নির্মল হালদারের কবিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
নির্মল হালদারের কবিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২২

হরিতকি গর্ভের আলোয়

হরিতকি গর্ভের আলোয়
-------------------------------------




প্রেম
--------

কার সাহসে মেঘ পাড়বো
মেঘ চাষী তো আমার সঙ্গে নেই।
আমার সঙ্গে বাথান মুটরুডি
চিপিদা টাঙিদা
গ্রামের পর গ্রাম আমার সঙ্গে থাকলেও
কার সাহসে বাদাম উপড়াবো?

বাদাম চাষী তো আমার সঙ্গে নেই।

-----৩০ আশ্বিন ১৪২৯
-----১৭---১০---২০২২
-----নির্মল হালদার




সকাল বেলা
-------------------

সারারাতের পিপাসা

সূর্য এসে নিবারণ করে সকালের শিশিরে

বেলা হলে পুকুরে নামে নদীতে নামে
স্নানও করে।
স্নান করতে করতে ছুঁয়ে ফেলে
জলের তলে পড়ে থাকা পাথর,

মাছের গা।

সূর্যের পরশে জ্যান্ত হয়ে ওঠে নদীর কল্লোল।

-----৩১ আশ্বিন ১৪২৯
-----১৮---১০---২০২২
----নির্মল হালদার




ঝিঙে ফুল
----------------

ঝিঙে ফুলের হলুদ ছিটকে পড়ে মাটিতে

আজ ১ লা কার্তিক
হেমন্তের শুরু
ধান পেকে উঠছে ক্রমশ

ওই ধান আমার ঘরে না এলেও
ধান পাকা হাওয়া আসবে
তুমিও আসবে রজনী

আবছা হয়ে যাবে ধানক্ষেতের সবুজ

আমি অন্ধকার হাৎড়ে খুঁজে বেড়াবো
জোনাকির ওড়াউড়ি।

২:

ঝিঙে ফুলের হলুদ আমার অঙ্গে অঙ্গে

আমিও লতায় পাতায়

সারারাত আমার কাছে ছিল নক্ষত্রের নিবিড়তা
সকালবেলা শিশিরের ছ্যাঁকা,

জেগে উঠেছি।

আমাকে খুঁজতে আসবে অবনীর মা

পাতার আড়াল থেকে আমি বলে উঠবো,
এইতো আমি এইতো----

রঙের কাঙাল।

-----১ লা কার্তিক ১৪২৯
-----১৯---১০--২০২২
-----নির্মল হালদার




মালা
--------

প্রতিটি শিশির ফোঁটা গেঁথে ফেলি

প্রতিটি শিশির ফোঁটা হয়ে ওঠে
শান্ত একটি মালা

সমর্পনেই খুঁজে পেয়েছে বন্ধন মুক্তি।

-----২ কার্তিক ১৪২৯
------২০---১০---২০২২
------নির্মল হালদার




এই সকাল
----------------
উড়তে উড়তে ফড়িংয়ের পায়ে লাগলো শিশির
সূর্যের কিরণ এসে পায়ে পায়ে ওড়ে।
সরষে ফুলের রেণু গরুর পায়ে পায়ে
শিঙেও লটকে গেছে।

কে পাঠালো এই সকাল?

আমি তো লিখিনি চিঠি আজকাল আর

আমার প্রেমের প্রস্তাব, নীরবে

চাঁদের কাছে শেষ রাতে।




লিখন
----------

তুমি না এসে
আমাকে পাঠালে চাঁদ
শেষ রাতে

চাঁদের গায়ে কী লিখবো?

আমি তো কানের লতিতে লিখতে চাই
একবিন্দু বৃষ্টি

আমার অস্থিরতা।

-----৩ কার্তিক ১৪২৯
-----২১---১০---২০২২
-----নির্মল হালদার




কাক
--------

বাসন মাজার শব্দ হলে উড়ে আসে কাক
এঁঠোকাঁটা পড়ে থাকলে কাকের আহার।
ও বড় বউ ও ছোট বউ
কাক আমাদের কুটুম না হলেও
কাকও একটা পাখি,

ভোরের মুখ।

এই মুখের দিকে চেয়ে ফুটে উঠছে,

লঙ্কা ফুল।

------৪ কার্তিক ১৪২৯
-----২২---১০---২০২২
-----নির্মল হালদার



 
এক নারীর একগুচ্ছ চুল থেকে
একটি চুল আলাদা করতেই,
একটি কালো রেখা।

যেন বা চিত্রকরের একটা টান।
পেন্সিলের টান।

এই রেখার দিকে চেয়ে
কবি রচনা করলেন একটি বিষাদের কবিতা।

হেমন্ত ঋতুর কবিতা।

-----৫ কার্তিক ১৪২৯
-----২৩---১০---২০২২
-----রাত্রি-৭---১২
-----নির্মল হালদার




নন্দিনী
-----------

হেমন্তের হিম ঝরা অন্ধকারেও মাছের খেলা

জলে জলে।

আমিও ঢেউ থেকে ঢেউ

আমিও আঁচল ছুঁতে চাই পাড় ছুঁতে চাই
আমি ডেকে উঠি: নন্দিনী নন্দিনী-----

আমার প্রতিটি ডাক হয়ে ওঠে নক্ষত্র।

---৬ কার্তিক ১৪২৯
----২৪---১০---২০২২
-----নির্মল হালদার




দৃশ্যের ভেতরে আরো দৃশ্য
---------------------------------------

বক এসে দাঁড়ালো নদীর পাড়ে

সূর্য এসে দাঁড়ালো নদীর পাড়ে

সূর্য তো স্নান করবে মাছ করবে শিকার

আর আমি বাবলা গাছে খুঁজবো রক্তের দাগ
বাবলা কাঁটা বিঁধেছিল আমার আঙুল
অথচ একটাও ফুল পাইনি

অবনীকে পেয়েছিলাম
চোর কাঁটার মত দাঁড়িয়ে ছিল,

নির্বাক।

-----৭ কার্তিক ১৪২৯
-----২৫---১০---২০২২
-----নির্মল হালদার




দ্বিপ্রহর
------------

রামানুজ একটা মন্দির পাঠালো
তার ঘন্টা ধ্বনিও শুনতে পেলাম
এই দুপুরে-----

পায়রার খিদেও শুনতে পাই।

খিদেও দেবতা এক
তার ভজনাও করি, পায়রাদের কাছে নিয়ে যাই
এক বাটি মুড়ি

দ্বিপ্রহরের রোদ স্তব্ধ হয়ে আসে।




ভালোবাসায় বেঁচে থাকা
------------------------------------

সারাদিন একটা ইশারা

একটি ইশারায় হাঁসের কোলাহল
মুরগির ডাক বাঁশ বনের হাওয়া
রাস্তা আসে রাস্তা যায়

সারাদিন একটি ইশারা

একটি ইশারায় পানকৌড়ির ডুব
গুগলি--শামুক পদ্ম বনের ডাক
মৌমাছি আসছে।

আজও রোদ আসছে

রোদ ঢুকে পড়ছে ঘরে ঘরে

গায়ের ঘাম নুনের জলে রোদ ভিজবে

আমাকে ভালোবেসে।

-----৮ কার্তিক ১৪২৯
-----২৬---১০--২০২২
-----নির্মল হালদার



 
সংসার
-----------

সংসার বলতে একটা ঘর
একটা জলের কলসি
জানালার ফাঁকফোকরে একটু আকাশ
একটা দুয়ারও আছে,

তুমি দাঁড়ালে হৃদয় দিব রাঁধিয়া।

-----৮ কার্তিক ১৪২৯
----২৬---১০---২০২২
----নির্মল হালদার




লাল-হলুদ গাঁদার আলিঙ্গনে
গোলমাল ক 'রোনা , চুপ করো।
লাল- হলুদ গাঁদার আলিঙ্গনে
সাত রঙের কিরণ

গোলমাল ক 'রোনা ,চুপ করো

রঙে রঙে বাতাসও ছুটছে

রঙিন ছুটছে

এসময় কথা ব'লোনা, এ সময়
লাল--হলুদ গাঁদার আলিঙ্গনে
ধুলোর সঙ্গে ধুলো হয়ে
আমিও চুপ

মিলনের মধু ঝরছে।

-----১০ কার্তিক ১৪২৯
----২৮--১০--২০২২
----নির্মল হালদার


                      আরও পড়ুন 








মঙ্গলবার, ২৪ আগস্ট, ২০২১

পানকৌড়ির ডুব / নির্মল হালদার

পানকৌড়ির ডুব / নির্মল হালদার



২৪.
রাস্তা চলে যায়
সোজা যায় বেঁকে যায়
সরু হয়ে যায়

রাস্তায় পায়ের শব্দ
যান চলাচল
ধুলো বালি , পাথর

রাস্তায় হোঁচট
ভিড়-ভয়--ভালোবাসাও
দেখা সাক্ষাৎ

রাস্তায় আলো অন্ধকার
বয়ে যায় জল
উঁচু নিচু খাল ডোব

হঠাৎ একটা গাছ
হাওয়া আসছে পথিকের।



২৫.
দুই পারে দুটি নৌকা
পারাপারের যাত্রি নেই
মাঝে নদী ছল ছল

নৌকা ঘরে উনুন জ্বলে
তেল হলুদের গন্ধ
চড়চড় করে দুপুরবেলা

জল ছুঁয়ে উড়ে গেল বক
পানা ভাসছে শ্যাওলা ভাসছে
পাতা আছে ধীবরের জাল

নৌকার পাল নড়ে উঠছে
মাথার উপরে স্তব্ধতা
নদীর বালিও চুপচাপ

দূরে কোথাও ধোঁয়া উঠছে
ঝমঝম করে ট্রেন চলে যায়
ঝনঝন করে ব্রিজ

একটা ডাক নদীর এপার ওপার।



-----২ ভাদ্র ১৪২৮
----১৯---৮---২০২১



২৬.
শিশু কোলে মা হাঁটছে

খাঁ খাঁ করছে চারদিক
রোদ পুড়ছে রোদের গায়ে
পড়ে আছে পাহাড় ভাঙা পাথর
দেখা যায় বনের পথ

মায়ের কোলে শিশুর হাসি

একটা গরুর গাড়ি আসছে
চাকায় জড়িয়ে আছে কাদা
গাড়োয়নের মুখে ক্লান্তি
মধ্য গগনে সূর্য

মায়ের দুধ টানছে শিশু।




২৭.
ঘর থেকে চলে যাচ্ছে টিনের তোরঙ্গ

দরজার মাথায় সিঁদুরের দাগ
দুয়ারে ঝুলছে আম পল্লব
ঘরের ভিতরে ঘুমিয়ে আছে শিশু
কুলুঙ্গিতে ফটো প্রতিমা

পিলসুজ দাঁড়িয়ে আছে একা
এক কোণে একটা কলসি
থালা-বাটিও সাজানো
আলনায় জামা কাপড়

ঘর থেকে চলে যাচ্ছে টিনের তোরঙ্গ

দেয়ালে ক্যালেন্ডার
দেয়ালে আঙুলের দাগ
এক কোণে কাঁথাকানি,হাঁড়িকুড়ি
ভেঙ্গে গেছে জানলার শিক

আকাশ ঢুকে পড়ছে।



-----৩ ভাদ্র ১৪২৮
----২০---৮---২০২১



২৮.
ধার বাকি করতে নেই

যা আছে যেটুকু আছে খাও পরো
চাল থেকে বেছে নাও কাঁকর
কচু শাক রান্না করো
ওল খুঁড়ে নিয়ে এসো

ধার বাকি করতে যেও না

ধার বাকি শোধ করতে না পারলে
এক জন্মের পাপ
ঋণের বোঝা সব সময়
মাথা থেকে নামিয়ে রাখো

ঘটি বাটি যা আছে বন্ধক দিতেও যেওনা।



২৯.
আম খেয়ে আমের আঁঠি পুঁতি মাটিতে

বীজ ফেলতে নেইরে ভাই
মাটি থেকে এসেছে তাকে মাটিতেই রাখি
ফলে ফলে শোভা পাবে ঘর

ফলের রঙ ফলের আলো সন্তানের মুখে পড়বে

সন্তান আমাদের শ্রী।


-----৪ ভাদ্র ১৪২৮
----২১---৮--২০২১



৩০.
বড়ি শুকানো রোদে
মা--খুড়িরা চুল শুকায়
বাপের ঘরের গল্প করে

সেই যে সেবার এক গাছ কুল
সেই বারেই তো গোপাল হয়েছিল
ঘরে প্রথম পুত্র সন্তান
শাঁখ বেজেছিল

মা---খুড়িদের গল্পে কাক ঢুকে পড়ে
খুঁটে দিয়ে গেল বড়ির মুখ
শীতের বেলা সূর্য ঢলে পড়ে

মায়ের চুলে চিরুনি চালায় খুড়ি।



৩১.
কে ডাকছে ধরণীকে?

মাঠে কাজ করছে একজন
দূরের শালিক কাছে আসে
ইঁট পাঁজায় উড়ছে নিশান

বুড়ি শাক তুলছে
ঝুড়ি ভর্তি রোদ
পাথরের খাঁজে শুকনো মাটি

কে ডাকছে ধরণীকে?

বুনো ফুলের বাহার
বাঁধের জলে শালুক পাতা
বেড়ে উঠছে আখের রস

জনার বীজের আভা
কাশের রেণু উড়ছে হাওয়ায়
কাঁটা ঘাসে বুনছে ঝাঁটা

কে ডাকছে ধরণীকে?

ধরণী দু ফাঁক হলে বীজের রোশনাই।



----৫ ভাদ্র ১৪২৮
----২২---৮---২০২১



৩২.
একটা নিম গাছ
দাঁড়িয়ে আছে অপেক্ষা।
একটা কুল গাছ
দাঁড়িয়ে আছে অপেক্ষা।

কে অপেক্ষা?

একটা কুয়াশা
দাঁড়িয়ে আছে অপেক্ষা।
একটা রোদ
দাঁড়িয়ে আছে অপেক্ষা।

কে অপেক্ষা?

একটা শুকনো হাঁড়ি
দাঁড়িয়ে আছে অপেক্ষা।
একটা শুকনো কলসি
দাঁড়িয়ে আছে অপেক্ষা।

কে অপেক্ষা?

অপেক্ষার কোনো নাম নেই।




৩৩.
শাল পাতায় পিঠে বেঁধে দাও।
যেখানে যে কুটুম আছে দিয়ে আসবো।
আমার সুখ দুঃখ দিয়ে আসবো।
পেঁপে গাছটা যে বড় হয়ে গেছে বলে আসতে হবে।

ইঁদুরে ধান চুরি করলেও চালে কম পড়বে না।
ছেলে মেয়েদের মুখে হাসি কম পড়বে না।
আলুও হয়েছে দেদার, বাদাম ও বিক্রি করেছি।
হাত পাততে হবে না কোথাও কারও কাছে।

কুটুম কে সব কথা না বললেও
বলে আসতে হবে, ঘরের দিকে যাবে হে।

ঘরের দিকে যাবে গো, ছোটটার মুখেভাত দিব।



----৬ ভাদ্র ১৪২৮
----২৩---৮---২০২১



৩৪.
কালি লেগে আছে থাক-----
তবে তো বুঝবে হাঁড়ি চড়েছিল উনুনে।
তবে তো বুঝবে রাঁধাবাড়া হয়েছিল।
পাত পড়েছিল।

গেরস্থের ঘরে উনুন টাও মঙ্গলের চিহ্ন।
উনুন জ্বললেই দুয়ারে দাঁড়ায় কাক ও কুকুর।
ভুলে গেলে চলবে না,
ওরাও আমাদের সংসারের

শুভকামনায় আছে।



৩৫.
একটা বাঁধেই সিনান করো।
জলের ভালো-মন্দ বুঝবে।
একটা ঘাটেই নামো, তোমাকে চিনবে
বাঁধের ঘাট

তুমিও চিনবে ঘাটের পাথর।

যে পাথরে পা ঘষতে ঘষতে
মনে পড়বে না, কে বহন করেছিল পাথর।
ডুব দিতে দিতেও মনে পড়বে না
কারা খুঁড়েছিল বাঁধ।



৩৬.
এক মুঠি চালের সঙ্গে দুটো আলু দাও।
যদি পারো একটু নুন দাও।
যদি ইচ্ছে করে শুনে নাও হরিনাম।
তুলসী গাছটাও খুশি হবে সকালের হরিনামে।

তুলসী গাছে জল দিয়েছো?

কপালে রসকলি না আঁকো মাথায় ঠেকিয়েছো ধূলা?



----৭ ভাদ্র ১৪২৮
----২৪---৮----২০২১
----নির্মল হালদার








বুধবার, ১৮ আগস্ট, ২০২১

পানকৌড়ির ডুব//নির্মল হালদার

পানকৌড়ির ডুব//নির্মল হালদার



১১.
গরুর কাঁধে হালের দাগ
গাছে কুড়ুলের দাগ
পাতায় পাতায় পোকায় কাটা দাগ

শুয়োর চরছে
শুয়োর ছানারাও আছে
ঝোপ জঙ্গলে মাকড়সা

রাস্তায় পিঁপড়ের বাসা
মাটি তুলছে কেঁচোরা
ছাগল চিবোয় ঘাসপাতা

মাথায় কাঠের বোঝা
সাইকেলে সবজি যায়
হাটবার

আমার সবকিছু আমার নয় কিছু।



১২.
পাহাড়তলীর ঘর
পাখির কলরব।
পাহাড়তলীর ঘর
পত্র পল্লব।

আলো হাওয়া
মেঘের আসা যাওয়া
আকাশ ঝুঁকে পড়ছে
শিকড়ের রস।

ধারালো টাঙ্গি
চকচকে কুড়াল
মহুলের গন্ধ
হাঁড়িয়ার সুবাস

মাদলের বোল
বাঁশির সুর
নাচ-গান পরব
শুয়োরের মাংস

থৈ থৈ প্রাণ।


-----২৬ শ্রাবণ ১৪২৮
----১২---৮----২০২১



১৩.
কী দেখবো আর এই তো সকাল

শিশিরের নিঃশব্দ মুখ
পাতায় পাতায় স্তব্ধতা
ফুলে ফলে ধরিত্রী নীরব

কী দেখবো আর এই তো সকাল

পাখিদের ডাকাডাকি
সূর্যের কিরণ
লাঙ্গল কাঁধে একজন

কী দেখবো আর এই তো সকাল

মাটি থেকে ওল খুঁড়ছে
মান পাতায় একটা মাছি
বাদামের ছোট ছোট গাছ

কী দেখবো আর এই তো সকাল

রাস্তায় চলাচল
নিম দাঁতনের গল্প
ভাঙ্গা টিউকল

আমার আগেই এসেছে সকাল অনেক আগে।



১৪.
আমবাগান
মৌমাছিরা উড়ছে।
আমবাগান
মৌমাছিরা উড়বেই।

আমবাগান।

আমের বোঁটা ছিঁড়লেই
আমের মধু।

মধু।

মধুমঙ্গল।

----২৭ শ্রাবণ ১৪২৮
----১৩---৮---২০২১



১৫.
কিছুই তো নেই অনেক কিছুই আছে

ভাঙ্গা মন্দির
দেয়ালে শ্যাওলা
বুড়ো বেল গাছ

বটতলে তাসের আসর
শিশুদের ধুলো খেলা
সাইকেলে ফেরিওয়ালা

মাথায় ঘাসের বোঝা
দড়ি ছেঁড়া বাছুর
পায়রা উড়লো

কিছুই তো নেই অনেক কিছুই আছে

বালিকার কোলে হাঁস
জল ছাপ ছপ পা
পুকুরে সিনান করছে বউ

জামবাটিতে মাড়ভাত
সজনে শাকের সুয়াদ
হাঁড়িতে জনার সিজছে

কুলুঙ্গিতে আয়না
কাঠের কাঁকই
ঝুলছে ময়লা কাঁথা

কিছুই তো নেই আলোছায়া খেলছে




১৬.
ওইতো দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা

রাস্তা যায় 
লোক যায়
গোধূলির আলো

ওইতো দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা

শাঁখ বাজে
সন্ধ্যা তারা আসে
ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বলে

ওইতো দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা

কপালে টিপ
মলিন মুখ
আঁচল টানে ছেলে

ওইতো দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা

কবে আসবে?
কখন আসবে?
কতদূরে কাজের দেশ?

অপেক্ষা ভেঙে পড়ছে কান্নায়।


-----২৮ শ্রাবণ ১৪২৮
----১৪---৮---২০২১



১৭.
স্তব্ধ জবা থেকে ফেটে পড়ছে রঙ
অপরাজিতাও ফুটছে
রঙের স্রোত

টগরের পাশে টগর ফুটছে
মাধবীলতায় ফুলের গৌরব
রঙের স্রোত

শিউলির গন্ধ উড়ছে
মৌমাছির গুঞ্জন
প্রাণের স্রোত

কে আসছো ফুল তুলতে?




১৮.
পুঁইলতায় জড়িয়ে আছে শিশির
ঝিঙেলতায় শিশির
ভোরের হাওয়া

আকাশ জুড়ে আলো
গাছে গাছে কানাকানি
বুয়ান ডালে চড়ুই

লঙকা ফুটেছে লাল
কাঁটা বেগুনের জমি
কাকতাড়ুয়া

কোদাল কাঁধে চাষী
ভেঙ্গে গেছে আল
অড়হরের পাতা কাঁপছে

তুলসীর ঝোপ
কল্কে ফুলের মধু
ফনিমনসা

আর আছে সকল প্রাণের আনন্দ

----২৯ শ্রাবণ ১৪২৮
----১৫---৮---২০২১



১৯.
অন্ধকার রাত্রি
একলা মানুষ
লন্ঠন এগিয়ে আসছে না

নির্জন পথ
হু হু করছে হাওয়া
জ্বলছে নিভছে তারা

কাছে দূরে আত্মীয়তা
কাছে দূরে ঘুম
নিদ্রাহীনতাও

কুকুর ডেকে উঠলো
ঝিঁঝিঁপোকার সুর
জোনাকি এগিয়ে আসছে না

গাছপালা অন্ধকার
একলা মানুষ
রাতচরা পাখির ডাক

সাড়া শব্দ নেই
নিঝুম চারপাশ

নিঃসঙ্গতা।


----৩০ শ্রাবণ ১৪২৮
----১৬---৮---২০২১



২০.
আলতা পরা পা
শাড়ির রঙিণ পাড়
হাতে চুড়ি রুণুঝুনু

উঠোনে ঝাঁট
গোয়াল পরিষ্কার
গরু গেল গোঠে

ন্যাংটো শিশুর কান্না
চালে ঝুলছে কাঁথা
লাউ লতের বেড়ে ওঠা

উনুনে আধপোড়া কাঠ
দড়ির খাটিয়া
হেলানো সাইকেল

বেলা বাড়ছে
সজনে গাছে রোদ
মাড়ুলি শুকায়

ভুবনের এক কোণে মায়ের সংসার



২১.
ভিজতে ভিজতে আসছে ছাগলের পাল
গাছপালাও ভিজছে
বৃষ্টির অন্ধকার।

এ অন্ধকারে মেঘের মাদল বাজে
কে বাজায়?
বিদ্যুৎ ঝলকে কার মুখ দেখি?

ব্যাঙ চলে যায়
কয়েকটা শামুক
বকের উড়াল

ধানের মাথা কাঁপছে
জলে জলে গলে যায় মাটি
খালডোবে জল

পুকুরে লাফায় মাছ
ঘাটে পড়ে আছে দাগ
চেয়ে আছে পাকা ডুমুর

বৃষ্টির ফোঁটায় ফোঁটায় প্রাণের শব্দ।


----৩১ শ্রাবণ ১৪২৮
----১৭---৮---২০২১



২২.
ঝিরিঝিরি নাচ
ঝিরিঝিরি গান
মেঘ ও রোদের খেলা

শিউলি ঝরছে
অপরাজিতার নীল
কল্কে ফুলের হলুদ

ধানক্ষেতে ছুটে বেড়ায় মাছ
ফেটে পড়া তাল
কাশবনে হুটোপুটি

মাঠে-ঘাটে আগাছা জন্মায়
ঘাস কাটছে বুড়ো
ফড়িঙের ডানা

বিরি-কলাইয়ের সবুজ
বাদাম ফুলের মধু
মৌমাছির ডাক

কী ভাষায় কথা বলব আর।



২৩.
মাটি কাটছে
গাঁইতি-কোদাল
মাটি কাটছে
এক চৌকা দু চৌকা।


ঝুড়ি ঝুড়ি মাটি
বালি কাঁকুরে মাটি
মাটি কাটছে
ঘাম

পিপাসা জাগছে
ছায়া নেই কোথাও
বাতাসেও উষ্ণতা
মরীচিকা

মেয়ে মরদের কাম
পুকুর খনন
কাছে দূরে গ্রাম
পাহাড়ের আভাস

দিনমজুরের গল্পে আমলকি নেই।



-----১ ভাদ্র ১৪২৮
-----১৮---৮----২০২১
----নির্মল হালদার










বুধবার, ১১ আগস্ট, ২০২১

পানকৌড়ির ডুব / নির্মল হালদার

পানকৌড়ির ডুব / নির্মল হালদার



১.
হাঁসটাকে দিয়ে এসো জলে
গরুটাকে খুলে দাও
দুয়ারে দাও মাড়ুলি

ঘরটাকে ঘর বলবে
ছিরিছাঁদ আসবে
লক্ষ্মী আসবে তবেই

মানুষকে ছুঁয়ে থাকো
আত্মীয়তা পাবে
মনের টান

মনটাই তো আসল
মনটাকে জাগিয়ে রাখো
হৃদয় থেকে সাড়া পাবে

সাড়াশব্দ পাবে ঘর ও বাইরের।



২.
খুঁটে বাঁধা পান দোক্তা খুলে মা মুখে নিয়েছে। পান চিবোচ্ছে মা।
নইলে ঢুল আসবে।
মহাভারতের কথা শোনাই হবে না।

মহাভারত পড়ে শোনায় দত্ত বাড়ির মেজ বউ।

একটি কাকও ডাকছে না।

গ্রীষ্ম দুপুরের স্তব্ধতায় অভিমন্যু বধ হয়ে গেল।
মা--খুড়ির চোখে জল।

আমি ঘুমিয়ে পড়েছি মায়ের কোলে।


-----২১ শ্রাবণ ১৪২৮
----৭---৮---২০২১



৩.
এসেছি যখন দু'দণ্ড থেকে যাই

ঢালা--মাড় নাই বা দিলে
দুটো কথা দিও।
নুনের কথা না হোক গুড়ের কথা না হোক
শুকনো কথা দিও।

চোখের হাসি না হোক
দৃষ্টি তো দিবেই।
আসন না দাও দু'দণ্ড বসতে দাও
এসেছি যখন।

এসেছি যখন এক ঘটি জল চাইবো
চোখ মুখ ধুয়ে দেখতে চাই,
সজনে গাছ টা আছে তো?
কালো গাইটা?

আগের মতই কি পায়ে শব্দ ওঠেনা?
আগের মতই কি ঘুমাও বেশি?
চুড়ির ঝন ঝন শুনতে পাবো তো?
পড়তে পারবো তোমার মন?

মনের কোথায় ফুল ধরেছে না ফল
আমাকে না বলো,তবে বলতে দোষ নেই
তুমি কেমন আছো?


----২২ শ্রাবণ ১৪২৮
-----৮---৮---২০২১



৪.
কাঁখে কলসি টলমল করছে
মেঘ টলমল করছে
রাস্তা টলমল করছে

পায়ে কাঁটা ফুটলো।

ভেজা শাড়ি থেকে জল ঝরছে
নাকছাবিতে রোদের ঝিলিক
ভেজা চুল থেকেও জল ঝরছে

পায়ে কাঁটা ফুটলো।

কাছে আসছে ঘরের দুয়ার
ছেলের মুখ
রান্নাঘর

রাস্তার পরে রাস্তা খালি পা।



৫.
ধূলায় লুটালেও বাঁশি বাজে

বাঁশির ভিতরে আসা-যাওয়া করে হাওয়া

ধূলায় লুটালেও বাঁশি বাজবে আর
বাঁশির সুর ধরে ধরে
আমিও যাচ্ছি

আমি যাচ্ছি

চাষী বউয়ের কথার দিকে
ভুট্টা ক্ষেতের দিকে
অফলা জমির দিকে

আমি যাই

রাহেড়ের দানা বেড়ে উঠছে
বিরি শাক সবুজ হয়ে উঠছে
বর্ষার জলে ভরে উঠছে বাঁধ

আমি যাই

মেঘের ওড়না উড়ছে বালিকার বুকে।


-----২৩ শ্রাবণ ১৪২৮
----৯---৮---২০২১
----নির্মল হালদার



৬.
দেয়ালচিত্র আড়াল করে দেয়াল লিখন।

দেয়ালে হেলানো গরুর গাড়ির চাকা
ঘুন ধরেছে চাকাতেও।

আগাছা জন্মায়
বিনবিন করে পোকা

খড়ের চালা উড়ে যায়
ছাই উড়ছে ভাঙ্গা উনুনের

উইঢিবিতে কে ঢুকবে?

আমার দুয়ার নাই।



৭.
গাছের গায়ে আঁচড়
ফড়িংয়ের ছেঁড়া ডানা
গরু চলেছে একা একা

জমিতে পড়ে আছে হাল
কাকের মুখে রা নাই
আলপথ ভাঙাচোরা

নদী করছে ধু ধু
মাছের সংসার উৎখাত
বালি পাথরের হাঁ

কুকুরের শুকনো মুখ
মাঠে-ঘাটে গর্ত
সাপের খোলস

এই কথা বলতে দেরি হয়ে যায়।


-----২৪ শ্রাবণ ১৪২৮
----১০---৮---২০২১



৮.
ধীবরের জালে ছটপট করছে মাছ
আঁশটে গন্ধ
কোলাহল।

নদী আপন মনে চলেছে
নদীর জলে লাফায় ছেলে
একটা ডাক।

আখের ক্ষেতে ঢুকলো একটা লোক
আখের পাতায় ঝিলমিল
ধানগাছ মাথা কাঁপায়

উড়ছে কাশ ফুলের রেণু
বুনো লতায় নীল রঙের ফুল
কেন্নো হাঁটছে

আল কোপায় এক রমণী
যুবকের কোমরে হাঁসুয়া
বট গাছের ঝুরি

চকচকে শালপাতায় কে রাখবে অন্ন?



৯.
পড়লো একটা তাল
ধুলো উড়লো
ভাদুরে হাওয়া

চার্চের মাঠ
ভেড়া চরছে
ডোবার জলে শালুকের রঙ

পায়ে চলা পথে স্বর্ণলতা

পড়লো আরো একটা তাল
ছুটে গেল ছেলে
খাটাল থেকে দুধ দোওয়ার শব্দ

শালুক পাতায় রোদের কিরণ
ঘন্টা বাজছে
প্রার্থনা গান

চিরজীবীতের সুর।



১০.
তাল গাছের তলে রসের হাঁড়ি
মাছিরা উড়ছে।
তালপাতাও পড়ে আছে শুকনো।

থালা বাটি হাতে পুকুরে যায় বউ
পিছনে পিছনে কাঁদছে ছেলে
রাস্তায় খালডোব।

আস্তাকুড়ে মুরগির লাফালাফি
মুরগির ছানারা আহার খুঁজছে
খসে গেল মুরগির পালক।

আমি আসছি একটু দাঁড়াও


-----২৫ শ্রাবণ ১৪২৮
-----১১----৮----২০২১
----নির্মল হালদার






ছবি : আলোকচিত্রী সন্দীপ কুমার

রবিবার, ৮ আগস্ট, ২০২১

কবিতা / নির্মল হালদার

কবিতা / নির্মল হালদার




১৮১.
যা দেখার দেখব এই বেলা
জমি ছোট হয়ে আসছে
লাঙ্গল নেই
ধুলা ওড়ায় ট্রাক্টর
পাখিরা পালায়

যা দেখার দেখব এই বেলা
চাষিরা ধুঁকছে
বীজের অভাব
কুকুরের চিৎকার
মুরগির লাফ

যা দেখার দেখব এই বেলা
ইঁট পাঁজায় আগুন জ্বলছে
মাটি ফুরায়
জল ফুরায়
সাপ আসে একা একা

যা দেখার দেখব এই বেলা
নদীর বালি চুরি হয়ে যায়
গাছ চুরি হয়ে যায়
পুকুর বুজে যাচ্ছে
ব্যাঙ নাই

ঘুমের পরে ঘুম আসছে খুব।



১৮২.
আমি ধুলা লিখি

আমার আখর ধুলায় গড়াগড়ি।
আমি ধুলা লিখি। ধুলায় ধুলায়
আমার আখর। আমার আলো।

আমি আলো লিখি।

লিখন আমার ধুলায় ধুলায় শিশির।
লিখন আমার শিশিরের আগুন।
আমার আগুন আমার আখর।

আমি আগুন লিখি।


----১৭ শ্রাবণ ১৪২৮
----৩----৮---২০২১



১৮৩.
এই টুকুই তো আছে আমার
বটের ছায়া
পাখির ডাক
বাঁশবনের হাওয়া
পুকুরে ডুব

এই টুকুই তো আছে আমার
ধুলা পথে পায়ের শব্দ
শালের পাশে শিমূল
একাকী বক
ঘাসের সবুজ

এইটুকুই তো আছে আমার
মেঘের পরে মেঘ
অশথের শিকড়
কানা ভাঙ্গা থালা
ঘোমটার আড়ালে মুখ

এইটুকুই তো আছে আমার
কাঁদছে শিশু
মায়ের ডাক
তুলসী তলা
শাঁখের আওয়াজ

এই টুকুই তো আছে আমার
পায়রার উঠোন
কাকের ওড়াউড়ি
জাম বাটিতে মাড়
ছড়ানো ভাত

হাওয়াতো আছেই হাওয়ার সঙ্গে।




১৮৪.
ডাকাডাকির এই সকাল বেলা
কার কাছে যে যাই! বৃষ্টির শব্দ
আমারই বন্ধু। মেঘের শব্দ
মিলনের আস্বাদন।

স্বাদে--আস্বাদে মাটির সোঁদা গন্ধ,
আমাকে ডেকেছে শৈশব থেকে।
আমি আজ ফিরে যাই
কাদামাটি খেলায়। যদি একটা
পুতুল গড়তে পারি,

মানুষ গড়তে পারি।


-----১৮ শ্রাবণ ১৪২৮
-----৪----৮---২০২১



১৮৫.
পায়রা এসে ফিরে গেছে
কাক এসেও খবর নিয়ে গেল
উঠোনে রোদ নেমেছে
বেলা হলো

এখনো ঘুমোয় ছেলে

সজনে গাছে শুঁয়োপোকা
ঝরাপাতার আবর্জনা
তুলসী তলে আম পল্লব
সিঁদুরের দাগ

এখনো ঘুমোয় ছেলে

রাস্তা চলে যায় রাস্তার দিকে
একটা ষাঁড় একা
কুকুরটা শুঁকছে ধুলোবালি
নিম গাছ থেকে পড়ছে ফল

এখনো ঘুমোয় ছেলে

বেলা হলো,আসছি বড় বউ।



১৮৬.
চৌকাঠে আলপনা
পড়ে আছে খড়ি গোলা বাটি
ছেলে ডাকছে, মা মা

কাপড় শুকোয়
বড়ি শুকোয়
আকাশ শুকোয় রোদে রোদে

কাল বৃষ্টি হয়েছিল খুব
কাদা জল খুঁটে গেল চড়ুই
সাইকেল এসে দাঁড়ালো

মুড়িওয়ালার ডাক
টগর ফুলের কানাকানি
পোকা উঠছে গাছের ডালে

দেরি হয়ে যায় ঘরে ফিরতে।


-----১৯ শ্রাবণ ১৪২৮
----৫---৮----২০২১



১৮৭.
পুকুরে ঢিল পড়তেই,
সরে গেল জল
পানা ফুলে লাগলো কাঁপন
পানকৌড়ি আমাকে দেখলো

আমি কোথায় যাবো?

পদ্মবনে মৌমাছি
পদ্মপাতা টলমল
সূর্যের সাত রঙ
পাখিদের ওড়াউড়ি

আমি কোথায় যাবো?

কেউ ডাকছে না
রাস্তায় চলাচল
অর্জুন গাছে একটা তক্ষক
শুকনোপাতার ঝর ঝর

আমি কোথায় যাবো?

এইতো আমার চরাচর।



১৮৮.
সজনে শাক আজ একটু ভাজবে
পুঁটি মাছের টক করতেও ভুলবেনা
কে আছো গো শুনছো?

শালপাতা নিয়ে আসব
ধোঁয়া ওঠা ভাতে বিউলির ভাল
ক'টা কাগজি লেবু পেড়ে দিও

আমাকে দেবার পরও যেন কিছু থাকে
হঠাৎ কুটুম এলে বেড়ে দিও ভাত
সংসারের পুণ্যি হবে


মনে রেখো কাক ও কুকুরকেও
গাছতলেও রাখবে এক পাত
পোকামাকড়ের আহার জুটবে

বাতাস আসবে একটু একটু করে।


-----২০ শ্রাবণ ১৪২৮
----৬---৮---২০২১
----নির্মল হালদার





মঙ্গলবার, ৩ আগস্ট, ২০২১

কবিতা / নির্মল হালদার

কবিতা / নির্মল হালদার



১৭০.
ধানতো হয় চালের জোগান কে দেবে?

এক মুঠি চালও ফুটতে পারে হাঁড়িতে।
আমাকে ভালোবাসতেই পারে ভাতের গন্ধ।

ভাত যে প্রতিদিনের আলো
প্রতিদিনের ছন্দ
আমার ছোট রাস্তাগুলি বড় হয়ে যায়।
আমি রাস্তার দু'ধারে লাগাই,
মানুষের চারা,যদি অনেক রাস্তা ঘুরেও
দেখতে পাই, সফল একটি মানব জন্ম।



১৭১.
যত যাই করি
মনে হয়, কিছুই তো হলো না।
এইতো ধ্বসে গেল পাহাড়----
কই, কাঁধে কি নিয়ে এসেছি আরেকটা পাহাড়?
এইতো শুকিয়ে ওঠে নদীমুখ
কই, মাথায় কি নিয়ে এসেছি আরেকটা নদী?

কেবলই হা--হুতাশ, হাহাকার

মানুষ থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়
কই, জোড়া লাগাতে পারি?
কই আর হতে পারি একটি গাছের চারা?


----১০ শ্রাবণ ১৪২৮
----২৭---৭---২০২১


১৭২.
যে কোনো ঘরেই একটা বট গাছের প্রয়োজন।
যে কোনো ঘরেই বট গাছের মতো অভিভাবক।
বটগাছ থাকলেই, সলতে পাকানোর মত
একটা মন পাবো। পিদিমের মত হৃদয়।

হৃদয় তো নীরব। শোনেনা মিছে কলরব।



-----১১ শ্রাবণ ১৪২৮
----২৮---২৮----৭----২০২১



১৭৩.
ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার পরও বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়ার পরও
রাস্তায় রাস্তায় খুঁজে বেড়াই আমারই প্রাণ-----
আমার উন্মাদ প্রাণ----মানুষের স্রোতে খুঁজেছিল নদী,
নদীর স্রোতে খুঁজেছিল মানুষ।

মানুষ আর মানুষ
ধুলাকে করে সোনা, ঘরকে করে বাহির।
মেঘে মেঘে খুঁজে বেড়ায় মৎস্যকুমারীর মুখ,
বৃষ্টির আগুন থেকে হৃদয়ের ঘ্রাণ

হে আমার উন্মাদ প্রাণ,
যেখানেই থাকো জাগো জাগো
আমার একলা ঘরের বিজন কোণে আমাকে জ্বালাও
আমাকে করো সুরের তরঙ্গ।



১২ শ্রাবণ ১৪২৮
২৯/৭/২০২১



১৭৪.
যেকোনো একটা মুখ আমারই মুখ
আমারই কৈশোর আমারই যৌবন
আমারই বিষণ্ন মুখ আমারই উজ্জ্বলতা।

আমি রেখে যাই সকল মুখের কাছে
মাছধরা মানুষের ধৈর্য ও অপেক্ষা।
আমি রেখে যাই সকল মুখের কাছে
ধান রোয়া হাতের শুশ্রূষা ও সুন্দরতা।

যেকোনো একটা মুখ চেয়ে আছে
আমারই ভাঙ্গা গড়ার দিকে।
যেকোনো একটা মুখ চেয়ে আছে
আমার পথ চলার দিকে।

সকল মুখের কাছে আমি হাত বাড়িয়ে আছি।



----১৩ শ্রাবণ ১৪২৮
----৩০----৭----২০২১



১৭৫.
বৃষ্টি শেষের হাওয়া কি খুঁজছে কাকে খুঁজছে?

উঠোনে শ্যাওলা জমেছে। পিছল হয়েছে খুব।
পা ফেলতে হবে সাবধানে।
ও হাওয়া, আমার হাত ধরো।
কুশল জেনে নাও। আজ আমরা একসঙ্গে যাবো
সূর্যের পথে

সূর্য আমার সখা, আমার প্রতিদিনের সৌন্দর্য।




১৭৬.
কাল বৃষ্টি হয়েছে খুব।
বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। ভেঙেছে মাটির ঘর।
ভেসে গেছে সবজির চারা। ভেঙ্গে গেছে
ধান ক্ষেতের আল।

এত জল এত জল
ভেসে ভেসে আসছে মাছ। মাছ ধরছেও
ছেলে ছোকরার দল।আজ
মেঘ ছেঁড়া আলো এসে আমার মুখে।

আমি রোদের মুখ খুঁজি।

রোদে রোদেই খুঁজে পাবো রৌদ্রের প্রবাহ।



-----১৪ শ্রাবণ ১৪২৮
-----৩১---৭----২০২১



১৭৭.
কী থাকবে কী থাকবেনা
আমার জানার কথা নয়, আমি দেখবো
কলসি কাঁখে চলে যায় এক রমণী।
গরুর গলায় ঘণ্টাধ্বনি।
নদী ঘাটে শুকায় ধীবরের জাল।
ঝরে পড়ছে বাবলা ফুলের হলুদ।

কী থাকবে কী থাকবেনা
আমার বলার কথা নয়, আমি দেখবো
মাথায় ঘাসের বোঝা।
ঝোপঝাড়ে প্রজাপতির পাখা।
শান্ত ধুলোবালি।
পাথর ফুঁড়ে আগাছা।

কী থাকবে কী থাকবেনা
আমার শোনার কথা নয়, আমি দেখবো
বাতাস উড়ছে বাতাসেই।
একটি শিশুর হেঁটে যাওয়া।
মেঘ নামছে মাঠে।
ছুটে আসছে একটা মোষ।

আমার নীরব চেয়ে থাকার মাঝে কাঁপছে আকাশ।



১৭৮.
চোখের জল শুকিয়ে গেলেও
অন্তরের কান্না? আমাকে জাগিয়ে আমার বুকে জেগে আছে। আর আমার বুক
সমুদ্রের চেয়ে মহৎ। কেবলই ঢেউ ওঠে
ঝিনুক ওঠে।

ঝিনুকে লুকানো মুক্তার চেয়েও অমূল্য

আমার মন।



----১৫ শ্রাবণ ১৪২৮
----১---৮---২০২১



১৭৯.
যা বলিনি কখনো বলতে চাই,
বাবার হাত ধরে ছেলে মেলায় যাচ্ছে
হইহই করছে রঙ

যা বলিনি কখনো বলতে চাই,
নাগরদোলায় হাসির হল্লা
পাঁপড় ভাজার গন্ধ

যা বলিনি কখনো বলতে চাই,
হাওয়াই লাড্ডু উড়ছে
উজ্জ্বল মুখ

যা বলিনি কখনো বলতে চাই,
শুয়ে আছে কাঠের পুতুল
শুয়ে আছে কাঠের চাকা

যা বলিনি কখনো বলতে চাই,
মেলার পিছনে স্তব্ধ এক গাছ
অন্ধকার এক গাছ

যা বলিনি কখনো বলতে চাই,
গাছ তলায় গুমরে ওঠা কান্না
মায়ের কোলে শিশু

আকাশ ভরা সূর্য তারার আদর



১৮০.
ঘুমিয়ে যাওয়ার আগে পেঁচা জ্বাললো চোখ

আর অন্ধকার নেই। কথা বলছে গাছ,
নীরব। একাকী। চাঁদ--তারা শোনে।
আমিও শুনতে শুনতে পৃথিবীকে
কাছে পাই


আমার পৃথিবী আমার প্রকৃতি

আমারই কন্যা।



----১৬ শ্রাবণ ১৪২৮
----২----৮----২০২১
----নির্মল হালদার










সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

কবিতা / নির্মল হালদার

কবিতা / নির্মল হালদার




১৬৩.
এটুকুই চাই
কখনো পায়ের দিকে চেয়ে থাকবো
কখনো শব্দের দিকে

যেখানে যা আছে থাক

ঘরের কোণে মাকড়সা
দুয়ারে সিঁদুরের দাগ
চৌকাঠে আলপনা

যেমন আছে থাক

আমি শুধু পায়ের দিকে চেয়ে থাকবো
নিত্যনতুন শব্দের দিকে
আগমনের দিকেও

আগমনেই দুলে উঠবে আম পল্লব।



১৬৪.
আষাঢ়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে
এসে পড়লো শ্রাবণ।
শ্রাবণের সঙ্গেও কথা বলতে হবে।
শুশনি শাক তুলতে হবে।

ভোর হয়েছে কবেই।

ঝিঙে ফুলের হলুদে রোদ পড়েছে।
ধান জমি থেকে আগাছা তুলছে চাষী বউ।
আমাকে যেতে হবে অনেক দূর।
স্নান করতে হবে।

আমার কোনো ছায়া পড়ে থাকবে না।


------৫ শ্রাবণ ১৪২৮
-----২২----৭----২০২১



১৬৫.
একেকটা ঋতুতে একেক রকম গন্ধ আসে।
সেই গন্ধ বিচার করার মতো
আমার ক্ষমতা নেই।
আমি শুধু বলতে পারি, সব গন্ধ ছাপিয়ে
আমার কাছে একটাই গন্ধ, মায়ের মুখের
পান দক্তার গন্ধ।

চিরদিন।



১৬৬.
আমার মায়ের কোনো ঘর ছিল না
অথবা মা নিজেই ছিল একটা ঘর।

আমার কাছে কান্নার এক ঘর

মা থাকতেও আমার মন ছিল নিরাশ্রয়।



----৬ শ্রাবণ ১৪২৮
----২৩---৭---২০২১



১৬৭.
জেঠি--খুড়ির সঙ্গে মায়ের ঝগড়া হলেও
আমার তো আর ঝগড়া ছিল না।
আমি আদর খেয়েছি জেঠি---খুড়ির কাছে।
সন্ধে হলেই গল্প পেয়েছি রাজারাজড়ার।
আর ঘুমিয়ে গেছি বুকের গন্ধে

কোলে কোলে।



১৬৮.
চুন সুপারি খয়ের আছে, দোক্তাও আছে
আর পানের বাটা থেকে উঠে আসছে,
বোঁটা লাগানো সবুজ একটি পান।

পানতো নয় যেন আমার মায়ের মুখ।

অনেক পুরনো গল্প অনেক নতুন।



-----৭ শ্রাবণ ১৪২৮
----২৪----৭----২০২১



১৬৯.
পাখি কখনো মা হয়ে কখনো প্রেমিকা হয়ে
সৌন্দর্য ছড়ায়। পাখি কখনো কেবলই দূরত্ব
সম্পর্ক থেকেও সম্পর্ক নেই।

নৈকট্য নেই।

আমার অন্তর পুড়তে পুড়তে আমি পাখি আঁকতে থাকি।
পাখির ডানাতে লাগাই আমারই তাপ।
পাখি ওড়ে। পাখির ডানায় লাগে আকাশের প্রবাহ।
আমি আর ছুঁতে পারিনা আমার পাখিকে।

দূরত্ব রচনা হয়। দূরত্ব প্রেম হয়।



-----৯ শ্রাবণ ১৪২৮
----২৬---৭---২০২১
-----নির্মল হালদার










বৃহস্পতিবার, ২২ জুলাই, ২০২১

এই আমি / নির্মল হালদার

এই আমি / নির্মল হালদার




পালকের সঙ্গে দুপুরে দেখা হলো। আজ সকালে দেখা হয়নি। আমি কোথায় ছিলাম?

পাহাড়ে যাইনি। সমুদ্রেও না। আমি কোথায় ছিলাম?

আচ্ছা আচ্ছা এবার মনে পড়লো, আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল শৈলেন কুন্ডুর। অনেকদিন বাদে দেখা। কথা ফুরোয় না। দেরিটা সেখানেই। ফলে, অযোধ্যার আঙুর বাগানে যেতে দেরি হয়ে গেল। আরও দেরি, শেয়ালের জন্য। সে যে থাকবে আমার ভাবনার বাইরে ছিল।
ভাগ্যিস ছিল, তাই টক আঙুর মিষ্টি আঙুর চিনতে পেরেছি। পালকের পছন্দের মিঠে আঙুর একটা একটা তুলে ভর্তি করেছি আমার ঝুলি।

পালককে কিছু না দিলে সারাটা দিন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। কালকে তো গেছলাম কমলালেবুর বাগানে।
কি রঙ।কি  সুগন্ধ। দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। পালকও খুশি হয়। সে যে কোনো ফল ভালোবাসে।তার জন্য কলা বনেও যাই। দেখা হয়ে যায় হাতির সঙ্গে।

আজ শৈলেন বাবুর সঙ্গে দেখা হলো কেন? তার সঙ্গে তো আমার কোনো সম্পর্কই নেই। এমনতো হতে পারে, তিনি শৈলেন বাবু ছিলেন না, ছিলেন মৃন্ময় বাবু। কিংবা  আশুতোষ বাবু। যিনি হাত দেখাতে পছন্দ করেন। হাতের রেখা চেনেন খুব বেশি করে। ভাগ্যের প্রতি অগাধ বিশ্বাস।

কিন্তু শৈলেন বাবু মৃন্ময় বাবু হতে যাবেন কেন? অথবা আশুতোষ বাবু কেন হবেন? আমার সঙ্গে শৈলেন বাবুরই দেখা হয়েছিল। এই শৈলেন বাবু কোনো ভাবেই মুখোপাধ্যায় নন। এই শৈলেন বাবু, শৈলেন কুন্ডু। আপাদমস্তক ভদ্রলোক।

কি কথা বলছিলাম, যে, আমার দেরি হয়ে গেল পালকের কাছে পৌঁছোতে? জুতোয় তো পেরেক ছিল না। পথে কোনো কষ্ট ছিল না। তবে?

রাস্তায় রাস্তায় ভিড় ছিল না। গাড়িঘোড়ার জটিলতা ছিল না। আমি তো হাঁটছিলাম। আমি সমুদ্রে গেলেও হেঁটে যাই। নিজের পায়ের শব্দ শুনতে শুনতে হেঁটে যাওয়া খুব সুখের। মনে হয়, আমার একজন সঙ্গী আছে।

শৈলেন বাবু কি বলছিলেন মনে পড়ছে না তেমন। একটাই কথা মনে পড়ছে শুধু, তিনি বলছিলেন এই শ্রাবণ মাসে  অনেকের সঙ্গে দেখা হবে। তাই তিনি বেশ আনন্দে আছেন।

আমার সঙ্গে তো কারো দেখা হয় না। একই ঘরে থেকে পালকের সঙ্গে দেখা করতেও আমার তো দুপুর হয়ে যায়।

দুপুরটা খুব খাপছাড়া। কোথাও মসৃণতা নেই। খচখচে লাগে। তখনই মনটা বেসামাল হয়ে ওঠে। মনে হয়, পালকের সঙ্গে খেলাধুলা করি।ওর কাছে নানা রকম পুতুল। দু'জনে পুতুল খেলবো।

আমরা পেয়ারা বাগানও যেতে পারি। গাছে উঠে পেয়ারা ফুল খুঁজে খুঁজে আমরা সহজেই জেনে
যাবো, ক'টা পেয়ারা হবে।

এখনো আশ্চর্য লাগছে, শৈলেন বাবু আমাকে চিনতে পেরেছেন ঠিকই কিন্তু আমার নামটা ভুলে গেছেন। আমি নীলেন্দু না নিমাই তিনি মনে করতে পারছিলেন না। আমি হাসতে হাসতে বললাম, আপনি যা ইচ্ছে নামে ডাকতে পারেন। আপনি আমাকে ভোদাই বললেও খুশি হবো।

একথা সে কথার পর আমরা চায়ের দোকানে গেলাম। আমার মন যদিও ছটফট করছিল, কখন দেখা হবে পালকের সঙ্গে।

পালকের জন্য আঙুর। পালকের জন্য পেয়ারা।পালকের জন্য কলা। 

কেবল কাছে যেতে হয়। হাত পাততে হয়।

হাতটা আমি বড়োই করেছি। আকাশের কাছে হাত পেতে পেতে হাতটা এত বড়ো হয়ে গেছে যে এখন আর কারোর কাছে হাত পাততে সমস্যা হয় না।

কখনো কখনো হাত না পেতেও বৃষ্টি পেয়েছি। বৃষ্টির রঙ বৃষ্টির আনন্দ পেয়েছি। শৈলেন বাবু জানেন না, আমি ধুলায় ধুলায় শুয়ে পড়তে পারি। শৈলেন বাবু জানেন না, আমি ভালোবাসার কাছে শতবার নত হতে পারি।

শৈলেন বাবুর সঙ্গে দেখা হলো কেন? এ প্রশ্নটাও আজ আমার মধ্যে ঘুরছে। দীপক বাবুর সঙ্গেও দেখা হতে পারতো।  যে দীপক বাবু আমাকে বলেছিলেন--------
কারো সঙ্গেই দেখা হয় না হে------কেবল দিনরাত্রির সঙ্গে দেখা হয়।

আমার সঙ্গেও শৈলেন বাবুর দেখা হয়নি। অযথা কিছু বিভ্রম আমাকে আজ পীড়িত করছে। আমি আজ  পালকের সঙ্গে কথা বলিনি একটাও।


-----৫ শ্রাবণ ১৪২৮
----২২----৭----২০২১
----নির্মল হালদার




মঙ্গলবার, ২০ জুলাই, ২০২১

কবিতা /নির্মল হালদার

কবিতা /নির্মল হালদার




১৫৩.
শাক তুলতে গিয়ে মনে হলো আমার
এও আমার দেশ। শাকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে
আমার ঘাম আমার আকাঙ্খা।

শাক তুলতে গিয়ে মনে হলো আমার
শাকের সঙ্গে কান্নাও আছে, আমি দু হাতে
নিয়ে যাচ্ছি।


১৫৪.
একটি নক্ষত্রের জন্ম হলে
আমি জন্মের কাছে যাই।


আমারই জন্মের কাছে যাই।


আকাশেও জন্ম আমার, মাটিতেও।
গাছেও জন্ম আমার, জলেও।

বাতাসেও আমার বীজ।

তুমি ধারণ করো।

একটি নক্ষত্রের জন্ম হলে
শাঁখ বাজে ঘরে ঘরে। শাঁখের ফুঁ হয়েও
আমার প্রকাশ।

আমি শব্দ আমি ধ্বনি।


-----৩০ আষাঢ়১৪২৮
----১৫----৭----২০২১



১৫৫.
সূর্য তারা এসেছে আমাদের করবে লালন

সূর্য তারার সঙ্গে জোনাকিও আছে
আমাদের করবে আলো। ডুবতে ডুবতে
পানকৌড়ি আমাকে দেখছে, আমি কেমন আছি

আমি যাই

আমার ছেঁড়া ছেঁড়া দুঃখকে ঢেকে রাখবো
শাল--শিমুলের ছায়ায়।



১৫৬.
বিরহ যদি খুদকুড়ো হয়, অভিমান তবে
ভাঙ্গা থালা। প্রেম তবে এক রাস্তা
হেঁটে যেতে হয়।

অনেক দূরের যাওয়া, যেখানে ভিখারির পাতে
রাজার আহার।


----৩১আষাঢ়১৪২৮
-----১৬----৭----২০২১


১৫৭.
বট গাছের নিকটে গিয়ে মনে পড়লো,
অশথ গাছও আছে। তার এক কোটরে
বাসা বেঁধেছে সাপ আর সাপিনী।
ওদের সংসারেও ছানাপোনা আছে, যদি
খোঁজ করো। খোঁজ করেই তো জেনেছো,

আমরা আট ভাই বোন, হরির লুটের বাতাসা কুড়াতে 
রাস্তায় এসেছি।

সম্পর্কের রাস্তায়।

রাস্তাও রক্তের সম্পর্কে আমার আত্মীয়।


৩২ আষাঢ়১৪২৮
১৭----৭----২০২১


১৫৮.
বটফল যেই মাটিতে পড়লো
আমি কুড়িয়ে নিয়েছি। আমার জন্য সে
টুকটুকে, রাঙা। অনেকদিন গাছে ছিল
এবার আমার কাছে সে, আমারই মুখে
মুখ দেখবে

ভালোবাসার অনেক মুখ

আমি বাক্স-প্যাটরা গোছালেও আমার সঙ্গে থাকবে না।



১৫৯.
যে হাত রুইছে ধান
সেই হাতের কাছে দাঁড়াবো
যদি আমাকে রোপন করে
আমিও ধান।

ধানের গৌরব।

ধানতো মান নিয়ে আসে

আর আমার জীবনে যে শুধুই অপমান।


----১ শ্রাবণ ১৪২৮
----১৮---৭----২০২১



১৬০.
আমি অর্ধেক মানুষ
একটি ফল পেয়েছি, যে ফলের ভিতরে
বীজ আছে। যে ফল সম্পূর্ণ

যে ফল স্বাধীন।

আমি তো স্বাধীনতাহীনতায় নুব্জ
হয়ে গেছি।

আমি কথাবার্তাতেও পরাধীন।



১৬১.
যে স্বরেই কথা বলো
তুমি একজন মানুষ।
বাতাসে সাঁতার কাটতেই পারো
জলে আঁক কষতেই পারো

এক পায়ে দাঁড়ালেও তুমি একজন মানুষ
তুমি তাল গাছে উঠতেই পারো অথবা
চাঁদ পাড়তে পারো
তুমি যে তোমারই ভাষায় স্বপ্ন দেখো।

স্বপ্ন দেখার অধিকারে তুমি স্বাধীন

তুমি সুন্দরও।

তোমাকে বাদ দিয়ে ফুটবে না একটি চালের দানা।


----২ শ্রাবণ ১৪২৮
----১৯----৭----২০২১



১৬২.
চলো এক গ্রামের দিকে

ধানের চারা কি বলছে শুনবো।

এতদিন তো আমরাই কথা বলে এসেছি,
দুয়ারে দুয়ারে টাঙিয়েছি,
আমাদের গৌরব গাথা। এবার না হয়
জল কাদা মাখামাখি
ধানের চারার কথা শুনবো।

গল্পে গল্পে উঠে আসবে আমার প্রাচীনা ঠাকুমা।
জ্যোৎস্না রাতে শুকাতে দিয়েছিল সেদ্ধ করা ধান।


-----৩ শ্রাবণ ১৪২৮
----২০----৭----২০২১
-----নির্মল হালদার








বৃহস্পতিবার, ১৫ জুলাই, ২০২১

কবিতা / নির্মল হালদার

কবিতা / নির্মল হালদার




১৪৩.
পথ তো নিজেই পথের শিখা
পথের দিকে আমার যাওয়া।
পায়ে পায়ে শব্দ উঠছে
আগুন জ্বলবে আরো

আগুনের দিকে আমার যাওয়া

পায়ে পায়ে শব্দ উঠছে
পায়ে পা মিলিয়ে
আগুন জ্বলবে আরো
আলো জ্বলবে আরো

আলোর দিকে আমার যাওয়া।



১৪৪.
আকাশ যখন টলমল করে
আমি তখন স্থির থাকতে মিনতি করি।
মেঘে মেঘে আকাশ যখন ছটফট করে
আমি তখন আকাশ টাঙাই আমার বুকে

বৃষ্টি হলে আমার বুকেই হোক।


----২১আষাঢ়১৪২৮
----৬----৭---২০২১


১৪৫.
ঠোঁটে ঠোঁট রেখে বলছি, 
মিথ্যে কথা বলবো না

শাদাকে শাদা বলছি
কালোকে কালো বলছি
ভালোবাসায় ওড়াচ্ছি হৃৎপিণ্ডের নিশান

সত্যি কথা বলতে কি
আমার হৃৎপিণ্ডের তাপে তৈরি করছি
আরেক উত্তাপ।


----২৩ আষাঢ়১৪২৮
----৮---৭---২০২১


১৪৬.
যা আছে 
যত টুকু আছে
এই আমার খুদকুঁড়ো
তুমি নাও।


যদি চাও
আমার ক্ষুধা তৃষ্ণা
এই নাও

আমি ভিজিয়ে দেবো আমার চোখের জলে।


----২৫ আষাঢ় ১৪২৮
-----১০--৭---২০২১


১৪৭.
শরীর?
নদীও আমার শরীর।
মন?
নদীও আমার মন।

আমারই স্রোত বয়ে চলেছে
মানুষের দিকে।
আমারই স্রোত বয়ে চলেছে
সৃজনের দিকে।

সৃজন?
আমারই শরীর থেকে।
সৃজন?
আমারই মন থেকে।

তুমি ফসল তুলবে।


----২৬আষাঢ়১৪২৮
----১১---৭---২০২১



১৪৮.
আকাশও আমার অস্তিত্ব।
আকাশ যতক্ষন আছে আমার চোখ আছে।
আমার মন আছে। আকাশকে তাই
প্রতিদিন ধুয়ে রাখি আমার কান্নায়। কান্নাকে তাই
আগলে রাখি আমারই অন্তরে।

আমার আলোয়।


----২৬আষাঢ়১৪২৮
----১১---৭---২০২১


১৪৯.
তাল গাছের পাশ দিয়ে যেতে যেতে 
মনে পড়লো, খেজুর গাছ কেমন আছে? 
আজকাল খেজুরের রসে মন আছে তো?

বনতো ফুরিয়ে যায় ক্রমশ
 হরিতকী বহেড়ার খবর পাইনা।
 মেঘ এলে ময়ূর কি নাচে?
তাল গাছের পাশ দিয়ে যেতে যেতে
তালগাছ জানালো, কোনো দিকে
কেউ ভালো নেই। আস্তে আস্তে

ছোট হয়ে যাচ্ছে তাল গাছের ছায়া।



১৫০.
আমার বুকে রামধনু

আমার বুকে রামধনুর রঙ
কাকেই বা সাজাবো?
আমার বুকে রামধনুর মালা
কাকেই বা পরাবো?

আমি রঙহীন হয়েও রঙিণ আজ
আমি সাত রঙের সমুদ্র
আমার বুকে চিহ্ন আঁকে
ময়ূরপঙ্খী নাউ


২৮আষাঢ়১৪২৮
১৩----৭----২০২১


১৫১.
শিরদাঁড়া সোজা হলেই সাহস

একবার নয় সবসময়ের জন্য
শিরদাঁড়া সোজা হলেই সাহস

একবার নয় সব সময় হাঁটবো সোজা
সহজ রাস্তায় সহজ ভাষায়

আমার ভাষাও আমার মেরুদন্ড
আমাকে করেছে টানটান, সোজা

আমি সাধাসিধে কথা বলবো

মুখ বন্ধ করবোনা।


-----২৯আষাঢ়১৪২৮
----১৪----৭----২০২১



১৫২.
নদীর চরে বকের সারি
মেঘের ছায়া
ঘাসের মুখে গরুর মুখ

এসবই আমার
এসব কিছুই নয় আমার

ধানের চারায় ফড়িঙ বসে
জমির জল হাওয়ায় কাঁপে
আলপথে পায়ের ছাপ

এসবই আমার
এসব কিছুই নয় আমার

কথা বলছে চাষার বেটা
মেঘ ডাকে আপন মনে
বাঁশবনে হাঁসের ছানা

এসবই আমার
এসব কিছুই নয় আমার

দিনরাত্রিকে আমার প্রণাম


-----২৯আষাঢ়১৪২৮
----১৪----৭----২০২১
-----নির্মল হালদার












সোমবার, ৫ জুলাই, ২০২১

কবিতা / নির্মল হালদার







কবিতা / নির্মল হালদার


১৩০.
আকাশের আর্তি : আকাশটা নেই আর।
মাটিরও আর্তি: মাটি নেই আর।
আর তুই, তুই আছিস তো? তোর বুকে
হাওয়া থাকলে, আমাকে দে।

ফুল-ফলের গর্ভে প্রবেশ চেয়েছি
যদি বাতাস থাকে। ফুল ফল তো নেই,
নেই আমার সরল শিরদাঁড়া।
কিভাবে হাঁটবো আর রাস্তা থেকে রাস্তা উধাও

আর তুই, তুই আছিস তো? 
আমার বুকে আঁচড় দে।



১৩১.
কাঁঠালের বোঁটা ছিঁড়ে গেলে
আমিও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই আমার বৃন্ত থেকে।
আমার বৃন্ত আমার প্রকৃতি। জলহাওয়ার খেলায় আমাকে খেলতে বলে। এই আষাঢ়ে
আম-কাঁঠালের সঙ্গে আমার খেলা।

রঙের খেলা। গন্ধের খেলা

ভালবাসাবাসির নিঃশ্বাসে নিজেরা হয়ে উঠছি
নিসর্গ- নির্মল।

----১৩আষাঢ়১৪২৮
-----২৮---৬----২০২১



১৩২.
নক্ষত্রের তাপ থেকে তোর উত্তাপ
আমারই নিকট আত্মীয়।
আমিও সঙ্গ নিঃসঙ্গতায় একাকী সুন্দর

আমার সৌন্দর্য রেখে যাই পথে পথে
যদি ছায়া ফেলে, পথিকের জন্য দু'দণ্ড
পথিকার জন্যেও এক আশ্রয়

আশ্রয় কি পেয়েছে মানুষ?

মানুষ তো প্রতিদিন বাস্তুচ্যুত।



১৩৩.
মানুষ অর্ধেক হয়ে আছে।

মানুষকে সম্পুর্ণ করতে পাহাড় নদী জঙ্গল চাই।

কোথায় নদী? তুমি এসো
কোথায় পাহাড়? তুমি এসো
কোথায় জঙ্গল? তুমি এসো


মানুষের খিদে-তেষ্টা সম্পূর্ণ করো

মানুষকে দাও মানুষের স্রোত
মানুষ যে অর্ধেক হয়ে আছে

মানুষের অর্ধেক কান্নায় ঢেউ ওঠে না


-----১৪আষাঢ়১৪২৮
----২৯---৬----২০২১



১৩৪.
আমার অনেক কিছুই আছে, আছে
শাল গাছের ঋজুতা
টিয়া পাখির ঠোঁটের রঙ
কাঠবিড়ালির লাফ
হাঁসের কোলাহল

আমার অনেক কিছুই আছে, আছে
তাল--খেজুরের রস
পদ্ম বনের মধু
নিমগাছের হাওয়া
পায়রার বকম বকম

আমার অনেক কিছুই নেই, নেই
পাখির পায়ের শব্দের মত
নিশ্চুপ প্রেম।



১৩৫.
যেখানে দাঁড়াবো
সেটাই যদি দেশ না হয়
আমার কোনটাই বা দেশ?
আমার কোনটাই বা মুখ?

যে কথাটা বলবো
সেটাই যদি স্বর না হয়
আমার কোনটাই বা নিজস্বতা?
আমার কোনটাই বা কথা?

যেদিকে বাড়াবো হাত
সেটাই যদি আলো না হয়
আমি কোন্ অন্ধকারে বাঁচবো?
আমি কোন্ অন্ধকারে বেঁচে আছি?


----১৫আষাঢ়১৪২৮
-----৩০---৬----২০২১


১৩৬.
পচা গলা বলে মাটিকে ছুঁড়তে পারো না।
দাঁড়িয়ে আছো মাটির উপরেই। বরং
মাটি দ্যাখে, তুমি কতটা হাঁটতে পারো
মাটির উপরে

কতটা দাঁড়াতে পারো গাছের পাশে

কবেই বা দাঁড়াবে মানুষের পাশে, এই প্রশ্নে
মাটি অস্থির। মাটি আর্তনাদও করে------
ফেটে যাওয়া মাটির ভিতরে বীজ নেই,
বিষ ঢুকছে আজ।



১৩৭.
প্রথম নিঃশ্বাস ফেলে ছিল মাটিতে?
মায়ের কোলে?
প্রথম নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পেয়েই
আমি কাছে চলে গেছি আমার প্রথম আলোর কাছে।

জন্মের কাছে।

জন্মের পর জন্ম আসে আমার জন্ম আসে
আমারই মুখের দিকে চেয়ে চন্দ্র সূর্যের কথা
রোদ-বৃষ্টির কথা

ধূলিকণায়  লেগে আছে জন্মের ঋণ


----১৬ আষাঢ়১৪২৮
-----১---৭---২০২১


১৩৮.
রাখালের মত নির্জনতা যদি চাও 
গোচারণে চলো। গাই--গরুদের ছায়ায় ছায়ায়
ঘাসও নীরব হয়ে থাকে।

নীরবতার কাছে চলো, একটি পাতা উড়ছে।
ফড়িং উড়ছে। বাতাস থেকে খুঁজছে সবাই
বাতাসের মধু

আর আমি ফড়িংয়ের পাখার তলায় খুঁজছি
আরেকটি ফড়িং। ফড়িংয়ের হাওয়া।


----১৭আষাঢ়১৪২৮
----২---৭---২০২১


১৩৯.
মাছের লাফ ছুঁতে গেছি।
পাখির ডাক ছুঁতে গেছি।
মানুষের হাসিকেও ছুঁতে গেছি বারবার
শেষে , নিজেকে ছুঁয়ে দিন রাত্রি জাগরণ

তুই আসবি।

ডুমুর পড়তে পড়তে ফেটে যায়
ছড়িয়ে পড়ে বীজ। একটি  পুরনো ডালে 
নতুন অঙ্কুর। পাতা আসবে স্পর্শ করতে।
সবুজও আসবে।

তুই--ও আসবি

আমি ছুঁতে চাইবো পায়ের শব্দ।



১৪০.
বাবলা গাছের ছায়া
শালিকের ওড়াউড়ি
মেঘের চলাচল
নদীর কাছে এসেছো যখন
যা খুশি নাও

বকের দাঁড়িয়ে থাকা
ঘাসের স্পর্শ
ভুট্টা ক্ষেতের ডাক
নদীর কাছে এসেছো যখন
যা খুশি নাও।

শুধু মুঠোভর্তি বালি নিও না
আঙুলের ফাঁকে ঝরে যাবে।
শুধু মুঠোভর্তি জল নিও না
আঙুলের ফাঁকে ঝরে যাবে।


-----১৯আষাঢ়১৪২৮
-----৪---৭---২০২১


১৪১.
আমি যে শব্দ করি
চোখের পাতা ফেলার মত
তুমি কি শুনতে পাও?

তুমি কান পেতে ছিলে
আমার কথার দিকেই
কথারা বড় কোলাহল করে

কথারা বড় কথার পিঠে জড়ায়

আমি যে শব্দ করি
আমার দৃষ্টির মতই
তুমি শুনতে পেলে না আজও

আমি আজও আমার কান্নার মতোই

নিস্তব্ধ।



১৪২.
হাত না ধরলে কি করে বুঝবো
আরেকটা হাত আছে। হাতে হাত ধরেই তো
আমাদের স্পর্শ-বিনিময়। হাত না ধরলে
কি করে বুঝবো হাতের জাদু।

হাতে হাত ধরেই তো আমাদের দৃষ্টি-বিনিময়।

হাতে হাত ধরেই তো আমাদের বেড়।

আমাদের বন্ধন।

আমাদের বন্ধন আমাদের আয়ু।


----২০ আষাঢ় ১৪২৮
----৫---৭---২০২১
----নির্মল হালদার




রবিবার, ২৭ জুন, ২০২১

কবিতা / নির্মল হালদার






কবিতা / নির্মল হালদার


১২০.
যে কোনো ফুল শব্দ করে
আমি ফুলের দিকে যাই।
যে কোনো ফুল কলরব করে
আমি কলরবে যাই।

আমি ঘরের দিকে যাই।

আমার ঘর আমারই স্বর
মাটিতে বসত করে।


১২১.
অনেক দিন আগে আমার একটা ঘর ছিল।
ঘরের দরজা জানলাও কথা বলে উঠতো।
ঘরের দেয়াল ঘরময় হেঁটে বেড়াতো,
আমারই সঙ্গে।

আমি একা হয়েও একা ছিলাম না।

সম্পূর্ণ ঘরটাই আমার সঙ্গে বেড়াতে যেতো,
শহরে গ্রামে। আমার স্পর্শে,আমার বন্ধুতায় 
সে ছিল প্রকৃত ঘর।
সে নক্ষত্র দেখেছিল।

নক্ষত্র সকলের চোখে ধরা পড়ে না

আমার ঘরের চোখ ছিল। চোখের আলোতে ছিল
একটা ঠিকানা, নক্ষত্রের বসতি।
ওরা হেঁটে বেড়ায়। শব্দ করে। ওদেরও আছে তৃষ্ণা
মাটিতে নেমে হাত রাখবে আমার কাঁধে।

অনেক দিন আগে আমার চওড়া কাঁধ ছিল

পাহাড়কে জায়গা দিয়েছি।


----৪ আষাঢ়১৪২৮
----১৯----৬----২০২১


১২২.
গাছ থেকে জাম পড়ে পড়ে চারদিক কালো।
আষাঢ়ের অন্ধকারে কালো আরো গভীর। মন টানে।
মনে হয়, এই অন্ধকার আমার পরিধেয়।

আমি আলোর দিকে যাবো।

মাটি ভক্ষণ করে ফল। বালক বালিকারাও জাম কুড়াবে।

আমিও কুড়াবো বৈকি।

সূর্যের বোঁটা ছেঁড়ার আগেই জাম--কালো অন্ধকার

আমারই।


----৫ আষাঢ়১৪২৮
----২০--৬--২০২১


১২৩.
আকাশে ছড়ানো বীজ আমারই রচনা।
কালিকলম তো ছিল না, ছিল আমার মন।
আকাশে ছড়ানো মন আমারই রচনা।

এক একটি রচনা এক একটি বিপন্নতা

কে পাঠ করবে গোপনে? প্রকাশ্য আলোয়?

পাঠক তো পাহাড়ের মত জ্যান্ত
আমাকে দেখাবে কি আমার পরাণ?



১২৪.
জাম রঙের আকাশ পাড়লে
জাম পাড়বোনা।আজ আকাশই
নুনে মাখামাখি হয়ে আমার সঙ্গী।

আমার ছোটবেলা।

আমার ছোটবেলায় তুইতো ছিলিনা
তোকে আজ ডাকছি। তুই আমার
এই আষাঢ় বেলার গোপন ইচ্ছা গুলি।


----৬ আষাঢ়১৪২৮
-----২১---৬---২০২১


১২৫.
কথা বলবে বলো
মাটি না জল, জল না মাটি
কার সঙ্গে কথা বলবে?

কথা বলবে বলো
আলো না হাওয়া, হাওয়া না আলো
কার সঙ্গে কথা বলবে?

ধুলোবালিও কথা বলে

দুঃখ এসে দাঁড়ালেও কথা বলবে
সুখ এসে দাঁড়ালেও কথা বলবে
কার সঙ্গে কথা বলবে?

মাটির তলে মাটি কথা বলে।
জলের উপর জল কথা বলে।
কার সঙ্গে কথা বলবে?

তুমি নিজেই এক ভূখণ্ড।


-----৭ আষাঢ়১৪২৮
----২২---৬---২০২১


১২৬.
ছোট রাস্তা বড় রাস্তা মানে
বড় খিদে ছোট খিদের মতই।
কখনো আলো
কখনো আগুন দেখতে পাই।

কখনো
তারার আগুনের চেয়েও তীব্র,
সৌন্দর্যমুখী----একই পঙক্তিতে 
ভোজন করি ছোট বড় সবাই



১২৭.
জল জঙ্গল জমির সমগ্রতা
মানুষের সমগ্র। মানুষের এই সম্পদের কাছে
বাতাস ছড়ায় স্বর্ণরেণু

নদী থেকে সোনা সংগ্রহ করে মানুষ
মাটি থেকে সোনা সংগ্রহ করে মানুষ
ধারাবাহিক এই জীবনের কাছে
আমিও হাতে হাত রাখি

অশেষ মানুষের স্পর্শ পাই।


-----১০আষাঢ়১৪২৮
-----২৪---৬---২০২১


১২৮.
নদীর সঙ্গে একটা মানুষ থাকলে মানিয়ে যায়।

মানুষের শ্বাস প্রশ্বাস বইবে
নদীর জলও বইবে।

সুখ দুঃখের মতো আলো অন্ধকার বইবে।

নদীর সঙ্গে একটা নৌকা থাকলে মানিয়ে যায়। কানা কড়িতে পার হয়ে যাবো

এপার থেকে ওপার।



১২৯.
আমি শুধু মানুষ দেখি
মানুষের সংখ্যা দেখিনা। আমি বাড়ি দেখলে
দেশ দেখতে চাই। দেশ বাড়ি
প্রকৃত ঠিকানা।

আমার ঠিকানা এই, দাঁড়িয়ে আছি গাছ তলায়

গাছের পাতা গুনি না।


-----১১ আষাঢ়১৪২৮
----২৫---৬---২০২১
----নির্মল হালদার






শুক্রবার, ১৮ জুন, ২০২১

কবিতা / নির্মল হালদার






কবিতা / নির্মল হালদার


১০৯.
সূর্যের প্রথম কিরণ নবজাতকের মতো
আমার কোলে এসে হেসে-কেঁদে ওঠে।
হাসি-কান্নার কোমলতায় পশুপাখির যাত্রা শুরু।
কীটপতঙ্গের যাত্রা শুরু।

খাদ্য সন্ধানে যাবে।

আমিও হাসি কান্নার আলোয় চোখ ধুই।
আমার মনের কালিমা ধুই।

আমিও সন্ধান করবো, কোথায় পড়েছে 
তোর পায়ের ছাপ।


১১০.
পাখির সুর ধরে ধরে
আমিও পাখিদের সঙ্গে
সকালবেলা।
যদি সুরের মতো আহার খুঁজে পাই

আমার মুক্তি পাই

আমার মুক্তি মানুষের কাছেও।

মানুষের হাত ধরে ধরে
আমিও মানুষের সঙ্গে
সারাদিন।
যদি মানুষের মত মানুষ খুঁজে পাই

আমার মুক্তি পাই।


-----২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
-----২৯----৬----২০২১


১১১.
সারাদিন মাটিতে দাঁড়িয়ে মাটির দিকে হাত বাড়াই

মাটি বিধ্বস্ত মাটি বিষণ্ণ
মাটি আক্রান্ত

এক বিঘা জমি কি আমার মাটি?
দু বিঘা জমি কি আমার মাটি?

শুধু পায়ের তলার মাটি আমার মাটি
আমার দেশ

একই হাঁড়িতে ফুটছি সবাই।



১১২.
আজ ফুটেছে ফুল চারদিকে---সোঁদা গন্ধ।

আবার এসেছে আষাঢ়

আবার আসবি না তুই?

বৃষ্টির ফোঁটা ধরে ধরে
আবার আসবি না তুই? তুই যে নিজেই মাটি
বৃক্ষরোপণের মত রোপন করবি আমাকে

আমার বিরহ বর্ষায়।


----৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----১৪---৬---২০২১



১১৩.
ওইখানে এক পাথর পড়ে আছে।

পাথরের কী বয়স কী নাম
আমার জানা নেই। পাথর কী বলতে চায়
আমার জানা নেই। আমি শুধু দেখছি,
ওইখানে এক পাথর পড়ে আছে। একা।

আমি পাথরের কাছে দু'দণ্ড দাঁড়াই।


১১৪.
একটা চড়ুই এসেছে।

আমার শৈশব এসেছে।

কে দেখবে আমার শৈশব?
কে আদর করবে আমার চঞ্চলতা?

একটা চড়ুই এসেছে।

আজ আর দুধ জল নেই। শুধু
মাড় পানি। আজ আর খেলা নেই। শুধু
মেঘের পরে মেঘ

আমি মেঘের ভিতরে যাই 
শৈশবের কান্না খুঁজতে।


-----৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----১৫----৬----২০২১


১১৫.
আকাশ জুড়ে আষাঢ় এসেছে।

আকাশ জুড়ে আমার আত্মীয়তা।

আকাশ জুড়ে ভিজছে আমার আত্মীয়তা
আমার মন
আমার জন্মের এই সকাল


আষাঢ়েও জন্ম আমার
শ্রাবণেও জন্মদিন।
একটি ভেজা কাকের কাছেও আমার জন্ম কথা

আকাশ জুড়ে মেঘের ডাক

আমি যাই।


----১ আষাঢ় ১৪২৮
----১৬---৬----২০২১


১১৬.
কেন যে ওইখানেই একটা গাছ
কেউ বলতে পারে না।
কেন যে গাছ তলায় উই ঢিবি
কেউ বলতে পারে না। কেবল
বাঁশ বনের পথে চলে যায় সবাই।

ধুলোমাখা শিশু হেসে উঠছে।



১১৭.
দু' পায়ে ধরা আছে একটি ডুমুর
চেয়ে আছে কাঠবিড়ালি।

কে প্রেম ডুমুর না কাঠবিড়ালি?

ডুমুর মাটিতে পড়লে কে নিয়ে যাবে?

ডুমুর ফেটে পড়লে অজস্র বীজ
অজস্র মুখের আলো

আমারই বংশের ধারা

প্রবহমান।


-----২ আষাঢ়১৪২৮
-----১৭----৬----২০২১



১১৮.
প্রজাপতির সঙ্গে রঙের বিনিময় করি

আমার গায়ের রঙ কালো

আমার মন ছিটিয়ে দিই।
আমার মন রঙে রঙে ভরপুর। উজ্জ্বল।

আমার উজ্জ্বলতা ছিটিয়ে দিই
আমার উদ্দীপনাও

যা আমি মানুষের কাছ থেকে পেয়েছি।



১১৯.
আমার বাড়ি যে সকলের বাড়ি
এ কথা বলতে দেরি হয়ে গেল।
সূর্যোদয়ের পরেই আমি যে এসেছি
এ কথা বলতেও দেরি হয়ে যায়।

সকলের মাঝে আমার ঠিকানা
কবে আর বলবো। কবে আর কাছে যাব
ওই যে পড়ে আছে ভাঙ্গা প্রদীপ
জোড়া লাগাতে হবে। জ্বালতেই হবে,

বিরহ বর্তিকা।


-----৩ আষাঢ় ১৪২৮
-----১৮/৬/২০২১
-----নির্মল হালদার







ছবি : তপন পাত্র

শনিবার, ১২ জুন, ২০২১

কবিতা / নির্মল হালদার







কবিতা / নির্মল হালদার


১০৪.
ফুলে থাকো আর ফলে থাকো
তুমি একটা বিষয়
দেশে আর দশে

ভুখে থাকো আর ভালোবাসায় থাকো
তুমি একটা বিষয়
দেশে আর দশে

তুমি একটা বিষয়
কেননা,
তুমি আলো তুমি অন্ধকার

তুমি এক স্বর

তুমিই সমাজ।


----২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----১০---৬----২০২১


১০৫.
সম্পর্কে তুই আমার পাহাড় হলে
পাহাড়ের স্তব্ধতা আমার আত্মীয়।

জলে-স্থলে আত্মীয়তা।
আত্মীয়তা এককে। সমগ্রে। অংশেও।

আমি নিকটে যাই।

নৈকট্য আমার প্রিয়।

আমি নত হয়ে কুড়াই আমার আলো।


১০৬.
আমি নিরাপদে আছি তো?
সন্দেহ করছি।
আমার নিরাপত্তা আছে তো?
সন্দেহ করছি।

ইঁটে লাথি মেরে
আমি ছুটে বেড়াই।
বুকের লোম উপড়ে
আমি ছুটে বেড়াই।

আমার সন্দেহ, আমি বেঁচে আছি তো?


----২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----১১----৬----২০২১


১০৭.
এত আলো অন্ধকার লাগছে।
কেউ কাছে থেকেও কাছে নেই।
শব্দ নেই। এত আলো
চোখে সইছে না।

নিজের হাত পা কই?

এত আলো অন্ধকার লাগছে।
একফোঁটা হাওয়া নেই।
হাওয়ার কথা নেই, অন্ধকার লাগছে

আলো জ্বালাও আলো জ্বালাও


১০৮.
হাওয়া ছুঁয়েই আছি

আমি চাই বা না চাই
হাওয়া আমাকে ছুঁয়েই আছে

যত দূরেই যাই
যত কাছেই থাকি
হাওয়া আমার সঙ্গে

কে হাওয়া?

আমার জন্মের সঙ্গে কি সম্পর্ক
আমার বিরহ ব্যথায়
কে হাওয়া?


----২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----১২---৬---২০২১
----নির্মল হালদার





কবি নির্মল হালদারের বিভিন্ন সময়ের ছবি

পড়ুন "ঘর গেরস্থের শিল্প"

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ