সোমবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২১

পড়ার জন্য নয় মুছে ফেলার জন্য / নির্মল হালদার

পড়ার জন্য নয় মুছে ফেলার জন্য / নির্মল হালদার



------আপনার ফোন নাম্বারটা দেবেন?
------নদী পাহাড় জঙ্গল।

ঝর ঝর করে হেসে ফেলে মেঘবতী।
সে আবার বলে, দিন না ফোন নাম্বারটা।
আমি বলি, ওই তো আমার নাম্বার।
নদী পাহাড় জঙ্গল। তার আগে মাটি শব্দ টা লাগিয়ে নিও। তাহলে অবশ্যই আমাকে পাবে।
মেঘবতী বলে------আমার সঙ্গে মজা করছেন? আপনিতো ফেসবুক করেন না। কথা কিভাবে বলবো?

-----কথা বলার তো দরকার নেই।
-----আমার যে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। তখন মনে হয়, কারোর সঙ্গে কথা বলি। ইচ্ছে তো হতেই পারে, আপনার সঙ্গে কথা বলতে।
-------হ্যাঁ ইচ্ছে তো হতেই পারে।
তোমার ইচ্ছেকে সম্মান জানিয়ে বলছি-------তুমি দেখো নদী পাহাড় জঙ্গল নাম্বারটা লাগিয়ে, আমাকে পাবেই।
-----না পাবো না। কখনোই পাবো না।
নদী পাহাড় জঙ্গল কি নাম্বার হতে পারে?
আমি বললাম, হ্যাঁগো নতুন শুরু হয়েছে। আমি প্রথম এই নাম্বারটা পেয়েছি।
মেঘবতী হাসতে হাসতে আমার
নাকটা ধরে নাড়িয়ে দেয়।
আমি খানিক রোমাঞ্চিত হয়ে তাকে বলি, সম্পর্ক করতে হয় কিন্তু সম্পর্ক নিয়ে নাড়াচাড়া করতে নেই। তুমি যেখানে আছো দিব্যি আছো। আর বেশি দূর এগিয়ো না।

------নিকট ও দূরের কি আছে, শুধু কথা বলবো। যদি মনে হয়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় পড়তে আপনাকে পড়ে শোনাবো। অথবা গীতবিতান থেকে
একটা গান শোনাতে পারি।
আমার গলায় সুর নেই। আমি গীতবিতানের গান কবিতাই মনে করি।
------আর আমার যদি শুনতে ইচ্ছে না করে? তখন? ফোনের শব্দে আমার যদি ঘুম না ভাঙ্গে? তুমি তো রাগ করবে। তাই বলছি, কোনো ফোনাফুনি নয়। এই যে দেখা হলো আমাদের, এই সাক্ষাৎটাই অক্ষয় হয়ে থাকুক।
এবার মেঘবতী ছদ্ম রাগ নিয়ে বলে,
আপনি আচ্ছা মানুষ তো! একটা মেয়ে আপনার কাছে বারবার ফোন নাম্বার চাইছে, আপনি দিতে চাইছেন না।

----দিলাম তো।
-----নদী পাহাড় জঙ্গল নাম্বার হতে পারেনা।
----১ থেকে ১০০ নাম্বার হতে পারে না।
-----কী হতে পারে?
-----শুধু ভালোবাসা।
-----নিঃসঙ্গতা নাম্বার হতে পারে না?
----পারে বৈকি।
-----তবে আমার সব নাম্বার নিঃসঙ্গতা।

আমার মনে হয় মেঘবতীর নিসঙ্গতার কাছে কেউ নেই। কেবল মেঘবতীর কবিতা ও গান। মেঘবতীর আবেগ। মেঘবতীর অনুভব। উত্তেজনা।

কবিতা ও গান সব সময় নিঃসঙ্গ।

নিঃসঙ্গতার সঙ্গে নিঃসঙ্গতা।
মেঘবতী একা।

আমি একা নই।

নদী পাহাড় জঙ্গল ক্লিক করলেই
সহজেই পেয়ে যাই আমার জগৎ।
সীমাহীন প্রেমের আস্তানা।

মেঘবতীকে বললাম------মোবাইলটা ফেলে দাও। জলে।
দেখবে,
আলো হাওয়ার সমুদ্রে তুমি সাঁতরে বেড়াচ্ছো। 
এসো--------তোমার ললাটে চুম্বন আঁকি। এসো।
আমার কথা শেষ হতেই, মেঘবতী
আমাকে জড়িয়ে ধরে।

একটা মহুল গাছ চেয়ে থাকে। নীরবে।

------৬ কার্তিক ১৪২৮
-----২৪----১০----২০২১
------নির্মল হালদার






খুশিয়াল / নির্মল হালদার

খুশিয়াল / নির্মল হালদার


অনেকদিন আমার সঙ্গে আছে খুশিয়াল।জল তেষ্টা পেলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি বুঝতে পেরে এক বালতি জল তার মুখের সামনে এগিয়ে দিই। রাস্তায় থাকলে
পুকুরের খোঁজ করি।

তাকে রোজ মাঠে ছেড়ে দিয়ে আসি।
সে আপন মনে চরে বেড়ায়। ঘাস খায়। আমি কোনো কোনোদিন মাঠেই বসে থাকি। আর খুশিয়ালকে বলি, আমি না থাকলে তোর মত গাধাকে কে দেখতো রে? যেদিন আমি থাকবো না, কি করবি তুই?

কেন যে তুই আমার কাছে ধরা দিলি?
আমিও তোকে সঙ্গী পেয়ে আগুপিছু
কিছুই ভাবলাম না। তোর ভবিষ্যৎটা
ভাবা উচিত ছিল আমার।


ধোবাদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে।
তাড়িয়ে দিয়েছে তোকে। নাকি আমাকে সঙ্গ দেবার জন্যই আমার কাছে এসেছিস তুই?

আমার সঙ্গে তুই আছিস, তাই
লোকজন আমাকে বলে গাধা।
লোকজনকে আমার প্রশ্ন, মানুষ তো আমাকে সঙ্গ দিলো না সাহচর্য দিলো না, আমি তো গাধার সঙ্গে গাধা হয়েই থাকবো।


খুশিয়াল কি বোঝে কে জানে।
বেশিরভাগ সময় আমার দিকে চেয়ে চেয়ে সূর্যাস্ত দেখে।
সূর্যাস্তের করুণ আভা খুশিয়ালের চোখে পড়লে আমার মন কেমন করে।

সে সারাদিন শান্ত ও চুপচাপ।

আমাকে একটুও জ্বালাতন করে না।
আমি প্রতিদিন সময়ে সময়ে তার কাছে খাবারের জোগান দিয়ে থাকি।
আমার ভাত থেকেও তাকে একমুঠো দিই।তার পেট ভরবে না জেনেও
আমার মনে শান্তি আসে। যে 
তাকে একমুঠো খাওয়াতে
পেরেছি। ভাগ দিতে পেরেছি।

খুশিয়াল কখন যে ঘুমোয় কে জানে।
মাঝরাতে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলে, আমি বাইরের উঠোনে এসে দাঁড়াই।
দেখি,সে জেগে আছে।

জেগে জেগে সে কী তারা ভরা আকাশ দেখে? সে কী চাঁদের সঙ্গে কথা বলে?
নাকি সে আমার নিঃসঙ্গতাকে পাহারা দিয়ে থাকে? যেন আমার নিঃসঙ্গতা আমার কাছেই থাকে। কেউ যেন চুরি করে না নিয়ে যায়।

আর আমি?

খুশিয়ালের গায়ে হাত বুলিয়ে বলি,
ঘুমিয়ে পড়্। ঘুমিয়ে পড়্।
ভোরের অনেক দেরি।

আমি অনেকদিন বাঁচবোরে। তুই দুশ্চিন্তা করিস না। আমি এখনো আছি। যতদিন আছি, তোকে দেখবো।


-------৩ কার্তিক ১৪২৮
------২১-----১০-----২০২১



আনন্দ / নির্মল হালদার

আনন্দ / নির্মল হালদার


গাধাটা এসে দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে।
জানতে চাইলাম, এতদিন দেখিনি কেন? সে বললো--------কোনো কাজ নেই আজকাল আর। ধোপারাও তাড়িয়ে দিয়েছে। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে
খাবার জোগাড় করতে পারি না। কি করবো?
শেষমেশ তোমার দুয়ারে এসে দাঁড়ালাম। যদি একটু মাড়জল দাও প্রাণে বাঁচি।

আমি বললাম, চলো তোমায় নিয়ে যাচ্ছি গেরস্থের ঘর। আমার ঘরে তো
শুধু জল ছাড়া কিছু নেই।
আমার এক কথায় গাধা রাজি হয়ে গেল । মনে হয়, সে জানে আমার অবস্থা।

গেরস্থের ঘরে যেতেই, আমার সঙ্গে গাধাকে দেখে অবাক।
আসলে, লোক জানে একটা মানুষের সঙ্গে খুব জোর একটা কুকুর থাকতে পারে। গাধা যে থাকতে পারে মানুষের ভাবনার বাইরে। তো, এক মহিলা আমাকে জিজ্ঞেস করে---------গাধাকে নিয়ে এসেছি কেন? গাধাটি কি আমার পোষা ?
আমি বললাম, গাধাটি আমার বন্ধু । আমি শুধু আপনাদের কাছে এসেছি, আপনারা যদি গাধাটাকে
একটু মাড়জল দেন।
মহিলা আমাকে আবার বলেন, আমাদের ঘরেই কেন ? আরো অনেক ঘরতো আছে।

আমি বললাম, তা জানিনা। তবে একটা কথা বলতে পারি, আপনার যদি দয়া হয় দেবেন। নিরীহ প্রাণী।
ভাতের মাড় ফেলে না দিয়ে গাধাটাকেই দিন।

মহিলা বলেন, আমাদের ভাত অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। ফেলে দিয়েছি মাড়।
তুমি ভাই অন্য কোথাও দেখো।

বন্ধুকে নিয়ে আরেক পল্লিতে ঢুকে যাই। একটা ঘর না করলে আরেকটা ঘর। যেভাবেই হোক বন্ধুর মুখে খাবার দিতে হবে।

একসময়ের বোঝা টানা গাধার পিঠে
অনেক দাগ। আমি হাত বুলিয়ে   বলতে চেষ্টা করলাম--------বোঝা আমিও টানি। আমাকেও টানতে হয়।
কেউ দেখতে পায়না। তোকেও বোঝা টানতে হবে আবার। তাহলেই, আহার জুটবে। ধোপারা তোকে তাড়িয়ে দিলেও আমি তোকে তাড়িয়ে দিচ্ছিনা।
তুই আমার সঙ্গেই থাকবি। শুধু আমার সঙ্গে। এটুকুই তোর বোঝা। আমি ঠিক সময়ে তোর মুখের কাছে এনে দেবো তোর খাবার।
এখন চল্ , দেখিগে , কার ঘরে তোর জন্য খাবার পাই।

আরেক গেরস্থের ঘরে কোনো সাড়া শব্দ না করে ঢুকে পড়েছি। ঘরের সবাই আমার সঙ্গে গাধাকে দেখে রে রে করে ওঠে।
 বলে-------------পাগলটা কোত্থেকে এলো রে বাবা!
তারপরেই বলে, যা যা এখান থেকে যা
এখানে কিছু নেই।
আমি বলবার চেষ্টা করি, আমি পাগল নই। আমি শুধু বন্ধুর জন্য মাড়জল খুঁজতে এসেছি।
তারা আমার কথা কান করে না।
কেবলই বলে যায়--------যা যা এখান থেকে যা। না গেলে গরম জল  ছুঁড়বো।

আমি বাইরে চলে আসি।

বন্ধুকে বলি, একদম হতাশ হবি না।
আমি যতক্ষণ আছি, তোর মুখে খাবার দেবো।
সে আমার মুখের দিকে চেয়ে কি বুঝলো কে জানে। হঠাৎ দেখি, পিচ বাঁধানো রাস্তার পাশে গজিয়ে ওঠা
ঘাসে মুখ দিচ্ছে।
আমার মায়া হলো। মনে হলো, এক প্রাণী এসে আমার কাছে খাবার চাইলো আর আমি দিতে পারবো না!
আমি কেমন মানুষ?

আমি বন্ধুকে নিয়ে গেলাম, সবজি বাজারে। এটা সেটা সবজি ভিক্ষা চেয়ে বন্ধুর মুখের কাছে ধরি। সে মনের আনন্দে চিবোতে থাকে।  এবং চিবোতে চিবোতে সে  তার মনের কথা বলে--------সে আমার কাছেই থাকবে। আমি যেন তাকে অন্য কোথাও ছেড়ে না দিয়ে আসি।
আমি বুঝতে পেরে বন্ধুর মাথায় হাত রেখে বলি-------তোর ভয় নেই। তুই আজ থেকে আমারই বন্ধু। তুই আমার আনন্দ।

আনন্দ আমার কাছেই থাকে।

তাকে নিয়ে ঘুরতে যাই। লোকজন আমাদের দেখলেই, আমাদের ক্ষ্যাপায়। ঢিল ছুঁড়তে থাকে। 
আমি আঘাত পেলেও চেষ্টা করি, আনন্দের গায়ে যেন না লাগে।

আনন্দ আমার বন্ধু।

আনন্দের বন্ধু আমি।

দুজন দুজনের মন টেনে নিয়ে চলতে চাই।


-------১ কার্তিক ১৪২৮
------১৯----১০----২০২১
-----নির্মল হালদার



পানকৌড়ির ডুব / নির্মল হালদার

পানকৌড়ির ডুব / নির্মল হালদার




১০৩.
ভিতর চিনলেই বাহির চিনবি।

যেমন নিজের ছেঁড়া কাপড়টা চিনেছিস,
তেমনি আকাশটা যে গোটা আছে
চিনতে হবে তোকে। মাটিটা ছিঁড়লেও
মাটি মাখা যায়। কেননা

তোর সর্বাঙ্গ যে মাটি।



১০৪.
পেঁপে পাকলে পাখি ঠুকরে খাবে।

পেকে উঠুক সব পেঁপে
পাখিরা আসুক। কেননা সব পাখি
আমারই মন। সমস্ত মনই
রাহেড় বাড়ি

রাহেড়ের দানাই মে আমার হৃদয়।


১৫----১০----২০২১
বিজয়াদশমী



১০৫.
যা বলার বলছে ভূমি

পেকে উঠছে ধান
খামার নিকানো চলছে
ধারালো হয়ে উঠবে হাঁসুয়া
ঝুড়ি--ঝাঁটাও আসবে।

যা বলার বলছে ভূমি

ঝরে গেছে কাশ
ঝিঙে ফুলে রোদ ঝলকায়
শিরশিরে হাওয়া
ধানক্ষেতে পাখি আসছে।

যা বলার বলছে ভূমি

ভেজা ধান জমি
শিশির ভেজা পাতা
মাঠে মাঠে আগাছা
গরুর পিছনে বাছুর।

যা বলার বলছে ভূমি

কোথায় তুমি?

ধানের ভেতরে নির্জনতা।


-----৩০ আশ্বিন ১৪২৮
----১৭----১০----২০২১



১০৬.
কপাল পুড়লো বলে আকাশ পুড়লো

আকাশও তোর কপাল,
অনন্ত কালের।
তুই লক্ষ্য করলি না বলে,
আকাশ থেকে গেছে আকাশে

নক্ষত্র পুড়ছে।


১০৭.
পাখির ভূমিকা চেয়ে
পাখিকে বলেছি, আমিও মুখে মুখ রেখে
আহার জোগাবো।

ডানা ঝাপটে পালিয়েছে পাখি

আকাশ নেই মাটি নেই, শুধু কুড়ুলের শব্দ।


------৩১ আশ্বিন ১৪২৮
-----১৮----১০-----২০২১



১০৮.
অভাবটাই আমার মূলধন
যত ভাঙ্গাই তত ভাব

যত ভাঙ্গাই তত ভাব

হাত পাততে হয় না কারোর কাছে
ঋণ করতে হয় না কারোর কাছে

অভাবটাই আমার আলো

যত ভাঙ্গাই তত আলো
যত ভাঙ্গাই তত ভাব

সাত রঙের সাতটা সূর্য তাল গাছের ফাঁকে।



১০৯.
গাছের কাছে ডানা চেয়ে শুনতে হলো,
আমাকে বীজ দেবে। আমাকে করতে হবে
বংশ বিস্তার।


বংশবিস্তার তো হয়েই আছে পাখিতে পাখিতে,
বটফলের রঙে। পুটুস ফুলের মধুতে,
কাকের ডাকে

আমি ডাকলে গরুর গলায় ঘন্টি বাজে।


-------২ কার্তিক ১৪২৮
------২০----১০----২০২১



১১০.
হেমন্তের শিশির
ঘাসে ঘাসে শিশির
ভিজে আছে ধুলামাটি
আজ তেসরা কার্তিক।

ভোর
আবছা কুয়াশা
উড়ন্ত পাখি
সবজি বাড়ি।

কাকতাড়ুয়ার হাঁড়ি মুখ
গাছে গাছে বেগুন
ফুলকপির ক্ষেত
ছোট ছোট পালং পাতা।

ক্রমশ আলো
সাত রঙের কিরণ
পুবের হাওয়া
চুলা জ্বলে উঠল ঘরে।

শিশুর কান্না
শীত শীত কাঁথা কানি
দেয়ালে হেলানো সাইকেল
দূর পাহাড়ে রোদ

পাহাড়তলীর ঘরে আমি যাই।



১১১.
যখন যেখানে পারি হাত পাতি

আমার ছোট হাত
অনেক দূর না গেলেও
সময় সমাজের কাছে ভিক্ষা মাগে

আমি একইসঙ্গে ভালো ভিখারি মন্দ ভিখারি

আঁকাড়া চালের সঙ্গে অবজ্ঞা ও অপমান
আমার ঝুলিতে

আমার হাতে ঝরাপাতার সৌন্দর্য।


------৩ কার্তিক ১৪২৮
-----২১----১০----২০২১



১১২.
বুকে দুধ নাই তো কি হবে লো
ধানে দুধ এসেছে। কচি ধানের গন্ধে
থেমেও যাবে তোর নুনুর কান্না।

আমিও আবদার করি,
ভোরের শিশির চিবানো। কে আর মেটাবে
আমার আদর। আমি শুধু

হিমেল রাতে ওই গগনে দীপ জ্বালাই।


------৪ আশ্বিন ১৪২৮
------২২----১০-----২০২১



১১৩.
বট গাছে ফল পেকেছে

কে খাবেরে কে খাবে?

বট গাছে ফল পেকেছে

ফলের স্বাদ?
হাওয়া এসে বলবে আমাকে।
ফলের স্বাদ?
পাখি এসে বলবে আমাকে।


-------৫ কার্তিক ১৪২৮
-----২৩-----১০----২০২১
-------নির্মল হালদার





সোমবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২১

আমার মায়ের নাম মায়া







কোনো বন্ধুর লেখা অন্যদের পড়ানোর মতো আনন্দ আর কিছুতে নেই। আর, সে-লেখা যদি হয় এমন।
আসুন, আমরা সঙ্গী হই এক আশ্চর্য যাত্রাপথের।
(লেখাটির নাম আমার দেওয়া, নির্মলের অনুমতি না নিয়েই।)
.
.
আমার মায়ের নাম মায়া
.........
নির্মল হালদার
.
বাবা বিয়ে করতে যাচ্ছে।
আমার বাবা বিয়ে করতে যাচ্ছে।
কোনো গাড়ি নেই। গাড়ি বলতে বাস-ট্যাক্সি নেই।
বর যাচ্ছে গোরুর গাড়িতে।
বরের সঙ্গে একজন মুরুব্বি।
তিনি শুধু হুঁকো টেনে চলেছেন।
বর নাকের কাছে হাত রেখে হাওয়া করছে। হুঁকোর গন্ধ তার সয়না।
পুরুলিয়া থেকে মানবাজার অনেকটা রাস্তা। কাঁচা রাস্তা। এবড়োখেবড়ো। উঁচু-নিচু।
ঢিকির ঢিকির গোরুর গাড়ি চলেছে।
বেলা বারোটায় শুরু হয়েছে যাত্রা। এখন, বেলা পড়ে আসছে। গাছপালায় আলো-আঁধারের শেষ খেলা। আর বর চলেছে নতুন জীবনের দিকে।
শেয়াল ডেকে উঠলো।
আরেকটা গোরুর গাড়িতে আছে আমার দাদু শিবপ্রসাদ হালদার। সে বলছে, ভয় নেই রে, ভয় নেই। এ বরং শুভযাত্রা।
আমিও তো আছি গোরুর গাড়িতে। আমি বললাম-- শেয়ালের অভিনন্দনবার্তা।
আমাকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না। এমন ভাবে লুকিয়ে আছি, আমার নিশ্বাসের শব্দ কেউ টের পায় না। আমি মজা করে, কয়েকবার বাবার পিঠে চিমটি কেটে দিই।
পিছন ফিরে দেখে, কেউ নেই।
কয়েকবারের পর বাবাকে বলতেই হলো-- পিঠে চিমটি কাটছে কে রে বাবা!
মুরুব্বি বলেন-- কে আবার, মশা।
আমি চুপিচুপি হাসি।
বাবার খিদে পায়। মুরুব্বিকে বলে। তিনি জানান, খাবি কী রে বাবা! আজ তো বিয়ের পরে খাওয়া। বাবাজি, আপাতত খিদে চেপে রাখো।
-- জল তো খেতে পাবো।
কিন্তু কোথায় জল?
মুরুব্বি হাঁক দেন-- 'ও খুড়া, বজেনের জলতেষ্টা পেয়েছে। কী করবো?'
আমার দাদু আরেক গাড়ি থেকে জানায়-- বাঁধ দেখলে দাঁড়াবি-ই-ই।
বাবার কপালে ঘাম।
আমি মুছিয়ে দিলাম, নিঃশব্দে। বাবা চারদিকে তাকিয়ে দেখে, কোথায় হাওয়া, কী হাওয়া।
যেটুকু হাওয়া বইছে, ঘাম মুছতে পারে না।
বাবা কী করে জানবে। আমার ছোট দুটো হাত, মুছে দিয়েছে বাবার ক্লান্তি।
বাবার মুখ শুকনো।
বাবার পরনে হাঁটুঅব্দি একটা ধুতি। একটা সাদা পাঞ্জাবি। বাবার পাশেই নামানো আছে টোপর।
সেও কখনো কখনো গরুর গাড়ির দুলুনিতে দুলে উঠছে। নাকি নেচে উঠছে খুশিতে?
গাড়ি দাঁড়িয়ে গেছে।
দুটো গাড়ি থেকেই সবাই নামলো। রাস্তার ধারে একটা পুকুর। অন্ধকার জল।
বরযাত্রীদের কে একজন বললো-- আগে হ্যাজাকটা জ্বালতে দাও, তারপর জলে নামবে।
আমিও নেমেছি। বাবার পিছনে পিছনে। বলা যায়, বাবার পাঞ্জাবি ধরে ধরে নেমেছি।
আমারও তেষ্টা পেয়েছে।
বাবার একবার মনে হলো, কেউ বোধহয় পিছন দিকে টানছে। পিছন ফিরে দেখে, কেউ নেই।
বাবা কোনো কথাও বলছে না। মুরুব্বি দাদুকে বলেন-- হ্যাঁগো খুড়া, তোমার ছেলে যে কোনো কথাই বলছে না। বরযাত্রীদের কে একজন বললো, নতুন বৌয়ের স্বপ্ন দেখছে। ওকে দেখতে দাও।
কী স্বপ্ন?
আমি জানতাম।
আমি জানতাম, স্বপ্ন নয়। বাবার মাথায় ঘুরছিল এক ভাবনা।
বিয়ে তো করছি, সংসার চালাতে পারবো? লোকের দোকানে চাল মেপে যেটুকু রোজকার, সংসার চলবে?
চলবে চলবে... পেঁচা ডেকে উঠলো। গাছে গাছে রাতের পাখিরা ডানা ঝাপটায়। জোনাকিরা উড়ে উড়ে বাবাকে শুভ বার্তা জানায়। প্রতিটি রাস্তায় ঝিঁঝিঁপোকার ডাক, আজ যেন প্রকৃতির শঙ্খধ্বনি।
আমার বাবা বিয়ে করতে যাচ্ছে।
আর কত দূর?
কত দূর?
এইতো এসে গেলাম, এসে গেলাম...।
দুটো গাড়ি আবার দাঁড়িয়ে যায়। বর ও বরযাত্রীরা নেমে পড়ে। দাদুর নির্দেশ, সবাই চিঁড়ে ভিজিয়ে খাবে। বিয়ে তো শেষ রাতে। আর কনের ঘর কি দেবে না দেবে, দাদু কিছুই জানে না।
চিঁড়ের সঙ্গে মিঠাই ছিল, আমিও পেয়েছি। লুকিয়ে লুকিয়ে।
আমার খিদের কথা কেউ জানে না। আরও কত খিদে, কেউ জানে না।
রাত হয়ে গেল মানবাজার পৌঁছোতে। কুণ্ডুঘরে বেজে উঠলো শাঁখ।
এয়োতিরা পিতল কলসির জল গোরুর গাড়ির চাকায় ঢালে। সবাই বরের মুখ দেখে বলে-- কী সুন্দর মুখ গো! আমাদের মেয়েটা সুখ পাবে গো সুখ পাবে।
বাবার মুখ নীচু।
মুরুব্বি পরিয়ে দেন টোপর।
আমার দিদিমা বাবাকে বরণ করে। মিষ্টিমুখ করায়।
আর আমি দিদিমার খুঁটে-বাঁধা পান খুলে ফেলে দিই।
বাজনা বাজছে।
আমার মামাবাড়িতে দুর্গা মন্দির আছে। দাদু বাবাকে বললো-- যা মন্দিরে গিয়ে প্রণাম কর।
সেই ফাঁকে আমি চলে গেছি মায়ের কাছে। মা বসে আছে সেজেগুজে।
মা না, এক বালিকা।
বারো বছর বয়স।
লাল রঙা এক ফিনফিনে শাড়িতে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে মা।
ভয় মেশানো মুখ। মা ভাবছিল-- কোথায় যাবে, কী করবে, কাদের পাবে শ্বশুরবাড়িতে। শেষ হয়ে গেল খেলনাবাটি খেলা। এক্কাদোক্কা। লুকোচুরি। পুকুরে সাঁতার। দুর্গা মন্দিরে খড়ের কাঠামোর পিছনে লুকিয়ে থাকার মজা, শেষ হলো।
ছল ছল করছে মায়ের মুখ।
তখনই আমি ঝপাং করে মায়ের কোলে। মা ভয়ে চেঁচিয়ে ওঠে আমাকে দেখে। বলে-- 'তুই এখুনি এলি! তোর তো অনেক দেরি আছে। এখন যা, পালিয়ে যা! যেন কেউ দেখতে না পায়। তোর বাবা দেখতে পায়নি তো?'
বলে-- 'তোর আসতে দেরি আছে সোনা... তুই যা।'
-- আচ্ছা, যাবো যাবো। তার আগে আমাকে একটা হামি দাও। আর বলো, তোমার নামটা কী?
-- তুই তো জানিস...
-- তোমার মুখে শুনতে চাই।
-- আমার... আমার নাম মায়া।

(১৭-১০-১৯)


একরাম আলি র দেওয়াল থেকে 🙏







শুক্রবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২১

কবি নির্মল হালদারের বিভিন্ন সময়ের ছবি
































বদলি হয়ে যাওয়া // নির্মল হালদার

বদলি হয়ে যাওয়া // নির্মল হালদার




সুব্রত স্যার ক্লাস সেভেনের ছাত্র-ছাত্রীদের বলতেন--------তোরা আমাকে স্যার স্যার করবিনা। সবাই দাদা বলবি।
সুব্রত স্যার ক্লাস সেভেনের ক্লাস টিচার। অঙ্ক পড়ান।

এক ছাত্রী বলেছিল-------স্যার
অন্য মাস্টারমশাইদের দাদা বললে
রাগ করবেন না তো?
সুব্রত স্যার উত্তরে বলেছিলেন------রাগ করতেই পারেন।
আবার না করতেও পারেন। আমি শুধু বলছি, আমি রাগ করবো না।

এই সুব্রত স্যার ছাত্র-ছাত্রীদের বলেছিলেন-------তোরা সবাই একটা খাতায় আমাকে লিখে দিস, কবে কার জন্মদিন।
ছাত্র-ছাত্রীরা একই সঙ্গে জিজ্ঞেস করেছিল-------কেন স্যার?
সঙ্গে সঙ্গে সুব্রত স্যার-------আবার স্যার? দাদা বলতে কষ্ট হচ্ছে তোদের?

হেসে ফেলে ছিল সবাই। বলেছিল-----
আর হবে না দাদা।

সুব্রত স্যার মনে করেন, তিনি কখনোই
কোনো সরকারি দপ্তরের চেয়ারে বসে নেই। এবং তার অধীনে ছাত্রছাত্রীরা নেই। তাহলে ছাত্রছাত্রীরা কেন বলবে, স্যার?

বরং ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের কাছ থেকে দাদা শুনতে মধুর লাগে। সেখানে স্যার শব্দটি শুনলেই মনে হয়, হাতে একটা ছড়ি আছে। যিনি শাসন করতে পছন্দ করেন। 

সুব্রত মুখোপাধ্যায় স্যার কোনো ভাবেই নন। তিনি সর্বদাই কাছের মানুষ। তাই টিফিন পিরিয়ডে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে গাছপালা চিনতে যান। ছাত্র-ছাত্রীরা যা চেনে, তাদের সুব্রতদা কে চিনিয়ে দেয়। সুব্রতদা যা চেনেন ছাত্র-ছাত্রীদের চিনিয়ে দেন। পারস্পরিক এক লেনদেনের মাধ্যমে
কাছাকাছি চলে আসার একটা সুযোগ। তার সঙ্গে অচেনাকে চিনে নেওয়া। 

এই সুব্রতদা প্রতিমাসেই ছাত্র-ছাত্রীদের জন্মদিন উদযাপন করে থাকেন। তিনি তো ক্লাস সেভেন থেকে টেন অব্দি পড়ান।তো সব ক্লাসের  ছাত্র ছাত্রীদের জন্মদিন উদযাপন করে থাকেন।

কিছুই না, সুব্রত দা নিজে যেকোনো একটা ফুল ছাত্র বা ছাত্রীর হাতে দিয়ে
একটি চকলেট খাইয়ে দেন। মনে মনে উচ্চারণ করেন, কল্যাণ হোক। জন্মদিন শুভ হোক।

ছাত্র বা ছাত্রী প্রণাম করে।


অঙ্কেও পারদর্শী।

ছাত্র বা ছাত্রী একবার না পারলে,
বারবার বুঝিয়ে দেবেন। তাও না পারলে সুব্রতদা বলেন-------টিফিনে আবার তোর কাছেই তোর জন্যেই আসবো। শেষ অবধি দেখা গেছে, অঙ্কে কাঁচা ছাত্র বা ছাত্রী পাকা হয়ে উঠেছে। 

সুব্রতদার জন্যেই সরস্বতী পুজোতে
প্রতিবছর নাটক। সে বছর রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর করেছিল ক্লাস নাইনের ছাত্র ছাত্রীরা। যে ছেলেটি অমল করেছিল, সে পুরস্কার পেয়েছিল অনেক।
আড়াল থেকে সুব্রতদা রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছিলেন।

সুব্রতদার জন্যেই পিকনিক। সুব্রতদা যদিও পিকনিক শব্দটি পছন্দ করতেন না।
বলতেন বনভোজন। চেষ্টাও করতেন,
কোনো না কোনো জঙ্গলের দিকে যাওয়া। কারণ, ছাত্রছাত্রীরা তাহলে জঙ্গলের মর্ম বুঝবে।

আর বনভোজন মানেই, শুরু থেকে শেষ অব্দি রবীন্দ্র সংগীত। ছাত্র-ছাত্রীরা না গাইলে সুব্রতদা একা একা গান করবেন ।

এই সুব্রতদাকে হঠাৎ স্কুলে আর দেখা যাচ্ছে না। ছাত্র-ছাত্রীরা জানতেই পারছেনা, সুব্রতদা স্কুলে কেন নেই?

ক্লাস টেনের অনিরুদ্ধ সঠিক তথ্যটাও
নিয়ে আসতে পারলোনা। সে জানেনা
সুব্রতদা বাড়ির কাছাকাছি  অন্য একটি স্কুলে বদলি নিয়েছেন। যাবতীয় ভালোবাসা ত্যাগ করে অনিরুদ্ধদের স্কুল থেকে চলে গেছেন।

প্রিয় সুব্রতদা চলে গেছেন। 

এই সত্যটুকু ছাত্র-ছাত্রীরা যখন জানতে পারলো, তখন ছল ছল করেছিল অনেকের বুক। আর মিত্রার মনে পড়ছিল, সুব্রতদা তাকে উপহার দিয়েছিলেন--------পথের পাঁচালী।
আর গীতাঞ্জলি।

মিত্রা মনে মনে তার প্রিয় মাস্টারমশাই কে একটা চিঠি লিখলো---------

প্রিয় সুব্রতদা
আপনি খুব খারাপ। খুব খারাপ মানুষ।
আমি দেখবো, আপনি আমাদের ছেড়ে থাকেন কি করে! কেননা, আপনার লাগানো আমগাছটা আমাদের সঙ্গেই স্কুলে থাকছে প্রতিদিন ।



-----১২ আশ্বিন ১৪২৮
----২৯----৯----২০২১






আমার পরিবারের একজন // নির্মল হালদার

আমার পরিবারের একজন // নির্মল হালদার




এক প্যাকেট বিস্কুট দিয়ে থাকি।
সকালবেলা।
সিঁড়ির গেট খোলার শব্দ পেলে
কুকুরটা বুঝে যায়, আমি উপর থেকে নামছি। সে আমার দিকে চেয়ে থাকে।

একেক দিন বিস্কুট নিয়ে নামতে আমি ভুলে যাই। আবার উপরে উঠি। বিস্কুট নিয়ে নামি। কুকুরটার সামনে বিস্কুট ভেঙে-ভেঙে ছড়িয়ে দিই।

আজও তাই করলাম। কিন্তু কুকুরটা
একটুও খেলো না। আমি ভাবছি, কী হলো? শরীর--টরির খারাপ নাকি? নাকি মন খারাপ?

মুখটাও করুণ লাগছে। কী হয়েছে তার? কিভাবে জানতে পারবো,
ওরভেতরের কথা?

আমি ডাকলাম-------আয়রে-------
খেয়ে যা। খেয়ে যা-------। তার কোনো
হেলদোল নেই। একবার এদিকে বসছে। আরেকবার ওদিকে। সিঁড়িতে উঠে এসেও বসলো। কিন্তু বিস্কুটের একটুকরোও ছুঁয়ে দেখলো না।


শুনতে পেলাম কে যেন বলছে, কুকুরটা গর্ভবতী। দেখতে পাচ্ছো না?
কে? কে বলছো?

সামনে-পিছনে তাকিয়ে দেখি, কেউ নেই। আবার শুনতে পেলাম, কে যেন
বলছে, কুকুরটা আসন্ন প্রসবা। ওকে
চুপচাপ থাকতে দাও। ওকে বিরক্ত করো না।

চারদিক তাকিয়ে দেখি, কেউ কোথাও নেই। কুকুরটা একা। আর আমি কুকুরটার জন্য বিচলিত বোধ করছি।

একবার ভাবলাম, রুটির টুকরো দিলে
কুকুরটা খাবে। রুটি কই?
আরেকবার ভাবলাম, এই সকাল বেলা মেঘ করেছে বলে, কুকুরটা বিষণ্ণ হয়ে আছে।

যেহেতু প্রকৃতির সঙ্গে সমস্ত প্রাণীর যোগ আছে।

আমার সঙ্গে যোগ নেই?
আমি যে অন্তর থেকে চাইছি,
কুকুরটা বিস্কুট খেয়ে নিক।
আমি শান্তি পাবো।

আমার সকালের যে শুরু এই বিস্কুট দিয়ে। আমার সকালের যে শুরু কুকুরের সঙ্গে  মনের দুটো কথা বলে। জানিস তো, বাপি অনেকদিন নেই। বাড়িতেই আছে।তার টাইফয়েড হয়েছে। এখন তুই যদি না খেয়ে থাকিস, আমার কি হবে?

তোর বাচ্চা এলে আমার ভালোই লাগবে। ওরা আসুক। আমি আনন্দ করবো নিজের মধ্যে।

কিন্তু আজ কুকুরটা একদম মন মরা।
নড়েচড়ে উঠছে না।
তাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে
আমি স্নান করলাম।
এবার চায়ের দিকে যাবো।


আমি হাঁটছি। 

দেখি, আমার পিছনে কুকুরটা।
আমি তাকে বললাম, সামনে চলে আয়।
এর আগে কখনো কুকুরটা আমার সঙ্গে কোথাও যায়নি। এই প্রথম।
আমার ভালো লাগছে।

চায়ের দোকানে আমি দাঁড়াতেই সেও
দাঁড়ালো। আমি একটা বিস্কুট নিয়ে
তাকেও একটা বিস্কুট দিলাম। এখানেও একই রকম ব্যবহার-------
কুকুরটা বিস্কুট খেলোনা।

-------১১ আশ্বিন ১৪২৮
------২৮----৯----২০২১





পানকৌড়ির ডুব / নির্মল হালদার

পানকৌড়ির ডুব / নির্মল হালদার




৮৭.
পাতা--পুতা জ্বালিয়ে কচু শাক সেদ্ধ।
আটাও গুলবে বসুমতী। আর ছেলেকে দিয়ে বলবে:
খা বেটা খা-----------পেটটা থিরাবে।


৮৮.
বাবার হাত ধরে ছেলে মেলা দেখতে যায়।

বাঁশ ঝাড় থেকে মুরগি দেখলো,
বাবার হাত ধরে ছেলে মেলা দেখতে যায়।
পুকুর থেকে হাঁস উঠতে উঠতে দেখলো,
বাবার হাত ধরে ছেলে মেলা দেখতে যায়।
ঘরে ফিরতে ফিরতে কাক থমকে দেখলো,
বাবার হাত ধরে ছেলে মেলা দেখতে যায়।

অনেক দূরের মেলা অনেক আলো
হাওয়াই লাড্ডু নাগরদোলা।
অনেক দূরের মেলা অনেক আলো
বেলুন উড়ছে কাঠের পুতুল।
অনেক দূরের মেলা অনেক আলো
কথা বলা পাখি খেলনা গাড়ি।

আকাশ থেকে মুখ নামিয়ে লাউ ফুল দেখলো,
বাবার হাত ধরে ছেলে মেলা দেখতে যায়।
রঙ ছড়াতে ছড়াতে গোধূলি দেখলো,
বাবার হাত ধরে ছেলে মেলা দেখতে যায়।
লাফাতে লাফাতে কাঠবিড়ালি দেখলো,
বাবার হাত ধরে ছেলে মেলা দেখতে যায়।

মেলার ভিড়, ভিড়ের ভয়
বাবা ছেলের হাত ছাড়ছেনা।


------১১ আশ্বিন ১৪২৮
-----২৮-----৯-----২০২১



৮৯.
সারারাত বৃষ্টি।


সকাল থেকেই বৃষ্টি।

ঘরের ছেঁদা চালা থেকে জল পড়ছে।
জাম বাটি পাতোরে
গামলা পাতো,জল ধরো।
মাথা বাঁচাও কাঁথা বাঁচাও।

ছেলেটাও কাঁদছে

চোখের জলও ধরে রাখি
আদরে আদরে।



৯০.
নুন ছাড়া এক দন্ড চলছে না আমার।
নুনের মতো আত্মীয় কে আর আছে!
নুনের সম্পর্ক থেকেই গুণ পেয়েছি,
গাছ থেকে ঘাস ভালোবেসে যাওয়া

শুধু ভালোবেসে যাওয়া

শিশির বিন্দু থেকে বৃষ্টির ফোঁটা
খরগোশের ছুটে যাওয়া থেকে
ঝড়ের ছুটে যাওয়া, সবই তো আমার
সমস্তই দু হাতে

আমার ঘামের নুনে মিলে মিশে আছে।


------১২ আশ্বিন ১৪২৮
----২৯-----৯----২০২১



৯১.
চাল সিজাই জনার সিজাই
কে কী খাবি বলরে নুনুরা?
আমিতো কামে যাবো,
আমার আসতে বেলা ডুবু।

তোরা তো খেলে বেড়াবি।
আমার কথা মনেই পড়বেনা।
আমারই মন পড়ে থাকবে
তোদের দিকে------

তোদের খিদার দিকে।


------১৪ আশ্বিন ১৪২৮
-----১----১০----২০২১



৯২.
কাঁঠাল গাছ
থৈ থৈ করছে রোদ
আশ্বিনের দিন
পদ্ম ফুটছে পুকুরে

শালুকও আছে
পদ্মপাতায় ফড়িঙ
পানকৌড়ি
বক উড়ছে

শাদা মেঘ উড়ছে
আকাশের নীল
অপরাজিতার নীল
আমারই দিকে

আমাকে কে পাঠালো?
আমাকে ভালবাসছে কে?
বেলা যে হলো
আমার যাওয়া কত দূরের?

গাছে গাছে পাতা নড়ে
পথে পথে পথচারী
চোখের আলো
আমার মুখে এসে পড়ে

কোন্ দিকে যাবো, কার কাছে?



৯৩.
সুখ বলো আর দুখ বলো
দুদিন বৈ তো নয়, শুধু
প্রেম পিরিতি থেকে যায় বুকে
লাঙ্গলের দাগের মত।

অনন্তকালের নাঙ্গল
সেই জানে, মাটির গভীরে
শিকড়ের সুর।

অনন্তকালের শিকড়
সেও জানে, পিরিতির সুখ।


------১৮ আশ্বিন ১৪২৮
-----৫-----১০----২০২১



৯৪.
আমাকে ধমক দেবার মত
আর কেউ রইলো না।
এক দাদা ছিল সেও গেল চলে।
আমি ভুল করলে
কে আর শাসন করবে? কে আর
বকুনি দেবে আমি ভুল পথে হাঁটলে?


সব রাস্তা পড়ে রইলো।

আমিও একা একা আর যাব না
পাখি ধরতে। কেননা, আকাশের মত
অভিভাবক আছে এই ভয়ে।



৯৫.
কাশবন
উড়ছে কাশের রেণু
আশ্বিনের ধানক্ষেত
ধান ফুল।

ধান ফুল
আগামীর সম্ভাবনা
আগামীর সম্পদ
মাটির সৌন্দর্য।

রক্ষা করে
আলো করে
গোলা ভরা ভালোবাসা
খড়ের আঁটির বাঁধন ।

বন্ধন, পায়রার পাখায়
মুক্তি, পায়রার পাখায়
পায়রা এসেছে
শালিক এসেছে।


মানুষ এসেছে
একটা মানুষ এক পৃথিবী
আবছায়া অস্পষ্ট
স্পষ্ট হয়েও যায়।

জন্ম আর মৃত্যুতে।


------২০ আশ্বিন ১৪২৮
-----৭----১০-----২০২১


৯৬.
মুখের বিড়িটা ছুঁড়ে দিয়ে
হারু খুড়া বলে, কিসে কি আছে রে
আজ মরলে কাল দুদিন--------
আমি তাই উপর দিকে চেয়ে আছি,
যদি নতুন তারার জন্ম দেখতে পাই।

আলো দেখতে পাই।



৯৭.
আমরা চার ভাই চারটে গাছ
তিনটে গাছ উড়ে গেলে, আমি একটা ভাই
খুদকুঁড়ো খুঁজতে খুঁজতে নিজেকে খুঁটে খাই।

নিজেকে ছিঁড়েখুঁড়েও খুঁজি
যদি দাদাদের দেখতে পাই, যদি হাত পেতে বলতে পারি,
দে আমাকে আদর দে।


------২১ আশ্বিন ১৪২৮
-----৮-----১০----২০২১



৯৮.
ঝুড়ি--ঝাঁটা বিক্রি করে কি দিন চলে?
হাতে--পায়ে খাটতে হয়।
বাজার যাই,কাজ খুঁজি।আর
কাজের পিছনে দৌড়ে দৌড়ে
দেড়শ টাকার মজুরি।

বাঁশের দামও বেড়েছে, কি করে শুনবে আর
বাঁশির মাধুরী।


-----২২ আশ্বিন ১৪২৮
-----৯----১০----২০২১



৯৯.
কার দোকানে যাব? কাদের দোকানে?

সারি সারি মনোহারি গোলদারি
সারি সারি চালেরও দোকান
কোথায় কি দর আমার জানা নেই।
আমি দেখছি খদ্দেরের ভিড়
আমি শুনছি টাকা-পয়সার ঝমঝম।


হাসি মুখ মলিন মুখ।


আমিও যে বুকের ঝাঁপ খুলে অপেক্ষায় আছি,
কখন আসবে বিনে পয়সার খদ্দের।



১০০.
কী চাইতে পারি আর?

বট গাছের ঝুরি ধরে দোল খায় ছোটরা
বটফলও দুলছে
গাছের মাথায় রোদ
বট পাতার চিকন

কী চাইতে পারি আর?

শিকড়ের চেয়ে থাকা
উঁচু-নিচু মাটি
পিঁপড়ের বাসা
পোকাদের ওঠানামা

কী চাইতে পারি আর?

বট গাছের ডালে ডালে কাঠবিড়ালি
বটের ছায়ায় একটা লোক
মলিন ধুলো
রাস্তা চলে যায়

কী চাইতে পারি আর?

বটের পিছনে দীঘি
পাতা ভাসে একটি দুটি
ঢেউ ওঠে ছোট ছোট
জলের ভিতরে জল

আমার মুঠিতে ধরবেনা।


-----২৩ আশ্বিন ১৪২৮
দুর্গা পঞ্চমী।
-----১০----১০----২০২১



১০১.
কৃষ্ণ নামে অভাব ঘুচবে গো
যদি কৃষ্ণের সঙ্গে ভাব করো।
কৃষ্ণ একমাত্র সুখ
কৃষ্ণ একমাত্র সখা
সুর জানে সৌরভ জানে।
ভালোবাসার ভাত জানে
আর জানে
বৃক্ষের শতনাম।

গাছের নামেও অভাব ঘুচবে গো
যদি গাছের সঙ্গে ভাব করো।


১০২.
আগে রসিক হও
তারপর খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধবে।
হাঁড়ি না পেলে
খেজুর গাছে বুক বাঁধবে।

টলমল করবে রসে।

রসে বশেই রসিকা, রাধা নাম খুঁজে পাবে।


------২৪ আশ্বিন ১৪২৮ / দুর্গা ষষ্ঠী
----১১----১০----২০২১
------নির্মল হালদার





মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১

ছাতিমের জ্বর হলে / নির্মল হালদার

ছাতিমের জ্বর হলে / নির্মল হালদার



পায়রাটা জানলায় এসে বসলো।
মনে হলো, আমাকে বলবে আজ,
চিঠি নেই তবে খবর আছে--------
ছাতিমের জ্বর হয়েছে।

ছাতিমের বয়স কতোই বা এই ২৭/২৮
এই বয়সে জ্বর হয় নাকি? ছাতিমের মতো তরুণের জ্বর হলে সারা পৃথিবীতে জ্বর আসবে। না না-------
পায়রাটা মনে হয় ভুল বলছে। কিংবা
আমি ভুল শুনছি।

পায়রাটাকে আমার সন্দেহ থেকে জিজ্ঞেস করি------- ঠিক বলছো তো,
ছাতিমের জ্বর হয়েছে? পায়রাটা এবার আমার কাঁধে এসে বসে পড়ে।
আমার কান কামড়ে বলে-------সত্যি গো সত্যি ছাতিমের জ্বর হয়েছে?

আমি তাকে বললাম------তাহলে চলো
তোমার সঙ্গে যাই তাকে দেখতে। পায়রাটা বললো, সঙ্গে বাসবদত্তাকে নাও-----ছাতিমের জ্বর ভালো হয়ে যাবে।

বাসবদত্তাকে কিভাবে পাবো? তার বাড়ি চিনি না। তার ফোন নাম্বার জানা নেই। একবার শুধু ছাতিমের সঙ্গে দেখেছিলাম তাকে।

আচ্ছা বাসবদত্তার বদলে চড়ুইকে নিয়ে যাই যদি? ছাতিম শুশ্রূষা পাবে না?

যে কোনো মেয়েই তো শুশ্রূষার একটা রূপ?

পায়রাটা আমাকে বলে-----অতশত চিন্তা করে লাভ নেই, তুমি যাবে তো আমার সঙ্গে চলো।
আমি কিন্তু কিন্তু করি। বাসবদত্তাকে মনে পড়ছে শুধু। আমি পায়রাটাকে বললাম------বাসবদত্তাকে নিয়েই যাবো। চলো, আমরা তাকে খুঁজে বেড়াই।

আমি পায়রার পিঠে উঠে বসলাম।

উড়তে উড়তে দেখতে পাই অজস্র লোকজন রাস্তায় চলাফেরা করছে।
ছাদে ছাদে জামা-কাপড় মেলছে মেয়েরা। দেখতে পেলাম আরো একটি মেয়ে ছাদের এক কোনে চুল এলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

পায়রাকে বললাম-----চলো মেয়েটির কাছে। মেয়েটিকে বললাম, তুমি বাসবদত্তার মত দেখতে। তোমাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে ছাতিমের কাছে। ছাতিমের জ্বর হয়েছে। তুমি গেলে তার জ্বর নেমে যাবে। 
মেয়েটি বললো, আমি যাবো না। কারুর ভূমিকায় আমার পক্ষে অভিনয় করা সম্ভব নয়। যদি যাই, আমি আমার নামেই যাবো।
আমি বললাম, তাই চলো। ছাতিমের জ্বর এই পৃথিবীতে মানায় না। তার জ্বর মানে প্রকৃতির জ্বর।

পায়রাকে বললাম, তুমি উড়তে উড়তে চলো। আমরা হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি।

রাস্তায় কোনো কথা নেই। মেয়েটি একবার শুধু আমার কাছে জানতে চেয়েছিল-----ছাতিম আমার কে?
আমি বললাম, আমার তরুণ বন্ধু।

হঠাৎ দেখি এক মনোহারি দোকানে
বাসবদত্তা। আমি এগিয়ে যাই তার দিকে। সে প্রথমে আমাকে চিনতে পারেনা। পরিচয় দিতে ছাতিমের কথা বলতে চিনতে পারলো। তারপর জিজ্ঞেস করে------কেমন আছি?

আমি তো সবসময় ভালো থাকি। আমার চারপাশটা শুধু খারাপ থাকে বলে আমি পীড়িত হই। আপাতত
ছাতিমের জ্বর হয়েছে। তুমি চলো তার কাছে। সে সুস্থ হয়ে উঠবে।
সেই মেয়েটি এবার আমাকে বলে-----
আপনি তো বাসবদত্তাকে পেয়ে গেছেন। আমি তাহলে চলে যাই।

দুজনকেই নিয়ে যাবো-------আমি বলি। তারপর বাসবদত্তার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।

বাসবদত্তা সমস্ত ঘটনা শুনে আমাকে বলে-------ছাতিমের জন্য এত কাণ্ড করছেন? সে তো আপনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখে না। শুনেছি। এখন যদি আপনাকে দেখে বলে-------আপনাকে তো চিনতে পারলাম না।

সেই মেয়েটি বাসবদত্তাকে বলে, তুমি যাও ভাই। আমাকে আর টেনো না।
আমাকে দেখিয়ে আরো বলে--------
এই ভদ্রলোকের পাগলামি আমার সহ্য হচ্ছে না।
পায়রা বলে-------পাগলামির কিছু নেই। খুব স্বাভাবিক, একজনের জ্বর হয়েছে বলে আরেকজন অস্থির হয়ে গেছে। এই অস্থিরতাকে স্থির করতে
সবাই আসবে না। তোমাদের যখন পাওয়া গেছে, তোমরা চলো ছাতিমের কাছে। এসো -------আমার পিঠে তিনজনেই উঠে পড়ো।

ছাতিমের পাশে শুয়ে আছে আরেকজন। সেও ছাতিমের মত দেখতে। দুজনেই ঘুমোচ্ছে।


এবার কি করবো?

-----২৯ ভাদ্র ১৪২৮
-----১৫-----৯----২০২১
-----নির্মল হালদার





আনন্দ-বেদনা / নির্মল হালদার

আনন্দ-বেদনা / নির্মল হালদার








পাশের ঘরটা সব সময় বন্ধ থাকে।
সকালে একবার খুলে পরিষ্কার করে
বন্ধ করে দিই। সন্ধ্যেবেলা একবার খুলে ধুপ জ্বালাই। বাদবাকি সময়
ঘরটা বন্ধই থাকে।

হঠাৎ কখনো কোনো অতিথি এলে
শোওয়ার ব্যবস্থা করি। এছাড়া ঘরটাতে আমার কোনো কাজ থাকে না।
একেকদিন দরজা যেই খুলেছি,
মনে হয়, একটা নতুন ঘরে ঢুকছি।
সব অচেনা লাগে।

মনে আছে, একদিন ঘুমাবো ঠিক করলাম। শুয়ে পর খটমট করছে মন।
উঠে পড়লাম।

ঘরটার সঙ্গে আমার সম্পর্কের ওঠা নামা হয়নি। তাই বুঝি, ঘরটার সঙ্গে
অভ্যস্ত হতে পারছি না।

এই ঘরটাতেই হঠাৎ করে খুঁজে পেলাম
আমার পুরনো স্মৃতি। যেমন, আমার মনে পড়লো --------কিছু পুরোনো কাগজপত্র বই বিক্রি করে ছিলাম স্কুলে পড়াকালীন। তো একটা বইয়ের মধ্যে লুকানো ছিল একটা চিঠি।

ক্লাস নাইনের প্রেমপত্র।

মনে পড়তেই, মেয়েটির মুখ মনে করার চেষ্টা করছিলাম। কিছুতেই মনে
পড়লোনা।

আরেকদিন দরজা খুলতেই, সেই কুকুরটা। আমি তখন ক্লাস ফাইভ।
কুকুরটা আমার খুব ন্যাওটা ছিলো।
যেখানেই গেছি, আমার সঙ্গে সঙ্গে।
সেই কুকুরটা হঠাৎ হারিয়ে গেল।
আমি মুষড়ে পড়েছিলাম।

সন্ধ্যেবেলা।
কি একটা খুঁজতে ঘরটা খুলেছি।
দেখতে পেলাম মায়ের লক্ষ্মীর হাঁড়ি।
সেই লক্ষ্মীর হাঁড়িতে হাত ঢুকিয়ে
আমি পুরনো টাকা পয়সা এবং রূপোর টাকা বের করছি।

ঘুগনি খাবো বন্ধুদের নিয়ে।

আমার মাথাটা ঝনঝন করে উঠলো।
মাকে মনে পড়ছে।
ঘরের আলো জ্বালাইনি। আলো জ্বালতেই কোথাও কিছু নেই। কেবল
দেয়ালে ছবি। আলমারিতে বই।

আমার একটা ভয় তৈরি হলো। যে
ভয় থেকে ঘরটা খোলার সাহস পাই না। কিন্তু দুবেলা খুলতেই হবে। এবং আমি ভয়ে ভয়েই ঘরটা খুলি।

কাল যেমন, সকালবেলা তালা চাবি খুলে ঘরে ঢুকছি , দেখি চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে একজন। আমার শব্দ পেয়েই সে ঢাকা খুলে আমাকে বললো-------কেমন আছো হে?
আমি প্রদীপ রায়। চিনতে পারছো?

আমি থমকে দাঁড়াই।

কাল রাত্রে তো কেউ আসেনি?
আমিতো দরজা বন্ধ করেই, আমার ঘরে শুয়ে ছিলাম। প্রদীপ রায় কিভাবে এলো?

প্রদীপ আমাকে চুপচাপ দেখে বলে,
তুমি ছিলে ক্লাস ফাইভ। আমি ছিলাম এক ক্লাস উপরে। মনে পড়ছে?

মনে পড়লেও মনে পড়ছে না,
কাল রাত্রে প্রদীপ কখন এলো আমার কাছে? মাঝরাত্রে কি? আমি কি তখন ঘুম ঘোরে ছিলাম?

এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সব।

ভাবছি------ঘরটা আর রাখবো না।
স্মৃতিরা আমাকে ক্লান্ত করছে। আমাকে বিধ্বস্ত করছে।
ভাবছি-------ঘরটাকে তুলে ফাঁকা মাঠের মধ্যে রেখে আসবো।

আজ দুপুরবেলা কি একটা বইয়ের জন্য ঘর খুলেছি। একটা ঝোড়ো হাওয়া আমাকে ধাক্কা দিলো খুব জোর। আমি পড়ে যেতে যেতে দরজাটা ধরে ফেললাম।

বন্ধ ঘরে ঝোড়ো হাওয়া?

দেখতে পাই, একটা শাড়ি।
সারা ঘরে উড়ছে।
কার শাড়ি?

আমার মনে পড়লো, রসিকা এসেছিল একদিন। সেই বোধ হয় ভুল করে  শাড়িটা ফেলে গেছে।
কিন্তু আগে দেখতে পাইনি কেন?

ঘরটা আর খুলবো না।
ময়লা জমলে জমে উঠুক। যখন যেদিন অতিথি আসবে খুলবো।

দু' তিনদিন বন্ধ রাখার পরে
মনে পড়লো, ওই ঘরে টেবিল ফ্যান আছে। এই ঘরে নিয়ে আসা জরুরি।

ঘরটা খুলতেই দেখলাম, টেবিল ফ্যান নেই। একটা হাত পাখা পড়ে আছে মেঝেতে। সে বলে-------তুমি লম্ফর আলোতে বড় হয়ে উঠেছো।কোনো
ইলেকট্রিক লাইন ছিল না। তুমি আজ
টেবিল ফ্যান খুঁজছো?

 
এই সব স্মৃতি আমাকে আজ বিচলিত করে। স্মৃতিরা যে  সততই দুঃখ-বেদনার ঘরটা ঢুকলেই আমি টের পেয়ে যাচ্ছি।

না না ঘরটাকে আর রাখতে চাই না।

সারাদিনের ঘোরাঘুরির পর
বাড়িতে এসে শুয়ে আছি। হঠাৎ মনে হলো, কে যেন ডাকছে আমাকে।

কে?
কে?

কোনো উত্তর নেই।

বাইরে যাই।
কেউ কোথাও নেই। চারদিক অন্ধকার।

আমার মন কি ভুল শুনেছে?

আজ ঘরটা খুলতেই হবে। একটা কলমের দরকার। এই ঘরেতো কাগজ-কলম কিছুই থাকে না। 

ঘর খুলে আলো জ্বালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই। কোনো কারণে ইলেকট্রিক কানেকশন কাটা পড়েছে।

অন্ধকারেই আন্দাজে, আলমারি খুলে
ফেলি। হাৎড়াই, একটা কলমের জন্য।
না -----কলম পাই না। বদলে একটা ছোট কাগজের গোছা। বুঝতে পারছি না, কিসের গোছা।

ঘর থেকে বেরিয়ে এই ঘরে এসে দেখি
একটা নোটের বান্ডিল। সুতো দিয়ে বাঁধা। সঙ্গে একটা চিরকুট।
স্নেহের
গোরা 
তুমি আমার কাছে কোনোদিন কিছুই 
চাওনি। আমারও ক্ষমতা হয়নি তোমাকে কিছু দেবার। আজ
তোমার জন্য পাঁচ হাজার টাকা রেখে গেলাম তোমাকে না জানিয়ে।  কারণ,
আজকের দিনে পাঁচ হাজার টাকা কিছুই না। আর আমারও এর বেশি ক্ষমতা নেই। অথচ তোমাকে দিতে ইচ্ছে করছে খুব।
তুমি খুশিমনে গ্রহণ করলে, আমার ভালো লাগবে।

ভালো থেকো।

আশীর্বাদক
তোমার বাবা


আমার বাবা কবে এসেছিল?
আজ মনে হচ্ছে, আমারও একটা বাবা ছিল। যিনি আমাকে  আশীর্বাদ করেছেন পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে।
যা আমি গুপ্তধনের মত আজ পেয়ে
মনে করছি, আমারও একটা শিকড় আছে। এবং এই ঘরটাও একটা শিকড়।

------৩১ ভাদ্র ১৪২৮
-----১৭-----৯----২০২১
-----নির্মল হালদার



ছবি : কল্পোত্তম



মৎস্যকন্যা // নির্মল হালদার

মৎস্যকন্যা // নির্মল হালদার




একটা গল্পের খোঁজে এসে স্বাগত কে দেখতে পেলাম। সে পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরছে। আমি জানতে চাইলাম, কি মাছ পেলে?
সে জানালো----একটাও মাছ পায়নি। বরং দেখতে পেয়েছে এক মৎস্যকন্যাকে। সে বারবার জল থেকে লাফ দিয়ে উঠছে। আর ডুবে যাচ্ছে।

স্বাগত আরও বললো------সে নাকি
কথা বলতে চাইছিল। মৎস্যকন্যা
কোনো কথা বলেনি। একবার ছিপের কাছে এসেও চলে গেছে। 

আমি স্বাগতর কাছে জানতে চাইলাম----মৎস্য কন্যার নামটাও জানতে পারলে না? সে বললো,
মৎস্যকন্যাদের কোনো নাম হয় না।
তারা শুধু মৎস্যকন্যা।
অপূর্ব সুন্দরী।

মৎস্যকন্যা একবার পদ্মপাতায় এসে শুয়ে ছিল। স্বাগত তখন ছিপ ফেলে চেষ্টা করেছিল কাছে যাওয়ার।

জলে শ্যাওলা খুব। যেতে পারেনি।

গল্পের খোঁজে এসে এই গল্প খুবই রহস্যময়। আমি ভাবছিলাম, মৎস্যকন্যা আছে যখন, তখন জলকন্যাও থাকবে নিশ্চয়ই।

আমি পুকুর ঘাটে বসে পড়লাম।
যদি একবার উঠে আসে জলকন্যা।
যদি একবার উঠে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে বলে------চলো নৌকাবিহার করি।

জলদেবতা উঠে এসে আমাকে নিশ্চয়ই ধমক দেবেন । জলদেবতারা পছন্দ করেন না, মানুষ প্রজাতির সঙ্গে জলকন্যারা মেলামেশা করুক। কেননা, মানুষ প্রজাতি খুবই স্বার্থপর হয়।
এই স্বার্থপরতা মানুষকে অনেক নিচে নিয়ে গেছে। তাই, পুকুরের জল পুকুরে থাকেনা। নদীর জল নদীতে থাকেনা।

মানুষ জলের অপচয় করে।

আমি শেষমেষ উঠে পড়লাম। স্বাগতকে বললাম, যদি মৎস্য কন্যার সঙ্গে কথা বলতে পারো, তবে আমাকে জানিও। এবং কি কি কথা হলো, তাও জানাবে। আমি একটা গল্প লিখব।

এই গল্পের নায়ক হবে স্বাগত।

এখানেও জলদেবতারা যদি আপত্তি করেন, গল্পের নায়ক মানুষ হবে না। তাহলে, আমার গল্পটাও হবে না।

কারণ, মৎস্যকন্যা নায়িকা হলে
স্বাগত নায়ক হলে, স্বাগতর গা থেকে
আঁশটে গন্ধ ছড়াবে।

আমার প্রয়োজন আঁশটে গন্ধ।

যা পাঠক কে আকর্ষণ করবে খুব বেশি। পাঠক তো মূলত বাঙালি। যারা
মাছ ভালোবাসে।

মাছের সঙ্গে বাঙালির আজন্ম ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা থেকে
মাছের দাম দিন দিন বেড়েই চলেছে।

মৎস্যকন্যা বাঙালির পাতে পাতে না এলেও বাঙালির মনে আসবে, তৃপ্তি দিতে আসবে, এই ইচ্ছে থেকেই আমার অনুরাগ-------মৎস্য কন্যার সঙ্গে স্বাগতর প্রেম।

পুকুর পাড়ে ঘুরতে ঘুরতে আরেক মাছ শিকারীর সঙ্গে দেখা হলো। কাছে যেতেই দেখতে পেলাম, শিকারি হচ্ছে আমাদের অতনু।
সে প্রতিদিন পুকুর থেকে মাছ ধরে।
মাছের সঙ্গে গল্প করে। আর মাছ ছেড়ে দেয় জলে আবার।
সে নিজে বলে--------সে শিকারি নয়।
সে প্রেমিক।

প্রেমিকার সঙ্গে কি কথা হয় কত দূরের কথা হয়, আমার কৌতুহল হলো। আমি জানতে চাইলাম। কিন্তু
অতনু বলে না। সে চুপচাপ থেকে
কেবল হেসে যায়। 

তার হাসি ধরে ধরে আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম। দেখলাম, তার মাছ ধরা ছিপ বাঁশের নয়। শুধু রূপো।
এই কারণেই রূপো যে  রূপোর ঝলকে
মাছ উঠে আসে।

অতনু বলছিল, পৃথিবীতে সমস্ত স্ত্রীলিঙ্গ সোনারূপো পছন্দ করে। হয়তোবা সেও কোনোদিন তার ছিপে
সোনা লাগাবে।

আমাকে উঠে আসতেই হলো।

আমি তো সোনা--রূপোর গন্ধ চিনিনা।
শুধু মাটির গন্ধ চিনি। আমি গল্পের খোঁজে এসেও গল্প পেলাম না।

কোথাও যে মাটি নেই।

-------৩ আশ্বিন ১৪২৮
------২০----৯-----২০২১



ছবি : রেখা সহিস


ঘটনা দূর্ঘটনা / নির্মল হালদার

ঘটনা দূর্ঘটনা / নির্মল হালদার





ঋজুর হাত ভেঙেছে বাইক এক্সিডেন্ট করে। আপাতত সে ঘরবন্দি।
মনীষা তাকে বলছিল, একটা হাত এনে দেবে । অর্থাৎ ঋজু তিনটে হাত নিয়ে কাজ করবে।
ঋজু বললো, সে নিজের যন্ত্রণায় অস্থির। এখন রসিকতা ভালো লাগছে না তার।
মনীষা ঋজুর প্লাস্টার বাঁধা হাতে হাত রেখে বলে--------রাগ করিস না। মানুষ একটা হাতেও কাজ করতে পারে। প্রয়োজনে একটা হাত দশটা হাত হয়ে যেতে পারে।
আজ তুই বরং আমার সঙ্গে বাইরে চল্। তোকে আমি আমার বাইকে ঘুরিয়ে আনবো।

ঋজু রাজি হয় না। সে এখন বাইকে উঠতে ভয় করছে। যদিও তার ইচ্ছে করছে, মনীষার সান্নিধ্য।

এই মুহূর্তে দুহাত জড়িয়ে মনীষাকে আদর করতে ইচ্ছে করছে ঋজুর। কিন্তু একটা হাত ভাঙ্গা। তার নিজের উপর রাগ হলো। এতদিন সে বাইক চালাচ্ছে কখনোই এক্সিডেন্ট করেনি।
সেদিন হঠাৎ -------------দুয়ারে সরকারের লাইন। একেবারে স্কুলের চৌহদ্দি পার হয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে মানুষ। সমস্ত ভিড় লক্ষীর ভান্ডারে। মেয়েদের লাইন।

ঋজু দেশ--গাঁ থেকে ফিরছিল শহরের বাড়িতে। এক মহিলা রাস্তা পার হয়ে আসছিল। সে বুঝে উঠতে পারছিল না, মহিলা কোন্ দিকে যাবে। এবং মহিলা এসে পড়ে বাইকের সামনে।
ঋজু মহিলাকে বাঁচাতে গিয়ে বাইক থেকে নিজেই পড়ে যায়। এতটাই দূরে পড়ে যায়, যে  কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না সে। মাথায় ভাগ্যিস হেলমেট ছিল।
বাঁ--হাতটা দুমড়ে-মুচড়ে যায়।
তার যন্ত্রণা হচ্ছিলো। সে অবস্থায় সে দেখতে চেষ্টা করছিল, মহিলার কিছু হয়নি তো!

কিছু লোকজন দৌড়ে এসে ঋজুকে তুলে দেয়।তাদের মধ্যে একজন বলে,
খুব জোর বেঁচে গেছো ভাই। তখন কোনো গাড়ি আসেনি ভাগ্যের জোর।
নইলে কি যে হতো। তবে মহিলার কিছু হয়নি তুমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারো। এখন যাও হাসপাতলে।

গাড়ি তুলে শহরে যাওয়ার মত ঋজুর 
ক্ষমতা ছিল না। ঋজুর মতো এক যুবক ঋজুর গাড়িতেই হাসপাতালে পৌঁছে দেয়। ছবি ও প্লাস্টার হয়ে গেলে
বাড়িতেও পৌঁছে দিয়ে যায়।

ঋজু মনে মনে দুয়ারে সরকার প্রকল্পকে গালাগাল করে। মনে মনে এও বলে------
দুয়ারে সরকার
ঘরে ঘরে বেকার।

মনীষার দিকে চেয়ে  ঋজু বলে, সত্যি সত্যি তুই যদি একটা হাত এনে দিতে
পারিস মন্দ হবে না। 
এমন তো হতেই পারে, ভাঙ্গা হাতটাকে খুলে মেরামত করলাম। তারপরে আবার লাগিয়ে নিয়ে কাজকর্ম করা। অথচ হাতটা হাতেই থাকবে। ভোগ করতে হবে যন্ত্রণা।

আজ ৭ দিন হয়ে গেল। বিরক্তি এসে গেছে--------এই বলে ঋজু ডান হাত দিয়ে কাছে টেনে নেয় মনীষাকে। মনীষা তার ভাঙ্গা হাতটা কাছে নিয়ে
চুমু খেতে থাকে। ঋজুর মনে হয়
হাত থেকে ব্যথাটা আস্তে আস্তে নির্মূল হয়ে যাচ্ছে।  ঋজু মনীষার মাথায় চুম্বন রাখে।  সে কুয়াশা দেখতে পায়।
দেখতে পায়--------ঋজু মনীষাকে কাঁধে তুলে নিয়েছে। আর বিড়বিড় করে বলছে----------------
মনীষার ভালবাসা মাহুতের মত ছিল
উঁচু/মনীষার ভালবাসা মাহুতের মত উঁচু।
সে মনীষাকে যেন বা চার হাত দিয়ে
নিষ্পেষণ করে। যেন বা সে তার চার হাত দিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় তুলে দিতেও পারে।

ঋজু সামনেই দেখতে পায় মস্ত এক পাহাড়। আলোয় আলোকিত।

-----৪ আশ্বিন ১৪২৮
----২১---৯---২০২১
-----নির্মল হালদার



নিঃশব্দ / নির্মল হালদার

নিঃশব্দ / নির্মল হালদার




বড় হাট থেকে ২ কেজি পটল। ২ কেজি টমেটো। ৩ কেজি কুঁদরি নিয়ে চক বাজারে বিক্রি করতে আসে বাসমতী মাহাতান।

বাসমতীর তিনটে বেটা।
সবাই আলাদা আলাদা খায়।
বাসমতীও আলাদা রান্না করে।
ভোর আঁধার থাকতেই সে উঠে পড়ে।
জোগাড় করে রান্নার।

প্রতিদিন বিকেলবেলা চকবাজার থেকে গিয়ে কাঠকুট সংগ্রহ করে রাখে। ভোরবেলা কাঠের আগুনে
ভাত চাপায়। সঙ্গে হয়তো দু-একটা আলু। অথবা সজনে শাক সিঝা
ভাতের সঙ্গে। 
তারপর হাঁটতে হাঁটতে শহরে আসে।

স্বামী নাই।

শরীর খারাপ হলে দেখার কেউ নাই।

সেবার অসুখে পড়েছিল। বেটারা উঁকি দিয়ে চলে গেছলো নিজের নিজের কাজে। গাঁয়ের এক মহিলা বাসমতীর অবস্থা দেখে টোটোতে নিয়ে গেছলো
সদর হাসপাতাল।

বলছিল আজকাল হাঁটতে কষ্ট হয়।
পা দুখায়।

গাঁ থেকে টোটো যায় শহরে। বাসমতী 
ভাড়ার ডরে গাড়িতে ওঠে না।
কে দিবেক ২০ টাকা! সবজি বিকে
রোজগার নাই।

বেশি পুঁজি হলে বেশি লাভ।

বাসমতীর পুঁজি নাই।
তিন তিনটা বেটার মত পুঁজি থাকতে
আর পুঁজি পাবে কোথায়?

চকবাজারে এসে কিছু কিনেও খেতে হয়। যে টুকু ভাত পেটে পড়ে  হেঁটে আসতে আসতে হজম হয়ে যায়। ঘরে ফিরে দুপুরবেলা আর কিছু খায় না 
বাসমতী। একেবারে সেই রাত্রিবেলা।

বলছিল-------সেদিন কে একজন
মুসুরির ভাল দিয়ে গেছলো। যেতে হয়েছিল পেট কোলে লুকিয়ে।বেটার
বউরা দেখলে কেড়ে লিবেক।

শহরে অনেকেই আছে, যারা গরিব-দুখিদের দান ধ্যান করে। তো কখনো কখনো বাসমতীও পুরনো সায়া--শাড়ি-ব্লাউজ পেয়ে থাকে।
সেও বউরা কেড়ে নিয়েছে।
তাদের অভাব নাই। কিন্তু শাশুড়ির সবকিছুতে ভাগ বসাবে। না দিলে গালমন্দ করবে। 

এই বাসমতী  সন্ধ্যা রাতে খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়ে। কেন না সে ক্লান্ত থাকে খুব। পায়ে ব্যথা বেদনাও থাকে। যেহেতু সে ভোর আঁধারে ঘুম থেকে উঠে পড়ে। তাই ক্লান্তিতে বেশি রাত অব্দি জেগে থাকতে পারেনা। বয়সও হয়েছে।

বলছিল------
ঠান্ডা কালে এক মাড়োয়ারি চকবাজারের অনেক সবজিওয়ালিকে কম্বল দান করেছিল। সেই কম্বল পেয়ে বাসমতী খুব খুশি। জাড়টা কেটে যাবে। ছেঁড়া কাঁথা আর গায়ে জড়াতে হবে না।

বাসমতীর কপালে অত সুখ সইলো না। সে ঘুমিয়ে গেছলো। তার গা থেকে কম্বলটা তুলে মেজ বউটা লিয়ে পালালো।

আলাদা ঘরে শুলে কি হবে, বাসমতীর ঘরের কপাটে কোনো হুড়কা নাই। পরেরদিন মেজ বউ আবার বলে------ তোর ত কাঁথাকানি আছে--------কিসকে কম্বল লিবি? হামদের ছুটু ছুটু বেটা বিটি। হামদেরেই দরকার খুব।

বাসমতী মুখে কাপড় চাপা নিয়ে
নিঃশব্দে কাঁদে।

------৫ আশ্বিন ১৪২৮
-----২২----৯----২০২১
----নির্মল হালদার




ছবি : রেখা সহিস


নীরবতার কাছে // নির্মল হালদার

নীরবতার কাছে // নির্মল হালদার




নীল গল্প করছিল।
কার সঙ্গে গল্প করছে?
রঙ্গনের সঙ্গে।

সকালে উঠেই নীল দেখেছে, গাছে ফুটে আছে দু তিনটে রঙ্গন।
তার কি বাহার! এবং নীরবতা।

এই নীরবতার সঙ্গেই নীল গল্প করছে।

গল্পের বিষয় রঙ্গনের পাতা।

দেবী প্রতিমার চোখের মতো রঙ্গনের পাতা। হাত দিলেই টলমল করে উঠবে জল। 
চোখের জল।

এই জল নিবেদন করা যাবে না কোথাও। শুধু চোখেই থাকবে।
শুধু চেয়ে থাকতে হবে।

নীল গল্প করতে করতে অপরাজিতার কাছে যায়। এইতো সবে ফুটছে অপরাজিতার রঙ। এখন কথা বলা যাবে না। সে মাধবীলতার কাছে আসে।
গাছে অজস্র ফুল।

নিবেদিত হয়ে আছে আলোর কাছে।

নীল কোথায় নিবেদিত?

সে একবার রঙ্গিলার প্রেমে নিবেদিত হতে চেয়েছিল। কিন্তু রঙ্গিলা বেশিদিন
থাকলো না। নীলের মনে হয়েছিল তখন, সম্পর্কে যে বিশ্বাস রাখতে হয়, রঙ্গিলা জানতো না।
আর প্রেম করলে যে, সমস্ত কিছুতেই অধিকার থাকবে,
এও সঠিক নয়।

আমরা অধিকারের ভুল প্রয়োগ করে থাকি-------একথা নীল বন্ধুদের বলে।
মা-বাবাকেও বলেছে।
তার বাবা কথায় কথায় বলে, তুমি জানোনা তোমার ওপর আমার সব অধিকার আছে। তুমি আমার সন্তান।

নীল তর্ক করেনা।

সে বরং বিছানাতে গিয়ে শুয়ে পড়ে।

তার মায়ের কাজ শুধু ছেলেকে খাওয়ানো। সকাল থেকে রাত অবধি
কেবল বলবে---------খা খা। না খেলে কি হয়। না খেলে কি শরীরে পুষ্টি হয়?
যেনবা খাওয়ালেই, মায়ের অধিকার
ফলানো যাবে।

রঙ্গন মাধবীলতা অপরাজিতা টগর
শিউলি শালুকের কোনো অধিকারবোধ নেই। তাই তারা নীরবে থাকতে পারে। 
তাই তারা অধিকার প্রয়োগ করে না নীলের উপর।

নীলও সহজ স্বাচ্ছন্দে ওই ফুলেদের কাছে কথা বলতে পারে। খুব দুঃখ কষ্টের কথাও বলতে পারে। সকালবেলা চায়ের কথাও সে বলে।

বিশেষ করে যেদিন নীল ভোরে ওঠে
সেদিন সে  রংগন কে বলবেই, কি চা
খাওয়াবে নাকি?
রঙ্গন হাওয়ায় দুলতে দুলতে বলে-----
একটু দাঁড়াও-------চা আসছে।


নীলের মা ছাদের বাগানে চা নিয়ে আসে।

বাগান আর কতটুকু, ৭/৮টা ফুলের টব। নীলের কাছে সাধের বাগান।
কথা বলার বাগান। কি সকাল কি রাত্রি একবার না একবার নীল বাগানে আসবেই। 
সে দেখবে রঙ্গনের  নীরব ভাষা।

নীল দেখে  রঙ্গনের চোখের মতো পাতা। যা নিটোল। যা গভীর।যা সৌন্দর্যময়।

রঙ্গিলা চলে গেলেও নীলের মনে পড়ে। বিশেষ করে রঙ্গনের পাতা দেখলেই। কেননা, সে তো চোখের ছায়ায় ঘুমিয়ে ছিল অনেকদিন। রঙ্গিলার প্রতি আস্থা রেখেছিল বলে পথ হেঁটে ছিল অনেকটাই।

নীল নিজেকে প্রশ্ন করেও উত্তর পায়না--------কেন পথ ভেঙ্গে যায়?
কেন পথ টুকরো টুকরো হয়ে যায়?
ভালোবাসা তবে কি?

ভালোবাসা যদি অপরাজিতার মত
মাধবীলতার মত টগরের মত শিউলির মত নীরব হতো?
কেমন হতো?
নিশ্চয়ই দেওয়া---নেওয়ার সম্পর্ক গড়ে উঠতো না।

দেওয়া-নেওয়ার ভেতরে বিশ্বাস অবিশ্বাস। এবং সন্দেহ। যা সম্পর্ককে
তিক্ত করে। এই তিক্ততা অন্ধকার বৈ কিছু নয়।

নীল মাঝেমধ্যেই একা একা নিজের ঘরে প্রশ্ন করে-------অন্ধকার
এতো অন্ধকার কেন?

রঙ্গিলা সামনে এসে দাঁড়ালেও সে কথা বলে না। কারণ সে জানে
রঙ্গিলা আজ মিথ্যে।
সে জল খায়। ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করে। ঘুম আসে না। 

ফুলের কোনো অন্ধকার নেই।
নীল বাগানে যায়। সে  কথা বলে সবার সঙ্গে। মনে মনে শুশ্রূষা পায়।

শুশ্রূষা ফুলের। শুশ্রূষা গাছের।
পাতার। সৌরভের।
হঠাৎ আলো জ্বলে ওঠে। নীল দেখতে পায়,মা এসে দাঁড়িয়েছে। তার পিঠে হাত রেখে জানতে চায়----------
কীরে ঘুম আসছেনা?
চল্ ঘুমোবি চল্---------আমি মাথায়
হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।

নীল ঘুমোবে না।

সে মাকে ছেড়ে আরেক ছাদে চলে যায়। কথা বলতে চায়-----------তারাদের সঙ্গে।

নীরবতার সঙ্গে।

------৮ আশ্বিন ১৪২৮
-----২৫-----৯---২০২১




ছবি : রেখা সহিস

কবি নির্মল হালদারের বিভিন্ন সময়ের ছবি

পড়ুন "ঘর গেরস্থের শিল্প"

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ