শনিবার, ২০ মে, ২০২৩

মাটিতে রামধনু ওঠে - ১১



মাটিতে রামধনু ওঠে - ১১

মাঠটা পড়ে আছে।

পাখি এসে ফেলে যায়না বীজ। প্রজাপতি ফেলে যায়না ফুলের রেণু। মেঘ এসে মাঠে দাঁড়িয়ে থাকে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চলেও যায়। রেখে যায় না মন।

খাঁ খাঁ করছে মাঠ।

এই একলা মাঠের সঙ্গী নেই।

মাঠের পাশ দিয়ে চলে যায় গ্রামের মানুষ। মাঠের উপর দিয়ে চলে যায় বাতাস। কেউ একটিও কথা বলে না।

একবার এক বুড়ো গানওয়ালা মাঠের কাছে এসে বলেছিল : আমি এখানেই গান বাঁধবো। একটা রাত কাটানোর পর সে বললো : এখানে কথা ও সুর হারিয়ে যাচ্ছে আমার----এ যেন আমার নির্বাসন।

মাঠ পড়ে থাকে একা।

এই মাঠে মেলাও বসে না। ছোট বড় পাথরে পাথরে ভরা এই মাঠকে একটি গাছও ভালোবাসে না। এই মাঠে গুনগুন করে না মৌমাছি। মাঠ কথা বলতে চাইলেও আকাশ গম্ভীর হয়ে থাকে।

সন্ধ্যাতারা এসে দাঁড়ালেও নীরব থাকে। শুকতারা চেয়ে থাকলেও কথা বলে না একটিও।

কে জানে কোত্থেকে একটা কুকুর এসে পড়েছিল মাঠে। শুঁকতে শুঁকতে চলেও গেছে। শুকনো পাতারা ওড়ে। স্পর্শ রাখে না মাঠের গায়ে।


মাঠটা পড়ে আছে।

অন্ধকারে নিঃশব্দ। আলোতেও নিশ্চুপ। আমি যদি ভালবাসি, আমাকে ভালবাসবে তো একলা মাঠ?

একাকী মাঠ?

মাঠ তো এদেশেরই মাঠ। আমাদের স্বজন। খুঁজে পেতেও পারি, এই মাঠের অনেক অনেক নিচে পোঁতা আছে সমস্ত মানুষের নাড়ি।

----২৯ চৈত্র ১৪২৯
----১৩--৪--২০২৩
----নির্মল হালদার





মাটিতে রামধনু ওঠে - ১২

সমস্ত মানুষই একা। এই পৃথিবীতে। এ কথাই শোনা যায়। কেমন একা? সংসার জীবন সমাজ জীবনে থেকেও একা?

"একা"-ও তো নানারকম।
কতরকম?

সেই ব্যাখ্যার দিকে না গিয়ে বলতে পারি, বস্তু সামগ্রীও একা। যেমন, কাঁসার একটি থালা। ব্যবহৃত না হয়ে বাক্সবন্দী। বাতিলও বলা যায়।পেতলের কলসির ক্ষেত্রেও একই কথা।

পুরনো দিনের কাঁসা-পিতল আজকের দিনে ব্রাত্য হয়ে একা। কাঁসা-পিতলের দাম যতই বাড়ুক, আজকের আধুনিক জীবনে প্রাত্যহিক জীবনে কোনো মূল্য নেই।

পিসি-মাসিদের দিনও চলে যাচ্ছে।

সম্পর্ক তো প্রশস্ত হয়ে থাকে কিন্তু আজ ছোট সংসার। সুখী গৃহকোণ। দাদু ঠাকুমা থেকেও নেই। পুরনো বাসনপত্রের মতোই তারাও একা হয়ে পড়ছে।

জেঠিমা কাকে বলে? জেঠু কাকে বলে? কাকু কাকিমা কাদের বলে? এই প্রশ্ন এসে গেছে। সবাই আছে শুধু সম্পর্ক গুলো নেই।

"সম্পর্ক" আজ একা।

যখনই আমি নতুন করে চিনিয়ে দিচ্ছি, এইটে জবা গাছ। তখন বুঝতে হবে, জবা গাছটি একা একা বড় হয়েছে। এবং থেকেও গেছে একা।

"গাড়ু" চলে গেছে। এখন হাতে মগ। খাবার জলের জন্য জাগ। তাহলে একা হলো কে?

অনেকে থেকেও নেই। এই আধুনিক জীবনে একাকীত্ব সম্পর্ক থেকে বস্তু সামগ্রীর কাছেও।

যে গাছ লতাগুল্ম, যে পাখি পোকামাকড়, আমাদের অলক্ষে বেড়ে বেড়ে উঠছে, তাদেরও নিঃসঙ্গতা আছে। আমরা খেয়াল করি না ।

আমার পুরনো বন্ধুকে আমি যদি চিনতে না পারি, বন্ধুও যে একা হয়ে যায়। কোনোদিন চিন্তা করেছি?

ঘরে থাকা অনেক জিনিসপত্রকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে ফেলে দি। যাদের ব্যবহার ছিল একদিন, আজ নেই তাই ফেলে দাও। এ কেমন বিচার?

যে ছিল একদিন আদরের সে হয়ে গেল জঞ্জাল। আমাদের গড়ে ওঠা আমাদের স্বভাব আমাদের আচরণ আমাদের যে কি দিয়েছে আর কি দেয়নি, হিসাব করিনি কখনো। সমাজবিদদের ব্যাখ্যা সব সময় মেনে নিতে পারি না। আরেকটা কথাও সঠিক, একাকীত্ব বোধের কাছে সমাজবিদরা কি যেতে পারেন? যে বোধ থেকে আকাশের জন্ম হয় মৃত্যু হয়। পাহাড় নদী জঙ্গল কাছে এসে চলে যায়। মানুষের সমগ্রতা যে বোধের কাছে----ফুঁ।

আমি মনে করি, একাকীত্ব বিষয়ে আলোচনা করাও এক রকমের বোকামি।

একাকীত্ব যে ভয়ংকর ভয়ের এক জায়গা, নিজে না দাঁড়ালে টের পাবে না কখনো। ওই যে একটা ছাতা, বৃদ্ধ বাবার মত পুরনো। ঘরের এক কোণে।

একাকীত্ব বলবে না?

------চৈত্র সংক্রান্তি ১৪২৯
------১৪---৪---২০২৩
-----নির্মল হালদার




মাটিতে রামধনু ওঠে - ১৩

একটা পুকুরের পাশে আরেকটা পুকুর। কেউ কারোর সঙ্গে কথা বলে না। একটা পুকুরের পাশে আরেকটা পুকুর। দুজনেই দুজনের দুঃখ-বেদনায় চুপচাপ থাকে।

একটা পুকুরে শালুক -পদ্ম ফোটে। আর একটা পুকুরে পানা ফুলও নেই। একটা পুকুরে মৌমাছির গুনগুন। আরেকটা পুকুরে কখনো কোনোদিন একটা বক এসে বসে থাকে।

দুজনের সঙ্গে দুজনের অনেক অমিল। পাশাপাশি থাকলেও একজনের জল শুকিয়ে গেলে, আরেকজন এগিয়ে দেয় না জল।

একজনের জলে গরু -কাড়া ধোওয়াধুয়ি হয়ে থাকে। আরেকজনের জলে স্নান করতে নামে মেয়ে পুরুষ ছেলে বুড়ো। বালক বালিকারাও।

দুটি পুকুরের মাঝখানে একটা রাস্তা চলে গেছে শিয়াল ডাঙ্গার দিকে। এই রাস্তাতে আমিও। কখনো কখনো জলের কম বেশি দেখতে দেখতে হেঁটে যাই।

পুকুরের দুঃখ পুকুরের খুশি আমাকে পীড়িত না করলেও আমি দুটি পুকুর দেখি। পাড়ে দাঁড়িয়ে।

১০০ বছর আগের যেন বা দুই বোন। দুজন দুজনকে চিনতে পারে না আর। যেন বা দুজনের জীবনে কোনো ভালোবাসা নেই। কেবল মানুষের সেবা করে যাও। আর লালন করো পোকামাকড়। মাছ। লতাগুল্ম।

দুটি পুকুরের মাঝখানের রাস্তাতে একটি ঝাঁকড়া তেঁতুল গাছ। অনেকেই স্নান করে তেঁতুল তলাতে খানিক জিরিয়ে নেয়। কিংবা অপেক্ষা করে আরেকজনের জন্য।

দুটি পুকুরেই আমি কখনো হাতমুখ ধুতে নামিনি। দুটি পুকুরই আমাকে চেনে।

দুটি পুকুরে ডুব দিয়ে আমি একদিন নিয়ে এসেছি দুই বোনের কান্না।

----১ লা বৈশাখ ১৪৩০
----১৫--৪--২০২৩
-----নির্মল হালদার




মাটিতে রামধনু ওঠে - ১৪

কোনো অপেক্ষা নেই।

গতকাল একটা অপেক্ষা ছিল। আজ নেই। আজ রোদের তীব্রতা। ভয়। এক কবি বলেছিলেন, বাঘের মতো রোদ। হাঁ করলেই গিলে ফেলবে।

ভালোবাসাও গিলে ফেলে।

ভালোবাসাকে ভয় করি?

ভয় তো করি। সব সময় ভয় করি, আমাকে ছেড়ে চলে গেলে আমি বাঁচবো তো!

ভালোবাসা কি বাঁচিয়ে রাখে?

বাঁচিয়ে রাখে। মেরেও ফেলে।

বাঁচিয়ে রেখে মেরে ফেলা ভয়ঙ্কর। তিল তিল করে দগ্ধ হতে হতে অবসাদে চলে যাওয়া।

অবসাদ এলে তাল খেজুরের রসও নিম নিম। আখের ক্ষেত হয়ে ওঠে বাঁশবন। শেয়ালের সঙ্গে দেখা হবে। তখন অবসাদগ্রস্তের কাছে সে রাজা। হামলে উঠে দাঁত দেখাতে পারে।

ভয়।

নদী বা পুকুরে ঝাঁপ দিতে গেলেও দেখা যায় সবই মরীচিকা।

কাঁপতে কাঁপতে অথবা জড়োসড়ো হয়ে নতুন করে ভালবাসার জন্য অপেক্ষা।

আজ কোনো অপেক্ষা নেই আমার। সত্যি কি নেই? একটা অপেক্ষার পরেই তো আরেক অপেক্ষার শুরু।

অপেক্ষাও একটি রোগ।

আমি জানি রঞ্জন আসবে না। আরো একজন দাঁড়িয়ে আছে তিলাবনি পাহাড়ের নিচে। সেও আসবেনা।

আমার চেয়ে অনেক অনেক আকর্ষণীয় একটা পাহাড়। তার অনেক খাঁজ। মসৃণতাও আছে। গাছও আছে আঁকড়ে ধরার মত।

আমাকে আঁকড়ে ধরলে এক বিন্দু ছায়া পড়বে না গায়ে। কেন আসবে আমার কাছে। আমার অপেক্ষা চেয়েও দেখবে না কোনো হাওয়া।

বাতাসে উষ্ণতা বাড়ছে। লু বইবে। আঁচল উড়িয়ে আসবে না দুলিয়া। ওই তো অবিন আর অঙ্গনা। সারা পৃথিবীর সমস্ত ছাদে পায়চারি করতে করতে গল্প করছে।

আমার গল্প কার সঙ্গে?

আমার বিছানায় আরেকটা বালিশ বাড়তি থাকলেও তার সঙ্গে আমার কথা নেই।

কার সঙ্গেই বা কথা থাকে আমার? নিজের সঙ্গে কথা বলতে বলতেও হাঁপিয়ে উঠছি।

এক গ্লাস জল দেবে?

চেয়ে খাওয়ার অভ্যেসটা আমার আজও গেল না। মা বলতো দিদিরা বলতো, হাত জোড়া---তুই নিজে নিয়ে খেয়ে নে----।

আমি জল গড়িয়ে খেলে জলের স্বাদ পাই না। ভাত বেড়ে খেলেও তৃপ্তি নেই।

কীসে তৃপ্তি পাই অপেক্ষা করে?

কার জন্য অপেক্ষা কে আসবে?

আসবে আসবে। রোদে ঝাঁজ থাকলেও কচি পাতার নুপুর বাজতে বাজতে আসবে। নুপুর পরা পা দেখতে না পেলেও নুপুরের ধ্বনি আমাকে শোনাবে, বর্ষার গান।

হাত বাড়িয়ে দিয়েছি, আমার হাতে পড়বেই, দু চার ফোঁটা বৃষ্টি।

-----২ বোশেখ ১৪৩০
-----১৬--৪--২০২৩
-----নির্মল হালদার




মাটিতে রামধনু ওঠে - ১৫

কার জন্য বাঁচি?

উত্তর তো হবে এই, প্রথমে নিজের জন্য বাঁচি তারপর অন্যের জন্য। সেই অন্যেরা কে? উত্তর হবে এই, গাছপালা কীটপতঙ্গ নদী পাহাড় আকাশ এবং মানুষের জন্যও বাঁচি।

এই বাঁচা যদি নিঃসঙ্গ হয়ে ওঠে? সকলের সঙ্গে বাঁচতে বাঁচতেও যদি একা হয়ে যাই?

উত্তর হবে এই, তবুতো বাঁচা। বেঁচে থাকাই যে আনন্দের। এই আনন্দ আমার সঙ্গী। আমার নির্ভরতাও।

অনেকে বলে, নির্ভরতা ভালো নয়। দুর্বল করে। তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, আমরা তো আকাশ ও মাটির উপরে নির্ভর করি। রোদ বৃষ্টির প্রতিও নির্ভর করি। সেই নির্ভরতা কি দুর্বল করে?

আমার চারপাশে কেউ নেই। কিন্তু মনে মনে সবাই আছে। এও তো নির্ভরতা। তাই নিঃসঙ্গতা আসুক। আমি ভয় পাইনে। যখনই খুব একা লাগে, তখনই ছোটবেলার কুল গাছটাকে ডাকি। দুজন মিলে অনেক কথা।

কুল গাছের ছোট ছোট পাতায় কতবার যে ধুলোর ভাত বেড়েছি, এ কথা মনে হতেই, দুজনের কি উল্লাস।

এও তো আমার বাঁচা।

শুধুমাত্র বেঁচে থাকাটাও সঙ্গী হয়ে ওঠে আমার কাছে। আমি প্রতিমুহূর্তে আমার নিঃশ্বাসের সঙ্গে বিনিময় করি আমার ভালোবাসা।

আমি গন্ধ চুরি করি তোর শরীরের। তোর মনের সুবাস আমি সঞ্চয় করছি নিজের জন্য।

আমি কি আর একলা হতে পারি?

একলা হয়ে যাওয়া এতই সহজ?

আমি হতে চাইলেও আমাকে হতে দেবে না আমার দিন রাত্রি। আমার সূর্য তারা।

আমার তো খুব ছোটখাটো চেহারা তার জন্য যারা খুব লম্বা, দীর্ঘদেহী তাদের খুব ভালোবাসি। যেমন, তালগাছ আমার খুব প্রিয়। শাল--সেগুন আমার পছন্দের খুব।

ভালোবাসাও এক রকমের নির্ভরতা। যেকোনো কিছুকে ভালবাসলে সঙ্গ পাই। যদিও জানি, ভালো বাসতে বাসতেও একা হয়ে যাই।

একাকীত্ব মধুর। কেননা, একাকীত্ব থেকে দেখতে পেয়েছি, আমার পায়ের কাছে একটি পিঁপড়ে উঠছে। মনেও হয়েছে, এ আমাকে কামড়াবে না। আমার শুকনো নজরকে ভিজিয়ে ফেলবে ভালোবাসায়।

আমার সারাদিনের নিঃশব্দ চিৎকার : এসো এসো এসো। আমার কাছে এসে দাঁড়ায় সারি সারি রঙ।

আমি হাত ডোবাই। রঙ দিই, আমার দূরের বন্ধুদের। আমার কাছের বন্ধুদের।

আমার না-বন্ধুও অনেক। হ্যাঁ -বন্ধুও অনেক। সবার সঙ্গে থাকতে থাকতে গাছের পাতা সবুজ, দেখতে পাই। আম মুকুল থেকে সজনে ফুল দেখতে পাই।

তোর পায়ের পাতার ঘাম তুই দেখাতে না চাইলেও আমার খুব চেনা। ওই ঘামের ফুটে ওঠার সঙ্গে আমিও ফুটে উঠি।

গোপনে একা।

-----৩ বোশেখ ১৪৩০
----১৭--৪--২০২৩
----নির্মল হালদার




মাটিতে রামধনু ওঠে - ৬



মাটিতে রামধনু ওঠে - ৬

মাঠের পর মাঠ। টাঁড় জমিও বলা যায়। ফসল ফলে না। যতদূর দৃষ্টি যায় একটিও গাছ নেই। কেবল মাঠের পর মাঠ। ঝাঁ ঝাঁ করছে চৈত্র শেষের রোদ।

মধ্য গগনে সূর্য।

রাস্তার পরে রাস্তা ধূ ধূ করছে ডাইনে বাঁয়ে। পথ চলতি মানুষের ছায়া পড়ছে না একবারও। একটি সাইকেলও দুম্ করে পাশ দিয়ে চলে যায় না।

দূরে কত দূরে ছায়া?

ছায়ার আনন্দ?

রাস্তা থেকে নেমে ঢালুর দিকে গেলেও কোথাও জমে নেই এক বিন্দু জল। দু ফাঁক মাটি। জ্বলে গেছে ঘাস। গরু ছাগল ভেড়া চলে গেছে নিজেদের ঘর। বেলা পড়ার আগে হয় তো আরেকবার আসতে পারে মাঠে। যদিও মাঠে নেই শস্য বীজ।

অচেনা অজানা কোনো পাখিও তার ডাকার সঙ্গে নতুন কোনো পথ দেখায় না।


কার হাত ধরবো আমি?

হঠাৎ করে মনে হলো, এক একটা অফলা জমি আমার এক একটা অতীত। আমার দিকে চেয়ে রোদের মতো হাসছে। যে হাসি চিরে ফেলছে আমাকে।

রক্ত নেই।

আছে শুধু রোদের মতো ঘাম।
হঠাৎ মাথায় ফিনকি দিয়ে কে যেন বললো---রাকাব জঙ্গলে আছে সিঁয়া কুল। শুকনো মহুল।

সঞ্চিতা আছে সুকুমার আছে। ওরা জল দেবে। ওরা সারাদিন সকলের তৃষ্ণা নিবারণ করে।

সঞ্চিতা কই? সুকুমার কই? দূরে বহু দূরে দেখতে পাই, একটি খড়ের চালা। কাছে গেলে দেখা পাবো? কার দেখা পাবো? কাদের দেখা পাবো?

চটির ভেতরে গরম বালি। শুকনো। হেঁটে যেতে হবে। যদি না যাই? যদি আমার এই মাঝ রাস্তাতেই ডাকি: ও বাপি বাপি--অবিন অবিন----কোথায় গেলি রঞ্জন?

রক্তকরবী না দেখতে পাই আমি দেখতে চাইছি আকন ফুল। আমি ডমরু বাজাবো।

ডমরু।

-----২৩ চৈত্র ১৪২৯
----৮---৪---২০২৩
-----নির্মল হালদার




মাটিতে রামধনু ওঠে - ৭

দরজার বাইরে পড়ে আছে চটি জোড়া। কে কবে খুলে গেছলো চটি? কার চটি? চৈত্রের দিন চলে যাচ্ছে। তার আগে চলে গেছে ফাল্গুন। বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ আসছে। চটি জোড়া কি পড়ে থাকবে এখানেই?

কার্নিশে একটা পায়রা এসে এদিক-ওদিক চাইছে। কাকে খুঁজছে এই দুপুরে? তুলসি গাছের নিকটে নেই একটা বড় গাছ। কে আসবে ছায়া দিতে? জল দিতে কে আসবে?

তুলসি গাছ সঙ্গ চাইবে কার?

সঙ্গ এক সহযোগিতাও।

সহযোগিতা ছাড়া একটা ইঁটের সঙ্গে একটা ইঁট জুড়তে পারে না। দেয়াল উঠতে পারে না। গড়ে উঠবে না ঘর।

দিকে দিকে ঘর গড়ে উঠছে। ক'জনের ঘর কতজনের ঘর? ঘর কি আশ্রয়?

ঘরের বাইরে পড়ে আছে এক জোড়া চটি। অসহায় লাগছে। কেননা, চটির তলায় রাস্তা নেই। চটি শব্দ করে কোথাও যে যাবে, কোনো সুযোগ নেই।

একটা হাওয়া এলো। জোরালো। চটি জোড়া এক ফোঁটা নড়াচড়া করে একই জায়গায়।

চটিতে পাঁচ আঙুলের দাগ। আঙুল গুলি কেমন ছিল? নারী না পুরুষের আঙুল? আঙুল গুলি স্পর্শ করেছিল আরো কোনো আঙুল? আঙুলে আঙুল জড়িয়ে ছড়িয়ে ছিল উত্তাপ?

আজকের রোদ মনমরা লাগছে।

চটি জোড়া পড়েই আছে দরজার বাইরে। ভেতরে ঢুকবে না?

কেউ নেই ভেতরেও।

ট্রেনের শব্দ আসছে। কোত্থেকে আসছে? মধ্যপ্রদেশ? ছত্রিশগড়? ঝাড়খন্ড? বিহার?

আমি তো জানি আমার দেশের রাজ্যগুলি হেঁটে হেঁটেই আসে নিজের নিজের ঘর। তবে ট্রেন আসছে কেন? কাকে নিয়ে আসছে?

চটিজুতোয় পা গলাবে কে?

তুই?

তোর পা তো অনেক ছোট।

----২৫ চৈত্র ১৪২৯
----৯---৪---২০২৩
-----নির্মল হালদার




মাটিতে রামধনু ওঠে - ৮

আলমারিতে বই। সারি সারি। কতদিনের বই? কতকাল আগের বই? সংগ্রহ করেছিল কে? কতকাল স্পর্শ করেনি কি কেউ?

ধূলায় ধূলায় ধূসর।

ধূসরতা ঝেড়ে কে পড়বে গল্প উপন্যাস কবিতা ইত্যাদি ইত্যাদি বই?

ঘরের এক কোণে আলমারি। আলমারিতে মুখ বন্ধ বই। মুখ খুলবে না? গল্প উপন্যাসে কত চরিত্র, নায়ক নায়িকা, পরিবেশ, নাটকীয়তা, কত আনন্দ বেদনা উন্মোচন করবে না?

উন্মোচন করবে তো পাঠক। আলমারির কাছে এগিয়ে আসবে কবে কোন্ পাঠক?

আলমারি দাঁড়িয়ে আছে। রোদ জল আলো অন্ধকারের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঝড় এলেও ধাক্কা দিতে পারে না গল্প উপন্যাসের চরিত্রকে। তারা যেন হাজার হাজার বছর ধরে মূক। তাদের মুখে কথা ফোটাতে কোনো পাঠক নেই।

পাঠক কোথায় থাকে?

বইয়ের আলমারি তো ঘরেই আছে। ঘরের লোক খেয়াল করে কি?

আলমারির দিকে এগিয়ে যায় ইঁদুর আরশোলা। তাদের পক্ষে সম্ভব নয় চরিত্রদের কাছে টানতে। তাদের মনেও হয়, চরিত্ররা যদি পোকা হয়ে থাকে, কী আর হবে দাঁত ফুটিয়ে!

একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ ঘরের বাইরে থেকে জানলায় উঁকি দেয়, যদি দেখতে পাওয়া যায় বইয়ের মলাট।

না। কেউ আসে না। চরিত্ররা বইয়ের ভিতরেই ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দিন কাটায়। বইয়ের মলাটে চরিত্রদের ঘাম ও হাসি কান্না ফুটে ওঠে না।

এক ছ বছরের শিশু খুলে ফেলেছিল আলমারির দরজা। ঝুর ঝুর করে পড়েছিল বইয়ের পাতা।

ঝুরঝুর করে পড়েছিল কান্না।

বইয়ের ভেতরে যে শিশুরাও আছে। শিশুদের খেলাও আছে।

আমার খেলা কার সঙ্গে?

বই তো আমার দিকেও তাকিয়ে থাকে। পুরনো বই পুরনো বন্ধুত্ব আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি কি বইয়ের দিকে চেয়ে চেয়ে ভালোবাসা খুঁজবো না আর? নাকি বই থেকে পালিয়ে যাওয়াই ভালো। দূরে থাকাই ভালো?

জীবনকেও যে পড়তে হয়। পড়তে পড়তে শাক বেচুনি মাসির সঙ্গে যে দেখা হয় আমার।

তার শিরা ওঠা মুখের ম্লান আলোতে আমি যে পেয়ে থাকি ঠাঁই।

-----২৬ চৈত্র ১৪২৯
-----১০---৪---২০২৩
-----নির্মল হালদার




মাটিতে রামধনু ওঠে - ৯

কবিতার কোনো কোনো পংক্তি একা হয়ে থাকে। তার জীবন ধরে তার সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত হতে পারে না আরো একটি পংক্তি। তাকে ভালবাসতে অক্ষর বা শব্দে সাজানো আরো একটি পংক্তি এগিয়ে এসে ছড়ায় না তার সৌরভ।

সেই একাকী পংক্তি জলে হাওয়ায় ঘুরে বেড়ায় বিষণ্ণতার সঙ্গে। কখনো কখনো একটি সম্পূর্ণ কবিতা থেকে কোনো পংক্তি বিচ্ছিন্ন হয়ে একা হয়ে পড়ে। সে তো তার দোষ নয়, পাঠক তাকে একা করে নিজের কাছে যত্ন করে।

আমাকে তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের এই পঙক্তিটি একা একা থাকে। সুখে থাকে কি? অথবা, মেলাবেন তিনি মেলাবেন পোড়ো বাড়ি ভাঙা দরজাটা তারপর? তারপর কি? অমিয় চক্রবর্তী আড়াল থেকে হেসে উঠবেন।

গীতবিতানের কবিতা থেকেও ছিন্ন হয়ে গেছে অনেক পঙক্তি। কোনো কবিতার শেষ পংক্তি আছে। অথবা প্রথম ও শেষ নেই মধ্যিখানের পংক্তি আছে।

বেদনার ভার নিয়ে এভাবেই চলছে অনেকে। ভার নামানো যায় না। ভার ভারাক্রান্ত হয়ে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে কোথাও কোথাও।

প্রায় ছোটবেলায় আমি একটি পংক্তি পেয়েছিলাম তা হলো-------মুরগির ডালা খুলে লাফিয়ে উঠলো ভোর---

এই পংক্তি টি আমার সঙ্গেই আছে। আজও। সে যে কোনো সেতু দিয়ে আসবে আরো একজনের কাছে তার ব্যবস্থা আমি করতে পারিনি। নিজেকে অসহায় লাগে।

একা লাগে।

ওই পংক্তিটির ভরণ পোষণের দায়িত্ব আমাকে বহন করতে হয়। কেন না, তাকে যোগ্য করে তোলার জন্য আমি কাউকে আর খুঁজে পাইনি।

অনেক অনেক বছর ধরে একা হয়ে আছে----

মুরগির ডালা খুলে লাফিয়ে উঠলো ভোর----

---- ২৭ চৈত্র ১৪২৯
----১১---৪---২০২৩
----নির্মল হালদার




মাটিতে রামধনু ওঠে - ১০

যেকোনো প্রদীপ মায়ের মত একা। সন্ধ্যেবেলা প্রদীপ জ্বলে উঠলেও প্রদীপ একা।

প্রদীপের সঙ্গে সলতে কতটুকু থাকে? সন্ধ্যে কতটুকু থাকে? আলো নিভে গেলে প্রদীপের একাকীত্ব মায়ের একাকিত্বের মতো। সংসারে সব থেকেও সবার সঙ্গে থেকেও মা একা।

প্রদীপ যতই পেতলের হোক ‌ যতই ঝকঝকে হোক, সারাদিন চুপচাপ। মায়ের বয়স তো বাড়ে। প্রদীপের বয়স তো বাড়ে না। তারপরেও প্রদীপ একা। তার এই একলা থাকা, ব্যাথার আলো, কে দেখে?

তুলসি থান দেখে? দেব দেবীরা দেখে?

দূর থেকে হাওয়া দেখে।

মাটির প্রদীপও রূপে গুণে লক্ষ্মী।

চেয়ে থাকে। সকলের দিকে চেয়ে চেয়ে আলো জ্বালায়। সেই আলো যেন করুণ অঞ্জলি।

চরাচরের কাছে অঞ্জলি।

অথচ প্রদীপ থাকে একা একা। নিঃশব্দ। প্রায় আড়ালে। অন্ধকারে। তার ভূমিকা তো সন্ধ্যেবেলা। দিনেও প্রদীপ জ্বলে কোথাও কোথাও। তার ভূমিকা তো যৌথতার।

তুমি যদি বলো, সারারাত জ্বলে চাঁদের আলো। অজস্র তারার রূপেও প্রকৃতি আলোকিত। সেখানে প্রদীপ তো একটি কণাও নয়। আমি বলবো, কণা শুধু নয় প্রদীপ তো কথাও। মাটি থেকে আকাশে ঊর্ধ্বমুখী কথা।

তুমি কান পেতে শোনো।

----২৮ চৈত্র ১৪২৯
-----১২--৪--২০২৩
----নির্মল হালদার




মাটিতে রামধনু ওঠে - ১



মাটিতে রামধনু ওঠে - ১

একটা শালিক উড়তে উড়তে গাছের ডালে। এদিক ওদিক চেয়ে থাকতে থাকতে উড়েও গেল। একটা কাক সেই ডালে এসে কাকে যেন ডাকছে।

কেউ নেই কোথাও নেই।

গাছের পাশে গাছও নেই।

আকাশ শুধু আকাশ।

তার সঙ্গে নীরবতা। অনেক দূরের এক মাঠে একটা লোক কি যেন কাজ করছে।

আবছা আবছা হলেও রোদ জোরালো। স্পষ্ট। গাছের ডালে, পাতায় পাতায় এক ফোঁটা ঘাম নেই।

কী আছে? কে আছে?

ওই তো একটা পোকা----ধীরে ধীরে মাটিতে ধূলায়। তার পায়ের দাগ দেখা যায় না। শোনা যায় না তার নিঃশ্বাস।

পোকাটির সঙ্গে তার গন্তব্য দেখতে কে যাবে? তার ভালোবাসা দেখতেও যাওয়া যায়। কে যাবে?

হাওয়া উঠছে। তার স্পর্শে পাতায় পাতায় মৃদু কম্পন। শিকড়েও কি কাঁপন জাগে?

গভীর থেকে গভীরে যাওয়ার শিহরণ থাকে শিকড়ে। মাটিকে আঁকড়ে ধরার আকুতি থাকে। আনন্দ থাকে।

ভালোবাসা? ভালোবাসা থাকে?

আরো একটা শালিক গাছের ডালে বসতেই পাশে এসে বসলো আরো একজন। একটি শালিক।

কী কথা বলবে দুজনে?

যুগলের স্বর একই রাস্তায় গেলে আমিও যাব। যদি খুঁজে পাই, ঠিকানাহীন একটি ঠিকানা। আমাকে আদর না করলেও আমাকে তিন হাত জায়গা দেবে। হাত-পা ছড়িয়ে তোকেই খুঁজবো, প্রিয়।

সারাদিন আমার যে রোদ শুধু আমার যে বৃষ্টি।

------বেলা--১১--৪
------২০ চৈত্র ১৪২৯
-----৪---৪---২০২৩
-----নির্মল হালদার




মাটিতে রামধনু ওঠে - ২

একটা গাছের ডালে সাঁটা আছে একটা আয়না। আয়নার নিচে লম্বা কাঠের তাক। ছুরি কাঁচি ক্ষুর চিরুনিও আছে। আরো আছে চুল ও দাড়ি কাটার এটা সেটা।

গাছের দিকে মুখ করে একটা চেয়ার।

রাস্তায় সারাদিন যানবাহনের চলাচল। তার ছবি আয়নাতে পড়ে। এবং সারাদিন আয়নাতে পড়ে থাকে অর্জুনের একটি দুটি ডালের ছবি।

অধিকাংশ সময় চেয়ার খালি।

সকাল দিকে দু চারজন চুল কাটতে আসে। বাদবাকি সময় আয়নাতে কোনো মুখ নেই।

আয়নাতে এসে পড়ে হাওয়া। মেঘ। বৃষ্টি এলে আয়না উঠে পড়ে গাছ থেকে। মালিক তাকে নিয়ে যায় নিজের ঘরে।

আয়নার ঘর নেই।

মালিকের যে ঘরে আয়না থাকে, সেই ঘরও অন্ধকার। মালিকের ছোট্ট বোন এই ঘরে ভুল করে ঢুকলে অন্ধকার আয়নাতে একবার মুখ দেখে নেয়।

আয়না খুশিতে আয়না হয়ে ওঠে। সে মনেও করে, আছে আছে। আমার সঙ্গে কেউ আছে। এই তো ছোট বোন এসেছিল আমার কাছে।

আয়নার অবশ্য পছন্দ গাছের গায়ে সেঁটে থাকাটাই। কারণ একটাই, রাস্তা থেকে উঠে আসে কত রকম শব্দ। আর শব্দ আয়নার কাছে পৌঁছে যায়। তারপর তো আছেই , আয়নার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে যানবাহন। উড়ন্ত পাতা। ধুলোবালি। মানুষের মুখ।

আয়নার মালিক সারাদিনে কয়েকবার আয়নার কাঁচ মুছে দেয়। সেই স্পর্শটুকুও আয়নার কাছে অনেক অনেক বেশি প্রাপ্তি। তা বাদে অন্ধকার নামার মুখে মালিকের গ্রামের বাড়ি। বন্দী হয়ে যাওয়া।

যখন সে সকালবেলায় মালিকের সঙ্গে সাইকেলে আসে তখন ফসলের ক্ষেতে নেমে দৌড়োতে ইচ্ছে করে।

কিন্তু আয়নার স্বাধীনতা নেই। সে অনেকদিন ধরে চেয়েছে, আজও চাইছে----তার বুকেই উঠবে গোলপারা একটা চাঁদ। চাঁদের দুধে স্নান করলে পূর্ণতার স্বাদ আসে। অথচ সে রয়ে গেল, গাছে সেঁটে থাকা একটি আয়না।

এক সেলুনে।

----দুপুর--১--৫৪
---২০ চৈত্র ১৪২৯
----৪--৪--২০২৩
----নির্মল হালদার




মাটিতে রামধনু ওঠে - ৩

লম্বা চওড়া বিছানা। বালিশও আছে কয়েকটা। কে মাথা রাখবে? কারা মাথা রাখবে?

আছে আছে আছে।

যখন তখন মেঘ আসে বৃষ্টি আসে। হাওয়া তো আসেই। রোদ এসে উঁকি দিয়ে যায়। আগে শালিক চড়ুই আসতো। এখন ওদের দেখা যায় না আর। কাঠবিড়ালি দূর থেকে ঘরটা দেখে লাফিয়ে চলে যায়।

বিছানাটা আছেই।

দিনেও আছে রাত্রেও আছে।

বিরহে আছে অভিমানেও আছে।

লম্বা চওড়া বিছানা। মেঝেতেই পাতা থাকে। বিছানার চাদর শিল্পের রেখায় শিল্পিত হলেও শূন্যতার দীর্ঘশ্বাস ওঠে।

দীর্ঘশ্বাস?

ঘর থেকে নিঃশ্বাস কি শোনা যায়?

হাসি কান্না?

ঘরে দেয়ালে টাঙানো ছবি কার সঙ্গে কথা বলে? ঘরে কেউ থেকেও তো নেই। একটা পিঁপড়েরও পায়ের শব্দ নেই।

ঘুম আছে?

ঘরের জানালা থেকে মাধবীলতাকে ডাক। সে নিজের মতো করে লতিয়ে উঠতে উঠতে ঘরের দিকে জানলার দিকে তাকিয়ে দেখে না, কে ডাকছে!


মন ডাকে। নিজেরই মন। নিজের সঙ্গে নিজের খেলা। হেরে যাওয়ার খেলা খেলতে খেলতে দিনরাত্রি এসে হেসে হেসে ওঠে।

এ হাসি লুফতে পারলেই, একটা রঙিণ বল।

তুই কখনো চাইলে তোকে দিয়ে দেবো। তুই কি হাত পাততে পারিস?

-----২১ চৈত্র ১৪২৯
-----৫---৪---২০২৩
-----নির্মল হালদার




মাটিতে রামধনু ওঠে - ৪

কাছে যাই বা না যাই, পাহাড় আমাকে ডাকে। অপেক্ষা করে না? করে। আমি কাছে গেলে কথা বলবে নীরব ভাষায়।

অনেক কথা। মন উজাড় করা কথা। সেই একদিন আমাকে বলেছিল: একটা গ্রাম ছিল, পাহাড়তলির গ্রাম। একটা নদীও ছিল। নিরাময় নদী। হঠাৎ একদিন কারা যেন এসে, নদীকে বেঁধে দিয়ে রুদ্ধ করে ফেললো নদীর গতিপথ। উচ্ছেদ হয়ে গেল গ্রাম।

পাহাড়কেও শেষ করে ফেলার ষড়যন্ত্র করেছিল। দু চারজন মানুষের জন্য পারেনি। তারপর তো, মানুষ শুন্য চারদিক।

এই পাহাড়তলির গ্রামেই ধানের বদলে আখের চাষ ছিল প্রধান। আখের রস থেকে গুড়। গুড়ের চাষ। শহর থেকে মহাজনরা এসে গুড় নিয়ে যেতো।

কত যে মাছি। কত যে মৌমাছির আনাগোনা ছিল। এখনও ড্যামের জলে দাঁড়িয়ে আছে দু তিনটে তালগাছ। যেন বা সাক্ষী হয়ে আছে এই গ্রামের। এখানে একদিন কোলাহল ছিল। হাটবাজার ছিল। শিশুদের হাসি কান্না ছিল।

মানুষ ছিল মানুষ।

কাছে যাই বা না যাই পাহাড় আমাকে ডাকে। নতুন গল্প শোনাবে? শোনাবে বৈকি।

পাহাড়ের মাথায় উঠেছিল নিশ্চয়ই তরুণ তরুণীরা। যাদের কাছে উচ্ছেদের গল্প অজানা। যারা জানেনা, পাহাড়ের ছায়ায় পাহাড়ের কোলে গাই-গরু, ছাগল-ভেড়ার চরে বেড়ানোর শব্দ লুকিয়ে আছে আজও।

আমাকে তো বলবেই এই গল্প এই কথা। নীরব ভাষায়। পাহাড়ের এই মাথা উঁচু করা গল্পের কাছে নিজেকে ছোট লাগে। তার কাছে যেতেও ভয় করে আমার।

আমার নিজের গল্প ঘরের কোণে চুপটি করে থাকা। তাকে আর কি বলবো। ইচ্ছে তো করে, পাহাড়ের গায়ে গায়ে কোনো গাছ আঁকড়ে দিন কাটাই। এজন্য সাহস লাগে। পিছুটান বর্জন করতে হয়। ভালবাসতে হয়, নীরব ভাষা।

আকাশ আর পাহাড় প্রতিদিন কথা বললেও, আমাকে ডাকে। আমি যাবো যাবো করেও একইভাবে ঘরের ভিতরে অন্ধকার।

পাহাড়তলির গ্রামে ছিল এক কবি। যার কোনো পরিচিতি ছিল না। কারণ, তার কবিতা আলোর মুখ দেখেনি কখনো। কবি শুধু পাহাড়ের কাছে এসে পাহাড়কে সকাল-সন্ধ্যে শুনিয়ে গেছে, একটার পর একটা কবিতা। সেইসব কবিতায় ছিল জনজীবনের ঝংকার। এ সমস্তই পাহাড়ের কাছে শুনেছি। একদিন।

সেই একদিন প্রতিদিন হয়ে উঠলে নতুন নতুন গল্প জীবনের স্পর্শ লাগা, মায়া লেগে থাকা ইতিহাস শোনা যেতো। সেরকমই আশা এখনও।

আমি যে আজ চৌকাঠ ডিঙিয়ে পাহাড়ের হাওয়ার কাছে যেতেই পারিনা। কেবলই, একা থাকতে থাকতে ভাতের থালার কাছে এসে স্তব্ধ হয়ে থাকি।

আমার স্তব্ধতা কার সঙ্গে ভাগ করবো? নিজের নিজের জায়গায় সবাই যে খুঁজে বেড়াচ্ছে, খেজুর রস তালের রস।

-----২২ চৈত্র ১৪২৯
-----৬---৪--২০২৩
-----নির্মল হালদার




মাটিতে রামধনু ওঠে - ৫

দরজাটা খোলাই আছে। খোলাই থাকে সারাদিন। শুকনো পাতা ঢুকে পড়ছে ঘরে। কখনো কখনো হাওয়ার সঙ্গে ছেঁড়া কাগজ। কুটোকাটা।

ঘরে কেউ নেই?

কোনো কোনো পাখি উঁকি দিতে এসেও ফিরে গেছে। ঘরে আছে একটি কলসি। বিবর্ণ। আর খোলা আছে ধুলো-ময়লা একটি খাতা।

কী লেখা আছে খাতায়?

আলো অন্ধকার ঘরের ভিতরে চলাচল করলেও খাতায় কি আছে জানে না। যে দু'চারটে টিকটিকি ঘুরে বেড়ায়, তারাও জানে না, কি আছে।

অনেকদিন আগে একটা পায়রা ঘরের ভিতরে এসে খুঁজে পেয়েছিল একটি মাত্র ধান। সে দেখতে পায়নি অন্য কিছু আর।

ঝড় বৃষ্টি এলে দরজার কপাট নড়েচড়ে। বন্ধ হয়েও যায়। খুলেও যায়। একবার এক পাগল এই ঘরে থাকার চেষ্টা করেও পালিয়ে গেছে। ছিঁচকে চোর ঢুকতে পারে না। যেন অলিখিত এক নিষেধ বাণী ঘুরে বেড়ায়।

দরজা খোলাই আছে। খোলাই থাকে। অনবরত। খাতার পাতা কখনো কখনো উড়তে উড়তে কিছু বলতে চায়।

কাকে বলতে চায়?

কে আছে কোথায়?

কুলঙ্গির একটা প্রদীপে আধ পোড়া সলতে। কবে জ্বলেছিল? কে জ্বালিয়েছিল? দেয়ালে কি যেন একটা নাম, স্পষ্ট নয়। আবছা হয়ে গেছে আয়নার কাঁচ।

কে মুখ দেখেছিল?

কার মুখের আলোয় আলোকিত হয়েছিল আয়না?

বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ছিন্ন হয়ে গেছে। ছিঁড়ে গেছে তার। ছেঁড়া তারে ঝুল অন্ধকার। হেলে পড়ে আছে কলসি।

কোনোদিন জল ছিল।

তৃষ্ণা ছিল কোনো মানুষের।

সে তৃষ্ণা কেমন তুমি দেখেছো?

----২৩ চৈত্র ১৪২৯
----৭---৪--২০২৩
----নির্মল হালদার






নির্মল হালদারের সংগ্ৰহে থাকা পুরোনো দিনের ছবি
























































কবি নির্মল হালদারের বিভিন্ন সময়ের ছবি

পড়ুন "ঘর গেরস্থের শিল্প"

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ