মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০২৩

মাটিতে রামধনু ওঠে - ৩১



৩১:
মাটিতে রামধনু ওঠে

আমার ছোট্ট একটি ঘরে আমি মেঝেতে বসেই লেখা লিখি করি। আলস্য করি।

মেঝেতেই শুয়ে থাকি। মেঝেতেই ঘুম। বন্ধুবান্ধবরা এলে মেঝেতেই। শোওয়া-বসা-আড্ডা সমস্তই।

একটা চেয়ার আছে। ইজি চেয়ার।

যার ইচ্ছে সে এসে বসতে পারে।

তবে চেয়ারটি সারাদিন একা পড়ে থাকে। নাকি চেয়ারটি একা থাকে না? আমার পূর্বপুরুষরা কেউ কেউ এসে বসে কি? আমার মাতৃকুলের কেউ এসে বসে কি?

তারা তো কেউ চেয়ারের লোক ছিল না। আমি যেটুকু জানি। তারপরেও ভাবি, চেয়ারটা ফাঁকা দেখে যদি বসে! আমার কুশল জানার জন্য কেউ কেউ তো আসতেই পারে। তারাও তো ভাবতে পারে, চেয়ারটা তাদের জন্যই।

আমি তো একদমই চেয়ারের আসন ব্যবহার করি না। অন্তত আমার ঘরে।

চেয়ারে বসবো চেয়ারে বসতে দেবো এই সংস্কৃতির মধ্যে আমি বড় হয়ে উঠিনি। আমার অভ্যেসও নেই, চেয়ার ব্যবহার করা।

মাঝরাতে কখনো কখনো ঘুম ভাঙলেই আমার চোখ চলে গেছে চেয়ারের দিকে। কেউ বসে আছে নাকি, এই সন্দেহে চেয়ে থেকেছি অনেকক্ষণ।

কাউকেই দেখতে পাই না।

ততক্ষণে ঘুম চলে গেছে। এপাশ-ওপাশ করি। আলো নেভাই। আলো জ্বালাই। জেগে ওঠে পিপাসা।

খুঁজে পাই না জলের বোতল। অথবা খুঁজে পেলেও জল নেই।

একদিন ভোরের সময় মনে হলো, চেয়ারে বসে আছে কেউ। অথচ তাকে দেখতে পাচ্ছি না, শুধু চেয়ারের তলে দুটি পা। ফর্সা দুটি পা। কোনো মহিলার পা। আমি শুয়ে শুয়েই জানতে চাইলাম----কে আপনি কে কে?

নিস্তব্ধতা।

কয়েক মুহূর্ত পরেই, পা দুটি দরজার দিকে এগিয়ে গেল। আমি চিনতে পারলাম না, কার পা এসেছিল। পায়ের চিহ্ন পড়েনি ঘরের মেঝেতে।

চেয়ারটা কার জন্য অপেক্ষা করে? একদিন দেখি, চেয়ারের হাতলে পড়ে আছে শাড়ির আঁচল। আমি শুয়ে শুয়েই আঁচলের দিকে হাত বাড়াই। উড়ে যায় আঁচল। আমি দাঁড়িয়ে পড়ি।

দরজা তো বন্ধ। অথচ আঁচলটি নেই।

চেয়ারটা আর কাছে রাখবো না।

পিটার পালক ব্যবহার করবে, ওদের কাছে রেখে দেবো। সঙ্গে সঙ্গে আরেক ভাবনা আসে, ওরা এখুনি হেলান দিয়ে বসলে, শিরদাঁড়ার ক্ষতি হতেই পারে। ওদের দেবো না। আমার ঘরেই থাক।

একলা একলা থাক। নিজের মতো করে থাকুক।

আমিও তো নিজের মতো করেই থাকি। তার দিকে আমার লক্ষ্য যায় না। আমি নজর করি না, তার রঙ কতটা ফ্যাকাসে হলো।

চেয়ারটা আমাকে দিয়েছে আমাদের বাড়ির বড় ছেলে নুপুর। তার উপহারকে যথার্থ সম্মান দেওয়া আমার কাজ। চেয়ারটাকে তাই সকাল সন্ধ্যা ঝাড়মোছ করা দরকার। এই সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে আজ ভোরের সময় দেখছিলাম, ছেঁড়া ছেঁড়া চুল পড়ে আছে চেয়ারে। কাঁচাপাকা লম্বা লম্বা চুল।

কে এসেছিল কখন?

এতো মেয়েদের মাথার চুল। যদি তা হয়েই থাকে, কে ছিল? মেয়েদের তো কাঁচা পাকা চুল হয় না, নিশ্চয়ই কোনো মহিলার চুল। কে ছিল মহিলা?

রোদ এসে চেয়ারে বসলো।

------বেলা-১০--২
-----২৬ বোশেখ ১৫৩০
-----১০---৫---২০২৩
-----নির্মল হালদার



৩২:
মাটিতে রামধনু ওঠে

বিছানার চাদরেও ফুল ফল থাকে। লতা পাতা থাকে। তুমি স্পর্শ না করা অব্দি ওই লতা পাতা ফুল ফল প্রাণ পাবে না। তোমার স্পর্শ মানে তোমার শয়ন। তুমি হাত-পা ছড়িয়ে দেবে। শরীরের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছড়িয়ে দিলেই, জেগে উঠবে প্রাণ।

প্রাণের সজীবতা।

তুমি দেরি করো না, স্পর্শ করার কোনো সময় অসময় বলে কিছু নেই। তোমার জন্যই অপেক্ষা করছে বিছানার চাদর। এবং তার নীরবতা।

নীরবতার কাছে তুমি স্পর্শ রাখো।

স্পর্শেই জাদু থাকে। শিউরে ওঠা।

তুমি জেনে রাখো, চাদরটি তোমার কাছেই এসেছে। তোমার কাছ থেকেই আশা করে, তুমি ছুঁয়ে ছুঁয়ে জাগাবে প্রাণ।

এইতো চাদর পেতেছো তুমি। শাদা -কালো রঙের মানুষও আছে দেখছি। তোমার জন্যেই এসেছে বহু যুগের ওপার হতে। ওদের সঙ্গে আলাপ করো। ওদের কুশল জেনে ঠিকানা নাও। তোমার সঙ্গে ওদের ভালবাসাবাসি হোক। ভালোবাসাই তো সমস্ত জীবনকে যত্নে রাখে।

ফুল ফল লতাপাতা এবং মানুষ তোমার কাছে এসেছে মানেই জীবন এসেছে। যে জীবনকে কাছে রেখে তোমার জীবনের সঙ্গে মেলাতে হবে।

সারাদিন বিছানার চাদর একা থাকে। যত তাড়াতাড়ি পারো তাকে সঙ্গ দাও। বিছিয়ে দাও তোমার শরীর।

তুমিও তো একা। চাদরের ফুল ফল লতাপাতা শাদা কালো মানুষ তোমাকে সঙ্গ দেবে।

আমাকে তুমি সঙ্গ না দাও, আমি অভিমান করবো না। আমাকে তুমি সময় না দাও, আমি রাগ করবো না। মিনতি করবো শুধু, চাদরের ফুল ফলে তুমি তৃষ্ণা জাগাও।

পিপাসা থেকে পিপাসায় ওরা থাকবে অমলিন।

-----২৭ বোশেখ ১৪৩০
----১১---৫---২০২৩
-----নির্মল হালদার



৩৩:
মাটিতে রামধনু ওঠে

সৃষ্টির পরেই যে কোনো শিল্প নিঃসঙ্গ হয়ে ওঠে। শিল্প যতক্ষণ কবি বা শিল্পীর কাছে ততক্ষণ সে সঙ্গ পেয়ে থাকে।
পাঠক শ্রোতা দর্শক শিল্পের নিকটে এলে শিল্প নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি পায়। সেও তো কিছু সময় জুড়ে। তারপর শিল্পের একাকীত্ব যাপন। লম্বা লম্বা রাস্তা ধরে একা একা হেঁটে যাওয়া।

যখন চিঠির আদান-প্রদান ছিল তখন চিঠিও ছিল একা। চিঠি পড়ার পরেই চিঠি চালান হয়ে যেতো আলমারি কিংবা বাক্সে। অথবা কুলঙ্গিতে। যেন বা নির্বাসন। নিঃসঙ্গতার দিকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া।

শিল্প সেও তো অন্ধকারেই থাকে। তাকে না ছুঁলে এগিয়ে আসবে না। যেমন বইয়ের পাতা না ওল্টালে আলো পড়বে না বইয়ের পাতায়।

দৃষ্টি ও মন তার সঙ্গে ভালোবাসা শিল্পকে জিইয়ে রাখে। এবং জিইয়ে রাখার জন্য সঙ্গ দিতে হবে।

শিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষ এই সত্যটুকু জানে কি?

-----২৯ বোশেখ ১৪৩০
-----১৩---৫---২০২৩
------নির্মল হালদার



৩৪:
মাটিতে রামধনু ওঠে

কোনো কোনো সকালে কোনো গান থেকে বিষণ্ণতা। হঠাৎ হাওয়ার মত ঢুকে পড়ে মনে। মন থেকে সারা শরীর।

কেঁপে ওঠে সকাল। কান্না থেকে কান্নায়।

কান্নাও নিঃসঙ্গ খুব। একা একা চলে যায় পিছনের রাস্তায়। যেখানে দাঁড়িয়ে আছে বন্ধুরা। যে বন্ধুরা আর এগিয়ে আসবে না সামনের দিকে। যে আত্মীয়-স্বজন আর এগিয়ে আসবে না আমার দিকে। শুধু দূর থেকে, পিছনের রাস্তা থেকে দেখবে।

পিছনের রাস্তাতেও অনেক কান্না।

খুব একা।

যেমন মায়েরাও খুব একা হয়। স্বামী সন্তানদের নিয়েও একা। এই দেশের একটি নিভৃত কোণে মায়ের ঠাই।

অন্ধকার মুখ।

একা একা নিঃসঙ্গতার আঁচ বারো মাস পোহাতে থাকে। এই মায়েদের শীত নেই গ্রীষ্ম নেই। এই মায়েদের নীরব একাকিত্বে হাওয়া নেই।

কান্না আছে। একাকী কান্না।

মায়ের পাশে যদি বাবা দাঁড়ায়? মা তার পরেও একা।

মা একা বলেই গর্ভে ধারণ করে বীজ। তার সঙ্গে তার ব্যথা বেদনা আনন্দ। যা খেলা করে অন্তরে। একা একা।

মায়ের স্নেহ ভালোবাসা সর্বত্রগামী। এ কারণেই এখনও এই প্রকৃতির চলাচল।

মা ও প্রকৃতি একইসঙ্গে আমাদের সামনে।

-------১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০
------১৬---৫---২০২৩
-----নির্মল হালদার



৩৫:
মাটিতে রামধনু ওঠে

খুব একা হয়ে গেছে কাঠের লাঙ্গল। খুব নির্জন। যে নির্জনতার কাছে শুশ্রষা নেই।

ওই তো ভাদু মাহাতানের ঘরের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লাঙ্গল। একা। ভাদুর শ্বশুরের আমলে এসেছিল। তারপর অনেকগুলো বর্ষায় চাষ করেছে। এই লাঙ্গল।

আজ লাঙ্গলের ফলায় মরচে।

মন খারাপের মরচে।

কেউ লক্ষ্য করে কি?

বছরে দুবার লাঙ্গলে সিঁদুর দিয়েই লাঙ্গল থেকে মুখ ফেরানো মানুষ, ট্রাক্টরের কাছে নত হয়েছে।

লাঙ্গল আজ একা। খুব একা।

ভাদু মাহাতান কোনো কোনো ভোরে লাঙ্গলের কাছে গোবর মাড়ুলি দেয়। লাঙ্গলের কি এটুকুই প্রাপ্তি? সে যে একদিন মাটি খুঁড়ে সীতাকে নিয়ে এসেছিল। ভুলে যাবে সবাই?

আজ আর কেউ পিছন দিকে তাকায় না, সামনের দিকে এগিয়ে যায় শুধু। সামনে খাল আছে না অন্ধকার চিন্তা করার সময় নেই। ট্রাক্টর এসেছে। অনেক ক্ষমতা নিয়ে এসেছে। তাকেই তো দরকার। অদরকারি হয়ে পড়লো লাঙ্গল।

একা হয়ে পড়লো লাঙ্গল।

কোনো কোনো সংসারে থেকেও নেই। ভাদু মাহাতানের ঘরে থেকেও এক পাশে একা। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তাকে তো চেনেই না।

আর কোনোদিন চিনবেও না।

ট্রাক্টর এসেছে।

হৈ হৈ করে ছেলেমেয়েরা ট্রাক্টরে উঠবে। শব্দ করতে করতে এগিয়ে যাবে ধান জমির দিকে। তার ঘন্টা পিছু ভাড়া--হাজার টাকা।

মাটিকে তল উপর করে চাষযোগ্য করে তুলবে জমি।

লাঙ্গলে চাষ করতে হলে গরুও চাই। গরুকে ঘরে রাখার জন্য খরচ ঢের। সাত ঝামেলায় না গিয়ে ভাদু মাহাতানরা ঝুঁকে পড়েছে ট্রাক্টরের দিকে। সময় লাগে কম। একটা লাঙ্গলের সঙ্গে একটা লোক। অনেকটা সময় চলে যায়। খাটুনি তো আছেই। তার চেয়ে সহজ ট্রাক্টর ভাড়া করো। লাঙ্গল পড়ে থাক একা।

লাঙ্গলকে আর কোনো কাজে লাগানো যেত না? চাষীরাই তো এ বিষয়ে নতুন করে ভাববে।

ভাববে না?

------২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০
----১৭---৫---২০২৩
-----নির্মল হালদার


মাটিতে রামধনু ওঠে - ২৬



২৬ :
মাটিতে রামধনু ওঠে

পুরনো দিনের বাড়ি।পুরনো দিনের মানুষ নেই। ঝুলে আছে কালিঝুলি। অন্ধকার।চামচিকে।
কোনো কোনো পাখিও বাসা বেঁধেছে।ডিম পড়ে আছে মেঝেতে।

বাইরের দেয়ালে বট চারা।

জানলা দিয়ে কাক ঘরে ঢুকে সঙ্গে সঙ্গে বাইরে।কোনো খাদ্য নেই।

গা ছমছম একাকীত্ব।

অনেক পুরনো হয়ে গেছে।একাকীত্ব পুরনো হয়ে গেছে।

একাকীত্বের দিকে চেয়ে থাকে
মানুষ। একাকীত্বের দিকে চেয়ে একা হয়ে যায় আলো- বাতাস।

পুরনো দিনের বাড়িতে ঝড়- বৃষ্টি এসেও ভয় করে।যদি একাকীত্ব জাপটে ধরে।

বেদনা থেকে বেদনায় দেয়ালের পলেস্তরা খসে পড়ে।

পুরনো বাড়ির বাইরের দেয়ালে সিনেমার পুরোনো পোষ্টার। এখনও একা একা হাসছে মলিন নায়ক -নায়িকা।

-----১৫বোশেখ ১৪৩০
----২৮--৪--২০২৩
-----নির্মল হালদার



২৭:
মাটিতে রামধনু ওঠে

মা আমাকে একটা কলম দিয়েছিল। সেই কলমই আমার কাছে ছিল আশীর্বাদী কলম। নিবের কলম। হালকা নীল রঙের।

আমার একটা টিনের বাক্স ছিল। স্কুল বয়সের। সেই স্কুল বয়সী বাক্সে রেখেছিলাম কলমটা।

সেই টিনের বাক্স ও আশীর্বাদী কলম কোথায় যে গেল, কোথায় যে একলা হয়ে গেল, আমি খুঁজে খুঁজে হয়রান।

কত কত চিঠিও ছিল আমার কাছে। ডানা মেলে কোথায় যে গেল কার মুঠোয়, কে জানে!

ওগো কলম ও বাক্স, ফিরে আসবে না? আমি যে স্বপ্নে স্বপ্নে ঘুরেফিরে দেখি, মায়ের নাক টিকালো নাক কলমের নিব। কেন না, নাকের মতো সোজা সবকিছুই দেখতে পাই। সোজাসুজিও কথা বলতে পারি।

শুধু সোজাসুজি নয়, সরলতার সঙ্গেই সব সময় ধারালো আমার কথা। যে যা মনে করে করুক, আমি সোজাসুজি বলবো।

আমার কলমের নিব সবকিছুই সোজাসুজি বলতে বলে। নাক বরাবর আমার রাস্তাও। ব্যাঁকা-ট্যারা হলে ঢুকতে হবে অলি গলিতে।

অলিগলি মানেই, অন্ধকার। হঠাৎ করে গায়ে পড়তে পারে জল। ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে আগাছা। অলিগলি মানেই, ছায়াশরীর।

আমার ভয় করে।

কিন্তু ভয় করবো কেন? আমার সঙ্গে আছে আমার কলম। তাকে খুঁজে না পেলেও সে যে আমার সঙ্গে আছে। সব সময়।

মায়ের সেই আশীর্বাদী কলম একা হয়ে যেতে পারে না। বরং সে আমার শিরদাঁড়াও।

শিরদাঁড়া কি একলা হতে পারে?

-----১৫ বোশেখ ১৪৩০
-----২৯--৪--২০২৩
----নির্মল হালদার




২৮:
মাটিতে রামধনু ওঠে

আমাদের এই বাংলাদেশের প্রায় সবার ঘরেই একটা বুড়ি দেখা যেত। এক সময়। সেই বুড়ি ছিল ফর্সা টুকটুকে। সে ছিল পুন্যি পুকুরের ব্রতে। লক্ষীর আলপনায়। কাজে অকাজে মায়ের পাশে পাশে।

সেই বুড়ি অধিকাংশ ঘরেই, ছোট মেয়ে। নম্র স্বভাব। রান্নাবান্নায় পটু নয়। বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ দিনে নুন লঙ্কা তেলে মাখা কুলের আচার খেতে আমাকে ডাকতো।

"বুড়ি" নামের কেউ আমাকে ডাকে না আর। "বুড়ি" নামটাই কি আছে এই বাংলায়?

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নামও পাল্টে গেছে। পাল্টে যাচ্ছেও। "বুড়ি" নামটিও সেকেলে হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে। যেমন আজকের কোনো শিশুর নাম ভোলানাথ রাখবে না কেউ। আরতি ভারতী পারুল প্রতিমাকে দেখা যাবে না।

খোকনকে দেখা যাবে?

ক্ষুদিবালা অনেক পুরনো।

পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে কেউ আগ্রহী তখনই হয়, যখন প্রয়োজন পড়ে।

প্রয়োজনও পড়ে না। বর্তমান যে স্বোতসিনী। কোজাগরী। রেশনা। তরঙ্গ। মনন। ইপিলদের সময়।

ঘটিও কি আছে আর? গামলাও কি আছে?

আমার সময় দীর্ঘশ্বাসে দীর্ঘশ্বাসে।

পুন্যি পুকুর বুজে গেছে। তার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মুখটিও নেই। ম্লান হয়ে গেছে গুরুপদরা।

"নির্মল" নামটিও খুব একা।

জানলার কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাকে যে খোঁজে কে জানে!

------১৭ বোশেখ ১৪৩০
-----১---৫---২০২৩
-----নির্মল হালদার



২৯:
মাটিতে রামধনু ওঠে

যে ভালবাসে তারও ভূমিকা থাকে। ভূমিকা অর্থে গুরুত্ব থাকে। যাকে ভালবাসছে সে যদি গুরুত্ব না দেয় তবুও গুরুত্ব থাকে মানে ভূমিকা থাকে এই সময়ের কাছে।

সময় তো দেখে। তার দৃষ্টিও প্রখর। কেমন করে দেখছে কোত্থেকে দেখছে, কেউই জানি না।

যে ভালবাসছে সে একটা গাছ হতে পারে, পাথর হতেও পারে, পিলসুজ হতে পারে। পিলসুজ প্রদীপকে ভালোবাসে। প্রদীপ জানে। কেননা, পিলসুজ ছাড়া প্রদীপের আলো উঁচু হয় না। আর উঁচু না হলে দেখা যায় না মুখ।

মুখ দেখার জন্য লন্ঠনকেও উঁচু করে তুলতে হয়।

কার মুখ?

যাকে ভালোবাসি যে আমার আত্মীয়। অনেক দূর থেকে আসছে আমার কাছে। অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে।

আলো তো লাগবেই।

লন্ঠন না থাকলে উঁচু করে ধরবো একটা প্রদীপ। এই প্রদীপ জ্বলছিল পিলসুজের মাথায়। এবং কয়েক মুহূর্তের জন্য একা হয়ে গেল পিলসুজ।

অন্ধকার।

শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকে পিলসুজ। প্রদীপ মাথায় উঠলে তার শান্তি ও স্বস্তি। প্রদীপ যে তার একমাত্র সঙ্গী।

অনেক সময় পিলসুজ একা। প্রদীপ নেই। অনেক সময় পিলসুজ ছাড়াও প্রদীপ জ্বলছে।

প্রদীপের সেই আলো ম্লান লাগে না? মনে কি হয় না, পিলসুজের সঙ্গে প্রদীপের দূরত্ব হয়ে গেছে? এবং এই দূরত্ব থেকেই নিঃসঙ্গতার শুরু, মনে কি হয় না?

ভালোবাসাবাসি রহস্যময়। ঘন।

ভালোবাসাবাসি থেকেই নিঃসঙ্গতা। বিষাদ। অবসাদও থাকে। পিলসুজের গা বেয়ে পিঁপড়ে উঠলেও খুঁজে পায় না প্রদীপ। যে প্রদীপের রূপে একদিন পিঁপড়েও আচ্ছন্ন হয়েছিল।

আজ আর আচ্ছন্নতা নেই। পিলসুজ একা।

------২৩ বোশেখ ১৪৩০
-----৭---৫---২০২৩
----নির্মল হালদার


৩০:
মাটিতে রামধনু ওঠে

দু'পাশে গাছপালা। তার মাঝে চলে গেছে একটি রাস্তা। ধূলা উড়ানি। এই রাস্তাতে পাখি নামলেও ধূলা ওড়ে। এই রাস্তাতে এক যুবক হেঁটে চলেছে।

ধূলা উড়ছে। পাতা উড়ছে।

শুকনো পাতার ওড়াউড়ি যুবকের সঙ্গী হয়ে সঙ্গে সঙ্গে যায়।

নির্জন পথ। গভীর। একলা যুবক হাঁটতে হাঁটতে কোথায় যাবে কার কাছে যাবে?

পাতা উড়ছে।ধূলা উড়ছে।

হেঁটে যাওয়ার শব্দে গাছপালা সজীব হয়ে ওঠে। সজীবতা ও সুন্দরতা থেকে একাকীত্ব সুন্দর হয়ে ওঠে।

একাকিত্বের মুখ থেকে আলোর ভরসা।

------২৪ বোশেখ ১৪৩০
-----৮--৫--২০২৩
-----নির্মল হালদার



মাটিতে রামধনু ওঠে - ২১




২১.
মাটিতে রামধনু ওঠে

পালক আজ মামাবাড়ি।

আমার তো মামা বাড়ি নেই।

মা নেই মানেই মামাবাড়ি নেই। শুধু "মামাবাড়ি" শব্দটা আছে। তবে পালকের মামা আছে। মামা বাড়িও আছে। সে মামা বাড়ি গেলে আমার ফাঁকা ফাঁকা লাগে।

সকাল-সন্ধে পালককে নিয়ে বাজার দিকে। তার হাত ধরে বেড়াতে যাওয়া বলতে পারি। অথবা এও বলতে পারি, সে আমার হাত ধরে আমাকে বেড়াতে নিয়ে যায়। কত যে প্রশ্ন তার, কত রকম যে কৌতুহল। যেমন, কুকুররা রাস্তায় থাকে কেন? ওদের বাড়ি নেই কেন? তারপরেই প্রশ্ন করলো, ডোডো দাদু, তোমার কি মা ছিল?

আরেকদিন প্রশ্ন নয় আমাকে আদেশ করলো, তার লাঠি দাদুকে একটা ফোন করে দিতে হবে। অনেকদিন আসেনি।

জল কাকু অনেক দিন আসেনি বলো? আমাকে মোবাইলটা দাও, বাবুভাইকে ফোন করবো।

আজ আমাকে বললো, তাকে অনেকগুলো লজেন্স কিনে দিতে হবে। মামাবাড়ি নিয়ে যাবে সে।

মামা বাড়ি।

আমাকে একলা করে মামা বাড়ি।

আমার তো মামা বাড়ি নেই।

মামা বাড়িতে কত আদর আবদার। পালকের মনেই পড়বে না, তার ডোডো দাদুর একলা দুপুর। একলা জল। যা তেষ্টা পেলেও সামনে আসে না। হাত বাড়িয়ে নিতে হয় জলের বোতল।

হাত বাড়ালেও পালক আসবে না মামাবাড়ি থেকে। এখন। সে মামা বাড়ির খেলনা নিয়ে খেলবে সারা দুপুর সারা বিকেল।

আমার তো খেলনা নেই।

কতগুলো বইপত্র খাতা ডাইরি আছে। খেলা যায় না শুধু দেখা যায়। আর হঠাৎ করে পালক কখনো প্রশ্ন করবে----এক কোটি আর ৫০ লাখ কত হয়? আমি চুপ থাকলে সে আমার কাছে চেয়ে নেয় মোবাইল। অঙ্কের যোগ আমাকে দেখায়।

আমাকে আরো প্রশ্ন করে----রাস্তায় পায়রা কি করছে? ওরা কি দোতলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে নেমেছে?

ওর জন্য কাল বেলুন এনে দিয়েছি। বেলুনের প্রতি ওর ঝোঁক আমার বেশ ভালো লাগে। যত সে বেলুন ফোলায় ততো রংবেরঙের বেলুন রঙ ছড়ায়।

আমিও রঙে রঙে উড়ে উড়ে ভেসে যাই। একা হয়ে যাই। রঙ যে আমার রঙ নয়। ও যে পালকের।

পালকের রামধনু যে মাটিতেই ওঠে। তার পায়ে পায়ে। তার ছ বছরের রাস্তায়। তার মামা বাড়িতেও রামধনু।

মন্ডা মিঠাই।

আমার তো মামা বাড়ি নেই। দুধের সর নেই। পালক এলেই, তাকে হামি দিতে দিতে সরের গন্ধ পাবো এই আশায় আজকের দিনটা না হয় একলা হয়ে গেলাম।

পালক তুমি হেসো না।

------৯ বোশেখ ১৪৩০
-----২৩--৪--২০২৩
-----নির্মল হালদার



২২.
মাটিতে রামধনু ওঠে

কাছে দূরে একটাও গাছ নেই। কার সঙ্গে কথা বলবে মাধবীলতা?

চারদিকে বাড়ি আর বাড়ি। ছাদে ছাদে পায়রা ওড়ে। কার্নিশে বসে থাকে কাক। ছাদ থেকে ছাদে কথা হয় মহিলাদের। মাধবীলতার সঙ্গে কথা বলে না কেউ।

মাধবীলতা ফুল ফোটায়। ছড়িয়ে দেয় মৃদু সৌরভ। সে পাশের বাড়ির জানালায় উঁকি দিয়ে কথা বলতে চায়। কিন্তু কথা বলে না কেউ। সবাই ব্যস্ত থাকে নিজের নিজের কাজে।

পাতা ঝরার সময় কেউ একজনও তার দুঃখ বেদনার কাছে এসে দাঁড়ায় না। নতুন পাতারা এলেও দেখা যায় না খুশি খুশি মুখ।

মাধবীলতাকে চিঠি লেখে না কেউ।

আমাকেও চিঠি লিখতে বলেছিল। আমিও গুরুত্ব দিইনি। হঠাৎ তার দিকে চোখ পড়লেই, অপরাধী লাগে। তাকে কখনোই জিজ্ঞেস করিনি----জল খাবে?

সে যে কোত্থেকে সংগ্রহ করে জল, আমি হদিস পাইনি। আমি দেখিও নি তার অভিমান।

অভিমান কি নেই?

হয়তোবা পাতার আড়ালে লুকানো থাকে। অথবা যা অভিমান যতটুকু অভিমান শিকড়ের দিকে চালান করে দেয়।

অভিমান থেকেই কি মাধবীলতা ফোটায় ফুল?

২০--২২ বছর হয়ে গেল আমার ঘরে এসেছে সে। আমি একটুও যত্ন করিনি। আদর করিনি দিনে বা রাতে। তবে লক্ষ্য করেছি, জোৎস্না রাতে কে যেন আসে তার কাছে। নিঃশব্দ।

একদিন মধ্যরাতে দরজায় শব্দ। আমার ঘুম ভেঙে গেল। দরজা খুলতেই আমার লক্ষ্য গেল মাধবীলতার নিকটে। মনে হলো, দাঁড়িয়ে আছে কেউ। অস্পষ্ট হলেও একটা অবয়ব যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখতে পাই। অথচ কাছে যেতে পারি না।

কবেই বা কাছে গেছি?

ক্যামেরাম্যান বন্ধু এলে সবুজ খুঁজতে খুঁজতে মাধবীলতার কাছে এসে দাঁড়ায়।

পাখিরাও তো আসে না।

মাধবীলতা নিশ্চয়ই পাখি খোঁজে।

আমাকে কখনো কি খোঁজে?

ও বোধ হয় আমাকে দেখতে পায়। আমার দরজা জানালা বন্ধ থাকলেও ফাঁক ফোকর থেকে নিশ্চয়ই দেখতে পায়, আমি আলস্য উপভোগ করতে করতে ঘুমিয়ে গেছি।

মাধবীলতার সারাদিনের কাজ বলতে, চারদিক দেখা। তারই সঙ্গে সে চেষ্টা করে, আকাশটা দেখতে।

বড় বড় বাড়ি উঁচু উঁচু অহংকার ভালবাসাকেও আড়াল করে। রাস্তা দিতে চায় না। কেমন করে আসবে মন?

ঝিলম কি আসে মাধবীলতার কাছে? সেই তো তাকে রেখে গেছে আমার ঘরে।

-----দুপুর-১--৪৮
----১০ বোশেখ ১৪৩০
-----২৪---৪---২০২৩
-----নির্মল হালদার




২৩.
মাটিতে রামধনু ওঠে

ডোবাতে জল নেই। শুকনো খটখটে বাঁধ। নদীতো নেই।

রোদের তাপ বাড়ছে।

পাখিদের জন্য জল কোথায়? পোকামাকড়ের জন্য জল কোথায়?

মাঠে চরতে চরতে গাই-গরু- মোষ, ছাগল-ভেড়া কোথায় পাবে জল? ঘুরে বেড়ানো কুকুর ও শুয়োরের জন্যেও জল নেই।

এই নিরণে শুধু গাছপালা সবুজ।

কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়া গাছে ঢেউ উঠছে। হাওয়া এসে রঙ ঝরায়। কোনো কিশোরী এসে ফুল কুড়াবে। বাঁশের মাচায় দুলে উঠছে ঝিঙে। গ্রীষ্ম দিনের রোদ উপেক্ষা করে শসার পাশে শসা ধুলা মাটির আদর মাখছে। উচ্ছে লতায় জড়িয়ে পড়ছে কোকিলের ডাক।

হঠাৎ হঠাৎ কোকিলের ডাক এসে ফুলে পল্লবে ও ফসলে জাগিয়ে তুলছে সুর। শুধু জমি থেকে মাথা তুলছে পাথর।

জল নেই।

মেঘের দেখা না পেয়ে পাথরের ঘুম নেই। জল কাদা মাটি পেলে সে স্বস্তিতে থাকে। কেন না, জল কাদা মাটি থেকেই অঙ্কুরের প্রকাশ। যেন বা পাথরেরও সন্তান। তার কোমলতায় পাথরের শান্তি।

অথচ জল নেই। মাঠ ঘাট শুকনো। রোদ জ্বলতে জ্বলতে খড়ের চালাতে। এক চাষীর দুহাতে তরমুজ। আলপথে হাঁটছে।

ক' জনের পিপাসা নিবারণ হবে?

বাতাস ছুটে যায় মরীচিকার দিকে। এক বাগাল ছা জোড় গাছের তলে শুয়ে আছে গামছা পেতে। তার মাথার তলায় লাঠি।

এই লাঠি তাড়াতে পারে না রোদের তাপ। ঝোপঝাড়ের শীতলতা খুঁজছে পোকামাকড়।

উড়তে উড়তে একটি শিশু বক একটি জমিতে নামলো। জলা জমি হলেও এখন একেবারেই শুকনো জমি।

মাছের আশায় দাঁড়িয়ে পড়েছে শিশু বক। যদি ভাগ্যে থাকে মাটি ফুঁড়ে উঠে আসবে মাছ। অন্তত একটি পুঁটি মাছ। সে জানে না, ভিতরে ভিতরে শুকিয়ে গেছে মাটি। জল নেই। কোনো প্রাণের জন্ম নেই।

বকের খিদে একাকী হয়ে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে কে জানে!

-----বেলা-১২--৬
-----১১ বোশেখ ১৪৩০
----২৫--৪--২০২৩
----নির্মল হালদার



২৪.
মাটিতে রামধনু ওঠে

ওই তো ছাদের তারে ঝুলছে একটা রঙিণ শাড়ি। কার শাড়ি। রাস্তা থেকেও দেখা যায় ছাদের তারে ঝুলছে একটা রঙিণ শাড়ি।

হাওয়া এসে শাড়িটাকে উল্টে পাল্টে দেয়। তবু নিজের জায়গা ছেড়ে শাড়িটা যেতে পারে না কোথাও।

রাস্তা থেকেই দেখা যায় তারে এসে বসলো একটা শালিক। সে এদিক-ওদিক চেয়ে উড়েও গেল।

শাড়িটা দুলছে।

শাড়িটা পুরনো না নতুন রাস্তা থেকে বোঝা যায় না। শাড়িটা কার অল্প বয়সী কোনো মেয়ের? মধ্যবয়সী কোন মহিলার? শাড়িটা উড়তে উড়তে ছুঁতে চাইছে কাকে?

যদি আকাশকে ছুঁতে চাইছে?

শাড়িটা কার?

শাড়ির পাড়ে হেঁটে যায় কে?

ঘরে শিশু আছে? সন্তান?

শাড়ির গায়ে ফুলফল আছে?

রাস্তা থেকে বোঝা যায় না।

শাড়িটা দুলছে।দুলতে দুলতে কারো কাছেই যাবে না। শাড়ির মন আছে কি?

রাস্তা থেকে বোঝা যায় না।

রাস্তা থেকে বোঝা যায় না, ছাদের মেঝে কতটা মসৃণ? ছাদের কার্নিশ কতটা পোক্ত? ছাদে কি টাঙানো যায় মশারি?

ছাদে ওঠার সুযোগ আছে কার?

শাড়িটা দুলছে।

মেঘের ছায়া শাড়িতে পড়লে শাড়ির রঙ কি পাল্টে যাবে?

রাস্তা থেকে কিছু বলা যাচ্ছে না।

রাস্তা থেকে দেখা যাচ্ছে শুধু শাড়িটা দুলছে।

শাড়িটা একা।

----বেলা ---৩--৪২
---১২ বোশেখ ১৪৩০
----২৬---৪---২০২৩
------নির্মল হালদার




২৫.
মাটিতে রামধনু ওঠে

গরমের দিনে ঘুমে আধো ঘুমে মায়ের হাতে ঘুরতো তালপাতার পাখা। দিনে ও রাত্রে একই রকম।

দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর শাড়ির আঁচল মেঝেয় পেতে শুয়ে পড়তো মা। আর হাতে ঘুরতো তালপাতার পাখা।

সেই পাখাটা কোথায় গেল?

হাটে বাজারে রঙিণ পাখা। তালপাতার পাখা আড়াল হয়ে গেছে। পাখা যারা বুনতো, সেইসব কুটির শিল্পীরা কোথাও কি হারিয়ে গেল?

আমি যে খুঁজছি।

ঘেমে উঠতে উঠতে ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত হয়ে ঘরে ঘরে খুঁজে বেড়াই তালপাতার পাখা।

মায়ের কাছে বসলেই, পাখার ডাঁটিতে আমার পিঠের ঘামাচি মেরে দিতো। সেই পাখাও ছিল গ্রীষ্ম দিনের পরম বন্ধু।

কয়লার উনুনে আঁচ উঠছে না পাখা করো। সেই পাখা কোথায় গেল? আমার শহরে আমি খুঁজে বেড়াই, তালপাতার পাখা।

আমাদের ঘর ছিল মাটির খোলায় ছাওয়া। সেইখানে গোঁজা থাকতো দু তিনটে পাখা। কয়লার ধোঁয়ায় কালো। কিন্তু হাওয়া ছিল আলোর মত সৎ ও সুন্দর। বিশুদ্ধ।

সেই বিশুদ্ধতা খুঁজে বেড়াই ঘরে বাইরে।

ঘরে নতুন জামাই এলে কেউ একজন তার সামনে পাখা নিয়ে হাওয়া ছড়ানো।

পাখার হাওয়াও আপ্যায়নের একদিক। ভুলে যাইনি আজও এবং সেই কারণে নিজেকে আপ্যায়িত করতে খুঁজে বেড়াই তালপাতার পাখা।

ছোটবেলায় কৌতুহল থেকে বড়দের কাছে প্রশ্ন ছিল আমার অথচ প্রশ্ন করিনি----তালগাছ তো অনেক উঁচু। কেমন করে পাড়ে তালপাতা? কে পাড়ে?

আম পাতে জামপাতে পাখা হবেনা?

মনে পড়ে, রাগ হলে ঘরের বড়রা পাখার ডাঁটি দিয়েও মেরেছে। মজাটা হলো, পাখা তো শুধু গরমের দিনে। বাকি দিনগুলিতে হাতের মার।

সেসব দিনের কথা মনে পড়তে পড়তে মনে পড়ে যায়, তালপাতার পাখা হাতে ঘুরতে ঘুরতে, বিশেষ করে মেয়েদের হাতে ঘুরতে ঘুরতে চুড়ি বেজে উঠতো।

সেই সমস্ত চুড়ি কোথায় বাজছে?

সেই সমস্ত হাত কোথায় গেল?

বাজারে ঘুরতে ঘুরতে দেখতে পেলাম, একটা ঝুড়িতে প্লাস্টিকের পাখার সঙ্গে দু তিনটে তালপাতার পাখা।

নিঃসঙ্গ।

----১৩ বোশেখ ১৪৩০
-----২৭--৪--২০২৩
------নির্মল হালদার




মাটিতে রামধনু ওঠে - ১৬



১৬.
মাটিতে রামধনু ওঠে

জানলায় মুখ।

কার মুখ? অমলের?
না না অমলের নয়।
কার মুখ? কমলের?
না না কমলের নয়।
কার মুখ? বিমলের?
না না বিমলের নয়।

জানলায় কার মুখ?

মেঘের মুখ?
না না।
বৃষ্টির মুখ?
না না।
ঝড়ের মুখ?
না না।

জানলায় কার মুখ?

সারাদিন খোলা থাকে জানলা। আকাশ দেখা যায় না। আকাশ কি তবে জানলার কাছে এসে দাঁড়ায়?
না না।

জানলা দিয়ে কি পালক ফেলে যায় পাখি? জানলা দিয়ে কি রোদের কণা ফেলে যায় রোদ?

একটাই জানলা।
সারাদিন হাওয়া আসে?
না না।
একটাই জানলা।
সারাদিন পাখির ডাক আসে?
না না।

জানলা থেকে পালিয়ে যাওয়া যাবে? জঙ্গলের কাছে যাওয়া যাবে? রাস্তা সহজ তো? স্পষ্ট?

জানলার কাছে রাস্তা আসবে না?
না না।
রাস্তা দুয়ারে আসে। দুয়ার কই?

দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকবে না সুধা?
না না।
দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকবে না ঠাকুর দাদা?
না না।
দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকবে না একটা গান?
না না।

পাড়ায় পাড়ায় খেপিয়ে বেড়াতো, কোন্ ক্ষ্যাপা সে? সেই যে সেই ক্ষ্যাপা আর আছে কি কোথাও? যদি থাকে দাঁড় করাও দুয়ারে।

আমি আসছি----

----৪ বোশেখ ১৪৩০
----১৮---৪---২০২৩
----নির্মল হালদার



১৭.
মাটিতে রামধনু ওঠে

পত্রপল্লবহীন একটাই গাছ এই মাঠে। চৈত্র চলে গেছে। বৈশাখ এলেও নতুন পাতা নেই। নতুন পাখিরা নেই। বাতাস আসা যাওয়া করলেও বাতাসে নেই নতুন সংবাদ।

বৃষ্টি কি কয়েক হাজার বছর নেই?

মেঘেরাও কি বলেনি, প্রেমিক প্রেমিকারা কোথায় আছে? প্রেম আছে তো নিভৃতে নির্জনে?

একটাই গাছ। গাছে একটি কোটর। কেউ কখনো এই কোটরে রেখে গেছে অভিমান? চোখে পড়ছে না কিছুই, শুধু একটি পাথর ছোট্টপাথর চেয়ে আছে চারদিকে। যেন বা কোনো চোখের মনি।

ঠোঁটে তুলে কোনো পাখি নিয়ে যায়নি। কেন না, পাখিরা তো ভুল করেও এখানে ঝাপটায় না পাখা।

পত্রপল্লবহীন একটাই গাছ।

এদিকে পায়ের শব্দ নেই। কথা নেই। দেশ ও দশের বাইরে একটাই গাছ। ফুল ও ফলের রূপ কল্পনাতে নেই।

একবার এক মৌমাছি মধু ঝরিয়ে শুনতে চেয়েছিল গাছের হৃদস্পন্দন। শুনতে পেয়েছিল একলা থাকার বেদনা।

দূরের এক কাঠুরিয়া ঘুরতে ঘুরতে এই গাছের কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। যদি হরণ করা যায় দু' চারটে ডাল। কাঠুরিয়ার হাত থেকে ফসকে গেছে কুড়াল।

কাঠুরিয়া ঘুমিয়ে গেছলো গাছ তলায়। এই গল্প ঘুরে বেড়ায় বাতাস থেকে বাতাসে।

এখানে বাতাস কেমন? কোনোদিন বীজ ছিল? এখানের বাতাস কি আব্রু রক্ষা করে?

পত্রপল্লবহীন একটি গাছ আজও মাটি আঁকড়ে আছে।

-----৫ বোশেখ ১৪৩০
----১৯---৪---২০২৩
----নির্মল হালদার



১৮.
মাটিতে রামধনু ওঠে

গ্রাম ছাড়িয়ে আরো কিছুটা দূরে একটি ইঁদারা। গ্রামের মানুষ এই ইঁদারার জল দিনের পর দিন ব্যবহার করেছে একসময়। পথচারীও দাঁড়িয়ে গেছে হঠাৎ। কোনো মহিলা জল তুলছে তখন, তার কাছে পেতে দিয়েছে আঁজলা।

তৃষ্ণার্তকে শান্ত করেছে এই ইঁদারা কুয়ো। শোনা যায়, ব্রিটিশ সরকার এই কুয়ো খনন করে গেছে। পথিকদের জন্য। বসত গড়ে উঠেছে অনেক পরে। এই কুয়োর জল সুস্বাদু। ভাত ডাল সেদ্ধ হয়। সাবানে ফেনা হয়। এখানে কুয়োর মাথায় প্রাচীন এক শিরীষ গাছ। তার অনেকটা পিছনে একটি টগর ফুলের গাছ। তার নিচে মানতের হাতি-ঘোড়া। মাটির। গোবর লেপা একটি বেদি। সকালে ধূপ জ্বেলে গেছে কেউ। ছাই পড়ে আছে।

শুকনো টগর ফুলে ভরে আছে চারদিক।

ইঁদারা কুয়ো ভেঙ্গে গেলেও জল আছে। অটুট। জলে ভাসছে শুকনো পাতা। আবর্জনাও।

কুয়োতে আর বালতি ওঠে না। নামে না। দাঁড়ায় না পথচারি। গ্রামের মানুষ টিউকলের জল থেকে সারাদিনের কাজকর্ম। কুয়োটা তাদের কাছে আজ দূর দূর লাগে।

এক সময় এই কুয়োতলা ছিল মহিলাদের সুখ-দুঃখের জায়গা। সারাদিন মুখর।

কুয়োর জল মন দিয়ে শুনতো সবার কথা। এখন শুধু মেঘ আসে কুয়োর ভিতরে। কুয়োর বাইরে আসে বৈশাখ থেকে বসন্ত। নীরবে এসে নীরবে চলেও যায়।

রাত্রি হলে মাটির হাতি ঘোড়া কুয়োর জল পান করতে নামে। এবাদে কুয়ো পরিত্যক্ত। একা।

তার নির্জন একাকীত্বের কাছে প্রেম করতে নামে না চাঁদ। কেবল এক পুরনো দিনের গাধা তার পিঠের বোঝা এখানে নামিয়ে চলে গেছে কোথাও।

----৬ বোশেখ ১৪৩০
----২০--৪--২০২৩
----নির্মল হালদার



১৯.
মাটিতে রামধনু ওঠে

বসন্ত কাকা, তোমার সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয়নি। কোথায় যে থাকো, খুঁজে পাই না। আমি ছটফট করি। এ ঘর ও ঘর করতে করতে রাস্তাতে যাই। প্রতিটি মানুষের মুখের দিকে চেয়ে খুঁজি, খুঁজতে থাকি তোমার মুখ।

বসন্ত কাকা, মাঝেমধ্যেই তোমার মুখও হারিয়ে যায়। তখন আম গাছের দিকে চেয়ে থাকি। সে যদি আমাকে দেখায় তোমার মুখ। এই আশাতে গাছ তলায় সারাদিন।

তুমিও তো আম গাছের ছায়া গায়ে জড়িয়ে ধুলোতে আঁকতে তোমার স্বপ্ন। কল্পনা। একদিন।

বসন্ত কাকা, তোমার স্বপ্নেরা কি খুব রঙিণ ছিল? খুব এলোমেলো? তুমিও কি কবিতাকাতর?

কবে যে তোমার সঙ্গে দেখা হবে?

আমার ঘুম নেই।

তুমি তো জানো, বৈশাখ জ্যৈষ্ঠের দিনগুলি কেমন থাকে পুরুলিয়া! তুমি তো জানো, লু বইতে থাকে প্রায় সকাল থেকেই। আমার মনে আছে, গরম হাওয়ায় বাবার খুব কষ্ট হতো। তাই একটু বেলা হলেই, বাবা ঢুকে পড়তো জেঠিদের ঘরে।

জেঠিদের ঘরটা ছিল ঠান্ডা ঠান্ডা অন্ধকার। বাবা ঘুমিয়ে পড়তো।

তুমি এখন কোথায় ঘুমোচ্ছো, কোথায় তোমার খাওয়া-দাওয়া, কে জানে! বসন্ত কাকা, এই দুপুরে আসবে আমার কাছে? দুজনে অনেক গল্প করবো।

আমার কাছে আমাদের পরিবারের বিশেষ কোনো গল্প নেই। বরং তোমার কাছেই অনেক ইতিহাস----- শিবপ্রসাদ থেকে ব্রজেন্দ্রনাথ তুমি বলতে পারবে।

তুমি যেখানেই আছো চলে এসো।

আমাদের গলির আঁধারে হঠাৎ আমি আর তুমি মুখোমুখি কিংবা তোমার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আমি চেঁচিয়ে উঠবো---বসন্ত কাকা আজ আমাদের ঝিঙে পোস্ত। অনেকটা ভাত খাবো। আমরা দুজন। চলো চলো----ঘরের দিকে যাই।

তুমি বৌদির সঙ্গেও কথা বলবে। পুরনো দিনের কথা। নুপুরের সঙ্গে বলবে, আজকের কথা।

কথার তো শেষ হবে না বসন্ত কাকা। তুমি হয়তো জানতে চাইবে, বোঙাবাড়ির ধান জমি কেমন আছে? আমি অবশ্য তার আগেই জানতে চাইবো, তোমার কপালে একটা দাগ কেমন করে এলো?

ঘরের দেয়ালেও অনেক দাগ।

অনেকে আসে অনেকেই স্পর্শ রেখে যায়। ছোটরাও দেয়াল ধরে ধরে বড় হয়ে ওঠে।

তুমি তো সবাইকে চেনো না। তুমি যে অনেক অনেক দিন আমাদের কাছে নেই। আমি তো খুঁজেই চলেছি, আমার যে একটা কাকা দরকার। জেঠাকেও চাই।

আমি যে চাই, আত্মীয় গ্রাম। আত্মীয় রাস্তা। ভালোবাসার অনেক নাম।

শক্তি সন্ধ্যা পারুল প্রতিমাকে মনে আছে তোমার? নারাণকে মনে আছে? আছে আছে। বলো, আছে। তুমি এখুনি বলবে, আমি এই ঘরের একজন। আমি কি আর ভুলে যেতে পারি, লক্ষীর হাঁড়ি।

লক্ষীর হাঁড়িই তো আমাদের সংসার।

তার আগে তোমার সঙ্গে দেখা তো হোক। তুমি নিশ্চয় বিবড়দা সোনামুখী যাওনি। তুমি তো যাবে না মলিয়ান। হেঁসলা যাবে? দেখা হলেই তুমি খুঁজবে মায়ার মত একটি গ্রাম। মায়াই তো তোমাকে ছেলের মত মানুষ করেছে। আমি তো মায়ের কাছে শুনেছি, তুমি ডাল সেদ্ধ দিয়ে মুড়ি খেতে ভালোবাসো।

আমিও।

আমি যে মায়ার সন্তান।

বসন্ত কাকা, আমরা সবাই মায়ার সন্তান। এ কথা ভুলে যাই আর এ কারণেই ভুলে যাই, তিনটে পাতা নিয়ে বেল পাতা।

একসঙ্গে থাকার একটা ছবি।

গাছপালা পাখি পাহাড় নদী পোকামাকড় সবাই আমরা একসঙ্গে। ওরা জল হাওয়া পেলে আমরাও পাবো।

তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে আমার জল তেষ্টা। বৈশাখ মাসের এই এক স্বভাব, সে সব সময় কাছে এনে দেবে পিপাসা।

শুধু কি জলের পিপাসা?

বৈশাখের দীর্ঘ বেলা একে তাকে খুঁজতে হয়। ভালবাসতে হয়, বট-অশ্বত্থের ঝলমলে রূপ।

তুমি এলেই দেখতে পাবে, আমাদের ঘরের দুয়ারে, এখনো আছে অশ্বত্থ গাছটা। মায়ের চেষ্টাতে একটা জলের হাঁড়ি একটা ডালে ঝোলানো। হাঁড়ির তলায় একটা ছেঁদা। সারাদিন পড়বে ফোঁটা ফোঁটা জল।

বাবা বলে, পিতৃ পুরুষের মুখে জল পড়ছে।

বসন্ত কাকা, তোমার কি জল তেষ্টা পায়? আমার খুব মনে আছে, গরমের রাতে ঘুম ভেঙে গেলে জল তেষ্টা আমার। মাকে ঠেলা দিয়ে বলতাম---আমার জল তেষ্টা পাচ্ছে খুব। মা বলতো, যা খেয়ে নিবি যা।

আমি খুঁজে পেতাম না জলের কলসি।

আজও খুঁজে পাই না সেই কলসি।

তোমাকেও খুঁজে পাচ্ছি না। তুমি কি একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছো কোথাও। তুমি কি একা হয়ে গেছো?

বসন্ত কাকা তুমি তো আমার চেয়ে বড়, তুমি বলতে পারবে, যেকোনো মৃত ব্যক্তি কি একা?

-----বেলা--৩--৫২
----৭ বৈশাখ ১৪৩০
----২১---৪--২০২৩
----নির্মল হালদার




২০.
মাটিতে রামধনু ওঠে

একটা মেঘ এসে চলে গেলে কে একা হবে? একটা বৃষ্টি এসে চলে গেলে কে একা হবে?

মেঘ একা হতেই পারে। বৃষ্টি একা হতেই পারে। কেন না, বৃষ্টি ছুঁয়ে গেল না তোকে। মেঘ ছুঁয়ে গেল না তোকে। ওরা দাঁড়াবে তোর কাছে, এরকম আশা করতেই পারি।

তুই হতাশ হয়ে গেলি। একা হয়ে গেলি। এই একাকীত্ব তোর প্রাপ্য ছিল না।

বৃষ্টি এসে দেখলো না তোকে। মেঘ এসে দেখলো না তোকে। তুই মনমরা হয়ে পড়লি।

অবিন কথা দিয়েও এলো না। অনিকেত ব্যস্ততার অজুহাতে কখনোই আসছে না।

অঙ্গনা সেও তো বন্দী।

তুই একা হয়ে গেলি। তোর কাছে মেঘের ছায়াও থাকলো না। বাপি এসেও চলে গেছে অনেকক্ষণ।

আমি তোর জন্য খুঁজতে বেরিয়েছি একটা ব্যাঙ। সে তোকে বৃষ্টির গল্প শোনাবে।

অনেককাল আগে বৃষ্টি এলেই সবার দুঃখ বেদনা ধুয়ে মুছে সবাইকে সঙ্গ। এই ছিল বৃষ্টির চরিত্র।

বৃষ্টিরা রঙিণ হয়ে দেখাতো প্রজাপতির ফোয়ারা। ঝর ঝর ঝর।

আমি তোর জন্য খুঁজছি একটা কলকে ফুলের গাছ। হলুদ রঙা ফুলগুলি ভালোবাসতে বাসতে তোকে দেখাবে, গায়ে হলুদ।

তুই শাঁখ বাজাবি।

আর থাকবে না একাকীত্ব। আর থাকবে না মন খারাপ।

আচ্ছা একটা কথা বলুন তো, মন খারাপ শুধু ওর কাছেই আসবে? সত্যি করে বলবেন, মন খারাপের আর কোনো জায়গা নেই? হঠাৎ হঠাৎ এসে, কলসিতে ঢুকে থাকবে? এক গ্লাস জল গড়াতে গেলে, শুধু মন খারাপ?

একাকীত্বকে দূরে সরিয়ে রাখলেও মন খারাপ চলে আসে মোষের পিঠে। তখন তাকে মনে হয়, একলা রাখাল। যে সারাদিন রোদের কামড় খেয়েও পায়নি এক ফোঁটা বৃষ্টি।

রাখালকে তুই চিনিস, ওদের কাঁসাই পারের গ্রামে তোকে খাইয়েছিল কচি শশা। মনে পড়ছে? ঘরে ফেরার সময় তোর হাতে দিয়েছিল একটা তালপাতার পাখা। রাখালের তৈরি ওই পাখা তোর কাছে অনেকদিন ছিল। তোকে সঙ্গ দিয়েছে অনেক অনেক রাত। নিদ্রাহীন রাত।

আমি তোকে ঘুমের কথা বলেছি সকালবেলায়। তুই রাজি না হয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিস ঘুমের মতো উপহার।

তোকে তো হতেই হবে একা।

এক সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে আমার, তুই সন্ধ্যা প্রদীপের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়েছিলি অনেকক্ষণ তুলসি থানে। আমি সামনে যেতেই তুই ঘরের দিকে চলে গেলি। আমি পেলাম ধূপের সৌরভ।

ধূপের গন্ধ একা। সব সময়। আমি একাকিত্বের ছাই জড়ো করে নীরব হয়ে থাকি।

-----৮ বোশেখ ১৪৩০
-----২২---৪---২০২৩
------নির্মল হালদার





কবি নির্মল হালদারের বিভিন্ন সময়ের ছবি

পড়ুন "ঘর গেরস্থের শিল্প"

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ