বুধবার, ১৬ মার্চ, ২০২২

আঁকাবাঁকা শিকড়ের ছায়া / নির্মল হালদার




অভিমান
---------------

শাড়ির খুঁট ধরে ছেলে কাঁদে পিছু পিছু

হাঁসের পিছনে হাঁসের ছানারা

আদর না অভিমান?
রোদের পিছনে মেঘের ছায়া

লাল শালুকের অভিমানে
রাঙা হয়ে আছে পুকুর।



ঢোল--ধামসা
---------------------

চামড়া ছিঁড়ে গেছে।
ঢোল - ধামসায় আকাশের চামড়া।

ঢোল ধামসা বাজে

মেঘ বাজে

শিরা-উপশিরা বাজে
শরাবন কালিন্দীর হাতে।


-----২৫ ফাগুন ১৪২৮
-----১০----৩-----২০২২



ছিপ
---------

কে মাঠ কে পুকুর
স্পষ্ট লাগেনা।
রাত্রির অন্ধকারে ছিপ ফেলতেই,
ছিপের কাঁটায় লাগে মাঠের পাথর।

উড়ে যায় জোনাকি।



রুটি
---------

রাত্রির অন্ধকারে উনুনের আলো

আবছা মুখ

রুটি বেলছে রুটি সেঁকছে

ফুলে ফুলে উঠছে গোল একটা পৃথিবী।


------২৬ ফাগুন ১৪২৮
-----১১----৩----২০২২



বেলা ফুরিয়ে আসছে

টিফিন বাটি হাতে ঘরে ফিরছে
চাষীর মেয়ে।
তার পায়ের শব্দে নড়ে উঠলো
পালং শাকের শিষ।



মন্দির
------------

দামোদরের বাঁধে ডুবে গিয়েও
মাথা উঁচু করে মন্দিরটি বলছে :
বাঁচাও বাঁচাও-----

এখনো জেগে আছি।



মূল
--------

দুপুর রোদে পুকুরে নেমে
পদ্মের মূল খুঁজছে কালিন্দীর বউ।

দুপুর রোদে পুকুরে নেমে
শিকড় খুঁজছে কালিন্দীর বউ।


------২৭ ফাগুন ১৪২৮
-----১২----৩-----২০২২



ভিক্ষে
----------
হাত পাততে পাততে হাত ঝুঁকে পড়ে
মাটির দিকে।

সজনে শুঁটি দুলতে দুলতে ঝুঁকে পড়ে
মাটির দিকে।

ধুলা মাটির কাছে ভিক্ষে করে।



আলপনা
----------------

শিশু এসে পান করেনি বুকের দুধ

রাস্তায় রাস্তায় ঝরে গেছে বুকের দুধ


রাস্তায় রাস্তায় আলপনা।


------২৮ ফাগুন ১৪২৮
-----১৩----৩----২০২২



পিলসুজ
--------------

পিলসুজ খুঁজে না পেলে
তুমি তো আছো তুমি

মাথায় রাখবে প্রদীপ।



সন্তান
-----------
লাউ কুমড়ার মত বারো মাস
কে বিয়োবে সন্তান?

সন্ধ্যে হলেই অজস্র তারার জন্ম

কে বিয়োয়?

প্রতিদিন?



ফল
-----------------
একটা গাছে কত ফল ফলে
পাখি জানেনা।
আমি জানি।
আমি মায়ের আঠারোতম সন্তান।


------২৯ ফাগুন ১৪২৮
-----১৪-----৩-----২০২২
------নির্মল হালদার




আঁকাবাঁকা শিকড়ের ছায়া / নির্মল হালদার




জ্যোৎস্না
---------------

জ্যোৎস্না আর কোথায় দেখবে!

সেতো লক্ষ্মীর হাঁড়িতে
ধানের ভিতরে লুকিয়ে থাকা
রূপোর টাকা

সিঁদুর লেপা।


২৭/২/২০২২



ফাগুন
------------

পলাশ গাছে ফুল কই?

বাবলা গাছে শুধুই কাঁটা

শুধু আকন ফুলের শোভা

মরদ দাঁড়িয়ে আছে উলঙ্গ পাথরের মত

দে ছুঁড়ি দে পরিয়ে আকন ফুলের মালা।


২৮/২/২০২২



কোল
----------

নদী ডাকতে ডাকতে ধাক্কা মারে
একটা পাথরে। আশ্রয় চায়।

একটা কোল।

হারানো বাছুরও ডাকতে ডাকতে খুঁজে বেড়ায়
তার মাকে।




সেজে ওঠা
------------------

পুব আকাশ থেকে চিরুনির পিছনে
সিঁদুর নিয়ে

সিঁদুর পরে।

সারা দিনের সংসারি ব্যস্ত বউ।


-----১৮ ফাগুন ১৪২৮
-----৩---৩---২০২২


আয়না
--------------

বেলা ডুবু ডুবু

চুল আঁচড়ায় রমণী

দু-পা ছড়িয়ে দুপায়ের ফাঁকে
আয়না রাখে রমণী

কপালে টিপ পরবে।



গোবর
------------

ধুতে হয় মুছতে হয়
ন্যাতাকানির দরকার পড়ে।

ঝাঁটারও দরকার পড়ে।

গোবরের দরকার পড়ে
দুয়ারে মাড়ুলি দিতে।


-----১৯ ফাগুন ১৪২৮
-----৪----৩----২০২২


বসন্ত
----------

নিম গাছে কচি পাতা এসেছে।

নিম --বেগুন  না --করো
নিম--ছেঁচকি?

আলুতো সবার সঙ্গে মেশে।

নিমে--আলু মাখামাখি
ফাগুন--চোতের মধু।



আঁচ
--------

সূর্য নিভে গেলেও
চাঁদ--তারা জ্বলে উঠবে।
সেই আগুনের আঁচে
মাহাত ঘরে,

ধান সেদ্ধ।


-----২০ ফাগুন ১৪২৮
-----৫---৩---২০২৩



হাটের দিকে
------------------

মাথায় কাঠের বোঝা
পাহাড় থেকে নামছে মেয়ে ।

পাহাড় থেকে নামছে মেঘ।

মেঘ আর মেয়ে কথা বলে,
আজ সিরকাবাদের হাট,

সে আসবে তো?

 

সংসার
------------

কাঠের উনুন, ছাই পড়ে আছে।

দেয়ালে দেয়ালে ধোঁয়ার কালি

শুকনো হাঁড়িতে ঝুল

ঘোমটা টানা অন্ধকার

নিঃশব্দ।

পাশের একটা ঘরে একটা ঢেঁকি,

বৃদ্ধ পিতামহ।


------২১ ফাগুন ১৪২৮
-----৬----৩----২০২২



চরকা
------------

চাঁদের বুড়ি চরকা চালায়

তাঁতি ঘরেও চরকা চলে

শিরা--উপশিরা চলে।



সংসার
-----------

মাটি খুঁড়েই চলে ইঁদুর।

বুক খুঁড়লে নিভে যাবে আগুন,

গরিব আগুন।

আগুনের আঁচেইতো ফুটবে,

পাঁচ ফোড়নের সংসার।


------২২ ফাগুন ১৪২৮
------৭----৩----২০২২



জং
-------

বুকের ওঠানামা

কামার শালে হাপরের ওঠানামা

মাটি চেয়ে থাকে
যদি ধার করা যায়, ধারালো করা যায়

মাটিতেও জং ধরেছে।




মজদুরি সকাল
------------------------

কোথায় পাখি ডাকলো
কে জানে!
কোন্ দিকে সূর্য ডাকলো
কে জানে!

উনুনে গুঁজছে শুকনো পাতা

উনুনে জ্বলছে শুকনো পাতা

মজুর বউ।

মজুরের সকাল হয়েছে নিম দাঁতনে ।



কুমোরের চাকা
-----------------------

যা খুশি চাইলে হবে না

হাঁড়ি চাইলে হাঁড়ি কলসি চাইলে কলসি

ছেঁদা থাকলে, কুমোরের চাকা জানেনা।


------২৩ ফাগুন ১৪২৮
------৮-----৩-----২০২২
------নির্মল হালদার


আঁকাবাঁকা শিকড়ের ছায়া / নির্মল হালদার




কিরণ
----------

সকালের কিরণ বিড়ি বাঁধা সুতোর মতো
বিড়ি বাঁধতে বাঁধতে নিজেকেই বাঁধা

এ বাঁধন খুলবে না যে

লাল সুতোর শক্ত গিঁট খুলবে না যে

মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাসে উড়বে বিড়ির দোক্তা।



কয়লা কুড়ানি
----------------------

ময়রা দোকানের উনুনে
চিনির রস ফুটছে।
মাছি পড়লে পড়তেও পারে।

উনুনের দিকে চেয়ে চেয়ে
চলে যায় কয়লা কুড়ানি

কখন কয়লা থেকে ছাই!


-----৮ ফাগুন ১৪২৮
----২১----২----২০২২



ওজন দেখতে দেখতে দেখতে হয়
মাছ ওয়ালির আঙুলে আঙুলে হাজা

খড়ি গোলা জলের মত শাদা।


----২১---২---২০২২
----৮ ফাগুন ১৪২৮



নতুন ধান
---------------

রাস্তাতে ধান শুকায়

নতুন ধানের গন্ধ টানে হাওয়া

ধান পাহারায় থাকা বুড়ি জানতেই পারে না।



কাকতাড়ুয়া
-------------------
ফসলের ক্ষেতে দাঁড়িয়ে আছে
হাঁড়ি মুখ কাকতাড়ুয়া।
যেন ঘর বাহির আগলানো
বুড়ো দাদু।



তেজ
-----------

সূর্যের নেশা
হাঁড়িয়ার নেশার মত
সকাল থেকেই।

কাজেরও নেশা।

ঘামে ঘামে হাঁড়িয়ার গন্ধ ছড়ানো

কাম কাজে সূর্যের তেজ।


------৯ ফাগুন ১৪২৮
-----২২----২---২০২২



জলের ভার
------------------
বাঁকে বাঁকে জল
এঘর ওঘর
সকাল থেকে সন্ধে
এ ঘর ও ঘর

কাঁধে দাগ পড়েছে
সূর্যের ছায়ার মত।



পোকা
------------

বেগুন কাঁটা আঙুলে লেগেছে।

বেগুনটি দু ফাঁড়া হতেই
বেগুন--পোকা চেয়ে থাকে, যেন
মায়ের গর্ভ থেকে প্রথম দেখছে আলো।


------১০ ফাগুন ১৪২৮
-----২৩----২----২০২২


ফাগুন বেলা
--------------------
বাঁধাকপি ফুরিয়ে এলো।
ফুলকপি ফুরিয়ে এলো।

রোদ বাড়ছে তরতরিয়ে

ধানক্ষেতের শুকনো আল
শুয়ে আছে ছোট ভাইয়ের মতো।

সবজি বাড়িতে জল ছিটছে মরদ
কথা বলছে কিশোরী কন্যা

পালং শাকের শিষ।



নিমকাঠি
--------------

নিম কাঠিতে সেলাই হয়ে থাকে
শাল পাতার সঙ্গে শাল পাতা।

নিম কাঠি খুঁজছে একটি মেয়ে।

পড়ন্ত বেলা
গাছগাছালির আলো ছায়া।

নিম কাঠি জড়ো করছে একটি মেয়ে।

পাখি ও পাতা উড়তে উড়তে দেখছে
নিম কাঠি গোঁজা আছে,

মেয়েটির কানের ছেঁদায়।


-----১১ ফাগুন ১৪২৮
-----২৪----২----২০২২



বাগাল
------------

সজনে শাক সেদ্ধ হলেই
শাকে--মাড়ে আহার করবে
এই সকাল।

এই সকালই
রোদে রোদে গরু বাগালি করে।



সঞ্চয়
-----------
ভাতের হাঁড়িতে ফেলার আগে
এক মুঠি চাল আলাদা রাখা।

এক মুঠি ঘাম আলাদা রাখা।

অভাবের দিনে
চালে--ঘামে এক হয়ে ফুটে উঠবে।


-----১২ ফাগুন ১৪২৮
-----২৫----২----২০২২



নিম
--------
নিম ফুলের মধু মৌমাছি নিয়ে গেল।

নিম পাতা নিয়ে যাবে কে?

এই ফাগুন--চৈত্রে নিম--বেগুনের ছেঁচকি।



২:
নিম গাছের হাওয়া যেদিক যাচ্ছে যাক।

নিম ডাল ভাঙবে বলরাম।

নিম দাঁতনে প্রতিদিনের সকাল।



গুগলি---শামুক
------------------------
পুকুর থেকে গুগলি কাড়ছে বউ

ভোররাতে।

পুকুর থেকে কাড়ছে বউ

ভোরের শুকতারা।

------১৩ ফাগুন ১৪২৮
-----২৬----২----২০২২



বাঁশবন
-------------
বাঁশ গাছের কচি কচি পাতা
হাওয়ায় দোলে।

বাঁশ গাছের কচি কচি পাতা
ছাগলে টানে।

বাঁশ গাছ থেকে বাঁশি পাড়ে,

একটি মেয়ে।



ছোলা শাক
------------------
ছোলা শাকের ছোট ছোট পাতায়
ছোট ছোট হাওয়া।

ছোলা দানাও বড় হয়ে উঠছে
সবুজ হয়ে উঠছে।

কদিন বাদেই গন্ধ ছড়াবে
ছোলার শাকের আচার।



আয়ু
---------

শাড়ির পাড় ছিঁড়ে সলতে পাকানো

প্রদীপ জ্বালানো

প্রদীপের মুখে সন্তানের আয়ু।


-----১৪ ফাগুন ১৪২৮
-----২৭----২----২০২২
------নির্মল হালদার





পূর্ব জন্মের স্মৃতি / নির্মল হালদারের



বৈতালিক
-----------------

পূর্ব গগন মাঝে
মন জাগো মঙ্গলালোকে---------

বৈতালিকে এই গান গাইতে গাইতে ইরা আঙুল ছুঁয়ে ফেলেছিল অবিনের।

ইরা ও অবিন পাশাপাশি হাঁটছিল।

ভোরের অন্ধকার।
পৌষ মাসের অন্ধকার।
শীতের অন্ধকার।

ইরা যে খুব চেনে অবিনকে তা নয়।বৈতালিকেই কয়েকবার দেখেছে।
গানের গলা খুব চমৎকার।

অনেকটা রাস্তা পরিক্রমার পর
ইরার চোখে পড়লো অবিনের গায়ে কোনো শীতবস্ত্র নেই।
সে কিছু না বলে তার গায়ের
কালো চাদরটি অবিনের গায়ে
জড়িয়ে দেয়।
অবিন ইরাকে দেখে শুধু। চুপচাপ থাকে।
অবিন জানে ইরা সঙ্গীত ভবনের ছাত্রী। এটুকুই।
কখনো-সখনো দেখেছে কলেজের অনুষ্ঠানে। তার মনে পড়ছে হল কর্ষণ উৎসবে ইরা
গান গেয়েছিল।

অবিন বাংলা পড়তে এসেও তার
গানের প্রতি আকর্ষণ । তার বেশিরভাগ বন্ধু সঙ্গীত ভবনের। এবং গানের প্রতি টান থেকেই সে
বৈতালিকে নিয়মিত।

গায়ে চাদর এসে গেলেও অবিনের
ঠান্ডা লাগছে বেশ। বরং তার আগে তার শীত তেমন করছিল না। সে ইরার পাশ থেকে এগিয়ে গেছে সামনের দিকে।

আকাশ ফর্সা হয়ে উঠছে-------
বৈতালিকের দল থেকে সুর যেন
উঠছে পুব আকাশের দিকেই।

গানের কোরাসে গলা তুলতে তুলতে ইরা ভাবছে, সে যে
অবিনের গায়ে চাদর জড়িয়ে দিলো, কই ধন্যবাদ তো এলো না।
ছেলেটা কেমন?

ইরার গায়ে কুসুমের পাতা থেকে ঝরে পড়লো দু-এক ফোঁটা শিশির। ছ্যাঁক করে লাগলো তার।

বৈতালিক শেষ হয়ে যাওয়ার পরে
অবিন ভাবছে, ইরাকে চাদরটা ফেরত দেবে। কিন্তু ইরাকে দেখতে পায়না।
সে সমস্যায় পড়লো। সে জানেও না, ইরার হোস্টেল।
সে চাদরটা নিজের গা থেকে খুলে
পাট করে নেয়।

অল্প অল্প রোদ উঠছে।

খসে খসে পড়ছে শীতের পাতারা।

আম গাছে মুকুল এসেছে। দু একটা পাখি কাকে যেন ডাকছে।
অবিন নাম জানেনা ইরার। কাকেই বা ডাকবে?

ইরাও নাম জানেনা অবিনের।

এক সাঁওতাল রমণী কাঁখে ঝুড়ি।
কাজ করতে আসছে।
অবিনের মনে হলো,তাকেই চাদরটি দিয়ে দেবে।

কিন্তু কাজটা কি ভালো হবে?
বৈতালিকে দেখা তো হবেই।
চাদরটা চাইলে?

অবিন যদি তার উষ্ণতা দেয়?

এ কী ভাবছে অবিন?

সে পকেট হাৎড়ে দেখে পয়সা আছে। এক কাপ চা খাওয়া যেতে পারে। সে কালোর দোকান দিকে
হাঁটতে থাকে।

ইরা দাঁড়িয়ে আছে শুকনো
পলাশ গাছের তলায়। সে দেখতে পায় অবিন হেঁটে যাচ্ছে একা একা। তার কালো চাদরটি অবিনের হাতে।
ইরা নিঃশব্দে তার পাশাপাশি শুরু করে হাঁটতে।
অবিন দেখতে পায়। এবং সঙ্গে সঙ্গে চাদরটি হাতে দিতে গেলে,
ইরা বলে------চাদরটি আপনাকে দিয়েছি।
অবিন বলে, আমিতো পছন্দ করি না কালো রঙ।
ইরা উত্তর করে, আপনার গায়ের রঙতো কালো, নিজেকে কি অপছন্দ করেন?

অবিন হাসে।

হাসির জোর এতটাই যে শান্তিনিকেতনের গাছপালায় দোলা লাগলো।

ইরা থমকে দাঁড়ায়।

অবিন বলে, চলুন ।
কোথায় যাবেন?

ইরা কিছুই না বলে, অবিনের
হাত থেকে চাদরটা নিয়ে পলাশ গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেয়।
অবিন জানতে চায়,এর মানে?
মানে হলো, আপনি তো কালো রঙ পছন্দ করেন না। এই গাছে
ঝুলে থাকলে, অন্য কোনো জন
নিয়ে যেতে পারবে।
এই কথা বলে ইরা অবিনকে
চা--দোকানের দিকে নিয়ে যেতে চায়।

অবিন এবার চুপচাপ কালো চাদরটি নিজের গায়ে জড়ায়।


------১০ ফাগুন ১৪২৮
-----২৩----২---২০২২
------নির্মল হালদার




সাংস্কৃতিক জমি তৈরি করার জন্য
অনেক লড়াই করতে হয়। নানা দিক থেকে বাধা আসে, আক্রমণ আসে, অকথা কুকথাও আসে। আক্রান্ত হতে হয়। তারপরও চালিয়ে যেতে হয় লড়াই। কেননা,
সাংস্কৃতিক জমি মানে, সুস্থ এক জায়গা। নিঃশ্বাসের সাবলীলতা।

আমার জীবন দিয়ে দেখেছি, ঘরে এবং বাইরে আক্রমণের মুখে পড়েছি। কিন্তু থেমে থাকিনি। নিজের সঙ্গেও লড়াই করতে করতে কবিতার দিকে এগিয়ে গেছি। কবিতা জীবনের দিকে এগিয়ে গেছি। নান্দনিকতার দিকে এগিয়ে গেছি।

সম্প্রতিকালে গুটকা ও পান মশলা ধামাকার সঙ্গে লড়াই করতে করতে পলাশ পরব।

এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা।

কারণ, যত দিন বাঁচা ততদিন আশা। যতদিন বাঁচা ততদিন
নান্দনিক হাওয়া ছড়াতেই হবে।

বাধা আসবেই।

অতিক্রম করতে হবে।

হতাশাও আসবে। কিন্তু হতাশাকে প্রশ্রয় দিলে চলবে না। নোংরা রাজনীতি আসবে, তাকে দুহাতে ঠেলে এগিয়ে যাওয়া।

কিছুই তো দেবার নেই, কেবল আমাদের কাছে আমাদের কাজ।

কী কাজ?

সাংস্কৃতিক কাজ। যা মন থেকে মাটি উর্বর করে। এবং এজন্য
সাংস্কৃতিক কর্মী হতে হয়। এবং
সৃজনশীল মানুষ ই সাংস্কৃতিক কর্মী হতে পারে, তার সৃষ্টি দিয়ে।
তার আবেগ ও উন্মাদনা দিয়ে।
প্রেম ভালোবাসা দিয়ে।

বাহ্যিক চাহিদা অনেক আছে।
বাইরে থেকে ইশারাও আছে।
নিজেকে গুছিয়ে তুলবার গল্প আছে অনেক।
সেই সমস্ত অগ্রাহ্য করে সংস্কৃতির জয়যাত্রায় বেঁচে থাকার নিশান,
প্রকৃত নিশান ওড়াতে হবে।


-----১০ ফাগুন ১৪২৮
----২৩---২---২০২২
----নির্মল হালদার




পাতাঝরা //

কিরাত এসেছে সেই সকাল বেলা।

স্কুল মাঠের মধ্যে আরেকটা পাকা ঘর তৈরি হচ্ছে। তার কাজে কিরাত এসেছে। রাজমিস্ত্রির সঙ্গে।
দুদিন আগে এই পাকা ঘরের জন্য
একটা জাম গাছ কেটে ফেলা হলো।
কিরাতের কষ্ট হয়েছে খুব।
সে জানে, একটা গাছ অনেক রোদ জলের মধ্যে বড় হয়। অনেক ঝড়-ঝাপটা সইতে সইতে
বড় হয়।
সেই সব গাছ কেটে ফেলা হলে
দুঃখ ছাড়া আর কি হবে।

কিরাত তো বড় হয়েছে সাঁওতাল গ্রামে। এবং তাদের গ্রাম গাছগাছালিতে ভরা। তারা জানে,
গাছের মত স্বজন ক জন আর হয়।

কাজের মাঝখানে একজন মাস্টারমশায়ের মত এসে বলেছিলেন, কাজে ঢিলেমি দিও না বাপু। অনেক ছেলে ভর্তি হচ্ছে।
তাদের থাকার জায়গা করতে হবে তাড়াতাড়ি। তোমরাও হাত চালাও।

কিরাত পড়াশোনা করলোনা।
ঠাকুর বলেছিলেন তার বাবাকে,
ছেলেটাকে আমার স্কুলে ভর্তি করে দাও। কিছুই লাগবে না ওর।
দেখতে দেখতে মানুষ হয়ে যাবে।

কিরাতের মা-বাবা তাকে স্কুলে পাঠিয়েছিল। কিন্তু তার মন বসলো না। সে জঙ্গল থেকে নদীর ধার পর্যন্ত ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসে। পাখি মারে। সাপ মারে। ইঁদুর মারে। তারপর ঘরে এনে পুড়িয়ে খাওয়া।

কিরাতের খিদে পাচ্ছে।
সে তার থলি থেকে টিফিনের বাটি
বাইরে নিয়ে আসে।

মা আজ তাকে দিয়েছে কুমড়ার তরকারি। ভাত। সঙ্গে একটা কাঁচা লঙ্কা।

রাজমিস্ত্রি তাকে ডেকে একটা আলু সেদ্ধ দেয়।

দুপুরবেলা।

পাতা ঝরে। শীতের পাতা ঝরে।

গেল বছর কিরাত প্রতিদিন দুপুরে এসে শুকনো পাতা জড়ো করে ঘরে নিয়ে গেছে।

একদিন ঠাকুর এসে বললেন, তুই
আমার ঘরের দিকে আসবি। গাদা গাদা ঝরাপাতা আমার ঘরে ও বাইরে। তুই পরিষ্কার করে দিবি।

ঠাকুর বিড়বিড় করে আরো কি যেন বলেছিলেন কিরাতের মনে পড়ছে না। মনে পড়ছে, একদিন একটি মেয়ে তার পাশ দিয়ে যেতে যেতে গাইছিল-------
ঝরা পাতাগো আমি তোমারই দলে-------।

ওই কালো বাড়িটার দিকে গেলেই
সুর শোনা যায়। কালো বাড়িটার কাজ যখন শেষ হয়ে আসছে, কিরাত তার বাবার সঙ্গে এসেছিল।

অনেকে ছিলেন যাদের চিনতো না
কিরাত। সবাই মিলেই দেয়ালে দেয়ালে খোদাই করছিল ছবি।
তার মনে পড়ে পড়ছিল, তাদের
পরবের সময় তার মা ও দিদি
ঘরের দেয়ালে ছবি আঁকে।

সে বড় হয়ে একটা পাখির ছবি এঁকেছিল। তীর ধনুকের ছবি এঁকেছিল।
কিরাততো মাটির পুতুল করতেও পারে। তার বাবা কিরাতের গড়া
পুতুলে রঙ করে পৌষ মেলায় বিক্রি করছিল একবার।

নন্দবাবু সেই পুতুল দেখে কিরাতের বাবাকে বলেছিল, ছেলেটাকে মজুরের কাজ করিয়ে নষ্ট করছো কেন? আমার কাছে দাও। অন্য কাজ শেখাবো।

রাজমিস্ত্রি ডাকে -------কতক্ষণ ধরে খাবি রে, মাস্টারমশাইরা এলে, ধমক খেতে হবে। জলদি উঠে আয়। কাজে হাত লাগা।

পাতা ঝরছে।

পাতাঝরা হাওয়ায় হাওয়ায়
কিরাতের ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে
তাদের গ্রামের দিকে।
তাদের পাঁচটা শুয়োরের বাচ্চা
চরে বেড়ায়। মা নিয়ে আসতে পারবে তো মাঠ থেকে?

কাজ শেষ করে যেতেই হবে। নইলে মজুরি পাবে না।
বাবা একবার বলেছিল, এইসব স্কুল বাড়ির জায়গা একসময় জঙ্গল ছিল। তার দাদুর আমলে।

কারোর কারোর ঘর ছিল।

একটা শুকনো পাতা এসে কিরাতের মাথায়।
সে পাতাটি নিয়ে দেখে শিরা-উপশিরা শুকিয়ে গেছে।

বেলা পড়ে এলো।

স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা
খেলা করতে নেমেছে। তাদের খালি পায়ের দিকে চেয়ে কিরাত
দেখতে পায় , কচি কচি রঙ।

কার বাড়ি কোথায়?

কিরাত জানতে পারবে না।

তাদের ঘরবাড়ি কাছে হলেও অনেক দূর। এখানের এই স্কুলের
ছাত্র-ছাত্রী ও মাস্টার মশাইদের
বাড়ি থেকে অনেক অনেক দূর।

কিরাতের তাই মনে হয়ে থাকে।

কাজ শেষের পর সে একা একা
হাঁটতে থাকে গ্রামের দিকে। দেখতে পায় রাস্তার ধারে একটা লোক খালি গায়ে লোহার ছড় আর বালি পাথর সিমেন্ট নিয়ে কাজ করছে।

কিরাত তার কৌতুহল থেকে লোকটার কাছে গিয়ে জানতে চায়------ইখানে কী কাজ হবে গো বাবু?


----১৪ ফাগুন ১৪২৮
-----২৭----২----২০২২
-----নির্মল হালদার




কোপাই//

ছুটি হয়ে গেছে।

গ্রীষ্মকালে বীরভূমের আকাশ বাতাস ও মাটিতে খরা।

জল নেই।

কার্তিকের ক্লাস নেই আর।
তার বন্ধুরা গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়ি চলে গেছে। রয়ে গেছে সে।

হোস্টেল তো বন্ধ।

কার্তিক ভুবন ডাঙ্গার একটি ঘর ভাড়া করে আছে। কেননা, তাকে
দুবেলা ছেলে পড়াতে হয়। বাড়ি চলে গেলে বেতন বন্ধ হয়ে যাবে।
আশ্রম খুললেই তো টাকা লাগবে।

হোস্টেল খরচ লাগবেই।

ছেলেরা পড়তে আসার আগেই, কার্তিক ঘুম থেকে উঠে পড়ে।
ভোরে ওঠা তার অভ্যাস।
এক একদিন সে সাঁওতাল গ্রামের দিকে চলে যায়। আজ এসেছে
কোপাইয়ে।

কোপাই ছোট্ট নদী।
তার দু পারে ফসলের জমি।
এখন তো ফাঁকা জমি থেকে
মাটির দীর্ঘশ্বাস উঠছে।

একটু বাদেই রোদের তাপ।
এখন ভোরের স্নিগ্ধতা। একটা বক
উড়ে এসে নদীর পাড়ে বসলো।
একগুচ্ছ শালিক জল ছুঁয়ে উড়ে উড়ে যায়।

একজন মহিলা বাঁ কাঁধে থালা বাসন নিয়ে আসছে। নিশ্চয়ই
নদীর জলে এঁটো বাসন পত্র
ধোওয়া--মাজা করবে। এক চাষী
কাঁধের লাঙ্গল পাড়ে রেখে নদীর জলে মুখ ধুচ্ছে।

কার্তিক নদীর পাড়ে বসে পড়লো।

কাছাকাছি একটা বাঁশ বন।
দেখা যাচ্ছে কয়েকটা মুরগির ছানা খেলা করছে।

এ পারে পোড়া কাঠের স্তুপ।

কোপাইয়ের পাড়ে শ্মশান।

কত মৃতদেহ আসে।

জ্যান্ত মানুষও আসে। নদী পারে
ঘুরে বেড়ায়। জলে ভাসায় বেদনার কথা। রেখে যায় পায়ের ছাপ।

মনের কথাও রেখে যায়। যা
লুকিয়ে পড়ে নদীর বালিতে। শ্যাওলায়। মাটিতে। এবং নদীর পাথরের খাঁজে খাঁজে।

আজ কার্তিকের ইচ্ছে করছে,
নদীতে স্নান করবে। কাল রাতে
ঘুম হয়নি তার।

১লা বৈশাখ ছিল গুরুদেবের জন্মদিন। তিনি না থাকলেও
জন্মদিন পালন করা হয়েছে তাঁর
গানে গানে।

কার্তিক নিজে গান গাইতে পারে না। গলা মেলাতেও পারেনা। তবে সে শান্তিনিকেতনের সমস্ত অনুষ্ঠানেই উপস্থিত থাকে। আশ্রমের গাছপালা নাচ গান
তার আপন জন।

তার বিশেষ বন্ধু বুড়ি তাকে
একটা কথা রোজ বলে-----
গান শিখলি না। নাচ শিখলি না।
শুধু ভালোবাসতে শিখলি।

হ্যাঁ, কার্তিক ভালবাসতে পারে।
সে এই কোপাইকেও ভালোবাসে।

একটা কুকুর এখন মাটি শুঁকতে শুঁকতে তার দিকেই এগিয়ে আসছে।

কী দেবে সে ?
তার পকেটেতো বিস্কুট নেই।
সে মনে মনে স্থির করে, এবার
কোপাইয়ের দিকে এলেই, বিস্কুট নিয়ে আসবে।

কার্তিক একবার কোপাই পার হয়ে আরো একটা গ্রামে চলে গেছলো।
সেবারও ছিল গ্রীষ্মকাল ‌। এক চাষী পরিবার তাকে তরমুজ খাইয়েছিল। ঘরে ফেরার সময়
তার হাতে দিয়েছিল দুটো তরমুজ।

তরমুজের স্বাদ অনন্তকালের তৃষ্ণা মিটিয়ে দেয়।

এক কিশোরী কি একটা বুনতে বুনতে আসছে। মনে হচ্ছে, কোনো
ঘাস বুনছে।

এক বুড়ি এই ভোরেই নদীতে স্নান করতে নেমেছে। মাছধরা জাল ফেলছে এক জেলে।

কার্তিকের মনে হলো, মাছ উঠলে
যদি কিনে নিয়ে যেতে পারে, দুপুরে হয়ে যাবে তার। সে তো রান্নাবান্না করে খায়।

পকেট হাৎড়ে সে দেখলো, পয়সা আছে।

কার্তিকের মনে কতকিছু আসা-যাওয়া করছে নদীর জলের মতো। তবে নদী উদাসীন। সে উদাসীন হতে পারে না। নির্বিকার হতে পারেনা। তাকে ভবিষ্যৎ চিন্তা করতে হয়। তার মা বাবা তাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখেন।

কার্তিককে পেতেই হবে একটা চাকরি। কিন্তু কী চাকরি করবে সে? সে পছন্দ করে মাস্টারি করা। যদি আশ্রমেই একটা কাজ জুটে যায়?

বুড়িকে একবার সে বলেছিল, তার কাছে মালীর কাজও পছন্দের। সে যদি আশ্রমের ফুল গাছ গুলি লালন করতে পারে, খুশি হবে খুব।

ছাতিম ফুলের গন্ধ নিতে কার্তিক
রাত্রিবেলা গাছের নিচে দাঁড়ায়।

এক বাউল এখন পাকুড় গাছের
নিচে দাঁড়িয়ে একতারাতে সুর তুলছে।

সুর বয়ে যায় নদীর স্রোতে।


-----১৮ ফাগুন ১৪২৮
----৩----৩----২০২২
-----নির্মল হালদার




সাঁওতাল ছেলে//

মায়ের সঙ্গে আসে। প্রতিদিন।

আশ্রমে কাজ চলছে।
মাটি খোঁড়াখুঁড়ি। ইঁট নেমেছে। বালি নেমেছে।

শত্রুঘ্নর মা দূরের মাঠে মাটি ফেলে দিয়ে আসে। মাথায় করে ইঁট নিয়ে আসে। সে শুধু ঘুরে বেড়ায়। দেখে
তার মতো ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা গাছ তলায় লেখাপড়া করছে। সে শুধু চেয়ে থাকে মায়ের কাজের দিকে। আর ওই ছাতিমতলার দিকে।

ছাতিমতলায় একটি বেদি আছে।

অন্যান্য গাছের তলায় কোনো বেদি নেই। শত্রুঘ্নর মনে প্রশ্ন আসে, কেন আমতলায় জামতলায় সিমেন্ট বাঁধানো নেই?

সে তাহলে যে কোনো বাঁধানো বেদিতে শুয়ে পড়তে পারতো।
একদিন দুপুরে ছাতিমতলায় সে
শুয়ে পড়েছিল। ঘুমিয়ে গেছলো।
একটা লোক এসে তাকে উঠিয়ে দিয়ে বলেছিল, এটা শোবার জায়গা নয়-------।
সে চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে এসেছিল মায়ের কাছে। জল তেষ্টাও পেয়েছিল তার।

মায়ের কাছে জল ছিলনা। মা বলেছিল, যা কাঁদর দিকে -----।

কাঁদরতো দূরে আছে। জল আছে কিনা কে জানে। শত্রুঘ্ন জলের খোঁজ করতে করতে আশ্রমের
রান্নাঘরের কাছে চলে আসে।

একটা লোক খালি গায়ে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। সে কাউকেই চেনেনা। তার বলতে ইচ্ছে করছে, একটু জল দেবে?

বলতে পারলোনা।

সে আবার এখান সেখান করতে করতে একটা বাড়ির সামনে।
উঠোনে পড়ে আছে অনেক মাটি।
একজন লোক শত্রুঘ্নর বাবার মত চেহারা। তার মনে হলো, এই একজনকে জলের কথা বলা যায়।

কাছে এগিয়ে যেতেই লোকটি
তাকে প্রশ্ন করে, কি চায় বাবা?
শত্রুঘ্ন খুব নিচু গলায় বলে , একটু জল দিবে?

লোকটি হাসে আর চিৎকার করে গেয়ে ওঠে-----তৃষ্ণা আমার তৃষ্ণা
ওগো------


------২১ ফাগুন ১৪২৮
------৬----৩----২০২২
------নির্মল হালদার



সোমবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

কবি নির্মল হালদারের দুটো অনবদ্য লেখা




ছাতিম পাতা
----------------------

উৎসর্গ: আমার সকল বন্ধুদের জন্য।

একটাও পলাশ ফোটেনি।

এখনো শীত আছে।

পলাশ গাছের সব পাতা ঝরে যাওয়ার পর ডালে ডালে পলাশ ফুটবে।

চারদিক চেয়ে রঞ্জন খুঁজে পায়না
অন্য কোনো ফুল।

আজ ক্লাস নেই।
সে সঙ্গীত ভবনের আশেপাশে ঘুরতে ঘুরতে শুধু পাখি দেখতে পায়।
ভোর হয়েছে অনেক আগেই। তবুও কাউকেই দেখা যাচ্ছে না।
সে আশা করেছিল, গাছ জুড়ে
ফাগুন বউ । তার হলুদ শাড়ি থেকে রঙের কিরণ ঝরাবে।

সেও তো নেই।

কাঞ্চন ফুল কই?

ফাগুন তো শুরু হয়েছে। শুধু
আম মুকুলের গন্ধ।
রঞ্জনের মন গুন গুন করে উঠলো----

ওরে ভাই, ফাগুন লেগেছে বনে বনে
ডালে ডালে ফুলে ফলে--পাতায় পাতায়

পাতায় পাতায় এসে রঞ্জনের সুর থেমে যায়।
কোথাওতো ফাল্গুন নেই। যদিও
বাতাসে বিষণ্ণতা।

সে রামকিঙ্করের সুজাতার কাছে
এসে দাঁড়ায়। দেখে সুজাতার পায়েসের বাটিতে ধুলো-ময়লা।
শুকনো পাতা।
রঞ্জনের মনে পড়ে গেল-------
বসন্ত কি শুধু ফোটা ফুলের মেলা রে।
দেখিস নে কি শুকনো পাতা ঝরাফুলের খেলা রে।।

তার ইচ্ছে করলো, হোস্টেলের কোনো ঘরে শব্দ করে ঢুকবে।

এক কাপ চায়ের জন্য সে তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠেছে।

একটা শাদা শাড়ি এগিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে, কলাভবনের কোন ছাত্রী। তার হাতে এক তাল মাটি।

রঞ্জন মেয়েটিকে আগে দেখেনি।

আলাপ করবে?

না, প্রয়োজন নেই।
সে একটা আম গাছের তলায়
ছায়া দেখতে লাগলো। কুড়িয়ে নেয় আম মুকুল। যেনবা আজকের এই উপহার তাকে কেউ পাঠিয়েছে।

আজকের ঘন্টাও স্তব্ধ হয়ে আছে।

কেউ কি জেগে উঠবে না?

ঘন্টা ঘরের তলায় একটা কাক।
কাকে যেন খুঁজছে।
হঠাৎ তার পাশ দিয়ে চলে গেল একটা সাইকেল। পিছনে বসে আছে একটি মেয়ে।
তার শাড়ির আঁচল উড়ছে বাতাসে।

সকালের রোদে স্নিগ্ধতা থাকলেও
রঞ্জনের হাঁটতে ইচ্ছে করছে না।
তার মনে জেগে উঠছে------

ওগো দখিন হাওয়া,ও পথিক হাওয়া---

গানটা সম্পূর্ণ করার আগেই একটা ডাক ভেসে উঠছে-------
পার্থ---পার্থ------

কে ডাকছে?

আমার একটা ডাক----
শেরনা----শেরনা--------

কে শেরনা?
কে পার্থ?

একটা ছোট পলাশ গাছের পাতা
কেঁপে কেঁপে উঠলো। তার শুকনো ডালে মনে হচ্ছে, কেউ যেন নোখ
দিয়ে লিখে গেছে-------দেখা হবে।

রঞ্জন বিড়বিড় করে------দেখা তো হয়না। কারো সঙ্গেই দেখা হয়না। কেবল বাতাস বয়ে যাচ্ছে।

বাচ্চু দির বাড়ির দিকে গেলে হয়।
সকালটা যদি গানে গানে পাওয়া যায়?
বাচ্চুদির গান মানেই, বুক ভরা বাতাস। রঞ্জনের কান্নাও আসে।
যে কান্নাকে দু হাতে আগলে রাখা যায়। ভালোবাসা যায়।

সে দেখতে পায় কালো বাড়ির কাছে কারা যেন এসে বসলো।
তার ঘরে তার বন্ধুতো ঘুমোচ্ছে।
সে রাতভর কী যে পড়ে কে জানে। গান শুনতেও পছন্দ করেনা।

একটা গানের সুর ঘুরে বেড়াচ্ছে
চারদিক। কে গাইছে কোথায়?

আমি তোমায় ডাক দিয়েছি ওগো উদাসী-----

সে চেয়ে চেয়ে খুঁজছে, গানের মুখ। খুঁজে পায়না। সে মাটি থেকে তুলে নেয় শিশির ভেজা ধুলো।

বুদ্ধদেবের মূর্তির কাছে এসে দাঁড়ায় রঞ্জন। তার খালি পায়ে লেগেছে শিশির। ঘাস ফুলের রেণু। সে উপর দিকে তাকিয়ে দেখে সূর্য অনেকটাই উঠে এসেছে ওপরে।
হোস্টেলের দিকে যাবে নাকি?
রঞ্জন স্থির করতে পারে না। তার মনের মাঝে গান থেমেছে, সুর আর লাগেনা।

নন্দিনীর সঙ্গে দেখা হয়না আজকাল। শুনেছে, নন্দিনী নাকি
সাঁওতাল গ্রামের দিকে মাঝে মাঝে যায় বাচ্চাদের পড়াতে।

তাদের হোস্টেল ঘরের দিকেও
রঞ্জন ঘুরঘুর করেও নন্দিনীকে দেখতে পায় না ইদানিং। তার মনে হলো আজ, নন্দিনীর সঙ্গে দেখা করবেই।

রঞ্জন কি পারবে নন্দিনীর হাতে
ছাতিম পাতা তুলে দিতে?


------১লা ফাগুন১৪২৮
-----১৪-----২----২০২২
-----নির্মল হালদার



২.

ঘন্টাতলা
--------------

পাঠভবন থেকে শুরু হয়েছিল।

আজ স্নাতকোত্তর। বিষয় বাংলা।

অনিকেতের আজ মনে হয়, সেই পাঠভবনের বয়সটা কি চমৎকার ছিল। তাদের এক মাস্টারমশাই ছিলেন যিনি ছাত্র-ছাত্রীদের প্রকৃতিপাঠ দিতেন। কিভাবে শুয়োপোকা থেকে প্রজাপতি, সেই মাস্টার মশাই দেখিয়েছিলেন।
দেখিয়েছিলেন, কল্কে ফুলের হলুদ আর ফাগুন বউয়ের হলুদ রঙ এক নয়।
তিনি এও দেখিয়েছিলেন, কাঠবিড়ালির চলাফেরা। এবং কাঠবিড়ালি ফল ছাড়াও আর কি কি খায়।

একদিন দুপুরবেলা খাবার খেতে গিয়ে অনিকেতের এক বন্ধু ইঁদুর দেখে মারতে গিয়েছিল। সেই মাস্টার মশাই অম্বুজ বাবু ছেলেটির হাত ধরে বলেছিলেন,
কোনো প্রাণীকে মারতে নেই। বরং দেখতে হয়, তাদের জীবন আচরণ।
কত সুখের ছিল পাঠভবনের দিনগুলি। অনিকেত তো নাচের দলেও ছিল। বসন্ত উৎসবে
খোল দ্বার খোল------গানের সঙ্গে
নাচতে নাচতে পরিক্রমা করেছে
মাঠ।

অনিকেতের অভ্যেস তার নিজের হোস্টেল থেকে এসে প্রতিদিন একবার পাঠভবনের দিকে যাবে।
একবার ঘন্টা তলায় দাঁড়াবে।
প্রতিদিন।
এখনো সে ঘন্টা শুনলেই দেখতে পায়, পাঠভবনের দিকে ছুটে যাচ্ছে অনেক শাদা পায়জামা।
হলুদ পাঞ্জাবি।
যেনবা ছুটে যাচ্ছে সমস্ত গাছপালা। এতোটাই সজীব। সুন্দর।

ঘন্টা শুনলেই মনে হয়, মা-বাবা বোধহয় এবার আসবে দেখা করতে।

অনিকেতের বাড়ি রাজনগর অনেক দূর।

পাঠভবনে ভর্তির পর অনিকেতের মন ছটফট করতো। তার মন বসতো না হোস্টেল ঘরে। ক্লাসে যাওয়ার জন্য ভোরে উঠতে পারতো না সে। তার এক বন্ধু ছিল
অনন্ত। সেই অনিকেতকে ঠেলে ঠেলে ঘুম থেকে তুলতো।
তারপর তো গাছ তলায় ক্লাস।

পাঠভবনে আসবার আগে স্কুল বিষয়ে মনে মনে তার একটা ছবি ছিল। এখানে এসে পাল্টে গেল সব।

একদিন দেখে একটা লোক
পাথর কুঁদে কুঁদে কি একটা বানাচ্ছে। সামনে যেতেই লোকটা
অনিকেতের মাথার চুল নেড়ে দিয়ে জানতে চায়, কি নাম গো তোমার?
অনিকেত চুপচাপ থাকে। লোকটাও আর কিছু বলে না।
জোর গলায় গাইতে শুরু করে,
আকাশ আমায় ভরলো আলোয়---+

অনিকেতের খিদে পেয়েছিল। কিন্তু গানের টানে দাঁড়িয়ে গেল সে অনেকক্ষণ।

পাঠভবন থেকে পাশ করে
যখন আস্তে আস্তে বড় হয়ে উঠছে
অনিকেত, তখন জেনেছিল
ছোটবেলার সেই বুড়ো লোকটি
শিল্পী রামকিঙ্কর।

এক পূর্ণিমার রাত্রে পলাশ গাছের নিচে রামকিঙ্করের কাছ থেকে
অনিকেত শুনেছিল আরো রবীন্দ্রনাথের গান।

বিশু পাগলের অভিনয়ে রামকিঙ্কর একবার অনিকেতকে মুগ্ধ করেছিল।

সেদিন সঙ্গে মৃত্তিকাও ছিল।

মৃত্তিকা শান্তিনিকেতন ছেড়ে
বর্তমানে দিল্লি নিবাসী। চাকরি করে।
এই মৃত্তিকাই বলেছিল একবার,
অনিকেত , তুই আর আমি
কোপাইয়ের কাছাকাছি একটা মাটির ঘর করে থাকবো।

অনিকেত উত্তরে বলেছিল, হ্যাঁরে
শান্তিনিকেতনের জলবাতাস আর
লালমাটি আমাদের জড়িয়ে ধরেছে।

তবে এটাও ঠিক রাত হলেই
গুরুদেবের দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাই।

মৃত্তিকা কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর বলে, মাঝে মাঝে মন খারাপ করে আমারও। ফাগুন দিনের পাতাঝরা বিষণ্ণতা আমাকে পেয়ে বসে। তারপরও এই মাটি ছেড়ে
অন্য কোথাও যাওয়ার কথা চিন্তা করতে পারিনা।
অনিকেতের উত্তর ছিল , ছাতিম গাছগুলো আমাদেরই আত্মীয়-স্বজন। আমাদের বন্ধু।
সবাইকে ছেড়ে কী করে চলে যাবো, জানিনা ।
গাছ তো অনেক আছে , বিশেষ করে ছাতিম গাছকে খুব কাছের মনে হয়।

অনিকেতের আজ মনে হয়, তার
অন্তরের আবেগ, উন্মাদনা শুকিয়ে উঠছে।
সে বিস্মিত হয়ে ওঠে,এত তাড়াতাড়ি শুকিয়ে ওঠার কথা তো নয়।

তবে কী শান্তিনিকেতনের আকাশ ও মাটি শুকিয়ে উঠছে?
কিন্তু আজকেই দেখেছে সে, পলাশের ডালে ডালে কুঁড়ি আসছে।

আবছা শীতের হাওয়া ক্রমশ
বিদায়ের দিকে।

ঘন্টা বেজে উঠলো।

সন্ধের অন্ধকার।

অনিকেত কী বৈতালিকে যাবে আজ?


-----৬ ফাগুন ১৪২৮
----১৯----২----২০২২
------নির্মল হালদার





ছবি : দীপাংশু মাহাত

আঁকাবাঁকা শিকড়ের ছায়া





আঁকাবাঁকা শিকড়ের ছায়া
----------------------------------

ভাত
-------

উনুনে আবার পা লাগবে কী?
উনুন এক খিদে,
সারাদিন।

খিদের গায়ে পা লাগলে,
খিদের অপমান।
ভাতের গায়ে পা লাগলে,

অন্নের অপমান।




রুটি
--------

রাত তো এই,
আগুনে ফুলে যাওয়া রুটি
একটার পর একটা রুটি

মায়ের স্নেহের মত উষ্ণতা।

চাঁদ এসে খোঁজে, একা একা।

আদুরে ছেলের মতো।


-----২৩ মাঘ১৪২৮
-----৬----২-----২০২২



আহার
-------------
দুপুর বেলার সূর্যের আলো
হাঁড়ি থেকে ফ্যান গড়ানো আলো।
যে যে টুকু পারে ধরে রাখে।
যে যেটুকু পারে আহার করে।

দিন কাটে।

নুনের মতো গলতে গলতে।



ঘাম
--------

যেটুকু মাটি আছে বিলাতি বেগুনের চাষ।

ঘরে রান্না হয়, বাজারেও বিক্রি হয়।

গতরের ঘাম ছেটাতে পারলেই,

ভালোবাসবে ভুঁই।

------২৪ মাঘ ১৪২৮
------৭-----২-----২০২২




ঝাঁটা
---------

ঝাঁটার কাঠি ক্ষয়ে গেলেও
ঝাঁটা পড়ে আছে আকাশের এককোণে

ধুলো জমে ছিল তারায় তারায়।




ঘটি
--------

একবার যখন এসেছে, আপন করতে হবে।

একটা ঘটি হলেও ঘরে থাকবে।

এক ঘটি জলেইতো সন্তুষ্ট একটা তুলসি গাছ।


কুটুমকেও দেখাতে হয় এক ঘটি জল।

মাঝলা বউ শুনে যা, ঘটিটাকেও মাজতে হবে,

মাটির আদর মাখাতে হবে।




লঙ্কা ফুল
----------------

লঙ্কা ঝাল হোক আর লাল হোক
লঙ্কা ফুলেও মধু আছে।
লঙ্কা ফুল এসেও পড়েছে, আইবুড়ো মেয়ের
নাকের ছেঁদায়।


-----২৫ মাঘ ১৪২৮
-----৮----২----২০২২




নাকছাবি
----------------
মুসুরির ডালের মতো নাকছাবি
সাধের ননদ লোভ করে, হাত বাড়ায়
হলুদ দিতে হবে না।




ঘাস
---------
কোন্ চাষী লাগিয়েছে ঘাস?

মাঠে মাঠে ঘাস

ফাগুনে --শ্রাবণে ঘাস

ঘাসে ঘাসে পা ফেলতেই, বেজে উঠছে
নূপুর।




খুঁটি
---------
ঘরের চালা ধরে রাখা নিম গাছের খুঁটি
বিক্রি করবে না, বাঁধাও দিবেনা
খুঁটিটাইতো বংশের শিরদাঁড়া

আকাশকেও ধরে রেখেছে।


-----২৬ মাঘ১৪২৮
-----৯----২-----২০২২



জাঁতি
------------

একটা জাঁতি এসে কাকে যে কাটে!

সুপারিতো নেই।


পান দোক্তাও নেই।

শুধু পান পাতার মতো মুখ চেয়ে থাকে

অন্ধকার থেকে।




কাজললতা
------------------

কাজললতা নেই

ঘরে এসেছে কাজললতা পাখি

শিশুকে পরাবে কাজল।




বাজার
-------------

কে জানে কে চেয়ে আছে
কপালের ঘামের দিকে।
কেঁপে কেঁপে ওঠে পায়ের তলা।
বিক্রি হয়ে যাবে,
গরুর শিঙে লেগে থাকা মাটিও।


-------২৭ মাঘ ১৪২৮
------১০----২----২০২২



ভার
--------
ঘরের চারটে খুঁটি চার ভাই

চারজনের কাঁধেই, ঝড় জল রোদের ভার।




থালা
-------
বাঁধের জলে পড়ে আছে থালা

কার ঘরের থালারে ভাই
কে মাজতে এসে ফেলে গেল?

থালা থেকে
আশীর্বাদ ও স্নেহের গন্ধ আসছে

যেনবা অন্নপ্রাশনের থালা।




সোনার দুল
-----------------
বালতিতে উঠে আসছে বালি কাদা

বালতিতে উঠে আসছে জল

বালতিতে উঠে এলো কানের দুল

কার কানের দুল কবে পড়ে গেছলো?

ও ছোট বউ শুনলো,তোর কানটা আছে ফাঁকা।


------২৮ মাঘ ১৪২৮
------১১----২----২০২২




জিইয়ে থাকা
-----------------

আর কতদিন?

আর কতদিন
আধপেটা হয়ে থাকবে নুনা নুনিরা?
এ যে এক হাঁড়ি জলে
মাগুর মাছকে জিইয়ে রাখার মত

জলে হাত নেড়ে নেড়ে দেখতে হয়
মাছটা খেলছে তো?




বিছে
-----------
যে যার আব্রু নিয়ে থাকে।

যেমন রূপার বিছা
কোমরেই থাকে

কেউ দেখতে পায়না।


-------২৯ মাঘ১৪২৮
-------১২-----২----২০২২



 যে জীবন জটিলতার দিকে
-----------------------------------
১:

হাঁড়ি থাপড়ালে ফাঁকা আওয়াজ ওঠে

মাটি থাপড়ালে ধুলো ওড়ে

কপাল থাপড়ালে ঠক্ ঠক্

আকাশ থাপড়াবে কী, নাগাল পায় না।


২:

জল হাৎড়ালে শুধু জল
তৃষ্ণা মিটে যায়।
মাটি হাৎড়ালে শুধু মাটি
পেট ভরে না।

দিনশেষে
মাঠে মাঠে ইঁদুরের গর্ত হাৎড়ানো
যদি ধান-চাল মেলে।


-----৩০ মাঘ১৪২৮
-----১৩----২----২০২২
-----নির্মল হালদার




শিখা
--------

সারাদিনের কাজ শেষে
হ্যারিকেনের কাঁচ মুছতে হবে।

হ্যারিকেনের শিখাইতো সংসারের আয়ু।


২:

হ্যারিকেনের কাঁচ মুছলেও
আকাশকে মুছতে হবে না, শুধু
হ্যারিকেনের শিখা উসকে দিলেই
চাঁদ--তারা জ্বলবে।



চোরকাঁটা
----------------

ব্লাউজটা ছিঁড়ে গেছে
আঁচলে ঢেকেছে গা।
কাঁখের ঝুড়িতে তুলছে গোবর।

শাড়িতে লাগছে চোরকাঁটা
শাশুড়ির গঞ্জনার মত।


-----১ ফাগুন ১৪২৮
-----১৪ ----২---২০২২



সম্পর্ক
---------
একটাই শাড়ি শুকাতে হয় পরতে হয়

যেমন
একটাই মরদ
শুকাতে হয় পরতে হয়

নইলে
সম্পর্ক যে থাকে না মান থাকেনা

যেমন
পান থেকে চুন খসলে সম্পর্ক কি থাকে?




বাঁশি
----------

বাঁশি আর কী শুনবে !

কাঠের চুলহা নিভে গেলে
বাঁশিতে ফুঁ দিয়েই আগুন জ্বালানো

বাঁশিটাই যে ফুকলন।


------২ ফাগুন ১৪২৮
-----১৫----২----২০২২



উকুন
----------

মাথায় মাথায় তারা ওঠে তারা কামড়ায়

উকুনও কামড়ায়

তারা থেকে উকুন বেছে
দু আঙুলের নখে টিপে মারে
আদ্যিকালের বুড়ি।




জল
--------

একলা রাস্তায় হেঁটে যায় যুবতী

ভেজা শাড়ি

পিঠে ছড়ানো চুল থেকে জল ঝরে
দু এক বিন্দু জল রোদে শুকায়

কুঁদরি লতে শিশির শুকায়।


------৩ রা ফাগুন ১৪২৮
-----১৬----২----২০২২



মাড়
--------
বাসি মাড়ে কি আর সুয়াদ আছে!

মাড়ের মতই শাদা শাদা মেঘ
সব সময় টাটকা,

চুমুক দিতেই পারো।




মশলা
----------

ভুঁইয়ে কী আর মশলা বাটাবাটি?

শিল--নোড়াতে পস্তু বাটলে
শাঁখা--চুড়ি ধোওয়া জল

জননী ও জায়ার শাঁখা-- চুড়ি ধোওয়া জল।


-----৪ ফাগুন ১৪২৮
----১৭---২---২০২২




চিকন
----------

বাঁধের ঘাটে
গায়ে সাবান ঘষে মেয়েরা
চেকনাই হবে গা।

মাথায় মাটি মাখছে মাহাত বুড়ি

চেকনাই করবে মন।




স্বাদ--আস্বাদ
---------------------
চাল--গম এক হয়ে গেলে
চন্দ্র-সূর্য এক হয়ে যাবে।
দাদারে, চাল থেকে গম
আলাদা করতেই হবে।

চাল আমাদের মা হলে
গম যে আমাদের মাসি।




বসন্ত
-----------
টেঁস ফুল ফুটে নাই।

আজও
গা ঘেঁষে দাঁড়ালেই ঘামের গন্ধ

চিরকালের মধুর গন্ধ


প্রতিদিনের বসন্ত।



------৫ ফাগুন ১৪২৮
----১৮-----২----২০২২




বড়ি
--------

জ্যোৎস্নার আলোয় বড়ি শুকায়

এতো এতো বড়ি
বিউলি ডালের বড়ি
কে দিয়েছে?

একা একা হেঁটে যায়
শাদা থান পরা বটুর মা।




নিসর্গ
-----------
কোথায় যাওয়া?

কদ্দুর যাওয়া?

আকাশের এক কোণে পস্তু বাটার মত
ঝকঝক করছে চাঁদ

শুধু চেয়ে চেয়ে থাকা

রাঁধুনির নাকফুলও জ্বলে জ্বলে উঠছে।


------৬ ফাগুন ১৪২৮
-----১৯----২----২০২২
-----নির্মল হালদার






সুন্দর বনের ছবি : সৌজন্যে-দীপংকর রায়

কবি নির্মল হালদারের বিভিন্ন সময়ের ছবি









































শনিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

শিল্পের অন্তরালে





শিল্পের অন্তরালে
-----------------------------

এক ঝুড়ি শাক ।

মাথায় করে নিয়ে এসেছে বুড়ি।
বাজারে। শহর বাজারে।

এক আঁটি শাকের দাম ৫ টাকা।

একটা ছেঁড়া গামছা বুড়ির মাথায়।
রোদ আড়াল করবে।

খালি পা।

বুড়ির মাথার চুল শনের মত।
তেল নেই। পরনে আধা ময়লা ধুতি।
ব্লাউজের হাতা ছেঁড়া।

বুড়ির গ্রামের নাম পিঁড়রা----চাকিরবন। শহর থেকে
প্রায় ১০ কিলোমিটার রাস্তা।
সেই গ্রাম থেকে খালি পায়ে হেঁটে এসেছে।

বুড়ির কাছে কে কে থাকে?

তার স্বামী যে নেই, তাকে দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যায়। আমি শুধু ধারণা করতে পারি বুড়ির উঠোনে একটি তুলসী গাছ আছে। থাকতেও পারে
একটি সজনে গাছ।

যেহেতু সজনে শাক বারো মাস পাওয়া যায় এবং খাওয়া যায়। ঘরে কাঁচা সবজি না থাকলে কিংবা নিজেরা
শাকসবজির চাষ না করলে, ভাতের সঙ্গে শুধু সজনে শাক সেদ্ধ অথবা
ভাজা খাওয়া যেতে পারে।

বুড়ির ঘরে ধান যদি হয়ে থাকে, তবে তা  ছ মাসের। হয়তোবা। যদি ছেলেপিলে থাকে, তাহলে তারা হয়তো
শহরে কাজ করে। দিনমজুরের কাজ।

এখন বুড়ির ভাবনা------শাক গিলান
না বিকালে তেল--নুন কীসে হবেক?

রোদ বাড়ছে চড়চড় করে।
মাথায় তাত লাগছে।

একজন খদ্দের এসে দর দার করে
বললো,৩ আঁটি শাক ১০ টাকায় দিলে
নিতে পারে।

বুড়ি দিয়েও দিলো।

শাক তো আর ঘরে নিয়ে যাওয়া যাবে না। যদি না বিকায় দিয়ে যেতে হবে বাজারের গরুকে।তার চেয়ে ভালো কাজ, যা বিক্রি হয়-----যেটুকু পয়সা পাওয়া যায়।

বুড়ি আরো ভাবলো তাকে তো
ছেলা ভুলাও নিয়ে যেতে হবে।

হয়তোবা বুড়ির নাতি-নাতনি আছে।
ছোট। তারা  তার ঠাকুমার কাছে
আবদার করে। তাদের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে যেতেই হয়।

জল তেষ্টা পেয়েছে।

বুড়ি টিউ কলের কাছে গিয়ে
পাম্প করে আঁজলাতে নেয় জল।
প্রথমে মুখ চোখ ধুয়ে দু তিন আঁজলা
জল খায়।

মিটে যায় তৃষ্ণা।

তারপরেও বুড়ির চোখে মুখে লেগে থাকে জীবনের তৃষ্ণা।

যা শিল্পে প্রকাশ করা যাবে না।

------১৯ মাঘ১৪২৮
-----২---২---২০২২
-----নির্মল হালদার





আঁকাবাঁকা শিকড়ের ছায়া





আঁকাবাঁকা শিকড়ের ছায়া
----------------------------------

স্নেহ ভালোবাসা
------------------------

চেটেপুটে খেলেও
কানা উঁচু থালাতে লটকে থাকে
ভাতের একটি দানা যেনবা বলতে চায় :
পেট ভরেছে তো?



পিপাসা
------------

কত কুয়ো খোঁড়াখুঁড়ি?
কত পুকুর খোঁড়াখুঁড়ি?

নদীতো আর খোঁড়া যাবেনা

সমস্তই,

তোর কানের লতিতে লেগে থাকা
এক ফোঁটা জল।



আলো
----------

হাওয়া আসছে
কেঁপে কেঁপে ওঠে লম্ফর আলো।
কাঁচের আড়ালে থাকে
হ্যারিকেনের সলতে,

জ্বালাও জ্বালাও।

যেমন চশমার আড়ালে চোখ,

জ্বলছেই।


-----১৪ মাঘ১৪২৮
----২৮----১----২০২২


মান
---------------

যতই গর্ত করুক
কপাল তো আর খুঁড়বেনা ইঁদুর।
যতই ধান নিয়ে যাক,
মানতো আর নিয়ে যাবেনা।



বংশধারা
---------------

কীসের ডর?

ঝড় এসে ফিরে গেছে।
ঝড়-বাদলও ফিরে গেছে।
রোদের ঝাঁঝতো আছেই।

ঘরেও আছে একটা টাঙ্গি একটা সাহস

বংশের পর বংশ।


-----১৫ মাঘ ১৪২৮
-----২৯----১----২০২২



হাল
--------

সম্বল বলতে একটা হাল
মাটি থেকে মেঘের চাষ করে।
মন খুলে দিলে, মনেরও চাষ।

বারো মাস।



বড়ি
-----------

রোদে বড়ি শুকোয়

দুঃখেরা শুকোয়

বটুর মায়ের হাতের বড়ি
বিক্রি হবে বাজারে।


------১৬ মাঘ১৪২৮
-----৩০-----১----২০২২


পান থেকে চুন খসলে
পানের আর কি থাকে?
চুনকে থাকতেই হবে লেপ্টে
সঙ্গে একটু খয়ের।

সম্পর্ক থাকবেই,
পানের রসের মতো লাল,

প্রতিদিন।

৩০----১----২০২২



চাষ
-------

চাষের যা হাল খরচ ও দেদার

বরং ছাগল চাষ করলে লাভ আছে

একটা ছাগল ধেনালেই দু তিনটে ছানা
যত বড় করবে করো, আছেই তো
তাততলের হাট

দে বিকে

হাতে আসবে নগদ টাকা।



শিশুর কান্না
------------------

কাঁদে ক্যানে?

অন্নপ্রাশনের থালায় তো আছে,
দুধে ভাতে থাকো।


২২.
থালাতো একটাই
চাঁদের মতো থালা
একবার কামড়ালেই, দুধ।

ছোটটার কান্না থেমে যাবে।

------১৭ মাঘ১৪২৮
-----৩১----১----২০২২


কপাল
-------------

উঠানে গোবর দিতে দিতে
আকাশেও গোবরের টিকা।

আকাশ তো ছেলেরই কপাল।

পুণ্যি হবে।



সাত সকাল
-------------------

পায়রা এসে বকম বকম

সকালবেলা।

সরলার পায়ে পায়ে রোদ নাচে

সকালবেলা।

আজ গাছে গাছে আম মুকুলের মতো সুখ

বুকে ভরে উঠছে দুধ।



কামিন
-------------

কুলির সাথে কামিনের কাজ
হাড়ভাঙ্গা খাটুনি।
ঘরে এসেও চুলা জ্বালানো।
জিরাবার মত ফুরসৎ কই?

শিল - নোড়ারও বিশ্রাম নাই।


------১৮ মাঘ ১৪২৮
-----১---২----২০২২



মাটি
---------

মাটির হাঁড়ি ছেঁদা হয়ে গেছে।

চোখের জলে ছেঁদা হয়ে গেছে মাটিও।

কেউ শোনে না।



সঙ্কট
--------

কয়লাকে কয়লা বললে, শুনছে না কেউ।

দুধকে দুধ বললে, শুনছে না কেউ।

কাজ চাইলেও দোষ।

কী কপাল করেছিরে!

ভাজা মাছ ছলকে যায় জলে।


-----১৯ মাঘ১৪২৮
-----২----২--২০২২



খুঁট
-------

মেঘের খুঁট খুললেই জল।

আমি কোল পুছা
প্রাচীন মায়ের শাড়ির খুঁটে বাঁধা আছি,

আজও।



ঝুল
--------

রাঁধনা শালে ঝুল জমেছে।

ইঁদুর লাফায়।

তেলের ভাঁড় উল্টে গেছে
হলুদ উল্টে গেছে নুনে।

ইঁদুর লাফায়।

রাঁধুনির মুখে ঝুল জমছে।



চাকা
-------

মাটিতে গেঁথে গেছে গরুর গাড়ির চাকা

গাড়োয়ান নেই।
কোথাও গাড়োয়ান নেই, শুধু

গরুর পায়ের তলায় তাপ।

-----২০ মাঘ ১৪২৮
-----৩----২---২০২২



ছেঁড়া কাঁথা
-------------------

যতই বৃষ্টি পড়ুক
যতই বীজ মরে যাক
মাঘ মাসের ঠান্ডায় যতই শীত করুক
ছেঁড়া কাঁথার মত মেঘ
ঘুরে বেড়াবে।



ভাব অভাব
-------------------

থালা-বাটি যেমন আছে
ঘরে একটা জামবাটিও আছে
তার পেট ভরাতে দুধ মুড়ি না হোক
মাড়ভাত চাই।


ঘরে একটা বালতিও আছে
গরুর দুধে না ভরুক
আকাশ থেকে দুইতে হয়
মেঘ-বৃষ্টি রোদ।

ঘরে একটা কুড়ুলও আছে

গাছের রক্ত লাগাই না।

------২১ মাঘ১৪২৮
-----৪----২----২০২২


শ্রম
---------

সারি সারি পিঁপড়ে
টেনে নিয়ে যাচ্ছে মুড়ি।
সারি সারি পিঁপড়ে
টেনে নিয়ে যাচ্ছে আলো।



বঁটি
-------

আঁশ বঁটির কাছে রোদ এসে
স্থির হয়ে আছে।
মাছ এসেও স্থির, নিষ্পলক।


২.
মাছি ওড়ে

মন দেবার মত আহার নেই।

ঘরে নেই বাইরে নেই, শুধু

বঁটিতে লেগে আছে মাছের রক্ত।


-----২২ মাঘ১৪২৮
-----৫-----২----২০২২
----নির্মল হালদার

কবি নির্মল হালদারের বিভিন্ন সময়ের ছবি

পড়ুন "ঘর গেরস্থের শিল্প"

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ