মঙ্গলবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২২

কবি নির্মল হালদারের গদ্য



ভুবন ডাঙ্গা//

সূর্যাস্তের করুণ আলো ছড়িয়ে পড়ছে চরাচরে। ঘরে ফিরছে পাখিরা।

পাতা ঝরে।

গাছপালার সবুজে সবুজে মায়া লেগে আছে।

ধুলো উড়িয়ে গাই গরুর দল ঘরের দিকে। সেই গোধূলির দিকে চেয়ে আছেন এক অনিন্দ্য সুন্দর পুরুষ।

তিনি একা।

শিলাইদহ থেকে ফিরে এসে
এখানেই তিনি এই লাল মাটির দেশে ।

গাছপালার ফাঁকফোকরে দেখা যাচ্ছে কয়েকটি আদিবাসী ঘর।

নিঝুম।

দু তিনটে শুয়োর শুয়ে আছে মাটিতে। একটা মোরগ ডানা ঝাপটে ঝোপের দিকে চলে গেল।

অনিন্দ্যসুন্দর পুরুষটি মনে মনে
রচনা করেন-------

চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো
তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে।

সুর আসছে না।

তিনি একজনকে খুঁজছেন।

তিনি আকাশের দিকে চোখ মেলতেই , আবছা আঁধার।
তিনি মনে মনে দেখতে পেলেন,
সন্ধ্যাতারার রূপ।
তাঁর মনে হলো, রূপের আগুন
সবাইকে যদি দেখাতে পারতেন।

তিনি প্রশ্ন করলেন নিজেকেই----
অন্তর কি আছে সকলের?

তাঁর হেঁটে যাওয়ার জন্য পায়ের তলার পাতা শুকনো পাতা ভেঙ্গে যাচ্ছে। শব্দ উঠছে শুধু। সেই শব্দ যেন বলছে-----নেই নেই কিছু নেই।

কিছুই কি নেই?

এইযে তারার আলোর মত শব্দ আসছে বাক্য আসছে, এইযে-----

আজি ওই আকাশ পরে সুধায় ভরে

কে পাঠালো আমার কাছে?

তিনি একটি গাছের কাছে দাঁড়ালেন। যেন তাঁর যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর দেবে গাছটি।

তিনি গাছের গায়ে স্পর্শ রাখলেন।
তাঁর গায়ে পড়লো অর্জুন গাছের একটি ফল।
তিনি মাটি থেকে কুড়িয়ে ফলটিকে প্রশ্ন করলেন, তোমার সঙ্গে আগে কোথাও দেখা হয়েছে?

আদিবাসীদের ঘর থেকে শব্দ আসছে। সুতোর মতো ক্ষীণ আলো আসছে।
তিনি এগিয়ে যেতে যেতে থমকে দাঁড়ালেন।
হঠাৎ তাঁর মনে পড়লো তাঁর একটি চরিত্র। বিশু পাগল।

তার সঙ্গে এখানে দেখা হলে খুব ভালো লাগতো। মনে হতেই মনে মনে হেসে উঠলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়লো,দিনু আসবে তাঁর ঘরে। নতুন গানের সুর নিয়ে।

এই এক বিপদ হয়েছে, গান না লিখলে, গান না শুনলে তাঁর মন
বিচলিত হয়ে পড়ে। মনে হয় চন্দ্র সূর্য আর উঠবে না। দিগন্তে উড়বে না কোনো উত্তরীয়।

যখন লেখা আসে না তখন
ইচ্ছে করে না কথা বলতে।

ঊষাকালে ঘুম থেকে উঠেই তিনি
কথা বলেন আকাশের সঙ্গে।
আকাশ অনেক দূরের হলেও তাঁর
সঙ্গে কথা বলতে নিচে নেমে আসে।
একা আসে না শুকতারাকে নিয়ে আসে।

তিনি মাটি থেকে ধুলো কুড়িয়ে
কি যেন দেখলেন।

ধুলোর মধ্যে কি প্রাণ আছে?

গুনগুন করে উঠলো মন------

আজ কিছুতেই যায় না মনের ভার।

চাঁদ উঠছে আকাশে।

একটি অর্ধ নগ্ন ছেলে এসে
তাঁর পরনের পাঞ্জাবিতে টান দেয়।
তিনি পিছন ফিরে দেখেন, ছেলেটি তার ভাষায় কিছু যেন বলতে চাইছে। তিনি বুঝতে পারছেন না। তিনি ইশারায় বললেন------চলো
তোমাদের ঘরের দিকে যাবো।


------২৩ চৈত্র ১৪২৮
------৭----৪----২০২২




ভুবন সায়র//

আজান ধ্বনির সুর ছলকে পড়ে
সায়রের জলে।

এক --একদিন আজান ধ্বনির সুরে জেগে ওঠে সূর্যদেব।

পাখিরাও জেগে ওঠে।

ছোট্ট রুস্তমের ঘুম ভেঙে যায়।
সে মায়ের কোলে কেঁদে ওঠে।

রুস্তমদের ঘর সায়রের কাছেই।
মসজিদের কাছাকাছি।

রুস্তমের ঠাকুমা আজানের আগেই উঠে পড়ে।

সায়রে যায়।

সায়র শান্ত হয়ে থাকে শিশিরে শিশিরে ভিজে।

শ্যাওলা ভাসে। পাতা ভাসে।
পুরনো ছেঁড়া কাগজ ভাসে।

মন ভাসে বৈকি।

রুস্তমের ঠাকুমা দেখতে পায়। দেখতে পায় জলের ভেতরে খেলা করছে মনের মত মাছ।

সহজে ধরা যাবেনা।

সায়রের জলে স্নান। কাচাকাচি।


গোপন ব্যথার চোখের জল
এই সায়রেই।

এই সায়র নিজেকে লুকিয়ে রাখে।

দয়াবান এক মানুষ নাম ছিল ভুবন সিং ----তিনি এই সায়র
মানুষের উপকারের জন্য দিয়ে গেছেন।
রুস্তমের ঠাকুমা তার বিয়ের পরেই এই গল্প শুনেছে। তারপর তো দিনের পর দিন চলে যায়,
কত কত মানুষের দুঃখ-কষ্ট-বেদনা আনন্দ সায়রের
জলে পড়ে তলিয়ে গেছে।

মসজিদ থেকে ছড়িয়ে পড়ে
আজানের সুর।

ভুবন সিং যেখানেই থাকুন
লক্ষ্য করেন মানুষ তার ঘামের সঙ্গে ধুয়ে ফেলছে নিজের পাপ।

রুস্তমের ঠাকুমা জানে, নিশ্চিত জানে আল্লাহ থাক বা না থাক,
ভুবন সিং আছে সায়রের ছোট ছোট ঢেউয়ে।

ঝড় এলে রুস্তমের ঠাকুমার মনে হয়, আজ ভুবন সিংয়ের রাগ হয়েছে সে জল তোলপাড় করে দেখবে, সায়রের পাড় কারা নোংরা করে গেছে।

উথালি পাথালি জল ধুয়ে যাবে
পাড়। কেননা, মানুষের পা পড়বে যে। মানুষই যে শেষ কথা বলবে।

শেষ কথা বলেও।


------২৭ চৈত্র ১৪২৮
-----১১----৪----২০২২



পুনশ্চ
---------

দূর থেকে দাঁড়িয়ে বাড়িটা দেখছে
অনিকেত। সকালবেলা। শিশিরে শিশিরে ভিজে আছে চারদিক।
সেও ঘাসে ঘাসে পা ফেলে ভুবন ডাঙ্গা থেকে এইখানে।

এই বাড়িটাতে গুরুদেব থাকেন?

অনিকেত কখনো দেখতে পায়নি।

এই বাড়িটাইতো "শ্যামলী"।

বাড়িটাতে প্রবেশ করার মত তার অধিকার আছে কী?

বাড়িটার পিছনে অনেক গাছপালা। সেই সঙ্গে অনেক পাখি। যেনবা পাখিদের ডানা থেকে গাছের ডানায় লটকে আছে
আকাশের টুকরো।

বাড়ির রাস্তাতে লাল কাঁকুরে মাটি। শীতের শিশিরে ভিজে থাকা
মাটিও যেন বলতে চায়--------
আমাকে বস্ত্র দাও।

তিনি কি ভোর বেলা থেকেই ব্যস্ত থাকেন নিজের লেখালিখিতে?
একবার ও দেখা গেল না।

কী লেখেন তিনি?

তাঁকে কেন বলা হয় গুরুদেব?
তিনি কি সাধু? তাঁর মন্ত্র কি?

একটা ছায়া দেখা গেল।
গুরুদেবের ছায়া?

অনিকেত তাঁকে তো দেখেছে গাছতলার ক্লাসে। তারপরও তার কৌতুহল তাঁর বাড়িতে তাঁকে দেখবে।
প্রভাতকে বলছিল তার কৌতূহলের কথা। প্রভাত বলেওছে অনিকেতকে গুরুদেবের বাড়িতে নিয়ে যাবে একদিন।
প্রভাত গুরুদেবের গান করে বলে,
সহজেই তাঁর বাড়িতে যেতে পারে।

দুপুরে ঘুমে যাওয়া অনিকেতের অভ্যাস নেই। রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে 
সে কোণার্ক-এর সামনে।

এই বাড়িটাইতো কোণার্ক?

মনে সন্দেহ এলেও অনিকেত 
একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে। যদি এই দুপুর বেলা গুরুদেব বাইরে আসেন!

সে কথা বলবে না। শুধু দেখবে
বাড়িতে তাঁর কী ভূমিকা?

দরজা জানালায় পর্দা।

মাঝে মাঝে পর্দা উড়লেও দেখা যায় না কিছুই। দূর থেকে দেখলেও চারদিক নিঃশব্দ লাগে।

অনিকেত আজ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে
চলে গেছলো উদয়ন বাড়িটার ভেতরে। কিন্তু কোথাও গুরুদেবকে দেখতে পায়নি সে।

ঘুম ভাঙতেই তার জেদ চেপে গেল মনে, সে কোন কিছু ভাবনা চিন্তা না করে, গুরুদেবের একটা বাড়িতে ঢুকে পড়বে।
যদিও শুনেছে সে, একটা বাড়িতে
একটানা বেশি দিন তিনি থাকেন না। তাহলে?

কোন্ বাড়িতে আছেন কার কাছে খোঁজ করবে অনিকেত?
তার মনের সাধ গুরুদেবকে একটা কলম দেবে।
প্রভাত বলছিল, তিনি কখনো কখনো ছাতিম তলা দিয়ে হেঁটে যান। তখন দিয়ে দিলেই হবে।

শালবীথি দিয়েও তিনি হেঁটে যান।
কই, অনিকেত তো কোনদিন দেখতে পায়না।

শীতকালেও বৃষ্টি।

শান্তিনিকেতনের গাছপালা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কেপে উঠছে।

অনিকেত নিজেও ভিজছে।
সে গায়ের চাদর মাথায় ঢেকে 
হেঁটে যায় উদীচীর কাছাকাছি।
গুরুদেব যদি দরজা জানালার
পর্দা খুলে বৃষ্টি দেখছেন?
তাঁর চোখ মুখের অভিব্যক্তি দেখা যাবে না?

সে শুনেছে, গুরুদেবের বাড়িতেও
নাটকের মহড়া গানের রিহার্সাল
হয়ে থাকে। সে সঙ্গীত ভবনের ছাত্র ছাত্রীদের সঙ্গে ঢুকে পড়বে।
কিন্তু তার জড়তা কিছুতেই কাটতে চায়না। কথা বলেনা বিশেষ কারো সঙ্গে।

আশ্রমের যে কোন অনুষ্ঠানে
অনিকেত পিছনে থাকে সবসময়।
তার কাঁধে কেউ হাত রাখলে সে কেঁপে ওঠে।

হোস্টেল ঘরেও সে প্রায় সময়
জড়োসড়ো হয়ে থাকে। অথবা
মুখ গুঁজে থাকে বইয়ের ভেতরে।

গুরুদেব বাড়ি পাল্টে পাল্টে থাকেন। কত লোকের একটাও বাড়ি নেই। আর তিনি একটার পর একটা বাড়িতে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

এই তো সেই পুনশ্চ।

এখন এই বাড়িটাতে গুরুদেব থাকছেন কয়েকদিন হলো।
দেখা যাচ্ছে, বারান্দায় এক বাউল।
তার উত্তরীয় বারান্দা থেকে উড়তে উড়তে মেঘ ছুঁয়ে দিগন্তের দিকে চলে যায়।

এই বাউল কি গুরুদেব?


--------২৪ বৈশাখ ১৪২৯
-------৮----৫-----২০২২
-------নির্মল হালদার















কবি নির্মল হালদারের গদ্য



১ লা বৈশাখ//

গ্রীষ্মের ছুটি পড়ে যাবে।

এখানে এই বীরভূম জেলায় গ্রীষ্মকালে জলের স্তর অনেক নিচে চলে যায়। অভাব দেখা যায় জলের।
কুয়োতে জল থাকে না। শুকিয়ে যায় নদীনালা পুকুর। কাঁদরে কাঁদরে ধুলো ওড়ে।

আশ্রম এ যেটুকু জলের ব্যবস্থা আছে শুকিয়ে যায়। এ কারণেই
আশ্রম বিদ্যালয়ে ঘোষণা করা হয় ছুটি ।

গুরুদেব যখন ছিলেন তিনি এই ব্যবস্থা করে গেছেন।
ললিত আরো শুনেছে, গুরুদেবের জন্মদিন ১ লা বৈশাখেই পালন করার রীতি। যেহেতু আশ্রমের
ছেলেমেয়েরা গ্রীষ্মের ছুটিতে চলে যাবে বাড়ি এবং তারা না থাকলে
জন্মদিন টা ফাঁকা ফাঁকা লাগবে।

ললিতের মন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। আশ্রমের অনেকেই আজ
চোত--সংক্রান্তির মেলা দেখতে গেছে গ্রামের দিকে। কথা ছিল
সেও যাবে। তার মনে পড়ে গেছে,
তাদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাকে একটা গান গাইতেই হবে
পল্লীর ক্লাবঘরে। সেই গানটা এখনো তুলতে পারেনি ললিত।
আজ রামময় দার হোস্টেলে গিয়ে
তুলে নিয়ে আসতে হবে গানটা।

এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ-----

এই গানে গ্রীষ্ম কে আহ্বান করা হচ্ছে। কিন্তু ললিতের গলায় সেই আন্তরিক সুর পাওয়া যাচ্ছে না।
বারবার তালিম নিয়েও কোথায় যেন আটকে যাচ্ছে ললিত।
রামময় দার এই বক্তব্যের কাছে
আর কোনো কথা চলে না। তাকে
তালিম নিতে আজ বসতেই হবে।
কাল সকালে গুরুদেবের জন্মদিন হয়ে গেলে চলে যেতে হবে গ্রামের বাড়ি।

এই গানটা গাইতেই হবে। যদিও ললিতের ইচ্ছে ছিল ওই গানটা------

মধ্যদিনে যবে গান বন্ধ করে পাখি
হে রাখাল , বেণু তব বাজাও একাকী।।

এই গানে মন খারাপ আছে। লুকানো এক কান্নাও আছে।
আর এই গানটাই করতে ইচ্ছে করে ললিতের।

গুরুদেবের জন্মদিনেও তার গান গাইবার কথা ছিল। সে কোনো ভাবে নানা অজুহাত দেখিয়ে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে।

জন্মদিন অনুষ্ঠানে যাবে শুধু।

দূর থেকে দেখবে গুরুদেবের
ছবিতে ঝুলে আছে শুকনো মালা।

গাছে গাছে শুধু কচি কচি পাতার হিল্লোল। গুরুদেব কে অভিবাদন জানাবে।

গতবছরের একটা দৃশ্য মনে পড়ে ললিতের । জন্মদিনের অনুষ্ঠানে
এক বৃদ্ধা কাঁদছিলেন।
সেই কান্না দেখে ললিতের চোখ ভিজে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল তার, তার চোখের জল
গুরুদেবকেই সে উৎসর্গ করলো
নতুন বছরে। জন্মদিনে।

গ্রীষ্মের ছুটিতে ছেলেমেয়েরা চলে যাবে বলেই, ২৫ শে বৈশাখের বদলে সবাইকে নিয়ে গুরুদেব পালন করতেন নিজের জন্মদিন।

কেমন ছিল সেই জন্মদিন?

ললিতের গলায় এসে পড়েছে
সেই গানটি----------

মধ্যদিনের বিজন বাতায়নে

এই গানেওতো মন খারাপ।

গুরুদেবের গানে বিষণ্নতা ছাড়া কিছু কি নেই?

ললিতের গায়ে এসে পড়লো একটা দমকা হাওয়া।


------১৮ চৈত্র ১৪২৮
-----২---৩---২০২২




অঙ্কুরের মাটি//

বাবার হাতে ক্যামেরা দেখে ছেলের ঝোঁক-----তারও ক্যামেরা চাই।
ক্যামেরা যেন খেলার সামগ্রী।
ক্যামেরা না পেলে কেঁদে ওঠে ছেলে। ৭ বছরের ছেলের কাছে তাই ক্যামেরা হয়ে উঠল পুতুল।

খেলার পুতুল।

বাবা পলাশ ঘোষ আলোকচিত্রশিল্পী। ক্যামেরা নিয়ে হাটে ঘাটে গ্রামেগঞ্জে ঘুরে বেড়ান।
সঙ্গে ছেলেও যাবে।
বাবার কাছে ছেলের বায়না, সে দেখবে ক্যামেরা নিয়ে বাবা কি করেন। তার কাছে তো ক্যামেরা
খেলনা বৈ কিছু নয়।

কিন্তু ছেলে দেখতে পেলো, বাবার ক্যামেরায় ছবি আসছে।
ঘরবাড়ি গাছপালা নদী পুকুর পাহাড় মানুষ সমস্তই আসছে।

এওতো এক খেলা।

ছেলে আদিত্য। আদিত্য রঞ্জন ঘোষ সেই ছোট থেকেই ক্যামেরার নেশায়।
এবং তার ক্যামেরায় স্থির হয়ে পড়ে চলমান জীবনযাত্রা।
পুরুলিয়ার ভূপ্রকৃতি। তার বৈচিত্র্য। তার পরব---পার্বণ।
মানুষের "রিঝ"। সঙ্গে ধরা পড়ে
পুরুলিয়ার মাটি। রুক্ষতা।

এক ফসলি জমির চরিত্র।

এখানে এই ছবিগুলিতে পুরুলিয়ার পালা পার্বণ এবং পালা-পার্বণের রঙ। সাধারণ মানুষের উল্লাস ধরা পড়েছে।

আদিত্য যেন বলতে চায়-----
"সবকিছুতেই খেলনা হয়"।
যে খেলনাগুলি জীবনের অঙ্গ।

কান্না হাসির মতই জীবনের সঙ্গে।

ক্যামেরা নিয়ে খেলতে খেলতে
তার ক্যামেরা কথা বলে। নিঃশব্দ।

নিঃশব্দ--নীরব ভাষার সঙ্গে থাকতে থাকতে আদিত্য পনেরো বছরে এসে দাঁড়ালো।

আমি তার খেলার সঙ্গী হতে চেয়ে
বন্ধুতা করেছি তার ছবির সঙ্গে।

বন্ধুতা করতে পারবো?

সাপ যেমন পদ্মফুলকে জড়িয়ে
খেলা করতে চাইলেও খেলা করতে পারে না। কেবল পদ্মের ডাঁটি ধরে ধরে ঘুমিয়ে যায়।

আমিও আদিত্যর ছবির কাছে
তার ছবির আবেশে ঘুমিয়ে পড়ছি।
আমার এই ঘুম আসলে এক জাগরণ।

আমি শান্ত হয়ে একা একা
আদিত্যর শাদা কালো ও
রঙিন ছবির সঙ্গে থাকতে চেয়ে
আদিত্যকে দিলাম প্রতিদিনের আকাশ।

মাটিতো পেয়েছে সে।

ক্যামেরা তার কাছে যেমন পুতুল
তেমনি মাটিও। যে মাটি থেকে
সে সৃষ্টি করে অসংখ্য পুতুল।

নড়াচড়া করে পুতুল।

চুপচাপ থাকে পুতুল।

জেগেও ওঠে পুতুল।

আমি আদিত্যর পুতুলের গলায়
পরিয়ে দিলাম রামধনুর মালা।


-------২০ চৈত্র ১৪২৮
------৪-----৪----২০২২




 কুঠিবাড়ি//

দময়ন্তী হোস্টেলে ফিরে এসেই
জ্বরে পড়লো। তার ঘরের বন্ধু বিশাখা বলে-----তুই আবার বাড়ি চলে যা। সারাদিন তোকে কে দেখবে?
আমিতো ক্লাস করতে চলে যাবো।
একা একা যদি যেতে না পারিস
আমি তোকে পৌঁছে দিয়ে আসবো।

দময়ন্তীর বাড়ি তেঘরিয়ার কাছে।
বাস থেকে নেমে গরুর গাড়িতে যেতে হয়।
অথবা হেঁটে যাওয়া।

দময়ন্তীর বাবা চেয়ে ছিলেন 
মেয়েকে যে কোনো কলেজে ভর্তি করতে। কিন্তু দময়ন্তীর মনের সাধ মেটাতে শেষ অবধি এইখানে।

গুরুদেবের আশ্রমে।

গুরুদেবের আশ্রম বীরভূম জেলাতে হলেও বীরভূমের ছেলেমেয়েরা যে খুব  পড়তে আসে এমনটা নয়। দময়ন্তীর
ইচ্ছে পড়াশোনার পাশাপাশি
গান-বাজনা করবে। যা অন্য কোথাও নেই।

সে তো  সঙ্গীত ভবনে যায়।

তার পড়াশোনার ক্ষতি হয় না কোনো। সে আশ্রমে এসে গুরুদেব কে পেয়েছে দু'বছর। গান করেছে গুরুদেবের কাছে।

 গুরুদেবের প্রশংসা তার মাথায়
ধান দুর্বার মত। সে আজীবন বয়ে বেড়াবে ‌।

জ্বর টা আবার আসছে।

শীত করছে দময়ন্তীর। সে
খুঁজে পায় না কোনো চাদর।

একটা কাঁথাও ছিল তার।
সাবিনা তাকে উপহার দিয়েছিল।
কাঁথায় ছিল সাবিনার মায়ের
হাতের কাজ। দেখার মত।

কাঁথাটা কোথায় গেল?

সে দরজা খুলে খুঁজছে এক টুকরো রোদ।

শীতের দিন বেলা তিনটে বাজতে বাজতেই রোদ ফুরিয়ে যায়।
যেটুকু রোদ আছে আড়াল হয়ে গেছে গাছপালার জন্য।

ছাতিমতলার দিকে খেলা করছে
কয়েকটা চড়ুই।
ওরা কি দময়ন্তীর মা-বাবাকে বলে দিয়ে আসবে,
তার শরীর খারাপ।

আজ চণ্ডালিকা।

দময়ন্তীর কন্ঠে গান। কিন্তু কিভাবে গান করবে সে?

আমি চন্ডালী-----সে যে মিথ্যা
সে যে মিথ্যা।
সে যে দারুন মিথ্যা।
শ্রাবণের কালো যে মেঘ
তারে যদি নাম দাও চন্ডাল
তা বলে কি জাত ঘুচিবে তার,
অশুচি হবে কি তার জল।

কে গাইবে? কে গাইবে আজ?

দু'বছর এসেও দময়ন্তীর কুঠিবাড়ি দেখা হয়নি। সে ভেবেছিল অনুষ্ঠানের অনেক আগেই বিশাখার সঙ্গে চলে যাবে। ঘুরে ঘুরে দেখবে কুঠিবাড়ির ভেতর-বাহির।

কুঠিবাড়ি সম্পর্কে অনেক তথ্য দিয়েছিল রামানুজদা। দময়ন্তীর অবাক লাগে, রামানুজ দা ছাত্র হয়েও ঠাকুরবাড়ির অনেক গল্প জানে। অনেক তথ্য জানে।

মাথা যন্ত্রণা করছে তার ।

দময়ন্তীর শরীর খারাপের কথা
সঙ্গীত ভবনে পৌঁছে দিয়েছে বিশাখা। গুরুদেব একজনকে পাঠিয়ে ছিলেন দেখার জন্য।
কতটা শরীর খারাপ। গান করতে পারবে কিনা।

দময়ন্তী জানিয়ে দিয়েছে তার পক্ষে গান করা সম্ভব নয়। 
তার গলায় কথাও আসছে না।

হোমিওপ্যাথিকের বড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন গুরুদেব। যদি সন্ধ্যে অবধি দময়ন্তীর শরীরটা ভালো হয়ে ওঠে। কেননা, গুরুদেব দময়ন্তীর বিকল্প হিসেবে আর কাউকে ভেবে রাখেননি।

দময়ন্তী মুষড়ে  যায় । মনে মনে ।
তার মনের মধ্যে কেউ বাজিয়ে দিয়ে যায় ---------

জল দাও, জল দাও, জল দাও।।


------২২ চৈত্র ১৪২৮
-----৬-----৪----২০২২
------নির্মল হালদার












আঁকাবাঁকা শিকড়ের ছায়া



মাছের জাল
-----------------

নদীর ধারে মাছের জাল শুকায়

রাতের বেলা ধরা পড়েছিল মাছ

দিনের বেলা ধরা পড়ে ও পালিয়েছে,

আলো-বাতাস।



তেজপাতা
--------------

তেল হলুদ নুন লঙ্কা বাদে
আর কী নেই?

তেজপাতার মতো উড়ে এলো একটি মেয়ে

রান্নাঘরে।




ইঁটভাটা
-----------

গাছ তলায় ইঁট পেতে
আকাশে রেখেছে মাথা,

হলধর বাউরী।

তার পায়ের কাছে এসে পড়েছে
ঘাস পোকা।
তার মাথার চুলে বিলি কাটছে
সন্ধের শুকতারা।

ইঁটভাটায় জ্বলবে আগুন।


------২৬ চৈত্র ১৪২৮
-----১০----৪----২০২২




জবা ফুল
-------------

পোড়ো বাড়িতে জবা ফুলের গাছ।

ফুলের রেণু উড়ে উড়ে বেড়ায়।

জবা ফুল উড়ছেও।

মাটিতে কার পা?




মহুল
-------

গাছে মহুল

ঘুঙুর বাজায়।

ও ঘুঙুর পায়ে বাজবেনা।
পথে-পথেও বাজবে না।
শুধু
হরিমতির ঝুড়িতে,

ঝম ঝম করে বেজে উঠবে।




অসুখ
--------

গরুটা আজও পালে গেল না।

না--খড়  না--মাড়
মুখে দেয় না কিছুই

অবলা প্রাণী।

গোয়ালের এক কোণে মাকড়সা
জাল বুনছে না আর।


------২৭ চৈত্র ১৪২৮
-----১১---৪----২০২২



কুঁচ ফল
-----------

গলায় পরবে বিছা হার
কোমরে পরবে বিছা---
মনের সাধ রয়ে গেল মনে

বনের দিকে ছুটে যায় মেয়ে

বুনোলতে পেকেছে কুঁচ ফল

রাঙা কুঁচ ফল গলায় গাঁথবে মেয়ে।




চুড়ি
------

এক গাছা চুড়ি শীর্ণ হাতে ঢলঢল করে

আরেক গাছা চুড়ি
ঘরের দেয়ালে পেরেকে টাঙানো।

সোনালি চুড়ির আভা সরল হয়ে ওঠে

রৌদ্র কিরণে।


-----২৮ চৈত্র ১৪২৮
-----১২----৪-----২০২২



ছিরি
-------
আকাশ যেন দোমড়ানো মোচড়ানো
ধোঁয়াটে ধোঁয়াটে
হাঁড়িতে ঢোকানো জামা কাপড়ের মত
ছিরি ছাঁদ নেই

চেয়ে থাকা মাটিও চিনতে পারছে না।



দণ্ডবৎ
---------

গরুর ক্ষুরে ধুলো এসে
পার হয়ে যায় রাস্তা।

একদিন গরুর লেজ ধরে
বৈতরণী পার, তাই

রাস্তার ধুলো
ক্ষুরে ক্ষুরে জানায় দণ্ডবৎ।




স্মৃতি
-------

বাক্স খুলতেই ন্যাপথলিনের গন্ধ।

স্মৃতি উঠে এলো।

শাশুড়ি বলেছিল, বেনারসিতে যেন
পোকা না লাগে, দেখো
বন্ধন যেন পোকায় না কাটে।


------২৯ চৈত্র ১৪২৮
-----১৩----৪----২০২২



ওল
-----

মাটি খুঁড়ে পেয়েছে একটি-দুটি ওল

যা ছিল পিঠের ভার

নামিয়ে চলে গেছে কেউ।




কাকতাড়ুয়া
----------------

সারাদিন পাহারা দিয়েও
তাড়াতে পারে না রোদ।
পুড়ে যায় শসার খেত, করলার পাতা

ছাগল এসেও মুখে টানে কচি ঝিঙা।

নীরব হয়ে থাকে হাঁড়ি মুখো কাকতাড়ুয়া।


-----৩০ চৈত্র ১৪২৮
-----১৪----৪----২০২২




ঠাঁই
------

রাত্রিবেলা
মেঠো ইঁদুরের দৌড়োদৌড়িতে
চাঁদ ও দৌড়োদৌড়ি করে।
চাঁদ ও খোঁজে  ইঁদুরের গর্ত।
যদি কখনো গর্তে থাকা যায়,

আহারের অভাব হবে না।




আল
--------

শাড়ির পাড় ছিঁড়ে  যেতে
ছুঁচ--সূতো খোঁজে প্রভাসের বউ।
যেন জমির আল ভেঙ্গে গেছে
বয়ে যাচ্ছে জল।

ফুল--ফলের রসদে টান পড়বে।




কল
------

যে দু একটা ঢেঁকি আছে
তার নিঃশ্বাসের শব্দ
ঘরের লোকের কাছে নেই

একা একা হাঁপিয়ে ওঠে ঢেঁকি

ধান ভানার শব্দ ওঠে কলে।


-----৩ বোশেখ ১৪২৯
-----১৭----৩----২০২২




পিঁড়ি
-------

আসনতো আছেই

তবে কুটুম এলে উঁচু আসন

পিঁড়ি পাততে হয়।




মাথার ছাদ
---------------

দেয়াল ফেটেছে

ঘরের মেঝে ফেটেছে

পা-ও ফেটেছে কাম কাজ করতে করতে

সূর্যকে আগলে রেখেও
আকাশ ফাটে নাই।
গরিবের এইটুকু ভরসা
মাথার ছাদ ফাটে নাই।


-----৪ বৈশাখ ১৪২৯
----১৮----৪----২০২২




পদ্ম
------

কাঠের পাটায় চড়ে
পুকুরে ঘুরতে ঘুরতে,

পদ্ম কাড়ছে ভরত কালিন্দী

বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের রুদ্র রূপ।




দিনযাপন
-------------

শুকনো পাত  গুঁজে গুঁজে
কত আর জ্বালাবে উনুন!

উপর থেকে পাড়ে জ্বলন্ত কয়লা।


------৫ বৈশাখ ১৪২৯
-----১৯----৪----২০২২
-----নির্মল হালদার













আঁকাবাঁকা শিকড়ের ছায়া






কপাল
---------

কার কপালে কী আছে কে বলতে পারে?

বুনন যতই ঘন হোক
বাঁশের ঝুড়িতেও ফাঁক থাকে

গাছের পাতা পোকায় কাটে

ভিখারির বাটিও ছেঁদা।



কপাল----২
---------------

শাক দিয়ে মাছ ঢাকা গেলেও
কপাল ঢাকা যাবেনা।
সূর্যকিরণ এসে কপালেই তো লিখবে:
আজকের সকালটা কী সুন্দর

ঘাম পড়বে মাটিতে।


-----১৮ চৈত্র ১৪২৮
-----২---৪----২০২২



তৃষ্ণা
-------


১:
কলসির গায়ে লেগে আছে এক ফোঁটা জল

অনন্তকালের জল

পিপাসায় বিধ্বস্ত বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ।


২:
কলসির গায়ে লেগে আছে এক ফোঁটা জল

দেয়াল থেকে চেয়ে আছে টিকটিকি

পিঁপড়ে উঠছে কলসির গায়ে।


৩:
চুঁয়া খুঁড়েও জল নেই

নদী শুধু বালির কাঠামো

আকাশ খুঁড়লে মেঘের হাড়গোড়।


-----১৯ চৈত্র ১৪২৮
-----৩----৪----২০২২



সহজ রস
-------------

জিলিপির প্যাঁচে প্যাঁচে রস

যে জানে, সে তাল--খেজুরের মাথায় উঠে
চাঁদকে করে সহজ রসের কান্ডারী।



বাঁধন
--------

মাটি বেঁধেছে ঘাসের শিকড়

জল বেঁধেছে পদ্মের মূল

খড় বেঁধেছে ঘরের ছাউনি

রাস্তা বেঁধেছে রাস্তা

আর মাহালির মেয়ে?

পায়ের আঙুলে বেঁধেছে সহজ আংটি।


------২০ চৈত্র ১৪২৮
------৪----৪----২০২২



হাঁড়ি
-------

এক দু সের চাল ধার পেতেই পারে।
ভাতের হাঁড়িতো ধার পাবেনা।

সুখনাড়ার ঘরে হাঁড়িও বাড়ন্ত।

হাঁড়ির কানা ভেঙ্গে গেছে।

চাকার মতো পৃথিবী ঘুরলেও
হাঁড়ি তৈরি হবে না।

যেতেই হবে কুমোরের ঘর।




ঠাঁই
------

পদিনার গন্ধ থেকে চাষী বউয়ের গন্ধ।

তার খুঁটেইতো বাঁধা আছে মাটি
তার কাছেই খুঁজছে ঠাঁই,

একটি দুটি রাহেড় গাছ।

কাজল লতা এসে গাছের ডালে দুলবে

কাজল লতার লেজ থেকে ঝরবে কাজল,

ছোট ছোট রাহেড়ের চোখে।


-----২১ চৈত্র ১৪২৮
-----৫----৪----২০২২



অক্ষর পরিচয়
-------------------

শেলেটে শেলেটে লেখার আগে
ভাতের থালায় করেছি আঁকি-বুকি।
অক্ষর পরিচয়ের আগেই আমার অক্ষর,

এক --একটি অন্ন।


----২১ চৈত্র ১৪২৮
----৫----৪----২০২২



রান্নার গন্ধ
--------------

সরমা রান্না করে পুঁটি মাছের চচ্চড়ি।

গন্ধ ওঠে।

স্বাতী ও সপ্তর্ষির কাছে।



ঘুঁটে
------

দেয়াল তো নেই

ঘুঁটে দেবার মত গাছও নেই

এক তাল গোবরের একহাত থাপ্পড়

আকাশেই।



গাঁথতে গাঁথতে
--------------------

আর যা যা থাকার আছে সবই,
ছুঁচ--সুতাও আছে।
কখনো ফুল গাঁথতে গাঁথতে
গেঁথে ফেলবে চোখের জল।


------২২ চৈত্র ১৪২৮
------৬----৪-----২০২২



সোনার কৌটো
--------------------

আমি পেয়েছি মায়ের সোনার কৌটো।

সকাল হলেই সিঁদুর ঝরায়।

বিকেল হলেই সিঁদুর ঝরায়।

চিরুনিতে খুঁজে বেড়ায় সিঁথি
ওই এক রমণী।



পাখি শিকার
-----------------


১:
উড়তে উড়তে
আকাশের রূপ সুন্দর করলেও
পাখিকে মারবেই মকর।

আকাশের সৌন্দর্যে আঘাত করবেই
গুলতির পাথর।


২:
পাখি মেরেছে।

পাখি পোড়া মাংসের গন্ধে
দু'মুঠো হয়ে যাবে চার মুঠো

মকর সোরেনের হাসি।


------২৩ চৈত্র ১৪২৮
-----৭----৪----২০২২



উনুন
-------

চৈত্রের সূর্য ধান সেদ্ধ করা উনুন

একটাই উনুন

চৈত্রের হাওয়ায় জ্বলে জ্বলে ওঠে

সারাবছরের খিদে উস্কে ওঠে।




শ্রী
---

ঝাঁটার কাঠি খুলে পড়লেও
পিঠে ছড়ানো চুল একটিও খসবে না।
বরং পিঠের চুল ভগবানের ভিজে পা মুছিয়ে
ঘরে নিয়ে আসবে শ্রী।



মুঠি
------

কার হাতে ধূলি মুঠি সোনা?

ধুলো তুললেই নক্ষত্রের গুঁড়ো

শ্বেত শুভ্র।


-----২৫ চৈত্র ১৪২৮
-----৯----৪----২০২২
----নির্মল হালদার










শরাবন কালিন্দী-----মাদলিয়া / নির্মল হালদার




শরাবনের গাঁ সেনাবনার কাছেই
সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়।
সে ঢোল - ধামসা বাজায়। মাদল বাজায়।
তার হাতের ওঠা - নামা দেখলে মনে হয়, সে আকাশের গায়ে চাঁটি মারলেও বিনা মেঘে বৃষ্টি ঝরবে মাটিতে।
সে বাজনা চায়, বাজনার ছন্দ চায়।
তো এই শরাবনের সারাক্ষণের সঙ্গী চারুবালা। যে ধুমড়ি নাচের শিল্পী। ধুমড়ি নাচ নাচনি নাচের
আরেকদিক। এই নাচের শিল্পী চারুবালার রসিক হলো শরাবন।

সেও ছোটখাটো পাহাড়।
মানুষ পাহাড়।
সব সময় চোখে মুখে এক সরল ঝরনা। তবু সে পিপাসায় থাকে । ক্ষুধায় থাকে।
তার পেটের খিদে মনের খিদের খবর কেউ রাখেনা।

শরাবনের অভাব থাকলেও মনের অভাব নেই।
সে সবসময় রসে - বশে।
প্রযুক্তির কারণে বিনোদনের রূপ-রঙ পাল্টে পাল্টে গেছে। তাই আর নাচনি নাচ ধুমড়ি নাচের কদর নেই।
একটা সময় ছিল পুরুলিয়ার নানান মেলায় গ্রামে গ্রামে নাচনি নাচের আসর। জমজমাট হয়ে উঠতো।
দিনকাল পাল্টে গেছে শরাবনের ডাক আসে না। চারুবালার ডাক আসেনা।
শরাবনের পাথুরে চেহারা লোল
হয়ে পড়ছে। তার অসহায়তার কাছে কেবল দাঁড়িয়ে থাকে অযোধ্যা পাহাড়। জঙ্গল। ছোটোখাটো ঝোরা।সে কখনো কখনো একা একা গোধূলির আলোয় ঢোল নিয়ে চলে যায়
ডুংরি কোলে।

জেগে উঠে চরাচর ।

শরাবনকে দারিদ্র ছুঁতে পারেনা।
সে শিল্পরসের বাসিন্দা।
ঢোল - ধামসা - মাদলের চামড়া ছিঁড়ে গেলে সে জানে নিজের পিঠের চামড়া ঢোল--ধামসার
মুখে লাগিয়ে দুহাতে বাজাবে।

জল - স্থল - অন্তরীক্ষে বাজতে বাজতে
ব্রহ্মাণ্ড বাজবে।

------৫ বৈশাখ ১৪২৯
-----১৯----৪----২০২২
------নির্মল হালদার





চারুবালাকথা 

দুর্গা দত্ত


বিয়া হয় নাই তো কী হয়েছে
উ-ই আমার স্বামী, উ-ই আমার কিষ্টধন , 
উ-ই আমার প্রেমের রসিক ।

এমন মাদল তুলতো ঝাঁকড়া চুলে আকাশ কাঁপিয়ে...
বুকের ভিতরে যেন হুপ্যাল মা'রত শোল মাছ
পায়ের পাতায় ঢেউ, লাচ --
ঘর ছ্যাড়ে এককাপড়ে পালিয়েছি 
সেই আসর থেকেই, ঝুঁঝক্যা রাতেই , 
উয়ার হাত ধ'রে ।
সেই থেকে উ-ই আমার রসিক আর 
আমি হঁছি উয়ার লাচনি ।
শরাবণ কালিন্দির জুড়ি আমি ,  
লাচনি চারুবালা --
উয়ার মাদল-বোলে সেই থেকে হাটে মাঠে বাঁশবনে
ধুমড়ি লাচে আসর কাঁপাই

 বিয়া করা বৌ লই তো কী হয়েছে !
 উ-ই আমার স্বামী। 
 রান্না বান্না ছুঁয়াছুঁয়ি বাদ দিয়ে
 সংসারের সব কাজ করি।
 ছাগল চরাই, কাঠকুচা ডালপালা 
 ঝেঁটিয়ে কুড়িয়ে আনি, শুকনো গোবর।
 ঘুঁট্যা দিই, ঘরে বাইরে গোবরের লাতা দিই, 
 মাথায় করেই বঝা বঝা ধান আনি ক্ষেত থেকে, 
 পালুই সাজিয়ে দিয়ে রসিকের খামার ভরাই...

 
বিয়া করা বৌ লই তো কী হয়েছে !
রসিকের ঘরদুয়ার তো আমারই সংসার ! ন কি !
পেটে ধরি নাই তো কী হয়েছে
রসিকের বিয়া-করা বৌয়ের ছেল্যাপুল্যা 
সবকটা ত আমারই,  ন কি !
কোলেকাঁখে বড়ো করেছি , 
নুনুকে তো কোলে নিয়েই 
ডাঙ্ ডহরে টাঁড়ে টাঁড়ে চরিয়েছি 
গরু বাছুর ছাগল ভেড়াকে।
বুকে আমার দুধ ছিল না বঠে। তাই
দুধ খাওয়াতে নাই পারি । ত !  কি হয়েছে !
নুনুকে ত বুকে লিয়ে কান্না ভুলিয়েছি ।

পেটে ধরলেই শুধু মা হয় ?
পেটে ধরি নাই ব'ল্যে কি  
উয়ার কি মা লই, বল ?
উ-ই আমার ব্যাটা ।
উ-ই আমার বুকের ধন । নুনু।

একটুকুন না দে'খল্যেই 
বুকের ভিতর কেমন হুদক্যে উঠে --
'বায়না'-র কথা শুনলেই বুক কেমন 
উথাল পাথাল ...
মনকেমন শুরু হয়ে যায় --
দস্তুর ধুমড়ি আমি ,তবু ঝিকিরমিকির লাচের আসরে
তোর মুখ ছলক্যে উঠে বাপধন যখন তখন --
তাল ভুল হয়ে যায় বাপ , থেমে যায় ঘুঙুরের বোল --
খেপে যায় শরাবণ রসিক

পেটে ধরি নাই ত কী হয়েছে !
গোয়ালঘরের এক কোণে 
খড়বিচালি ছেঁড়া চট ছেঁড়া কাঁথা আমার সংসারে
তুই-ই ত একমাত্র ধন বাপ ! 
কত কী যে ভাবি !
মরে গেলে আমাকে তো কেউ ই ছুঁবেক নাই । 
কেবল রসিক 
যে আমাকে আদরে আহ্লাদে লাচনি করেছে
মরে গেলে গরু বাঁধবার পাগা পায়ে বেঁধে 
টেনে টেনে নিয়ে গিয়ে ফেলে আসবে 
টাঁড়ের ভাগাড়ে ---

আমাদের, লাচনিদের  কেউ কখনো 
মুখে আগুন দেয়নি বাপধন
একমাত্র গীতারাণী ,
নিবারণ মাহাতোর লাচনি ছিল , মাঝিহিড়া-য় ঘর
ছেল্যা নাই , পুল্যা নাই ,তবু মুখে আগুন জুটেছে।
কিত্তিবাস ‌কম্মকার, নামী ঝুইম'রা, গান বাঁধত।
গীতা মাহাতোর গলায় কিত্তিবাস ছিল যেন 
অন্য কোনো কবি কিত্তিবাস
যেন জলজ্যান্ত ভবপিতা-র রঙ্ --

আমার ত কিত্তিবাস নাই 
দীনা তাঁতি, চামু কামার, বরজুরাম 
আমার ত কেউ নাই বাপ
সবাই ত চলে গেছে কতদিন আগে --
আমার ত কেউ-ই নাই --
আমার কেবল তুই ; সুর ,তাল ,বুকের ধুকপুক
তুই ছাড়া কেউ আমাকে ছুঁয়েও দেখবে না ...

টাঁড়ের ভাগাড়ে শিয়াল শুকনিতে কুত্তায় 
ছিঁড়ে খুঁড়ে শেষ করবার আগে
তুই বাপ মুখে একটু আগুনের নুড়া গুঁজে দিস্।
তোর হাতের আগুন পেলেই
আমার শুকনো চোখে ঢেউ উঠবে
ধন্যি হয়ে যাবে এই লাচনি জীবন।
সব পাপ ধুয়ে যাবে কাঁসাইয়ের জলে
সগ্গবাস হবে , আমার সগ্গবাস হবে বাপধন 

আমি মরল্যে মুখে একটু আগুনের নুড়া দিবি বাপ্ ...





শরাবনের সঙ্গীনি কিংবা নাচনি
চারুবালাও তার লড়াইয়ের জীবনে একটা অংশ। দুজনের শিল্প সত্ত্বা এক হয়ে যৌথ এক রূপ।
সেই চারুবালাকে নিয়ে কবি দুর্গা দত্তর একটি কবিতা এখানে প্রাসঙ্গিক বলেই রাখছি।

পাঠকের কাছে আমার নম্র নমস্কার।




প্রথম ছবি : সন্দীপ কুমার 
বাকি ছবি : অজয় মাহাত







রবিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২২

তুমিও নবীন পাতা


ফাগুন--চৈত্র থেকেই গাছে গাছে
আগমন নতুন পাতার। মন থেকে মন গেয়ে ওঠে--------
এসো ,এসো, এসো হে বৈশাখ-----

আরেক নতুন ঋতু নতুন দিনকে
আমরা আহ্বান করি।

আনন্দ করি কচি পাতার রঙে রঙে।  
এও তো এক যৌথতা।
প্রকৃতির সঙ্গে সহবাস।

আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে চাইলেও কোনভাবেই বাঁচতে পারবো না।  যদিও সমাজ-সংসারে
আমরা বিচ্ছিন্ন হয়েই আছি।

কখনো কখনো  বিচ্ছিন্নতা ছেড়ে এসে একসঙ্গে থাকা এবং একসঙ্গে বাঁচার জয়ধ্বনি করি।

সেরকমই একটি দিন-------
১ লা বৈশাখ ১৪২৯। সেরকমই একটি দিন  
তুমিও নবীন পাতা
আমিও নবীন পাতা।
এবং উৎপল দাসের দ্বিতীয় কবিতার বইটি একেবারে টাটকা।

এই টাটকা বইয়ের গন্ধ নিতে 
একসঙ্গে সবাই জড়ো হয়ে ছিলাম
ডিয়ার পার্ক সংলগ্ন " বন পুলক"---এ।

পুরুলিয়া শহর থেকে কাছেই।

উৎপল তো কবিতা পাঠ করলো।
সেই সঙ্গে অনিকেতের আরো অন্যান্য বন্ধুরা।

অজয় ও বাপি তৎপর হয়ে
সবার কাছেই পাঠিয়েছিল ডাক।

সৈকত রক্ষিত এসেছিলেন।

সাহিত্যিক সৈকত রক্ষিত। 
যার গল্প-উপন্যাসে পুরুলিয়ার পিছিয়ে পড়া অবদমিত শ্রেণির ছবি দেখতে পাই।

মাটির গন্ধ পাই।
 
"মাটির বাঁশি বাজে গো 
নুন হলুদে উনুনে" 
উৎপল দাসের দ্বিতীয় কবিতার বইটির 
মোড়ক উন্মোচন করলেন কথাকার
সৈকত রক্ষিত।

গোধূলির পাখিরা ঘরে ফিরতে ফিরতে থমকে দাঁড়িয়ে শুনে গেল, কবি কণ্ঠস্বর।

কবিতা পাঠ ‌।

বৈশাখের প্রথম দিনের মৃদুমন্দ হাওয়ায় নতুন পাতারা দুলতে দুলতে দাঁড়িয়ে পড়েছিল, কবিতা শুনবে।

আরো শুনেছিল রসিক বিজয় কর্মকারের সঙ্গে নাচনি--শিল্পী পস্তু বালার ঝুমুর গান।

অনিকেতের বন্ধুরা মিষ্টি মুখের ব্যবস্থা করেছিল। তার  সঙ্গে রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়ের সৌজন্যে
চা--সিঙাড়া।

রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায় একজন আদ্যোপান্ত সংস্কৃতি পাগল মানুষ।
তারই উদ্যোগে গড়ে উঠছে ক্রমশ
একটি সাংস্কৃতিক পীঠস্থান--------
"বন পুলক"।

এই ১ লা বৈশাখের  কেতন 
ওড়াতে এসেছিলেন  বাচিকশিল্পী শুভাশিস গুহ নিয়োগী। এবং একজন ভ্রমণ লেখক ভাস্কর বাগচী। আলোকচিত্রশিল্পী
অভিজিৎ মাজি। এবং রামকৃষ্ণ মিশন থেকে ছুটে এসেছিলেন দেবাশিস মণ্ডল।

দীপাংশু মাহাত ও অজয় মাহাতর
কলম---ক্যামেরায় বৈশাখী আড্ডার নানা ছবি ধরা পড়ছিল।

ফ্রেমে ফ্রেমে বাঁধা পড়ছিল 
অনিকেতের বন্ধুরা।

তাদের যৌবন লাবণ্যে পুরনো আকাশের কালিমা  লুপ্ত হতে হতে
দেখা গিয়েছিল সন্ধ্যাতারা।

বিকেল রোদের ঝলকে  একসঙ্গে সবাই জড়ো হয়ে শিল্প-সাহিত্য
অনুরাগের সুর তুলেছিল। যা সম্পূর্ণতা পেয়েছিল সন্ধ্যার আকাশে।

নবীনতায়।

এবং
কান না পেতেও
মাটির বাঁশি বেজেছিল
সকলের মনে।

গাছে গাছে।

------২ রা বৈশাখ ১৪২৯
-----১৬-----৪-----২০২২
------নির্মল হালদার
---------------------------------





















































ছবি : শুভাশিস গুহ নিয়োগী, দীপাংশু মাহাত ও অজয় মাহাত









কবি নির্মল হালদারের বিভিন্ন সময়ের ছবি

পড়ুন "ঘর গেরস্থের শিল্প"

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ