মুক্ত গদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মুক্ত গদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২১

পড়ার জন্য নয় মুছে ফেলার জন্য / নির্মল হালদার

পড়ার জন্য নয় মুছে ফেলার জন্য / নির্মল হালদার



------আপনার ফোন নাম্বারটা দেবেন?
------নদী পাহাড় জঙ্গল।

ঝর ঝর করে হেসে ফেলে মেঘবতী।
সে আবার বলে, দিন না ফোন নাম্বারটা।
আমি বলি, ওই তো আমার নাম্বার।
নদী পাহাড় জঙ্গল। তার আগে মাটি শব্দ টা লাগিয়ে নিও। তাহলে অবশ্যই আমাকে পাবে।
মেঘবতী বলে------আমার সঙ্গে মজা করছেন? আপনিতো ফেসবুক করেন না। কথা কিভাবে বলবো?

-----কথা বলার তো দরকার নেই।
-----আমার যে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। তখন মনে হয়, কারোর সঙ্গে কথা বলি। ইচ্ছে তো হতেই পারে, আপনার সঙ্গে কথা বলতে।
-------হ্যাঁ ইচ্ছে তো হতেই পারে।
তোমার ইচ্ছেকে সম্মান জানিয়ে বলছি-------তুমি দেখো নদী পাহাড় জঙ্গল নাম্বারটা লাগিয়ে, আমাকে পাবেই।
-----না পাবো না। কখনোই পাবো না।
নদী পাহাড় জঙ্গল কি নাম্বার হতে পারে?
আমি বললাম, হ্যাঁগো নতুন শুরু হয়েছে। আমি প্রথম এই নাম্বারটা পেয়েছি।
মেঘবতী হাসতে হাসতে আমার
নাকটা ধরে নাড়িয়ে দেয়।
আমি খানিক রোমাঞ্চিত হয়ে তাকে বলি, সম্পর্ক করতে হয় কিন্তু সম্পর্ক নিয়ে নাড়াচাড়া করতে নেই। তুমি যেখানে আছো দিব্যি আছো। আর বেশি দূর এগিয়ো না।

------নিকট ও দূরের কি আছে, শুধু কথা বলবো। যদি মনে হয়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় পড়তে আপনাকে পড়ে শোনাবো। অথবা গীতবিতান থেকে
একটা গান শোনাতে পারি।
আমার গলায় সুর নেই। আমি গীতবিতানের গান কবিতাই মনে করি।
------আর আমার যদি শুনতে ইচ্ছে না করে? তখন? ফোনের শব্দে আমার যদি ঘুম না ভাঙ্গে? তুমি তো রাগ করবে। তাই বলছি, কোনো ফোনাফুনি নয়। এই যে দেখা হলো আমাদের, এই সাক্ষাৎটাই অক্ষয় হয়ে থাকুক।
এবার মেঘবতী ছদ্ম রাগ নিয়ে বলে,
আপনি আচ্ছা মানুষ তো! একটা মেয়ে আপনার কাছে বারবার ফোন নাম্বার চাইছে, আপনি দিতে চাইছেন না।

----দিলাম তো।
-----নদী পাহাড় জঙ্গল নাম্বার হতে পারেনা।
----১ থেকে ১০০ নাম্বার হতে পারে না।
-----কী হতে পারে?
-----শুধু ভালোবাসা।
-----নিঃসঙ্গতা নাম্বার হতে পারে না?
----পারে বৈকি।
-----তবে আমার সব নাম্বার নিঃসঙ্গতা।

আমার মনে হয় মেঘবতীর নিসঙ্গতার কাছে কেউ নেই। কেবল মেঘবতীর কবিতা ও গান। মেঘবতীর আবেগ। মেঘবতীর অনুভব। উত্তেজনা।

কবিতা ও গান সব সময় নিঃসঙ্গ।

নিঃসঙ্গতার সঙ্গে নিঃসঙ্গতা।
মেঘবতী একা।

আমি একা নই।

নদী পাহাড় জঙ্গল ক্লিক করলেই
সহজেই পেয়ে যাই আমার জগৎ।
সীমাহীন প্রেমের আস্তানা।

মেঘবতীকে বললাম------মোবাইলটা ফেলে দাও। জলে।
দেখবে,
আলো হাওয়ার সমুদ্রে তুমি সাঁতরে বেড়াচ্ছো। 
এসো--------তোমার ললাটে চুম্বন আঁকি। এসো।
আমার কথা শেষ হতেই, মেঘবতী
আমাকে জড়িয়ে ধরে।

একটা মহুল গাছ চেয়ে থাকে। নীরবে।

------৬ কার্তিক ১৪২৮
-----২৪----১০----২০২১
------নির্মল হালদার






খুশিয়াল / নির্মল হালদার

খুশিয়াল / নির্মল হালদার


অনেকদিন আমার সঙ্গে আছে খুশিয়াল।জল তেষ্টা পেলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি বুঝতে পেরে এক বালতি জল তার মুখের সামনে এগিয়ে দিই। রাস্তায় থাকলে
পুকুরের খোঁজ করি।

তাকে রোজ মাঠে ছেড়ে দিয়ে আসি।
সে আপন মনে চরে বেড়ায়। ঘাস খায়। আমি কোনো কোনোদিন মাঠেই বসে থাকি। আর খুশিয়ালকে বলি, আমি না থাকলে তোর মত গাধাকে কে দেখতো রে? যেদিন আমি থাকবো না, কি করবি তুই?

কেন যে তুই আমার কাছে ধরা দিলি?
আমিও তোকে সঙ্গী পেয়ে আগুপিছু
কিছুই ভাবলাম না। তোর ভবিষ্যৎটা
ভাবা উচিত ছিল আমার।


ধোবাদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে।
তাড়িয়ে দিয়েছে তোকে। নাকি আমাকে সঙ্গ দেবার জন্যই আমার কাছে এসেছিস তুই?

আমার সঙ্গে তুই আছিস, তাই
লোকজন আমাকে বলে গাধা।
লোকজনকে আমার প্রশ্ন, মানুষ তো আমাকে সঙ্গ দিলো না সাহচর্য দিলো না, আমি তো গাধার সঙ্গে গাধা হয়েই থাকবো।


খুশিয়াল কি বোঝে কে জানে।
বেশিরভাগ সময় আমার দিকে চেয়ে চেয়ে সূর্যাস্ত দেখে।
সূর্যাস্তের করুণ আভা খুশিয়ালের চোখে পড়লে আমার মন কেমন করে।

সে সারাদিন শান্ত ও চুপচাপ।

আমাকে একটুও জ্বালাতন করে না।
আমি প্রতিদিন সময়ে সময়ে তার কাছে খাবারের জোগান দিয়ে থাকি।
আমার ভাত থেকেও তাকে একমুঠো দিই।তার পেট ভরবে না জেনেও
আমার মনে শান্তি আসে। যে 
তাকে একমুঠো খাওয়াতে
পেরেছি। ভাগ দিতে পেরেছি।

খুশিয়াল কখন যে ঘুমোয় কে জানে।
মাঝরাতে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলে, আমি বাইরের উঠোনে এসে দাঁড়াই।
দেখি,সে জেগে আছে।

জেগে জেগে সে কী তারা ভরা আকাশ দেখে? সে কী চাঁদের সঙ্গে কথা বলে?
নাকি সে আমার নিঃসঙ্গতাকে পাহারা দিয়ে থাকে? যেন আমার নিঃসঙ্গতা আমার কাছেই থাকে। কেউ যেন চুরি করে না নিয়ে যায়।

আর আমি?

খুশিয়ালের গায়ে হাত বুলিয়ে বলি,
ঘুমিয়ে পড়্। ঘুমিয়ে পড়্।
ভোরের অনেক দেরি।

আমি অনেকদিন বাঁচবোরে। তুই দুশ্চিন্তা করিস না। আমি এখনো আছি। যতদিন আছি, তোকে দেখবো।


-------৩ কার্তিক ১৪২৮
------২১-----১০-----২০২১



আনন্দ / নির্মল হালদার

আনন্দ / নির্মল হালদার


গাধাটা এসে দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে।
জানতে চাইলাম, এতদিন দেখিনি কেন? সে বললো--------কোনো কাজ নেই আজকাল আর। ধোপারাও তাড়িয়ে দিয়েছে। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে
খাবার জোগাড় করতে পারি না। কি করবো?
শেষমেশ তোমার দুয়ারে এসে দাঁড়ালাম। যদি একটু মাড়জল দাও প্রাণে বাঁচি।

আমি বললাম, চলো তোমায় নিয়ে যাচ্ছি গেরস্থের ঘর। আমার ঘরে তো
শুধু জল ছাড়া কিছু নেই।
আমার এক কথায় গাধা রাজি হয়ে গেল । মনে হয়, সে জানে আমার অবস্থা।

গেরস্থের ঘরে যেতেই, আমার সঙ্গে গাধাকে দেখে অবাক।
আসলে, লোক জানে একটা মানুষের সঙ্গে খুব জোর একটা কুকুর থাকতে পারে। গাধা যে থাকতে পারে মানুষের ভাবনার বাইরে। তো, এক মহিলা আমাকে জিজ্ঞেস করে---------গাধাকে নিয়ে এসেছি কেন? গাধাটি কি আমার পোষা ?
আমি বললাম, গাধাটি আমার বন্ধু । আমি শুধু আপনাদের কাছে এসেছি, আপনারা যদি গাধাটাকে
একটু মাড়জল দেন।
মহিলা আমাকে আবার বলেন, আমাদের ঘরেই কেন ? আরো অনেক ঘরতো আছে।

আমি বললাম, তা জানিনা। তবে একটা কথা বলতে পারি, আপনার যদি দয়া হয় দেবেন। নিরীহ প্রাণী।
ভাতের মাড় ফেলে না দিয়ে গাধাটাকেই দিন।

মহিলা বলেন, আমাদের ভাত অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। ফেলে দিয়েছি মাড়।
তুমি ভাই অন্য কোথাও দেখো।

বন্ধুকে নিয়ে আরেক পল্লিতে ঢুকে যাই। একটা ঘর না করলে আরেকটা ঘর। যেভাবেই হোক বন্ধুর মুখে খাবার দিতে হবে।

একসময়ের বোঝা টানা গাধার পিঠে
অনেক দাগ। আমি হাত বুলিয়ে   বলতে চেষ্টা করলাম--------বোঝা আমিও টানি। আমাকেও টানতে হয়।
কেউ দেখতে পায়না। তোকেও বোঝা টানতে হবে আবার। তাহলেই, আহার জুটবে। ধোপারা তোকে তাড়িয়ে দিলেও আমি তোকে তাড়িয়ে দিচ্ছিনা।
তুই আমার সঙ্গেই থাকবি। শুধু আমার সঙ্গে। এটুকুই তোর বোঝা। আমি ঠিক সময়ে তোর মুখের কাছে এনে দেবো তোর খাবার।
এখন চল্ , দেখিগে , কার ঘরে তোর জন্য খাবার পাই।

আরেক গেরস্থের ঘরে কোনো সাড়া শব্দ না করে ঢুকে পড়েছি। ঘরের সবাই আমার সঙ্গে গাধাকে দেখে রে রে করে ওঠে।
 বলে-------------পাগলটা কোত্থেকে এলো রে বাবা!
তারপরেই বলে, যা যা এখান থেকে যা
এখানে কিছু নেই।
আমি বলবার চেষ্টা করি, আমি পাগল নই। আমি শুধু বন্ধুর জন্য মাড়জল খুঁজতে এসেছি।
তারা আমার কথা কান করে না।
কেবলই বলে যায়--------যা যা এখান থেকে যা। না গেলে গরম জল  ছুঁড়বো।

আমি বাইরে চলে আসি।

বন্ধুকে বলি, একদম হতাশ হবি না।
আমি যতক্ষণ আছি, তোর মুখে খাবার দেবো।
সে আমার মুখের দিকে চেয়ে কি বুঝলো কে জানে। হঠাৎ দেখি, পিচ বাঁধানো রাস্তার পাশে গজিয়ে ওঠা
ঘাসে মুখ দিচ্ছে।
আমার মায়া হলো। মনে হলো, এক প্রাণী এসে আমার কাছে খাবার চাইলো আর আমি দিতে পারবো না!
আমি কেমন মানুষ?

আমি বন্ধুকে নিয়ে গেলাম, সবজি বাজারে। এটা সেটা সবজি ভিক্ষা চেয়ে বন্ধুর মুখের কাছে ধরি। সে মনের আনন্দে চিবোতে থাকে।  এবং চিবোতে চিবোতে সে  তার মনের কথা বলে--------সে আমার কাছেই থাকবে। আমি যেন তাকে অন্য কোথাও ছেড়ে না দিয়ে আসি।
আমি বুঝতে পেরে বন্ধুর মাথায় হাত রেখে বলি-------তোর ভয় নেই। তুই আজ থেকে আমারই বন্ধু। তুই আমার আনন্দ।

আনন্দ আমার কাছেই থাকে।

তাকে নিয়ে ঘুরতে যাই। লোকজন আমাদের দেখলেই, আমাদের ক্ষ্যাপায়। ঢিল ছুঁড়তে থাকে। 
আমি আঘাত পেলেও চেষ্টা করি, আনন্দের গায়ে যেন না লাগে।

আনন্দ আমার বন্ধু।

আনন্দের বন্ধু আমি।

দুজন দুজনের মন টেনে নিয়ে চলতে চাই।


-------১ কার্তিক ১৪২৮
------১৯----১০----২০২১
-----নির্মল হালদার



সোমবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২১

আমার মায়ের নাম মায়া







কোনো বন্ধুর লেখা অন্যদের পড়ানোর মতো আনন্দ আর কিছুতে নেই। আর, সে-লেখা যদি হয় এমন।
আসুন, আমরা সঙ্গী হই এক আশ্চর্য যাত্রাপথের।
(লেখাটির নাম আমার দেওয়া, নির্মলের অনুমতি না নিয়েই।)
.
.
আমার মায়ের নাম মায়া
.........
নির্মল হালদার
.
বাবা বিয়ে করতে যাচ্ছে।
আমার বাবা বিয়ে করতে যাচ্ছে।
কোনো গাড়ি নেই। গাড়ি বলতে বাস-ট্যাক্সি নেই।
বর যাচ্ছে গোরুর গাড়িতে।
বরের সঙ্গে একজন মুরুব্বি।
তিনি শুধু হুঁকো টেনে চলেছেন।
বর নাকের কাছে হাত রেখে হাওয়া করছে। হুঁকোর গন্ধ তার সয়না।
পুরুলিয়া থেকে মানবাজার অনেকটা রাস্তা। কাঁচা রাস্তা। এবড়োখেবড়ো। উঁচু-নিচু।
ঢিকির ঢিকির গোরুর গাড়ি চলেছে।
বেলা বারোটায় শুরু হয়েছে যাত্রা। এখন, বেলা পড়ে আসছে। গাছপালায় আলো-আঁধারের শেষ খেলা। আর বর চলেছে নতুন জীবনের দিকে।
শেয়াল ডেকে উঠলো।
আরেকটা গোরুর গাড়িতে আছে আমার দাদু শিবপ্রসাদ হালদার। সে বলছে, ভয় নেই রে, ভয় নেই। এ বরং শুভযাত্রা।
আমিও তো আছি গোরুর গাড়িতে। আমি বললাম-- শেয়ালের অভিনন্দনবার্তা।
আমাকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না। এমন ভাবে লুকিয়ে আছি, আমার নিশ্বাসের শব্দ কেউ টের পায় না। আমি মজা করে, কয়েকবার বাবার পিঠে চিমটি কেটে দিই।
পিছন ফিরে দেখে, কেউ নেই।
কয়েকবারের পর বাবাকে বলতেই হলো-- পিঠে চিমটি কাটছে কে রে বাবা!
মুরুব্বি বলেন-- কে আবার, মশা।
আমি চুপিচুপি হাসি।
বাবার খিদে পায়। মুরুব্বিকে বলে। তিনি জানান, খাবি কী রে বাবা! আজ তো বিয়ের পরে খাওয়া। বাবাজি, আপাতত খিদে চেপে রাখো।
-- জল তো খেতে পাবো।
কিন্তু কোথায় জল?
মুরুব্বি হাঁক দেন-- 'ও খুড়া, বজেনের জলতেষ্টা পেয়েছে। কী করবো?'
আমার দাদু আরেক গাড়ি থেকে জানায়-- বাঁধ দেখলে দাঁড়াবি-ই-ই।
বাবার কপালে ঘাম।
আমি মুছিয়ে দিলাম, নিঃশব্দে। বাবা চারদিকে তাকিয়ে দেখে, কোথায় হাওয়া, কী হাওয়া।
যেটুকু হাওয়া বইছে, ঘাম মুছতে পারে না।
বাবা কী করে জানবে। আমার ছোট দুটো হাত, মুছে দিয়েছে বাবার ক্লান্তি।
বাবার মুখ শুকনো।
বাবার পরনে হাঁটুঅব্দি একটা ধুতি। একটা সাদা পাঞ্জাবি। বাবার পাশেই নামানো আছে টোপর।
সেও কখনো কখনো গরুর গাড়ির দুলুনিতে দুলে উঠছে। নাকি নেচে উঠছে খুশিতে?
গাড়ি দাঁড়িয়ে গেছে।
দুটো গাড়ি থেকেই সবাই নামলো। রাস্তার ধারে একটা পুকুর। অন্ধকার জল।
বরযাত্রীদের কে একজন বললো-- আগে হ্যাজাকটা জ্বালতে দাও, তারপর জলে নামবে।
আমিও নেমেছি। বাবার পিছনে পিছনে। বলা যায়, বাবার পাঞ্জাবি ধরে ধরে নেমেছি।
আমারও তেষ্টা পেয়েছে।
বাবার একবার মনে হলো, কেউ বোধহয় পিছন দিকে টানছে। পিছন ফিরে দেখে, কেউ নেই।
বাবা কোনো কথাও বলছে না। মুরুব্বি দাদুকে বলেন-- হ্যাঁগো খুড়া, তোমার ছেলে যে কোনো কথাই বলছে না। বরযাত্রীদের কে একজন বললো, নতুন বৌয়ের স্বপ্ন দেখছে। ওকে দেখতে দাও।
কী স্বপ্ন?
আমি জানতাম।
আমি জানতাম, স্বপ্ন নয়। বাবার মাথায় ঘুরছিল এক ভাবনা।
বিয়ে তো করছি, সংসার চালাতে পারবো? লোকের দোকানে চাল মেপে যেটুকু রোজকার, সংসার চলবে?
চলবে চলবে... পেঁচা ডেকে উঠলো। গাছে গাছে রাতের পাখিরা ডানা ঝাপটায়। জোনাকিরা উড়ে উড়ে বাবাকে শুভ বার্তা জানায়। প্রতিটি রাস্তায় ঝিঁঝিঁপোকার ডাক, আজ যেন প্রকৃতির শঙ্খধ্বনি।
আমার বাবা বিয়ে করতে যাচ্ছে।
আর কত দূর?
কত দূর?
এইতো এসে গেলাম, এসে গেলাম...।
দুটো গাড়ি আবার দাঁড়িয়ে যায়। বর ও বরযাত্রীরা নেমে পড়ে। দাদুর নির্দেশ, সবাই চিঁড়ে ভিজিয়ে খাবে। বিয়ে তো শেষ রাতে। আর কনের ঘর কি দেবে না দেবে, দাদু কিছুই জানে না।
চিঁড়ের সঙ্গে মিঠাই ছিল, আমিও পেয়েছি। লুকিয়ে লুকিয়ে।
আমার খিদের কথা কেউ জানে না। আরও কত খিদে, কেউ জানে না।
রাত হয়ে গেল মানবাজার পৌঁছোতে। কুণ্ডুঘরে বেজে উঠলো শাঁখ।
এয়োতিরা পিতল কলসির জল গোরুর গাড়ির চাকায় ঢালে। সবাই বরের মুখ দেখে বলে-- কী সুন্দর মুখ গো! আমাদের মেয়েটা সুখ পাবে গো সুখ পাবে।
বাবার মুখ নীচু।
মুরুব্বি পরিয়ে দেন টোপর।
আমার দিদিমা বাবাকে বরণ করে। মিষ্টিমুখ করায়।
আর আমি দিদিমার খুঁটে-বাঁধা পান খুলে ফেলে দিই।
বাজনা বাজছে।
আমার মামাবাড়িতে দুর্গা মন্দির আছে। দাদু বাবাকে বললো-- যা মন্দিরে গিয়ে প্রণাম কর।
সেই ফাঁকে আমি চলে গেছি মায়ের কাছে। মা বসে আছে সেজেগুজে।
মা না, এক বালিকা।
বারো বছর বয়স।
লাল রঙা এক ফিনফিনে শাড়িতে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে মা।
ভয় মেশানো মুখ। মা ভাবছিল-- কোথায় যাবে, কী করবে, কাদের পাবে শ্বশুরবাড়িতে। শেষ হয়ে গেল খেলনাবাটি খেলা। এক্কাদোক্কা। লুকোচুরি। পুকুরে সাঁতার। দুর্গা মন্দিরে খড়ের কাঠামোর পিছনে লুকিয়ে থাকার মজা, শেষ হলো।
ছল ছল করছে মায়ের মুখ।
তখনই আমি ঝপাং করে মায়ের কোলে। মা ভয়ে চেঁচিয়ে ওঠে আমাকে দেখে। বলে-- 'তুই এখুনি এলি! তোর তো অনেক দেরি আছে। এখন যা, পালিয়ে যা! যেন কেউ দেখতে না পায়। তোর বাবা দেখতে পায়নি তো?'
বলে-- 'তোর আসতে দেরি আছে সোনা... তুই যা।'
-- আচ্ছা, যাবো যাবো। তার আগে আমাকে একটা হামি দাও। আর বলো, তোমার নামটা কী?
-- তুই তো জানিস...
-- তোমার মুখে শুনতে চাই।
-- আমার... আমার নাম মায়া।

(১৭-১০-১৯)


একরাম আলি র দেওয়াল থেকে 🙏







শনিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১

হোয়াটসঅ্যাপ / নির্মল হালদার

হোয়াটসঅ্যাপ / নির্মল হালদার




আমি কি মহিলার কাছে জানতে চাইবো, আপনি কী ফুল পছন্দ করেন? আমি কি জানতে চাইবো,
কী রঙ আপনার প্রিয়?

না না,কোনো কিছুই জানতে চাইবো না। চুপচাপ থাকাই সহজ উপায়। ঘনিষ্ঠ হলেই যত বিপদ।

মহিলা আমার কাছে আমার ফোন নাম্বার চেয়েছিলেন------আমাকে ফোন করবেন। আমি ফোন নাম্বার দিইনি। যদি মহিলার কাছাকাছি চলে আসি, ঝামেলায় পড়তে পারি। জটিলতায় পড়তে পারি। এই ভয়ে 
আমি মহিলার নাম জানতে চাইনি।
শুধুমাত্র হোয়াটসঅ্যাপে সুপ্রভাত শুভ রাত্রি। এর বাইরে যেতে চাই না। খামোকা বিপদ ডেকে আনার দরকার কি? মহিলা যেখানে আছে থাক। আমিও যেখানে আছি থাকবো। বেশি দূর এগিয়ে যাওয়া ঠিক কাজ হবে না।

মহিলা আমাকে মাঝে মাঝেই রবীন্দ্র নাথের গান পাঠিয়ে থাকেন। আমি শুধু পরিবর্তে ধন্যবাদ পাঠাই। বেশি কথা বললে যদি জড়িয়ে পড়ি, যদি
কাছাকাছি চলে আসি, আমার খুব ভয় করে।

আমার স্ত্রী ছাড়া আমার জীবনে ঘনিষ্ঠ
কোনো মহিলা নেই। মা ছিল একসময়। গত হয়েছে অনেককাল আগে। তা বাদে পাড়া-প্রতিবেশী মহিলাদের সঙ্গে আমি তেমন কথাই বলি না।
আমার কেবলই ভয় করে। পাছে
কারো সঙ্গে জড়িয়ে--মড়িয়ে উঠি।
কী হবে তখন?
আমার দুটি ছেলে মেয়ে। তারা স্কুলে যায়। তারা আমার কাছে ছুটে আসে
বাবা বাবা করে। তাদের আমি কোনো
কারণে উপেক্ষা করতে পারবো না।

মহিলা একদিন হোয়াটসঅ্যাপে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কটার সময় ঘুম থেকে উঠি। কটার সময় ঘুমোতে যাই।
আমি উত্তর দিলাম না। উত্তর দিলে
যদি নৈকট্য বাড়ে? যদি কাছাকাছি চলে আসি?
এই কাছাকাছিকে আমি খুব ডরাই।

একদিন ভাবছিলাম, হোয়াটসঅ্যাপে
সুপ্রভাত জানাবো না। শুভরাত্রি
জানাবো না। কী দরকার? সম্পর্ক বজায় রাখা, কী দরকার? সম্পর্ক মানেই তো ভালোবাসা। সম্পর্ক মানেই তো সহানুভূতি। সম্পর্ক মানেই তো আদান-প্রদান।

কী দরকার?

মহিলা দূরে আছে দূরে থাকুক।

তিনি যতই লিখুন, আজকের দিনটা খুব ব্যস্ততায় কাটলো। অথবা তিনি যতই লিখুন, আমার মন খারাপ করছে।
আমি উত্তর করবো না। কথা বাড়তে বাড়তে অনেক কথা। বেড়ে যাবে স্বাভাবিক নিয়মে। আমি কোনো দিক থেকেই এগিয়ে যাব না।

আমি যেমন দশটা পাঁচটা অফিস করি, আমি যেমন স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে নিয়ে সংসার করি, করে যাব। নতুন কোনো সম্পর্কে নিজেকে জড়াবো না আর।

মহিলার কি উদ্দেশ্য আমিতো জানিনা। মহিলা কি চাইছে আমার জানা নেই। এমনকি মহিলাকে এখনো দেখিনি আমি। হঠাৎ যদি আজ বাদ
কাল দেখতে ইচ্ছে করে ?

না বাবা দেখা দেখিতে আমি নেই।
যদি নতুন করে আমার গাছে মুকুল আসে? সেই আতঙ্কে আমি কাছে যেতে নারাজ। যদি কাছে যাই যদি
এক কাপ চা এগিয়ে দেয়? তাহলেই তো হয়ে গেল।
না বাবা, আমি ওসবে নেই। একদম নেই।
আমার স্ত্রী আমার মাটি ও আকাশ।
আমি দুবেলা মাটির দিকে তাকাই।
আকাশের দিকে তাকাই। এই আমার সুখ। অন্য কোনো অসুখ নিয়ে আমি বাঁচতে পারবো না। এবং আমার স্ত্রী
আমার সন্তানদের মা। আমি তাকে
অগ্রাহ্য করতে পারি না।

আমি তাই মহিলার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার উড়িয়ে দেবো। কি করে যে আমার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার পেয়েছেন আমি জানি না। তিনি তাই প্রথম থেকে নিজেই এগিয়ে এসেছেন। এক্ষেত্রে আমার কোনো দোষ নেই।

আমি ছাপোষা মানুষ। আমি একজন
হরিপদ কেরানি। আমার কোনো বিষয়ে কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। উচ্চাশা নেই। লোভ নেই। ছেলে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে জীবনের বাকি দিনগুলো কাটিয়ে দেবো-------এরকমই মনের সাধ।

মহিলা দূরে আছেন দূরেই থাকুন।
তাকে কোনোদিন বলবো না, আমি র চা পছন্দ করি। আমি চারবার চা খাই।
চা আমাকে এনার্জি দেয়।
তাকে কোনোদিন বলবো না, চুনো মাছ আমার পছন্দের তালিকায়। বলতে গেলেই তো, ছোঁয়া ছুঁয়ির জায়গায় চলে আসতে পারি।
বাবারে, আমি মরে যাব।  
তিনি তার মত একা একা জীবন যাপন করছেন, করুন। আমি আমার মতো যাপন করছি জীবন, এইতো বেশ।

মহিলার কত বয়স আমার জানার আগ্রহ নেই। মহিলা চাকরি করেন, নাকি শুধু ঘরকন্না করেন, আমার জানার আগ্রহ নেই।
তবে জেনে ফেলেছি, মহিলা বিধবা।

এক্কেবারে একা থাকেন।

তার নিসঙ্গতার কাছে আমি পৌঁছোতে চাই না।

-------১৮ ভাদ্র ১৪২৮
------৪----৯----২০২১
------নির্মল হালদার








শুক্রবার, ২৭ আগস্ট, ২০২১

আমবাগান / নির্মল হালদার

আমবাগান / নির্মল হালদার



আমবাগানে মালি আছে। তার ইয়া গোঁফ, দেখলেই সবাই ভয় পেয়ে পালায়। এই কারণে আম চুরি হয় না।

আমের যা রঙ যা সুবাস দেখলেই লোভ হয়। আমের যা গড়ন দেখলেই কাছে যেতে ইচ্ছে করে।

মালির ভয়ে বাগানের ধারে কাছে কেউ যেতে পারে না। একবার এক বালক ধরা পড়তে বেঁধে রেখেছিল মালি। বালকের বাবা এসে ক্ষমা চাওয়ার পর বালককে ছাড়া হয়েছিল। সেই থেকে বালকের দলের মালির উপরে খুব রাগ।

আম বাগানের পাশেই বড় একটা মাঠ। ফুটবল হয়। ক্রিকেট হয়। অন্যান্য খেলাধুলাও হয়ে থাকে।
বালকরা এই মাঠেই খেলতে আসে।

খেলতে খেলতে বল গিয়ে পড়ে আমবাগানে।বালকদের ক্যাপ্টেন ঠিক করে দেয়, কে যাবে বল কুড়াতে। দুইদলের ২২টা ছেলে ২২বার বল কুড়াতে যাবে। কারণ একটাই, ২২টা ছেলেই আম পকেটে করে নিয়ে আসবে। মালি টের পাবে না।

বালকরা ইচ্ছে করেই খেলতে খেলতে বল পাঠায় আমবাগানে। আর বল খুঁজতে গেলে মালি কিছু বলতে পারেনা। এদিকে ভেতরে ভেতরে লুকিয়ে একটা দুটো আম বালক পকেটে ঢুকিয়ে নেয়।

গাছে কম পড়ে না আম। মালি বোঝে না বলেই, সে স্বার্থপর । সে ছোটদের ভালবাসে না। সে একদিন  ধরে ফেলেছে এক বালককে। বালক মালির হাত কামড়ে, দে ছুট। একেবারে মাঠের দিকে।

মালি বলে, তোদের চালাকি বুঝতে পেরেছি। দাঁড়া, কি করছি আমি দেখতে পাবি। বালকের দল হাসে।

এবার বাগানে বল পড়লেই, মালি ফুটো করে দেয় বল। বল খুঁজতে এসে বালক হতাশ হয়ে পড়ে। তখন আর আম চুরির ইচ্ছে মনে জাগে না। দলের ক্যাপ্টেন বুদ্ধি করলো, বাগানে বল পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে একজন নয় দুজনকে ছুটে যেতে হবে। মালি যেন সুযোগ না পায় বল ফুটো করে দেবার। একজন বল খুঁজলে আরেকজন লক্ষ্য করবে মালি কোথায় কি করছে।

মালি বালকদের সঙ্গে পেরে ওঠে না। বালকদের পকেটে আম আসতেই থাকে। খেলা শেষে মহানন্দে তারা আম খায়। আমের আঁঠি চুষতে থাকে। এবং সেই আঁঠি বালকরা ছুঁড়ে দেয় বাগানেই। ক্যাপ্টেন বলেছে, আঁঠি থেকে আবার গাছ হবে। তাই, আঁঠি নষ্ট করো না।

মালির নাতি আস্তে আস্তে বড় হয়ে উঠছে। সে ঘর থেকে দেখতে পায় মাঠের খেলা। তার মনে সাধ হয়,
সেও খেলবে। নাতি দাদুর কাছে আবদার করে, তাকে মাঠে নিয়ে যেতে হবে। সে খেলবে সবার সঙ্গে।

মালি দাদু খেলার সময় মাঠে গিয়ে ক্যাপ্টেনকে বলে-------তার নাতিকে খেলাও। ক্যাপ্টেন জানায়
নিশ্চয়ই খেলাবো। তবে আমাদের দিতে হবে আম। মালি রাজি হয়ে যায়। কেন না, মালির নাতি একটাই।

মালি যখন নাতিকে মাঠে নিয়ে যায় খেলাতে তখন সঙ্গে নিয়ে যায় আম। সবার হাতে হাতে আম দিয়ে মালি নিজেও খেলা দেখে।

দেখতে থাকে, তার একটা নাতি নয় তার অনেক নাতি। অনেক মুখ। অনেক আলো ছুটছে।


------১০ ভাদ্র ১৪২৮
-----২৭----৮----২০২১
-----নির্মল হালদার







উল্কা / নির্মল হালদার

উল্কা / নির্মল হালদার




মেয়েটি একা একা হাঁটছে।

ভাবছিলাম, সামনে বা পিছনে কেউ আছে। অথবা আড়ালে আছে কোন এক কারণে।

অনেকক্ষণ আমিও ঘোরাঘুরি করছি, কাউকে দেখছি না।
মেয়েটি একা একাই ঘুরছে।
এই নির্জনে।

মেয়েটির সঙ্গে আমার আলাপ হচ্ছে না। জানতে পারছি না তার নাম। আমি মনে মনে তাই, নামকরণ করে ফেললাম, উল্কা।

এখানে নদী নেই পাহাড় নেই।

উল্কা কার সঙ্গে কথা বলছে?

কয়েকটা গাছপালা আর একটি জলাধার। এদের সঙ্গে কথা বলা যায়?

আমার ইচ্ছে করছে উল্কার
কাছে যাই। কথা বলি।

এইতো এইতো আপনি-----

----আপনার পরিচয়?
----আমি বৃক্ষ। বন্ধুরা মজা করে বলে, আমি ভিক্ষুক।
আপনি যে কোন নামে ডাকতে পারেন।
----আমি বৃক্ষ বলব। ভারী সুন্দর নাম। শব্দটা উচ্চারণ করলেই, গাছপালার নিবিড়তা। বন্ধুত্ব। ভালোবাসা।

----আপনি একা একা ঘুরছেন সঙ্গে কেউ নেই?
-----আমি একা ঘুরতে ভালোবাসি। আর শুনুন, আপনি আমাকে তুমি করে বললেই ভালো লাগবে।

----আচ্ছা আচ্ছা।
তোমার বাড়ি?

-----এটা জানা কি খুব জরুরী?

-----না জরুরী নয়। তবু তো আমরা একটা ঠিকানা চাই।

-----ঠিকানা?
আমি যে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, এই তো একটা বড় ঠিকানা।

-----তুমি সুন্দর সুন্দর কথা বলো দেখছি।

-----নির্জনের কাছে এলে
কথারা সুন্দর হয়ে যায়।
------মানুষও সুন্দর হয়।
-----সবাই হয় কি?
------সেভাবে সমীক্ষা করে দেখা হয়নি কোনদিন।
-----তর্ক বাদ দিলেই ভালো. এই নির্জনতা তর্কের রব পছন্দ করেনা।
-----তোমাকে নিশ্চয়ই করে।
----আমি দেবদ্যুতি নই। আমি সামান্য একজন মানুষ। আমাকে বড় করে দেখবেন না।
-----তোমার অন্তরের সৌন্দর্য
তোমাকে বড় করে দেখাচ্ছে।
আমি কি করতে পারি।

-----মনে হচ্ছে, আপনিও অন্তর থেকে একজন বড় মাপের মানুষ।
----না না একদম না।
আমার কোন অস্তিত্ব নেই কোথাও। অস্তিত্ব নিয়ে থাকলে
নিজের মধ্যে অনেক টানাপোড়েন চলে। কে মূল্য দিলো কে মূল্য দিলোনা , সব সময় হিসেবে থাকতে হয়।
হিসেব কি সবাইকে মানায়?

---এই কথাটা অমূল্য।
অস্তিত্বের যা জটিলতা তা নিয়ে চিন্তা করা উচিত নয়। বরং প্রকৃতির অস্তিত্বকে নিয়ে
আমরা চিন্তাভাবনা করবো।
কিভাবে প্রকৃতিকে রক্ষা করা যায়।

একি, উল্কা দাঁড়িয়ে পড়লো কেন? হঠাৎ তার মুখ থমথম করছে। কি হলো?

আমি বিচলিত হয়ে মুখোমুখি হই। প্রশ্ন করি, কি হল তোমার? শরীর খারাপ লাগছে না তো?
উল্কা চুপ করে আছে। আমিও
নীরব থাকি।

কিছুক্ষণ পর সে বলে ওঠে, চলুন একটা চায়ের দোকান খুঁজি।

খুঁজতে খুঁজতে এই কথা সেই কথা। এলোমেলো কথারাও আমাদের চারপাশে ঘুরতে থাকে।
দোকান খুঁজে না পেয়ে উল্কা বসে পড়ে একটা পাথরে। সঙ্গে আমিও।

তারপর, রোদ পড়তে থাকে।
হেমন্তের হাওয়ায় শিরশিরানি।
ঠান্ডা। রং পাল্টে যাচ্ছে আকাশের। হঠাৎ উল্কা
আমার পিছনে এসে কাঁধে
মুখ রাখে।

সে কাঁদছে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।
তার চোখের জল আমার কাঁধ 
বহন করতে পারবেতো?



----১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
----২৬---১১---২০২০
------নির্মল হালদার






ছবি : সন্দীপ কুমার

মঙ্গলবার, ২৪ আগস্ট, ২০২১

আমার বয়স মাত্র ১৮ দিন / নির্মল হালদার

আমার বয়স মাত্র ১৮ দিন / নির্মল হালদার




আমি জন্ম থেকেই শুধু কাঁদি। মা বলে, কী খাবি রে?কী খাবি? আমার বুকে দুধ নেই। সে কথা আমি শুনবো না। আমিতো কাঁদবোই। কাঁদতে কাঁদতে একসময় ঘুমিয়ে পড়বো। খিদে নিয়েই ঘুমিয়ে পড়বো। মা বাবাকে বলে, হ্যাঁগো দুধের বদলে অন্য কিছু পাওয়া যায় না? ছেলেটাকে দিতাম। বাবা বাজার থেকে এনে দেয় হরলিক্স।

হরলিক্স দুধের বিকল্প নয়। আমি খেলেও আমার পেট ভরে না। আমি কেঁদে উঠি। মায়ের মন বুঝতে পারে। কিন্তু মা করবে কি! আমার হাতে ধরিয়ে দেয় চুষিকাঠি। আমার ছোট আঙুলে কচি আঙুলে আমি ধরতে পারি না। ধরতে পারি শুধু মায়ের বুক। আমার একমাত্র পৃথিবী। সেও তো ধরতে পারি না। মায়ের বুকে দুধ নেই। আমি কাঁদি।

বাবা এসে আমাকে কোলে নেয়। আমি ভুলি না।দিদিরা এসে আমাকে কোলে নেয়। আমার কান্না থামে না।

আমি জন্মেই জেনে গেছি, মায়ের দুধের বিকল্প নেই। তাই সব সময় আমার কান্না। মা বিরক্ত হয়ে নিজেও কেঁদে ওঠে। বলে------কী কপাল করেছিসরে তুই? শেষ বেলায় আমাকেও কাঁদাতে এলি? মায়ের বেদনা দেখে আমি আরো কাঁদতে থাকি। মা ভাবে, আমার খিদে পেয়েছে। আমাকে কোলে নেয়।পিঠ চাপড়ায়।আমার মুখে পুরে দেয় শুকনো স্তন। আমি খানিক শান্তি পাই। মনে হয়, এইতো পেয়ে গেছি, আমার মায়ের পৃথিবী। আমার পৃথিবী।

আমাকে কোলে নিয়েই মা ঘরের কাজকর্ম করতে থাকে। আমি থেকে থেকে কেঁদে উঠছি। আমার জেঠি আমাকে কোলে তুলে নেয়। আমার পিসি আমাকে কোলে তুলে নেয়।

দুধের অভাব কি কোল মেটাতে পারে? আর আমার যে কিছু নেই দুধ ছাড়া। আমার যে কিছু নেই মা ছাড়া।

আমি কারোর কোলে উঠেও ঘুমোতে পারি না। আমার খিদে পায়। আমি জন্মেই আকাশটাকে দেখতে পেয়েছি। মনে হচ্ছে, আমার দুই হাতে খামচে টেনে নামাই। মনে হচ্ছে, আকাশটাকে কামড়াই।

মায়ের দুঃখ-বেদনার দিকে আর তাকাতে পারি না।

আমার বয়স মাত্র ১৮ দিন।



-----৭ ভাদ্র ১৪২৮
----২৪----৮----২০২১
-----নির্মল হালদার



শুক্রবার, ২০ আগস্ট, ২০২১

পাতা ও পাখি / নির্মল হালদার

পাতা ও পাখি / নির্মল হালদার




বালক-বালিকার দল খেলা করছে। তাদের মাঝে এসে পড়েছে এক যুবক। রঞ্জন।

খেলার মাঠ যেমন বড় তেমনি মাঠে আছে অসংখ্য ফুল ফলের গাছ। মাঠের ধারে ধারে। মাঠের আকর্ষণ তাই সকলের কাছে। সকাল-বিকেল অনেক মানুষই বেড়াতে আসে এখানে। মনোরম হাওয়া। অনেক পাখ-পাখালি। নানা সুর।

এখানে রঞ্জন পাখিদের সুর তুলতেই আসে। প্রায় দিন। কখনো কখনো তার টিউশনের ছাত্র-ছাত্রীদের মাঠে নিয়ে আসে। পাখিদের সুর শুনিয়ে পাখিদের ডাকে। রঞ্জনকে অনুসরণ করে তার ছাত্র-ছাত্রীরাও। রঞ্জন বলে, পাখিদের সুর গলায় তুলতে পারলে গলা কখনোই খারাপ হবে না। নষ্ট হবে না। যে যতটুকু পারবে পাখিদের সুর তুলে নাও।

বালক-বালিকারা খেলতে এসে খেলা বন্ধ করে দেয়। তারা শোনে রঞ্জন কি চমৎকার পাখির সুরে সুর মেলাচ্ছে।

বালক বালিকাদের মধ্যে একজন রঞ্জনকে বলে, আমাকে শিখিয়ে দেবে। রঞ্জন উত্তর দেয়, হ্যাঁ শিখিয়ে দিতে পারি, যদি একটা গাছের কত পাতা আছে গুনতে পারিস? বালকটি বলে, আমি পারবো আমি পারবো--------।

বালক জাম গাছে উঠে পড়ে। সে জানে এখন গাছে অনেক ফল। ফল খেতে খেতে পাতা গুনে ফেলবে সে।
অসংখ্য জাম খেয়ে ফেলার পরও বালক গাছের পাতা গুনে ফেলতে পারলো না। রঞ্জন ও তার ছাত্র ছাত্রীরা হেসে উঠলো। রঞ্জন জানে, এই কাজটি কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। সে বালককে বলে, এখন যা তোকে অন্য দিন পাখির সুর শুনিয়ে দেবো। অথবা পাখিকে ডেকে দেবো তোর কাছে। পাখি শোনাবে তার সুর।

এবার রঞ্জন এক বালিকাকে ডেকে বলে, তুই গাছের পাতা গুনতে পারবি? যদি পারিস তোকে ছবি আঁকার জন্য রংপেন্সিল দেবো। বালিকা রাজি হয়ে শাল গাছে ওঠার চেষ্টা করে। পারে না। আরেক বালক এসে জাম গাছে উঠবো বলে। রঞ্জন "না" করে না। বালক জানে গাছের পাতা গুনতে পারবে না। তবে জাম খেয়ে নেমে আসতে পারবে। বালকের এই চালাকি ধরতে পারেনা রঞ্জন। সে বালকের গাছে ওঠার দিকে চেয়ে থাকে। বালক গাছের মাঝ বরাবর গিয়ে একটা ডালে বসে পড়ে। আর জাম তুলে তুলে ফেলতে থাকে মুখে।
নিচ থেকে রঞ্জন দেখতে পায়। কিন্তু কিছু বলে না। ছোট ছেলে খাচ্ছে খেয়ে যাক। তো সেই ছোট ছেলে রঞ্জন কে উপর থেকে বলে, স্যার স্যার---সাতশো এগারোটা পাতা আছে।

রঞ্জন হেসে ফেলে। কারণ, সে জানে গাছের পাতা গোনা যায়না। বালকের কথা মিথ্যে কথা। রঞ্জন কিছু মনে করে না। সে বালককে নিচে নামতে বলে। আর বলে, তুই বলতেই পারতিস, তোর জাম খাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে। শোন্ একটা কথা, আমিও গাছের পাতা গুনতে পারবোনা। তবে তোদের দিতে পারবো একটা করে চকলেট। এখানে সবাইকে ডাক-----।

বালক-বালিকারা এক জায়গায় জড়ো হলে রঞ্জন তাদের বলে, একটা দিন আমরা গুনবো মাঠে কটা গাছ আছে। কী কী গাছ আছে। আমার মনে হয়, এই কাজটা আমাদের পক্ষে সম্ভব। ঠিক তো?

যেদিন এই কাজটা করবো, সেদিন ডাকবো অনেক পাখিকে। তোদের গলার স্বরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবো পাখিদের।

আজ সন্ধ্যে হয়ে আসছে সবাই বাড়ি যাও।


----৩ ভাদ্র ১৪২৮
----২০---৮---২০২১
----নির্মল হালদার







বুধবার, ১৮ আগস্ট, ২০২১

জ্যান্ত / নির্মল হালদার

জ্যান্ত / নির্মল হালদার



তোমাকে আমার চিঠিটাই লেখা ছিল বাকি। অনেক কিছুই দিইনি তোমাকে। যেমন, মেঘ বৃষ্টি। যেমন রৌদ্র ছায়া। যেমন শরতের ধানক্ষেত। হ্যাঁ, এটাও ঠিক তোমাকে কোনো সন্তান দিতে পারিনি। আবার এটাও ঠিক, তোমাকে দিয়েছি একটা বাড়ি।

বাড়িটা আগলে আগলে তুমি থাকো। সম্পত্তি নাইবা ভাবলে। ভাবো, বাড়িটাই তোমার একমাত্র সন্তান। যে তোমাকে দেখবে।

তোমাকে দিতে পারিনি কাশবনের ছোটাছুটি। তোমাকে দিতে পারিনি অপরাজিতার রঙ। লাজুক শালুক ফুল। তবে আমি তোমাকে দিয়েছি একটা বাড়ি।

আমরা ভাড়া বাড়িতে ছিলাম। মাত্র দুটো ঘর। সব সময় অন্ধকার। ঝকঝকে বাথরুম ছিলনা। একটা কল তলা ছিল। একটা পায়খানা। তুমি সব সময় মুখ কুঁচকে থাকতে। তুমি সব সময় আমাকে বলেছো, আমি অকর্মণ্য। কলম ছাড়া আমার নাকি কিচ্ছু নেই। আমার রোজগার করার ক্ষমতা নেই। একটা বাড়ি পর্যন্ত আমি করতে পারিনি। আমার মুরোদ নেই।
তুমি আমাকে উঠতে বসতে অপমান করতে। আমি কোনোদিন কোনো অপমানের জবাব দিতে যাইনি।
আমি সবসময় চেষ্টা করেছি, আমার মুখের হাসি থেকে তোমাকে ভালো রাখতে। কিন্তু তুমি বুঝতে না। তুমি বলতে, আমার লেখালেখি থেকে এক পয়সা উপার্জন করি না। আমার আবার কিসের অহংকার। আমার নাকি হাসিও মানায় না।

যেদিন খবর পেলাম আমার বাবার জমানো টাকা আমি পাচ্ছি। তা প্রায় পনেরো লাখ টাকার মতো। বাবা নাকি কাউকে কিছু না বলে, আমার নামেই ফিক্সড করে গেছলেন। আমি যখন জানলাম, প্রথমেই তোমাকে বলেছি, তোমাকে বাড়ি করে দেবো। আর চিন্তা করতে হবে না। তুমি মহা খুশি হয়ে সেদিন আমাকে মাংস ভাত খাইয়েছিলে। বলেছিলে এটাও, আমি যেন দোকানের খাতা লেখার কাজ ছেড়ে দিই। অথচ কোনোদিন জানলে না, ওই খাতা লেখার কাজ থেকেই আমাদের সংসার চলে। এবং ওই খাতাতে আমার যাবতীয় লেখালেখি। সেও আমার মালিক জানতেন। তিনি সহৃদয় ব্যক্তি। আমার লেখালেখির কাজে তার মৌন সমর্থন ছিল। তাই সরস্বতী প্রকাশন থেকে আমার এক একটা বই প্রকাশ হয়ে চলেছে। প্রকাশক টাকা না দিলেও বইটা যে প্রকাশ পাচ্ছে, এও তুমি কোনোদিন জানার চেষ্টা করলে না। কেবলই
আমাকে লোকজনের কাছেও ছোট করে গেছো। মন্দ কথা বলে গেছো।

তোমাকে দিতে পারিনি একটা নদী। তোমাকে দিতে পারিনি সবুজের আলো। তোমাকে দিতে পারিনি পাখির উড়াল। একটা জঙ্গল দিতে পারলে তুমি বুঝতে পশুপাখিদের সংসার। এখন তুমি নতুন বাড়িটা নিয়ে সুখী হয়ে থাকো।

যেদিন ১ কাঠা জমি দেখাতে তোমাকে নিয়ে গেলাম শহর শেষের সীমানায়। সেদিন তুমি আমার কপালে রেখেছিলে একটা চুম্বন।

আমাকে খুঁজে দেখতে হবে চুম্বনের দাগটা আছে কিনা। সেই তো তোমার প্রথম ভালোবাসা। আমার মনে হয়। কেন না তুমি আমাকে কোনোদিন ভালোবাসতেই পারোনি। আজ আমার মুক্তি। বাড়িটা করে দিতে পেরেছি। তোমার নামেই করে দিতে পেরেছি। আর আমি নিজে পাহাড়ি এক গ্রামের উদ্দেশ্যে চলে যাচ্ছি। অনেক দূর। আর কোনোদিন ফিরে না আসার চেষ্টা করবো। তুমি থাকো। ভালো থাকো।

তোমাকে দিতে পারিনি ঘন বৃষ্টির রাত্রি। তোমাকে দিতে পারিনি গ্রীষ্মের আমবাগান। তোমাকে দিতে পারিনি হেমন্তের গোধূলি। এই এতদিন পর তোমাকে দিতে পারলাম একটা জ্যান্ত বাড়ি। তাকে সন্তান মনে করে লালন করবে। এই আশা করতেই পারি।

একটা বাড়িও এক সন্তান।

তোমাকে আমার প্রথম ও শেষ চিঠি। পড়ে নিয়ে কুচি কুচি করবে। আমি মনে করি, আমার এই কথা রাখবে।


----১ ভাদ্র ১৪২৮
----১৮---৮---২০২১
----নির্মল হালদার








সন্দীপ সম্পর্কে আমি যা জানি / নির্মল হালদার

সন্দীপ সম্পর্কে আমি যা জানি / নির্মল হালদার



সন্দীপ সেই ক্যামেরাম্যান যে শুধুমাত্র চিত্রকর সনৎ করের ছবি তোলার জন্য শান্তিনিকেতন ছুটে যায়। কবি দেবদাস আচার্যর ছবি তোলার জন্য কৃষ্ণনগর ছুটে যায়। সে সুদূর ব্যাঙ্গালোর ছুটে গেছে গায়ক মান্না দের ছবি তুলতে। জলপাইগুড়ি ছুটে গেছে কালাচাঁদ দরবেশের ছবির জন্য।

শুধু কবি শিল্পী নয় নাটকের, অভিনেতাদের, সিনেমার অভিনেতাদের ছবি তুলে গেছে দিনের পর দিন। গল্পকার ঔপন্যাসিকদের ছবি তুলে গেছে।

সৈকত রক্ষিতের ছবি তোলার জন্য অপেক্ষা করেছে বছরের পর বছর। শেষ অবধি এই গত শীতে
সৈকত রক্ষিতের ছবি তুলতে পেরেছে।

অর্থের লোভে নয়। খ্যাতির লোভে নয়, শুধুমাত্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ছবিগুলো থেকে যাবে। ইতিহাস হয়ে থেকে যাবে।

আমার মনে আছে, আমাকে মডেল করে সে যখন
ছবি তুলে যাচ্ছে, তখন তার ইচ্ছে ছিল, আমার ন্যুড ছবিও তুলবে। আমি আমার সংস্কার থেকে সেই ছবি তুলতে দিইনি। তবে সে বডি পেইন্টিং এর ছবি তুলেছে। এজন্যে কত তোড়জোড়। সারা শরীরে কে ছবি আঁকবে? শিল্পী আশিস নন্দী কে প্রস্তাব দিতেই,
রাজি হয়ে গেল।

আশিস আমার বাড়িতে এসে আমার খালি গায়ে ছবি যেমন আঁকলো তেমনি দুই তরুণ বিশ্বনাথ বাউরী ও বাপি কর্মকারের গায়ে ছবি এঁকে ভরিয়ে তুললো তাদের শরীর।

সেদিন তাদেরও ছবি তুলে সন্দীপ খুশি হয়েছিল খুব। সেদিন অবিনদের গ্রামের কাছে কাঁসাই যাওয়া হয়েছিল দুপুরের পরে। সেখানে সঞ্জীব বাউরী আমার খালিগায়ে ছবি এঁকেছিল। সন্দীপের ক্যামেরায় আমি বন্দি হয়ে গেছি।

ছবি তোলার ব্যাপারে সন্দীপের আবেগ এতটাই যে  সে যখন তখন দূরদূরান্ত ছুটে যায় ক্যামেরা নিয়ে। 

পুরুলিয়ার নাচনি--শিল্পীদের ছবি সন্দীপের কাছেই সমস্ত আছে। পুরুলিয়ার কোনো লোকশিল্প অনুরাগীর কাছে নেই।

 
সে ছুটে এসেছে পুরুলিয়াতে টুসু বা মকর পরবের ছবি তুলতে। এই সন্দীপের আচার-আচরণে কোনো অহংকার প্রকাশ পায় না। তার যে ছবির বিষয়ে আবেগ তাকে  কুর্নিশ করতেই হয়।

------নির্মল হালদার
-----১৪---৮---২০২১







মৌমাছিরা / নির্মল হালদার

মৌমাছিরা / নির্মল হালদার



একেকদিন ক্লান্ত লাগে খুব। ঘুম আসে। আর ঘুম এলেই , এসে দাঁড়ায় অবন্তিকা। সে মাথার চুলে বিলি কাটতে থাকে। তখন আমার মনে হয়, আমবাগানে ছুটে যাই। মৌমাছিদের সঙ্গে খেলা করবো।

ঘুম তো ভাঙ্গে না।


ঘুম ভাঙলেই, আমি চলে যাবো মৌমাছিদের কাছে।
ডাকলেই কাছে চলে আসে। কি সুন্দর যে তাদের নাচ। কি মধুময় তাদের গুঞ্জন। আমি নেচে নেচে উঠি।

কি সকাল কি দুপুর যখনই যাই কাছে পাই মৌমাছিদের। ওদের ডানায় ডানায় আমার স্পর্শ রেখে
আমি ওদের নাচ করতে বলি। আমি ওদের গান করতে বলি।
ওরা শোনে আমার কথা। আম হলে কতটা পেকেছে আমাকে জানায়।আমে রঙ এলেই ওদের ফুর্তি। ওরা জানে , আমের মধু। যা আমিও পাই ওদের কাছ থেকে। গাছে মুকুল এলেই ওরা আমাকে ঘরে এসে খবর দেয়। আমিও ছুটতে থাকি আম বাগানের দিকে।

অবন্তিকা এলেই আমি ঝামেলায় পড়ি। সে বলবে, পার্কে গিয়ে বসতে। যদিও পার্কে কিছুই নেই। দুটো দোলনা দুলছে শিশুদের জন্য। এ বাদে একটিও গাছ নেই।

আমি তাকে আম বাগানের কথা বলি। মৌমাছিদের কথা বলি। সে বলে, আমি নাকি রূপকথা শোনাচ্ছি। রূপকথা যে নয় সে না গেলে কি করে বুঝবে। তাকে দেখাতেই পারি, মৌমাছিরা আমার কাঁধে উঠে নাচে। আমার হাতে উঠে নাচে। মনে হবে মৌমাছিদের নাচের সঙ্গে গানের সঙ্গে আম গাছ নেচে নেচে উঠছে।

অবন্তিকার কাছে নাচ মানে মানুষের নাচ। অবন্তিকার কাছে গান মানে মানুষের গান। সে তো আছেই। থাকবেও। তারপরও দেখতে হয়, মৌমাছিদের নাচ।

আম যখন থাকে না তখন মৌমাছিরা আমাকে বলে, জাম বাগানে চলো-----জাম রঙ দেখলেই ভালবাসতে ইচ্ছে করবে।

মৌমাছিদের সঙ্গে অপরাজিতার কাছেও গেছি।শিউলির কাছেও গেছি। আর অবন্তিকার সঙ্গে হোটেল রেস্তোরাঁ। অবন্তিকার সঙ্গে মেলায় মেলায়। চাপ চাপ
ভিড়ে।

মৌমাছিদের সঙ্গে নির্জনতায়।

মন যেখানে সুস্থ হয়। মন যেখানে প্রাকৃতিক হয়। মন যেখানে আলোকিত হয়ে ওঠে। এই কথা বলার পরেও অবন্তিকাকেও আমার চাই।

কখনো কখনো সেও আমার শুশ্রূষা। আম পল্লব মাথায় ছোঁয়ালে যে শুশ্রূষা আসে, সেইরকম শুশ্রূষা না হলেও মানবিক শুশ্রূষা বলতে পারি। যেমন আমার মাথা ধরেছে। অবন্তিকাকে ডাকতেই হবে। কিংবা  ব্যাঙ্গালোর যাওয়ার টিকিটটা সেই মোবাইল থেকে কেটে দেবে। আমি তো প্রযুক্তির কিছুই বুঝি না এখনো। আমার কাছে মৌমাছির আলোবাসা।

মৌমাছিরা একদিন আমাকে বলেছিল আমাকে দেখাবে মৌচাক। আমি দেখেছি। আমি গন্ধ নিয়েছি মধুর। ওরা আমার বাড়ির জন্য মধু দিতে চেয়েছিল।

না, আমি নিইনি।

মৌচাকে মধু থাকুক। জীবন্ত হয়ে।

আজ আমবাগানে এসে আমি হতাশ। দেখতে পেলাম একটা মৌমাছির একটা ডানা ভাঙ্গা। কী করে ভাঙলো? কে ভাঙলো? কার কাছেই বা খোঁজ করবো? আমি মৌমাছিকে কাছে ডেকে জানতে চাইলাম, এই দুর্ঘটনা কি করে ঘটলো? সে চুপচাপ থাকে। সে যে যন্ত্রণা পাচ্ছে, আমি টের পাই। আমি দেখতে পাই, ভাঙ্গা ডানার একটি অংশ মাটিতে পড়ে আছে।

আমি হাতে নিয়ে ডানার সঙ্গে জোড়া লাগাতে চাই। জোড়া লাগে না। আমার কষ্ট হয়। মনে হয়, এ জীবনে কিছুই পারলাম না।

-----২৭ শ্রাবণ ১৪২৮
----১৩---৮---২০২১
-----নির্মল হালদার





বুধবার, ১১ আগস্ট, ২০২১

পাহাড়ের গল্প / নির্মল হালদার

পাহাড়ের গল্প / নির্মল হালদার


রোজ পাহাড়ের কাছে সে এসে দাঁড়ায়। সকালবেলা। সে অর্থাৎ বাপি মনে করে পাহাড়টা তার আপনজন। তার দাদুও প্রতিদিন পাহাড়ের কাছে এসে পাহাড়ের দেখভাল করতো। যেন কেউ পাহাড়ের গায়ে আঘাত না করে। যেন পাহাড়ের গাছপালা পাহাড়েই অক্ষত থাকে।

দাদুর মত বাপিও পাহাড়ের কাছে এসে পাহাড়ের গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করে-----কেমন আছো? আর কোনো বন্ধু এসেছিল তোমার কাছে? আজ?
কী বলছিল?
বাপির মনে হয় পাহাড়টা নড়েচড়ে বলে-----আজ কেউ আসেনি। তবে কাল রাতে শিশির পড়েছে খুব। ঠান্ডা লাগছিল। বাপি তার কথার উত্তরে বলে------ দাঁড়াও দাঁড়াও আরো গাছ লাগাবো। তাহলে শিশির আটকানো যাবে। নিশ্চয়ই গাছ হবে তোমার গায়ে ।
আগেও তো হয়েছে। কিন্তু গাছপালা বেশি নেই বলে, শিশিরের ছ্যাঁকা লাগছে।

বাপি কখনো কখনো সন্ধের দিকে যায়। সন্ধের অন্ধকার পাহাড়কে আরো রহস্যময় করে তোলে। যেন ধ্যানী এক মহামানব। অথবা এক শক্তি। বাপির গা ছমছম করে। সে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে সাহস পায় না। তার মনে হয় , যদি ধ্যান ভেঙ্গে যায়? যদি ক্রোধের সৃষ্টি হয়? এবং ক্রোধ থেকে আগুনের সৃষ্টি হয়? ক্ষতি হয়ে যাবে চারপাশের।

বাপি  পাহাড়ের দিকে চেয়ে ঘরে ফিরে আসে। ঘুমোতে গিয়েও বাপির মন ছটফট করে পাহাড়ের জন্য।কেবলই মনে হয়, পাহাড়টা যদি ছোট হয়ে যায়? সেও ছোট হয়ে যাবে। পাহাড়টা যদি ছোট হয়ে যায়?আকাশটা ছোট হয়ে যাবে। একবার মাঝরাত্রে তার মনে হলো কেউ চুরি করতে এসেছে পাহাড়ের পাথর। সে ঘুম থেকে উঠে দৌড়োতে দৌড়েতে পাহাড় কোলে পৌঁছে যায়। কেন না, পাথর হলো পাহাড়ের হৃৎপিণ্ড।
পাথর হলো পাহাড়ের শরীর। পাহাড়ের মন।

এক একটা পাথর পাহাড়-শরীরের একেকটা অংশ। কোনো ভাবেই পাথর চুরি করতে দেওয়া হবে না। পাথর কাটা চলবে না।

পাহাড়ের গায়ে যত গাছ আছে পাহাড়ের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। পাহাড়ের নিঃশ্বাস গাছের গায়ে গায়ে বইতে থাকে। গাছের নিঃশ্বাস পাহাড়ের গায়ে গায়ে বইতে থাকে।

পাহাড়ের মাথায় মেঘ জমলে পাহাড়কে আরও সুন্দর লাগে। গাছপালা হলো পাহাড়ের প্রেম। মেঘ হলো পাহাড়ের প্রেম।

বাপি লক্ষ্য করলো, ইদানিং পাহাড়কে খুব করুণ লাগছে। কারণটা সে বুঝতে না পেরে, পাহাড়ের চারদিকে ঘুরতে থাকে। তারপরেই চোখে পড়লো, পাহাড়ের পায়ের তলার দিকটা ছিন্নভিন্ন। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসে পড়লো। তার চিন্তা পাহাড়কে কীভাবে রক্ষা করবে?

যদি গ্রামের লোককে বলে, পাহাড় বাঁচাও, শুনবে কি? যদি  গ্রামের লোককে বলে-----পাহাড় আমাদের চৌদ্দপুরুষের। সবাই শুনবে কি?

সাতপাঁচ চিন্তা করতে করতে বাপি গ্রামের কোনো কোনো যুবককে তার ভয়ের কথা বলে। বিশেষ করে বাপির যারা বন্ধু। কথাগুলো শুনলেও কেউ কোনো
সমাধানের পথ বাৎলায়না। একজন তো বললো, পাহাড়টা আমার বাপের নয়। পাহাড়কে নিয়ে যে যা ইচ্ছে করুক গে।

বাপির মুখে বিষণ্ণ ছায়া।

সে এইবার কয়েকটা বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে পাহাড় তলে
পলাশ গাছ লাগাতে শুরু করলো। সে দিনে রাতে দেখতে চায় কারা আসছে পাহাড় ভাঙতে। এবং সে একা একা পাহাড় কোলেই রাত্রিবেলা ঘুমোয়। কারণ, বাপি পাহারায় থাকতে চায়।

সে একদিন স্বপ্নে দেখতে পেলো অনেক ট্রাক্টর এসেছে। অনেক লরি এসেছে। পাহাড় কাটার যন্ত্র
এসেছে। সে চিৎকার করেও কাউকে আটকাতে পারছে না। সে মাথার চুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে পাহাড়ের নীচে শুয়ে পড়েছে। সে বলছেও-----আমাকে আগে মারো তারপর পাহাড়কে আঘাত করবে।

তার ঘুম ভেঙে গেল।

ঘুম ভাঙ্গা মাত্রই বাপি তার কাঁধে ওঠায় পাহাড়টাকে। তার আদরের পাহাড় ভালোবাসার পাহাড় তাদের ঘরেই থাকবে।


-----২৫ শ্রাবণ ১৪২৮
-----১১---৮---২০২১
-----নির্মল হালদার




শুক্রবার, ৬ আগস্ট, ২০২১

সারাংশ / নির্মল হালদার

সারাংশ / নির্মল হালদার



আমি আজ সারাংশকে খুঁজছিলাম। আমি আজ সারাদিন সারাংশকে খুঁজছিলাম।সে বলেছিল ------- প্রতিটি ঘর আমার ঘর। যেকোনো ঘরে আমি ঢুকে যেতে পারি।

এই তো একটা ঘর থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরে এলাম। এই তো ওই হলুদ ঘর থেকেও ফিরে এসেছি। ওই শাদা ঘর থেকে ফিরে এসেছি। সমস্ত ঘর আমাকে বলে, আমাকে চেনে না কেউ। সমস্ত ঘর আমাকে বলে, মগের মুলুক পেয়েছেন? ঢুকে পড়লেই হলো? কোথাও কোথাও শুনতে হলো, ঘরে ঢুকলেই গলা ধাক্কা খেতে হবে।

এইরকম একটা ঘরে বলেছিলাম, হ্যাঁ হ্যাঁ চলে যাচ্ছি। তার আগে আমাকে এক গ্লাস জল দিন। না--- জল পাইনি।

আজ সারাদিন সারাংশকে খুঁজছি। সে বলেছিল, গ্রামে শহরে আমার ঘর আছে। যেকোনো ঘর
আমার ঘর।

ঘর?

একটা আশ্রয়। আত্মীয়তার স্বাদ।
যৌথতার আলো অন্ধকার।

না।
কোনো আশ্রয় নেই।
না।
যৌথতা নেই।
না।
আত্মীয়তার আস্বাদ নেই।


সারাংশ কোথায় দেখেছে ঘর? সারাংশ কোথায় দেখেছে আশ্রয়ের আলো ছায়া?

কাল মনে হয়েছিল, ওই যে নীল রঙের বাড়ি। ওই বাড়িতে যাবো। সাধ হয়েছিল, দুটি ডাল ভাত খাবো।
সেই বাড়ির দরজার কাছে গিয়ে দেখলাম, দরজা খুললো। দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আমি হতাশ না হয়ে সারাংশর উদ্দেশ্যে একটা হাসি হেসে উঠলাম। এবং এই হাসির পরেও সারাংশকে আমি খুঁজে চলেছি।

সারাংশ কেন বলেছিল, প্রতিটি ঘর আমার ঘর। প্রতিটি মানুষ আমার আত্মীয় বন্ধু?

সেদিন পথচলতি একজনকে বললাম, চলুন চা খাই। তিনি বললেন, অন্য কাজ আছে। আর অচেনা মানুষের সঙ্গে তিনি চা খাবেন কেন? সেদিন চা দোকানের দিকে চেয়ে এক চা পিপাসুকে বললাম, এক কাপ চা খাওয়াবেন? তিনি বললেন, আপনাকে চিনি না জানিনা। চা খেতে খুঁজছেন? আমি হাসতে হাসতে চা দোকান থেকে বাইরে এসে পেয়ারা বিক্রেতাকে বললাম, একটা পেয়ারা দেবে? বিক্রেতা পয়সা চাইলেন।

পয়সা?

পয়সা আমি চিনতে চাই না।
আমার পকেটে পয়সা নেই।
আমি বললাম না সে কথা। আমি চুপচাপ রাস্তায় রাস্তায় বন্ধু খুঁজতে খুঁজতে এলোমেলো হয়ে পড়ছি।
আমার পিপাসা দীর্ঘ হয়ে উঠছে।

মিষ্টির দোকানে গিয়ে জল চাইলাম। এক গ্লাস জলের দাম এক টাকা। আমার পকেটে পয়সা নেই। আমাকে খুঁজতেই হবে সারাংশ কোথায়? আমাকে খুঁজতেই হবে সারাংশ সত্য না মিথ্যে?

সারাংশ তো সত্যই।
হাত পা আছে। চোখ নাক কান আছে। আর একটা মানুষের যা যা থাকা দরকার, সমস্তই আছে।

সারাংশ মানুষ।

এবার বুঝতে হবে, সত্যি মানুষ না মিথ্যে মানুষ?
এবার বুঝতে হবে, সত্য কি? মিথ্যা কি?

আমি বিচলিত হয়ে পড়ছি।
আমি ঘেমে উঠছি। আমার খিদে নেই। শুধু জল তেষ্টা।
সারাংশকে আজ পেতেই হবে।
তার সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হয়। আজ কেন হবে না?

ওই ঝুপড়িতে ঢুকে পড়বো।
আমাকে ফেরাবে না নিশ্চয়ই।
আমি একটু জিরোতে চাই।

ঢুকতে যাবো যেই, এক বালক এসে বললো, এখন কেউ নেই। আপনি আসবেন না।

সারাংশ সারাংশ
চিৎকার করতে ইচ্ছে করলো।

আপনারা কেউ সারাংশকে দেখেছেন? ঠোঁটে একটা কাটা দাগ আছে। সব সময় শাদা পাজামা পাঞ্জাবী পরে। হঠাৎ হঠাৎ রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে ওঠে।
আপনারা দেখেছেন তাকে?

কে যেন ডাকছে আমাকে।
চারদিক তাকিয়ে দেখি, কেউ নেই। কেউ নেই। আবার শুনতে পাই, আমাকে কেউ ডাকছে।

রাস্তায় শুধু দাঁড়িয়ে আছে একটা নিম গাছ। 
তবে কী সেই ডাকছে আমাকে?

আমি সাড়া দিলে সারাংশকে খুঁজে পাবো না।

----২০ শ্রাবণ ১৪২৮
----৬---৮---২০২১
-----নির্মল হালদার




বৃহস্পতিবার, ৫ আগস্ট, ২০২১

জন্মদিনের গন্ধ / নির্মল হালদার

জন্মদিনের গন্ধ / নির্মল হালদার



অনেকদিন পর বাবা ঘরে ফিরেছে। মায়ের জন্য নিয়ে এসেছে একটা ফুলন পাড় শাড়ি। মা আরও চেয়েছিল, একটা টিনের বাক্স। ফুল আঁকা। সেও নিয়ে এসেছে বাবা। মায়ের জন্য গন্ধতেলও নিয়ে এসেছে। সবকিছু দেখেও মা গদগজ করছিল, ছেলেমেয়েদের জন্য বাবা কিছুই আনেনি।

ছেলেমেয়েরা বাবার পোঁটলা পুঁটলি খুলে খুলে দেখছিল। তবে আমার জন্য নিয়ে এসেছে একটা চাকা। কাঠের। হাতে পেয়েই আমি চাকাটা চালিয়ে নিয়েছি। বেশ সুন্দর। ধুলা কেটে কেটে এগিয়ে যায়।

বাবা বলছিল, ও দেশে আবার গেলে আমার জন্য নতুন একটা জামা এনে দেবে। আর দিদিদের জন্য শাড়ি। কাজ ফুরিয়ে গেছলো বলে,তেমন কিছু টাকা পায়নি। নইলে, ও দেশের মন্ডা নিয়ে আসতো।পাপড়ি নিয়ে আসতো। খুব ভালো খেতে।

যা পেয়েছি তাতেই আমি খুশি। দিদিরা অবশ্য মুখভার করছিল। তাদের কপালে কিছুই জুটলো না। বাবা হাসতে হাসতে বলে, দাঁড়া এখান থেকেই তোদের জন্য নতুন কাপড় এনে দেবো।

অনেকদিন পর আমি বাবাকে পেয়েছি বলে, বাবার পিছু ছাড়ছি না। বাবা যেখানেই যায় সঙ্গে আমি। মা বারণ করে। বলে----তোর বাবা কাজে যাচ্ছে। কাজ খুঁজতে ও যাচ্ছে। তুই সঙ্গে যাবি কেন? তুই ঘরে আয়।
আমি শুনি না। বাবার সঙ্গে থাকলে, বাবা এটা সেটা কিনে দেয়। সেদিন তো দু' পয়সার কুল কিনে দিলো। তারপরেই দু পয়সার নিমকি--বোঁদে।

বোঁদে খেয়ে বোঁদের রস বাবার কামিজে মুছে দিলাম। বাবা হাসলো। বাবার এক বন্ধুর বাড়িতে আমাকে চা-ও দিয়েছিল। যদিও আমি চা খেতে খুব একটা অভ্যস্ত নই। কিন্তু খেয়ে দিলাম। বাবা ও বললো, খেয়ে নিতে।

বাবা অনেকদিন পর এসেছে বলে, আমাদের ভাইবোনদের লেখাপড়া লাটে উঠেছে। বাড়িতে সব সময় খুশি খুশি ভাব। কাল বাড়িতে মাছ হয়েছিল। পোরশু ডিম হয়েছিল। আমি আধটা ডিম পেয়েই অনেকটা ভাত খেয়ে ফেলেছিলাম। কাল মাছের কাঁটা বেছে দিয়েছিল মেজদি। কাঁটাতে আমার খুব ভয়। একবার গলায় লেগে বিপদ হয়েছিল। আরেকবার মায়ের কোলে থাকতে-থাকতে চোখ উল্টে দিয়েছিলাম। সবার কান্নাকাটি। ভাবছিল, আমি মরে গেছি।

আমি এখন অনেক বড় হয়ে গেছি। পাড়ার স্কুলে যাই। বারো মাস সকালে স্কুল। আমি আঁধার থাকতেই উঠে পড়ি। আর উঠেই কাঁদতে থাকি। মাকে বলি, স্কুলে যাবো না। মা-ও বলে, ঠিক আছে যেতে হবে না। তুই এখন ঘুমো। আমি আবার ঘুমোবো না। স্কুলেই যাবো।

বাবা এসেছে বলে, সত্যি সত্যি আমি এখন স্কুলে যাচ্ছি না।

বাবা ভোরে ওঠে। মা বলছিল, গ্রাম থেকে যে সমস্ত ঝুড়ি ঝুড়ি চাল আসে , বাবা লোকের জন্য কিনে দেয়। এজন্য পয়সা পেয়ে থাকে। ও দেশ থেকে বাবা তেমন কোনো টাকা পয়সা আনতে পারেনি। তাই বাড়িতে এসে কিছু কাজকর্ম করার চেষ্টা। নইলে যে সংসার চলবে না।

দিদিরা ঠোঙা করলেও চাল ডালের দাম ওঠে না। ভাবে অভাবেও বাবার মুখে হাসি থাকে। কখনোই আমাদের ভাইবোনদের ধমক দেয় না। বিশেষ করে আমি ভাইবোনদের মধ্যে ছোট বলে, মা-বাবার কাছ থেকে আস্কারা পেয়ে থাকি। সবার কাছ থেকেই আদর  পেয়ে থাকি। এ কারণেই, চোর-পুলিশ খেলতে আমার বাধা নেই। এবং খেলতে খেলতে সন্ধে হয়ে যায়।

খেলা শেষে ঘরে এসেই ঘুমিয়ে পড়ি। বাবা ও মা আমাকে ঘুম থেকে তুলে খেতে বলে। আজ বলছিল, কাল বাদে পোরশু আমার জন্মদিন। ন'টা তরকারি পায়েস করার মতো সামর্থ্য নেই। শুধু কালী মন্দিরে পুজো দিয়ে আসবে মা।

তারপরেই, মায়ের চোখে জল। দুধ কিনতেও পয়সা লাগবে। বাবা বললো, দুঃখ করোনা। একদিন
ভগবান মুখ তুলে চাইবে। দেখো। হাসি ফুটবে সবার মুখে। আমার মেয়েদের ঠোঙা করতেও হবে না।

আমি ঘুম চোখেই শুনে ফেলেছি আমার জন্মদিনের কথা। গেল বার মা আমাকে কপালে চন্দন দিয়ে খেতে দিয়েছিল। বাবা ছিলনা। তবে চিঠি লিখেছিল একটা মাকে। মা পড়তে পারে না বলে বড়দা পড়ে শুনিয়ে ছিল। চিঠিটা ছিল এই রকম---------ছোট বউ এই শ্রাবণ মাসে ঘর যেতে পারলাম না। এদিকে বর্ষা খুব।
পুরুলিয়াতে জল হচ্ছে কী?

দত্তবাবু বলছিলেন, একেবারে পুজোর সময় যেতে। তাই হয়তো যাবো। ততদিন তোমরা ভালো থেকো। আর এমাসে গোরার জন্মদিনটা পালন করবে। তার জন্য আমার আশীর্বাদ রইলো।

চিঠিটা শুনতে শুনতে মা কেঁদেছিলো খুব। বলছিল, গোরা বাপের সঙ্গ পেলো না তেমন।

এ বছর তো বাবাকে পেয়েছি। মাকে বলবো, জন্মদিনে
বাবা আর আমি একসঙ্গে খাবো।

মা বলছিল, কিছু করি বা না করি পায়েস একটু রাঁধতেই হবে। জন্মদিনে পায়েসটা শুভ। বাবা বললো, তুমি চিন্তা করোনা আমি এক পুয়া আতপ চাল এনে
দেবো।

আমি আজ থেকেই পায়েসের গন্ধ পাচ্ছি।



-----১৯ শ্রাবণ ১৪২৮
-----৫---৮---২০২১
-----নির্মল হালদার









বুধবার, ৪ আগস্ট, ২০২১

আমি যখন মডেল / নির্মল হালদার
















































ছবি : আলোকচিত্রী সন্দীপ কুমার

মডেল : কবি নির্মল হালদার



আমি যখন মডেল / নির্মল হালদার



আমি যখন মডেল হয়ে উঠলাম ফটোগ্রাফার সন্দীপ কুমারের কাছে তখন আমিও একজন শিল্পী। অথবা সৃজনশীল একজন হয়ে উঠেছি। হয়েওছি। কেননা, সৃজনশীল না হলে আলোকচিত্রীর মনকে বুঝে উঠতে পারবোনা। আলোকচিত্রী যেহেতু ক্যামেরা দিয়ে একটি ছবি আঁকবেন, তখন আমাকে আমার মেধা ও মনন থেকে স্থির হতে হবে। আমার হৃদয় দিয়ে বুঝতে হবে, তিনি কি চাইছেন। পারস্পরিক ভালোবাসা থেকেই, একটি যৌথ সৃষ্টি হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রেও আমি যখন মডেল আমাকে সচেতন হয়ে স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে আলোকচিত্রীকে সহযোগিতা করে যেতে হবে। তাই সন্দীপ যখন চাইলেন, শালুক ভরা দীঘিতে আমাকে নামাতে। আমি গামছা পরে নেমে গেলাম। তারপর লাল শালুকের মাঝে আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। সন্দীপের ক্যামেরা ছবি এঁকে চললো একটার পর একটা ।

আলোকচিত্রী চাইছেন, আমাকে বিরাট এক ওজন দাঁড়িতে বসিয়ে ছবি তুলবেন। এখানে আমি যদি
কিন্তু কিন্তু করি, তাহলে আলোকচিত্রী তার লক্ষ্যের ছবিটি পাবেননা। আমি রাজি হয়ে গেলাম। কারণ,
আমি মডেল। আমিও একজন সৃজনশীল।

আলোকচিত্রীও মডেলের যৌথতার ফসল হয়ে উঠবে একটি ছবি। কিংবা ফটোগ্রাফ। এ কথা বা ভাবনা দুজনের মাথাতেই রাখতে হবে। তবেই প্রকৃত একটি ছবি। সৃষ্টি হবে।

সন্দীপ যখন বললেন, নদীর উপরে যে পাথর সেখানে আমাকে শুয়ে পড়তে হবে। আমি শুয়ে পড়লাম। তার মানে আমার মনকে আমি শুইয়ে দিলাম ক্যামেরার সামনে। ক্যামেরা তার চোখ দিয়ে যেমন ইচ্ছে যেদিক দিয়ে ইচ্ছে ছবি তুলে যাবে।

আমি বলতে চাই, আলোকচিত্রীর সঙ্গে মডেলের বোঝাপড়া থাকা চাই। আমাদের ক্ষেত্রেও মুখে মুখে বোঝাপড়া ছিল না বটে, তবে মনে মনে ছিল। আর ছিল বলেই, সন্দীপ যখন যা বলেছেন, আমি চুপ করে শুনেছি।

একবার এক পাহাড়ের কাছে গিয়ে আমাকে বললেন, ছোট ছোট পাথরে উঠে যেতে। শুয়ে পড়তেও বললেন। আমি কোনো ভাবেই "না" করিনি। আমাকে আরো বললেন, অবিনের কাঁধে উঠে পড়তে। অবিন কাঁধে নিয়ে হেঁটেও যাবে। আমি ভয়ে অস্থির। কিন্তু ভয় করলে চলবে না। আমি জয় মা বলে অবিনের কাঁধে উঠে পড়লাম। অবিন হেঁটে চলেছে। আমার বুক দুরু দুরু। সন্দীপের ক্যামেরা চলছে। না চললে, আমার সৃজনশীলতা ভেঙ্গে পড়বে। আমাকে তাই সৃষ্টিশীল মন নিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে। আমি বলতে চাই, আমি মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনয় করছি। কেবল আমার মুখে সংলাপ নেই। পরিচালক যা চাইছেন, আমাকে করে যেতে হচ্ছে।

মুখটা এদিকে হবে না ওদিকে,মাথা কতটা ঝুঁকে থাকবে, আমাকে শুনে যেতে হচ্ছে। কোনো নির্দেশ অমান্য করা যাবে না। ভুল করলেই দর্শকরা ঢিল ছুঁড়বে।

ওই ভাঙ্গা ঘরটাতে ঢুকে পড়ুন-----সন্দীপ আমাকে নির্দেশ করলেন। রাস্তার ধারে ঘর। ভেঙ্গে পড়া ঘর। ঝুলকালিতে ভর্তি। ঘরের মেঝেতে গোবর। কাদামাটি। সেই ঘরের জানালা থেকে আমাকে মুখ বাড়াতে হবে। সন্দীপ বাইরে থেকে ছবিটা তুলবেন। আমি রাজি। একবারও বললাম না, আর পারছি না ভাই।

আলোকচিত্রী অথবা নির্দেশক যখন ক্লান্তির কথা বলছেন না, আমাকেও বলা চলবে না। আমি মডেল হলেও আমিও শিল্পী।

আমাকে ক্যানভাসে রেখে চিত্রকর রঙ ঢালছেন। আমাকে নড়াচড়া করা চলবে না। কেন না, আমাকে নিয়ে চিত্রকর পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করছেন।

আমাকেও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। হেরে গেলে পিছিয়ে পড়লে চলবে না। তো একটি ফটোগ্রাফের ক্ষেত্রে যদি ফটোগ্রাফার মডেল নিয়ে কাজ করেন, মডেলকে অবশ্যই ক্যামেরার সামনে স্বতঃস্ফূর্ত হতে হবে। ভালোবেসে।

একটা জায়গায় অনেক মদের বোতল। মদের বোতল গুলি মাটিতে ছড়িয়ে সন্দীপ আমাকে নির্দেশ দিলেন, তার মাঝে শুয়ে পড়তে। আমি কোনো দ্বিধা না করে শুয়ে পড়েছি।

যে ছবি দেখে পরে অনেকে নাক উঁচু করেছেন। যদিও আমার কোনো শুচিবাই ছিল না। মদ্যপান করবো আর ছবি তুলতে আপত্তি? এরকম মধ্যবিত্ত সুলভ আমার মন নয়। এই কারণেই সন্দীপের ক্যামেরার সামনে মডেল হতে পেরেছি।

আমার মনে হয়েছে, মডেল কোনো পুতুল নয়। মডেল, একজন সৃজনশীল মানুষ। ক্যামেরাম্যান ও মডেলের যৌথ ভাবনা থেকেই ছবি উঠে আসে। সৌন্দর্যের কাছে। মানুষের কাছে।


আমি যে মডেল হতে পেরেছি, এ আমার প্রাপ্তি। আমি যে ক্যামেরার মুখোমুখি হয়ে, ভয় না করে, সংকোচ না করে,জড়তা না রেখে সন্দীপকে একটার পর একটা ছবি দিয়েছি, এ আমার এক জীবনের আলোক প্রাপ্তি। এখানে তাই সন্দীপকেও বলতে চাই, আমার কুর্নিশ গ্রহণ করুণ।

অনেক ছবি। অনেক ঘটনা। অজস্র অভিজ্ঞতা। শেষে একটা গল্প বলতেই হবে, বর্ষা চলছে। সন্দীপ আমাকে নিয়ে মানবাজার। ছবি তুলতে। তো ঘুরতে ঘুরতে
একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি। সন্দীপ দেখতে পেয়েছেন একটি বড়ো কচু পাতায় একটি নিঃশব্দ শামুক। আমাকে নির্দেশ করলেন, কচু পাতার উপরে শামুকের কাছে আমার মুখটিকে হাঁ করতে হবে।

আমি সঙ্গে সঙ্গে তার কথা মান্য করলাম। শামুকের প্রাণের সঙ্গে আমার জীবন এক হয়ে একটি ছবি হয়ে উঠলো। শাদাকালো।

এই ভাবে চলতে চলতে সন্দীপ আমার বন্ধু। আমিও বন্ধু হতে পেরেছি তার কাছে।

একবার এক জায়গায় আমার মুখে সিগারেট। তখন সন্দীপের সঙ্গে আলাপ ছিল না। সিগারেটে টান দিতে দিতেই পরিচয় । তিনি ততক্ষণে ছবি তুলে চলেছেন।

আমার সিগারেট শেষ। সন্দীপ একটার পর একটা সিগারেট আমাকে দিয়ে যাচ্ছেন। কারণ, সিগারেটের ধোঁয়ার সঙ্গে আমার মুখ তিনি চাইছেন।

সেই প্রথম আলাপেও আমি সন্দীপের সৃষ্টিশীল মন পড়তে পেরেছিলাম।

----১৮ শ্রাবণ ১৪২৮
-----৪---৮----২০২১
-----নির্মল হালদার









সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

জাল / নির্মল হালদার

জাল / নির্মল হালদার





পাহাড়টা উড়ছিল। হাত পেতেছি যেই, আমার হাতে
দাঁড়িয়ে পড়লো। আমাকে প্রশ্ন করে, কী চাই?

কী চাই? নিজেকে প্রশ্ন করি এবার। কিছুই তো চাই না। পাহাড় আমাকে চুপচাপ দেখে, উড়তে শুরু করে।  
এই অবধি লিখে ডাইরিটা বন্ধ করে কবীর।সে ঘরের সিলিংয়ে চোখ রাখে। দেখতে পায়, একটা মাকড়সা। জাল বুনছে। এবং সে উপর দিকে উড়তে থাকে। আস্তে আস্তে জালে আটকে যায়। ছটফট করে। চিৎকার করার চেষ্টা করে, স্বর বেরোয় না। তার জল তেষ্টা পায়।

কোথায় জল পাবে? কে দেবে জল? তার কণ্ঠস্বর কোথাও পৌঁছয় না। সে মাকড়সার জালে জড়িয়ে জড়িয়ে  শেষে কাঁদতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হয়,
চোখের জল তাকে মানায় না। সে দাঁত দিয়ে ছিঁড়তে থাকে সমস্ত জাল। জালের জটিলতা। 

এত কঠিন জাল সহজে ছেঁড়া যায় না। সে প্রাণপণ চেষ্টা করে। দাঁতে দাঁত ঘষে। কিন্তু জাল ছেঁড়েনা। যদিবা জাল থেকে বেরিয়ে আসে শরীর, মাথা আটকে যায়। দম বন্ধ হয়ে যায় কবীরের। সে বুক ফাটিয়ে ডাকতে থাকে। মৃত্যু চিৎকার করতে থাকে ------ রুমেলা ------ রুমেলা ------। রুমেলা ----- ।

অনেক ডাকাডাকির পর রুমেলা এসে দাঁড়ায়। সে কবীরের অবস্থা দেখে মাথায় হাত রাখে। সে বলে,
মাকড়সার জাল থেকে কিভাবে তোমাকে মুক্ত করবো রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিনা। কবীর বলে,আগে এক গ্লাস জল দাও------তারপর দেখছি, কিভাবে কি করা যায়।
বেশি দেরি করা যাবে না আর। আমার প্রাণ যায় যায় অবস্থা। আমার মুখের থুতুও শুকিয়ে গেছে।

কবীর হাত--পা ছুঁড়তে থাকে। সে ঘরের সিলিং  এ নোখ আঁচড়ায়। সিলিং এর রঙ ঝরতে থাকে। কিছুতেই কিছু হয়না। রুমেলা বলে, তুমি উপর দিকে উঠলে কেমন করে? তুমি উড়ছিলে নিশ্চয়ই। কবীর বলে, এখন প্রশ্ন করার সময় নয়। তুমি চিন্তা করো আমাকে কিভাবে বাঁচাবে। রুমেলা উত্তর দেয় ------ বাঁচাবো বাঁচাবো। দাঁড়াও আমি যাচ্ছি তোমার কাছে।
রুমেলাও উড়তে উড়তে সিলিং এর কাছে। সে হাঁ করে মাকড়সার মাথা মুখের ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলে। আর চিবোতে থাকে। ক্রমশ জাল ছিঁড়তে ছিঁড়তে কবীরকে মুক্ত করে।

দু'জনে নেমে আসে নিচে। যেন বা এই প্রথম প্রাণ পেলো কবীর।

-----৯ শ্রাবণ ১৪২৮
----২৬---৭---২০২১
----নির্মল হালদার








শনিবার, ২৪ জুলাই, ২০২১

ভারতবর্ষ / নির্মল হালদার

ভারতবর্ষ / নির্মল হালদার




ক্লাস এইট অব্দি পড়াশোনা করে মকরের মনে হলো, দিনমজুরের কাজ করা ঢের ভাল। মায়ের হাতে অন্তত দু চার টাকা দিতে পারবে।

বাপটাও মরে গেছে। বাপও ছিল দিনমজুর। সন্ধ্যা হলেই, বাংলা মদ গিলতো। এত গিলতো যে অকালে চলে গেল।

মকরদের চাষবাসও নাই। শুধু একটা একচালা ঘর। খড়ের ছাউনি। মকরের মা একটা ছাগল পুষে ছিল। ছাগল চাষে লাভ হয় নাকি। সে ছাগলও রোগে রোগে
মরলো।

কপাল মন্দ হলে যা হয়। মকরের মা এই কথা বলে, কপাল চাপড়ায়। মকরকে কাজে যেতেই হয়। আর এমন ঠিকাদারের পাল্লায় পড়েছে, রোজ কাজ নাই।
যেদিন কাজ থাকে না সেদিন মকর হাড়াই নদীতে মাছ ধরতে চলে যায়।

মকরের বয়সীরা আজকাল ক্রিকেট খেলে না। ফুটবল খেলে না। শুধু মোবাইলে গেম। দেখা যায় অনেক ছেলেই নদীর ধারে এসে গেম খেলছে। কারণ একটাই, নদীর দিকে টাওয়ার থাকে। মকর তখন চেয়ে থাকে ছিপের দিকে------কখন একটা মাছ  লাগবে। অন্তত একটা মাছ। রাত্রিবেলা তাহলে, ভাতের সঙ্গে মাছের তরকারি। দু'মুঠা ভাত বেশি খাওয়া যায়। এমনিতে
প্রতিদিন শাক সিজা। আলু সিজা। ভাত। মকরের নাই ভাল লাগে। সে জানে তাদের পয়সা নাই।তার মা
লোকের ঘরে কাম করে এক থালা ভাত পায়।আর মাসে তিনশো টাকা। এই বৈশাখে যা হলো,ঝড়ে উড়ে গেছলো মকরদের খড়ের চাল।সে যা অবস্থা একটা রাত তো  ছাউনি ছাড়াই মা বেটা ঘরে শুয়ে ছিল।
খড় জোগাড় না হলে চাল ছাইবে কী করে? পরের দিন মাহাতদের ঘর থেকে একশো খড় এনে  ছাইতে হলো।
মাহাতরা মকরের মায়ের সঙ্গে শর্ত করলো,বেতন ছাড়াই কাজ করে দিতে হবে এক মাস। উপায় ছিল না। মকর মাঝেমাঝে যা রোজগার করে, এক পয়সাও জমে না।

মকরের বাপ কোনো টাকা পয়সা রেখে যায়নি। মকরও লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে তেমন কোনো কাজে
ঢুকতে পারে নাই।

গাঁয়ে থাকে। মকরের আর কোনো আয়--উপায় নাই।সে সময় সুযোগ পেলেই, মাছ ধরে।

হাড়াই নদীতে বারো মাস জল থাকে না। এখন বর্ষাকাল বলে, জল আছে। মাছও আছে। আজ
তাই, ছিপ ফেলেছে আশায় আশায়। যদি চ্যাঙ--গড়ই উঠে আসে।যদি উঠে আসে কয়েকটা পুঁটি। সেই আশাতেই মকর ছিপটা মাটিতে রেখে খৈনি ডলে বাঁ--হাতের তালুতে। আর ছিপটা পড়ে যায় জলে।ছিপটাও নদীর স্রোতে ভেসে ভেসে যায়। সে দেখতে পেয়েই, ঝাঁপ দেয় জলে। তুলে নিয়ে আসে।

মকরের জেদ বেড়ে যায়, সে আজ মাছ ধরবেই।রুই-কাতলাও ধরতে পারে। সে ভিজা কাপড়েই নতুন করে ছিপ ফেলে। উপর দিকে মুখ করে জোড় হাত করে বলে-----হে ঠাকুর আমার আশা পূরণ করবে। আমি তোমাকে  রঙ--বরঙের মাছ দেখাবো। এই নদীতে রঙিণ মাছও ঘুরে বেড়ায়। সবাই জানে না ঠাকুর।

এই  এইতো উঠছে একটা মাছ।

সূর্যাস্তের রঙ হাড়াই নদীর জলে খেলা করে।


-----৭ শ্রাবণ ১৪২৮
-----২৪-----৭----২০২১
-----নির্মল হালদার










শুক্রবার, ২৩ জুলাই, ২০২১

বালিকার মুখ / নির্মল হালদার

বালিকার মুখ / নির্মল হালদার




আমার সামনে হাত পেতে দাঁড়িয়ে আছে এক বালিকা। আমি পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখি, কিছু নেই।
বালিকার হাত ধরে বললাম-------চল্ আমার বাড়িতে।
সে না না করে। আমি বললাম-----ভয় নেই তোর চল্ -----তোকে মুড়ি দেবো। গুড়--মুড়ি খেতে চাইলেও দিতে পারি।

অনেকবার বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বালিকাকে বাড়িতে নিয়ে এসেছি। যদিও তার জড়োসড়ো ভাব কাটছে না। মাকে বললাম, গুড় মুড়ি দেবার জন্য। মা বললো, গুড়তো নেই, মুড়ির সঙ্গে ছোলা ভাজা দিতে পারি।
 
বালিকার মলিন মুখের দিকে চেয়ে মনে হলো, এই আমার দেশ। এদের রক্ষা করতে আমরা পারিনা। আমরা এদের ভিখারি সাজাই। অথবা ভিখারি তৈরি করি।

বালিকা বারান্দায় বসে নিচু মুখে মুড়ি খেতে খেতে লক্ষ্য করছে, খেলনা ট্রেনের দিকে। পছন্দ হয়েছে বুঝতে পারছি। বালিকাকে বললাম, ওই খেলনা ট্রেন তোর লাগবে? সে চুপচাপ থাকে। আমার দিকে
চেয়ে রয়। আমি বললাম, তোকে ট্রেনটা দিয়ে দেবো। তার আগে ওই ট্রেনে করে আমরা ঘুরে আসি চল্------।


খেলনা ট্রেন আমার ছোট ভাইপোর। সে এখনই চাইলে
দিতে হবে। ঝটপট তাই বালিকাকে নিয়ে ট্রেনে উঠে বসেছি। টিকিট কাটা হয়নি। না-হোক। আপাতত ঘুরে আসি। ধানচাটানি হয়ে উশুলডুংরি। পাহাড় ঘেরা গ্রাম। 

যে কোনো একটা গ্রামে নেমে পুতুলের সঙ্গে দেখা করবো। আমার সেই কাঠের পুতুল। বিয়ে হয়েছে বাঁশিটাঁড়ে। সে আমাদের দেখে খুশি হবে খুব।আমাদের খাওয়াবে নাড়ু।


একটা স্টেশন থেকে একজন হকার উঠলো। সে বিক্রি করছে কাগজের পুতুল। তেঁতুলের আচার। আমি বালিকার জন্য কিনে ফেললাম। তার চোখে মুখে হাসির ঝিলিক। সে তেঁতুলের আচার খেতেও শুরু করলো। আমার জিভে জল। তার কাছ থেকে খানিক নিয়ে জিভে দিয়েছি যেই, কি টক। কি টক। তবুও ভালো লাগছে। কেননা, অনেকদিন বাদে ঘুরতে বেরিয়েছি।

ধানচাটানির কাছে এসে দেখলাম সূর্যাস্ত হচ্ছে। তার রঙের বিভায় আমার মনে হলো, ঘরে ফিরবো না আর। বালিকাকে নিয়ে থেকে যাবো কোথাও।

বালিকাও ট্রেনের জানালা থেকে দু'চোখ ভরে দেখছে নানান দৃশ্য। সেও খুশি খুব।


দুপুর পার হয়ে যায়। খিদে এসেছে। যা আসে প্রতিদিনের মত। বালিকাকে শুধাই------তোর
খিদে পাচ্ছে। সে ঘাড় নাড়ে।


ট্রেন কে বললাম-----চলো ঘরের দিকে। জোরে জোরে হাঁক পাড়ি-----মা মা আমাদের খিদে পেয়েছে । খেতে দাও।  

খিদেই তো আমার দেশ। ক্ষুধা তৃষ্ণা আমার দেশ। এই বালিকা আমার দেশ। এই বালিকাকে আমি শুধু
খেলনা ট্রেনে তুলে বেড়াতে নিয়ে যাবো। তার বেশি কিছু করবো না। এই বালিকাকে আমি শুধু গুড়--মুড়ি খাওয়াবো। সেই সঙ্গে বালিকার হাতে গুঁজে দেবো কয়েকটা টাকা। আর ভুলে যাবো বালিকার মুখ।আমার দেশের মুখ।

----৬ শ্রাবণ ১৪২৮
----২৩----৭----২০২১
-----নির্মল হালদার






বৃহস্পতিবার, ২২ জুলাই, ২০২১

এই আমি / নির্মল হালদার

এই আমি / নির্মল হালদার




পালকের সঙ্গে দুপুরে দেখা হলো। আজ সকালে দেখা হয়নি। আমি কোথায় ছিলাম?

পাহাড়ে যাইনি। সমুদ্রেও না। আমি কোথায় ছিলাম?

আচ্ছা আচ্ছা এবার মনে পড়লো, আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল শৈলেন কুন্ডুর। অনেকদিন বাদে দেখা। কথা ফুরোয় না। দেরিটা সেখানেই। ফলে, অযোধ্যার আঙুর বাগানে যেতে দেরি হয়ে গেল। আরও দেরি, শেয়ালের জন্য। সে যে থাকবে আমার ভাবনার বাইরে ছিল।
ভাগ্যিস ছিল, তাই টক আঙুর মিষ্টি আঙুর চিনতে পেরেছি। পালকের পছন্দের মিঠে আঙুর একটা একটা তুলে ভর্তি করেছি আমার ঝুলি।

পালককে কিছু না দিলে সারাটা দিন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। কালকে তো গেছলাম কমলালেবুর বাগানে।
কি রঙ।কি  সুগন্ধ। দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। পালকও খুশি হয়। সে যে কোনো ফল ভালোবাসে।তার জন্য কলা বনেও যাই। দেখা হয়ে যায় হাতির সঙ্গে।

আজ শৈলেন বাবুর সঙ্গে দেখা হলো কেন? তার সঙ্গে তো আমার কোনো সম্পর্কই নেই। এমনতো হতে পারে, তিনি শৈলেন বাবু ছিলেন না, ছিলেন মৃন্ময় বাবু। কিংবা  আশুতোষ বাবু। যিনি হাত দেখাতে পছন্দ করেন। হাতের রেখা চেনেন খুব বেশি করে। ভাগ্যের প্রতি অগাধ বিশ্বাস।

কিন্তু শৈলেন বাবু মৃন্ময় বাবু হতে যাবেন কেন? অথবা আশুতোষ বাবু কেন হবেন? আমার সঙ্গে শৈলেন বাবুরই দেখা হয়েছিল। এই শৈলেন বাবু কোনো ভাবেই মুখোপাধ্যায় নন। এই শৈলেন বাবু, শৈলেন কুন্ডু। আপাদমস্তক ভদ্রলোক।

কি কথা বলছিলাম, যে, আমার দেরি হয়ে গেল পালকের কাছে পৌঁছোতে? জুতোয় তো পেরেক ছিল না। পথে কোনো কষ্ট ছিল না। তবে?

রাস্তায় রাস্তায় ভিড় ছিল না। গাড়িঘোড়ার জটিলতা ছিল না। আমি তো হাঁটছিলাম। আমি সমুদ্রে গেলেও হেঁটে যাই। নিজের পায়ের শব্দ শুনতে শুনতে হেঁটে যাওয়া খুব সুখের। মনে হয়, আমার একজন সঙ্গী আছে।

শৈলেন বাবু কি বলছিলেন মনে পড়ছে না তেমন। একটাই কথা মনে পড়ছে শুধু, তিনি বলছিলেন এই শ্রাবণ মাসে  অনেকের সঙ্গে দেখা হবে। তাই তিনি বেশ আনন্দে আছেন।

আমার সঙ্গে তো কারো দেখা হয় না। একই ঘরে থেকে পালকের সঙ্গে দেখা করতেও আমার তো দুপুর হয়ে যায়।

দুপুরটা খুব খাপছাড়া। কোথাও মসৃণতা নেই। খচখচে লাগে। তখনই মনটা বেসামাল হয়ে ওঠে। মনে হয়, পালকের সঙ্গে খেলাধুলা করি।ওর কাছে নানা রকম পুতুল। দু'জনে পুতুল খেলবো।

আমরা পেয়ারা বাগানও যেতে পারি। গাছে উঠে পেয়ারা ফুল খুঁজে খুঁজে আমরা সহজেই জেনে
যাবো, ক'টা পেয়ারা হবে।

এখনো আশ্চর্য লাগছে, শৈলেন বাবু আমাকে চিনতে পেরেছেন ঠিকই কিন্তু আমার নামটা ভুলে গেছেন। আমি নীলেন্দু না নিমাই তিনি মনে করতে পারছিলেন না। আমি হাসতে হাসতে বললাম, আপনি যা ইচ্ছে নামে ডাকতে পারেন। আপনি আমাকে ভোদাই বললেও খুশি হবো।

একথা সে কথার পর আমরা চায়ের দোকানে গেলাম। আমার মন যদিও ছটফট করছিল, কখন দেখা হবে পালকের সঙ্গে।

পালকের জন্য আঙুর। পালকের জন্য পেয়ারা।পালকের জন্য কলা। 

কেবল কাছে যেতে হয়। হাত পাততে হয়।

হাতটা আমি বড়োই করেছি। আকাশের কাছে হাত পেতে পেতে হাতটা এত বড়ো হয়ে গেছে যে এখন আর কারোর কাছে হাত পাততে সমস্যা হয় না।

কখনো কখনো হাত না পেতেও বৃষ্টি পেয়েছি। বৃষ্টির রঙ বৃষ্টির আনন্দ পেয়েছি। শৈলেন বাবু জানেন না, আমি ধুলায় ধুলায় শুয়ে পড়তে পারি। শৈলেন বাবু জানেন না, আমি ভালোবাসার কাছে শতবার নত হতে পারি।

শৈলেন বাবুর সঙ্গে দেখা হলো কেন? এ প্রশ্নটাও আজ আমার মধ্যে ঘুরছে। দীপক বাবুর সঙ্গেও দেখা হতে পারতো।  যে দীপক বাবু আমাকে বলেছিলেন--------
কারো সঙ্গেই দেখা হয় না হে------কেবল দিনরাত্রির সঙ্গে দেখা হয়।

আমার সঙ্গেও শৈলেন বাবুর দেখা হয়নি। অযথা কিছু বিভ্রম আমাকে আজ পীড়িত করছে। আমি আজ  পালকের সঙ্গে কথা বলিনি একটাও।


-----৫ শ্রাবণ ১৪২৮
----২২----৭----২০২১
----নির্মল হালদার




কবি নির্মল হালদারের বিভিন্ন সময়ের ছবি

পড়ুন "ঘর গেরস্থের শিল্প"

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ