই। তাকেই টানতে হয় সংসার। ধান যেটুকু হয় সারা বছর চলে না। সে ক্লাস ইলেভেন থেকেই যুক্ত হয়েছে ছো-নাচের দলের সঙ্গে।ছো-নাচে তার আবেগ যেমন কাজ করে, তেমনি দুটো পয়সা হয়। একরাত নাচ করলে আড়াইশো টাকা।যদিও সারা বছর কাজ থাকেনা। সে বলে, বোনের পড়াশোনার জন্য টাকা চাই। অসুখ-বিসুখের জন্য টাকা লাগে। লোক-লৌকিকতাও করতে হয়। সবকিছুর পিছনেই টাকা চাই।

কে দেবে?

হাত পাতবো না। শরীরে তাকৎ আছে খেটে খাবো।

সেই খেটে খাওয়া রামকৃষ্ণ মাহাত কবিতাও লেখে।সম্প্রতি বিভাস রায়চৌধুরীর কবিতা আশ্রম পত্রিকা তাকে তরুণ কবি হিসেবে সম্মান জানিয়েছে।

রামকৃষ্ণের বাড়ির কাছেই দ্বারকেশ্বর নদী। কখনো কম কখনো বেশি কখনো মাঝারি আবেগ নিয়ে চলে দ্বারকেশ্বর। প্রভাব তো পড়বেই রামকৃষ্ণের হৃদয়ে।

আমিও ভিজতে চাই হৃদয় থেকে উৎসারিত আনন্দ থেকে আনন্দে।

রামকৃষ্ণ অভাবে অনটনে বড় হলেও গ্র্যাজুয়েশন  করেছে। মাস্টার্স পড়ার ইচ্ছে থাকলেও কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই সুযোগ পায়নি সে।

সে কখনো কখনো সুযোগ পায় ছো-নাচের দলে। দুর্গা বাদে সখি থেকে কার্তিক গণেশের নাচ সে করতে পারে। এক রাতের একটা নাচ আড়াইশো টাকা।পারিশ্রমিক। সারা বছরে হয়তো বা ৩০ দিনের কাজ।তাকে টিউশনি করতেই হয়। গ্রামের দিকে টিউশনিতে অল্প টাকা। এ বাদে কিছু করারও নেই। তার ভাষায়---- লড়ে যেতে হবে।

শ্যামাপদ ও রামকৃষ্ণের লড়াইয়ের পাশে আমি আছি।আমার আবেগ থেকে আছি। আমি জানি, তাদের লড়াই তাদের আবেগ তাদের ভালোবাসা ফুটছে।সকালে সন্ধ্যায়। তার বিকশিত সৌরভ থেকে গড়ে উঠছে আমারও কবিতা।

শাদামাটা সজীব কবিতা।

------১৩ অঘ্রাণ ১৪২৯
-----৩০---১১--২০২২
-----বেলা ১--৭
------নির্মল হালদার








কবি নির্মল হালদারের বিভিন্ন সময়ের ছবি

পড়ুন "ঘর গেরস্থের শিল্প"

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ