রবিবার, ৮ আগস্ট, ২০২১

কবিতা / নির্মল হালদার

কবিতা / নির্মল হালদার




১৮১.
যা দেখার দেখব এই বেলা
জমি ছোট হয়ে আসছে
লাঙ্গল নেই
ধুলা ওড়ায় ট্রাক্টর
পাখিরা পালায়

যা দেখার দেখব এই বেলা
চাষিরা ধুঁকছে
বীজের অভাব
কুকুরের চিৎকার
মুরগির লাফ

যা দেখার দেখব এই বেলা
ইঁট পাঁজায় আগুন জ্বলছে
মাটি ফুরায়
জল ফুরায়
সাপ আসে একা একা

যা দেখার দেখব এই বেলা
নদীর বালি চুরি হয়ে যায়
গাছ চুরি হয়ে যায়
পুকুর বুজে যাচ্ছে
ব্যাঙ নাই

ঘুমের পরে ঘুম আসছে খুব।



১৮২.
আমি ধুলা লিখি

আমার আখর ধুলায় গড়াগড়ি।
আমি ধুলা লিখি। ধুলায় ধুলায়
আমার আখর। আমার আলো।

আমি আলো লিখি।

লিখন আমার ধুলায় ধুলায় শিশির।
লিখন আমার শিশিরের আগুন।
আমার আগুন আমার আখর।

আমি আগুন লিখি।


----১৭ শ্রাবণ ১৪২৮
----৩----৮---২০২১



১৮৩.
এই টুকুই তো আছে আমার
বটের ছায়া
পাখির ডাক
বাঁশবনের হাওয়া
পুকুরে ডুব

এই টুকুই তো আছে আমার
ধুলা পথে পায়ের শব্দ
শালের পাশে শিমূল
একাকী বক
ঘাসের সবুজ

এইটুকুই তো আছে আমার
মেঘের পরে মেঘ
অশথের শিকড়
কানা ভাঙ্গা থালা
ঘোমটার আড়ালে মুখ

এইটুকুই তো আছে আমার
কাঁদছে শিশু
মায়ের ডাক
তুলসী তলা
শাঁখের আওয়াজ

এই টুকুই তো আছে আমার
পায়রার উঠোন
কাকের ওড়াউড়ি
জাম বাটিতে মাড়
ছড়ানো ভাত

হাওয়াতো আছেই হাওয়ার সঙ্গে।




১৮৪.
ডাকাডাকির এই সকাল বেলা
কার কাছে যে যাই! বৃষ্টির শব্দ
আমারই বন্ধু। মেঘের শব্দ
মিলনের আস্বাদন।

স্বাদে--আস্বাদে মাটির সোঁদা গন্ধ,
আমাকে ডেকেছে শৈশব থেকে।
আমি আজ ফিরে যাই
কাদামাটি খেলায়। যদি একটা
পুতুল গড়তে পারি,

মানুষ গড়তে পারি।


-----১৮ শ্রাবণ ১৪২৮
-----৪----৮---২০২১



১৮৫.
পায়রা এসে ফিরে গেছে
কাক এসেও খবর নিয়ে গেল
উঠোনে রোদ নেমেছে
বেলা হলো

এখনো ঘুমোয় ছেলে

সজনে গাছে শুঁয়োপোকা
ঝরাপাতার আবর্জনা
তুলসী তলে আম পল্লব
সিঁদুরের দাগ

এখনো ঘুমোয় ছেলে

রাস্তা চলে যায় রাস্তার দিকে
একটা ষাঁড় একা
কুকুরটা শুঁকছে ধুলোবালি
নিম গাছ থেকে পড়ছে ফল

এখনো ঘুমোয় ছেলে

বেলা হলো,আসছি বড় বউ।



১৮৬.
চৌকাঠে আলপনা
পড়ে আছে খড়ি গোলা বাটি
ছেলে ডাকছে, মা মা

কাপড় শুকোয়
বড়ি শুকোয়
আকাশ শুকোয় রোদে রোদে

কাল বৃষ্টি হয়েছিল খুব
কাদা জল খুঁটে গেল চড়ুই
সাইকেল এসে দাঁড়ালো

মুড়িওয়ালার ডাক
টগর ফুলের কানাকানি
পোকা উঠছে গাছের ডালে

দেরি হয়ে যায় ঘরে ফিরতে।


-----১৯ শ্রাবণ ১৪২৮
----৫---৮----২০২১



১৮৭.
পুকুরে ঢিল পড়তেই,
সরে গেল জল
পানা ফুলে লাগলো কাঁপন
পানকৌড়ি আমাকে দেখলো

আমি কোথায় যাবো?

পদ্মবনে মৌমাছি
পদ্মপাতা টলমল
সূর্যের সাত রঙ
পাখিদের ওড়াউড়ি

আমি কোথায় যাবো?

কেউ ডাকছে না
রাস্তায় চলাচল
অর্জুন গাছে একটা তক্ষক
শুকনোপাতার ঝর ঝর

আমি কোথায় যাবো?

এইতো আমার চরাচর।



১৮৮.
সজনে শাক আজ একটু ভাজবে
পুঁটি মাছের টক করতেও ভুলবেনা
কে আছো গো শুনছো?

শালপাতা নিয়ে আসব
ধোঁয়া ওঠা ভাতে বিউলির ভাল
ক'টা কাগজি লেবু পেড়ে দিও

আমাকে দেবার পরও যেন কিছু থাকে
হঠাৎ কুটুম এলে বেড়ে দিও ভাত
সংসারের পুণ্যি হবে


মনে রেখো কাক ও কুকুরকেও
গাছতলেও রাখবে এক পাত
পোকামাকড়ের আহার জুটবে

বাতাস আসবে একটু একটু করে।


-----২০ শ্রাবণ ১৪২৮
----৬---৮---২০২১
----নির্মল হালদার





শনিবার, ৭ আগস্ট, ২০২১

জন্মদিন যখন প্রিয় কবির


আমাদের প্রিয় কবি নির্মল হালদারের জন্মদিন। এক নজর দেখে নেওয়া ফেসবুকের পাতায়।
____________________________________________



আজ প্রিয় কবি নির্মলদার জন্মদিন।  নির্মলদা আজ শুধু পুরুলিয়ার নন সারা বাংলার প্রিয় মানুষ।  আপনার উন্নত শির আকাশ স্পর্শ করলেও পা আপনার পুরুলিয়ার মাটিতেই থাকুক এই কামনা করি।  শুভ জন্মদিনের শ্রদ্ধা ভালোবাসা  শুভেচ্ছা জানাই।  ভালো থাকুন নির্মলদা,  আরও লিখুন,  আমরা প্রাণিত হই।




_______________________________________________

আলাপ ছিল না।পরিচয় ছিল না।শুধু নাম শুনেছি বহু মানুষের কাছে। ওর কবিতার সঙ্গেও আগে এতটা পরিচয় ছিল না। নির্মল হালদার। বাংলার বিশিষ্ট কবি। উন্নাসিক ছন্নছাড়া আবোল তাবোল জীবন। কবিতার জন্য আর শুধু কবিতাকে সঙ্গে নিয়ে একটা আস্ত গোটা জীবনযাপন। সবজি বিক্রেতা, বহুরূপী, কৃষক, শ্রমিক, রাস্তার ভিখারি-- এরা সবাই কথা বলে কবির কবিতায়। অতিমারীর এই সময়ে তাদের জীবনযাত্রা নিয়ে, দুর্দশা নিয়ে, অসহায়তা নিয়ে, কবির মন জমাট বাঁধে কালো মেঘের মতো। পরক্ষণেই বৃষ্টিপাত।
এখন তো আবার ভিশন ছটফটে। কোথাও গেলে স্থির হয়ে বসে থাকতে পারে না। জামা ধরে টেনে বসিয়ে রাখতে হয়। নির্মল দা কে নিয়ে অনেকের ভালো লাগা, না লাগা আগেও শুনেছি। কাছে এসে দেখলাম আসলে মানুষটা অন্যরকম। পাঁচজনের সঙ্গে মেলে না। নিজে যেচে উপহার পেতে যেমন ভালোবাসে তার থেকে বেশি উজার করে দিতে আবেগতাড়িত হয়ে পড়ে। নিজের কিছু রাখে না। সেই না থাকাতেই যেন ভীষণ আনন্দ তার। অদ্ভুত মানুষ!! আমার কলেজ জীবনে এটাও শুনেছিলাম- পুরুলিয়ায় একজন কবি আছেন যার বাড়ির দরজায় কোন তালা পড়ে না। সব সময় খোলা থাকে। তারপরে হঠাৎ করেই কোন একদিন পরিচয় হলো। দিন আর মনে নেই। পরিচয় থেকে ভালোবাসা। আত্মীয়তা। ভাইফোঁটার দিন দুজনের কাছে নিয়ম করে ফোঁটা  নিতে বেরিয়ে পড়ে। একজন নাচনী শিল্পী পস্তুদি। অন্যজন রুমা। রুমা গুহ নিয়োগী। বেঁচে থাক আত্মীয়তা। ভালো থেকো নির্মলদা। জন্মদিনের অনেক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানাই।





_________________________________________________


কবির কাছে রেখে এলাম
জন্মদিনের ডোর
ভালোবাসায় অপরিসীম
শ্রাবণ দিনের ভোর

শুভ জন্মদিন কবি নির্মল হালদার। আমাদের প্রিয় নির্মলদা।


_________________________________________________





________________________________________________



________________________________________________

আজ ২১ শ্রাবণ ১৪২৮/৭ অগাস্ট ২০২১ কবি নির্মল হালদারের জন্মদিন। সেই উপলক্ষে আমরা, তাঁর বন্ধুরা আগামীকাল ২২ শ্রাবণ/৮ অগাস্ট রোববার সন্ধ্যেবেলা জন্মদিন উদযাপন করবো নির্মলদার বাড়িতেই। হবে কবিতা পাঠ। আপনারাও আসুন। আমন্ত্রণ জানাই সকলকেই।



______________________________________________

নির্মলদার জন্মদিন
--------------------------
পৃথিবী পাক খায়
বছর পাক খায়
আমাদের কবিতায় থাকাগুলো
পাক খেতে খেতে

নির্মলদার ঘরে এসে
হুমড়ি খেয়ে পড়ে একদিন

সেদিন হৈ হৈ উৎসব
সেদিন থৈ থৈ কবিতা

সেদিন আমাদের সবার জন্মদিন

সেদিন বাংলা কবিতার জন্মদিন
বাংলার মাটির কবিতার জন্মদিন

কবি নির্মল হালদারের জন্মদিন




উত্তম, নির্মলদার জন্মদিনে শুভেচ্ছা ও একটি কবিতা পাঠালাম ৷ কাল পাঠ করবে এই অনুরোধ ৷ আমি যেতে পারছিনা ৷

                                                             মুজিবর




শুক্রবার, ৬ আগস্ট, ২০২১

সারাংশ / নির্মল হালদার

সারাংশ / নির্মল হালদার



আমি আজ সারাংশকে খুঁজছিলাম। আমি আজ সারাদিন সারাংশকে খুঁজছিলাম।সে বলেছিল ------- প্রতিটি ঘর আমার ঘর। যেকোনো ঘরে আমি ঢুকে যেতে পারি।

এই তো একটা ঘর থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরে এলাম। এই তো ওই হলুদ ঘর থেকেও ফিরে এসেছি। ওই শাদা ঘর থেকে ফিরে এসেছি। সমস্ত ঘর আমাকে বলে, আমাকে চেনে না কেউ। সমস্ত ঘর আমাকে বলে, মগের মুলুক পেয়েছেন? ঢুকে পড়লেই হলো? কোথাও কোথাও শুনতে হলো, ঘরে ঢুকলেই গলা ধাক্কা খেতে হবে।

এইরকম একটা ঘরে বলেছিলাম, হ্যাঁ হ্যাঁ চলে যাচ্ছি। তার আগে আমাকে এক গ্লাস জল দিন। না--- জল পাইনি।

আজ সারাদিন সারাংশকে খুঁজছি। সে বলেছিল, গ্রামে শহরে আমার ঘর আছে। যেকোনো ঘর
আমার ঘর।

ঘর?

একটা আশ্রয়। আত্মীয়তার স্বাদ।
যৌথতার আলো অন্ধকার।

না।
কোনো আশ্রয় নেই।
না।
যৌথতা নেই।
না।
আত্মীয়তার আস্বাদ নেই।


সারাংশ কোথায় দেখেছে ঘর? সারাংশ কোথায় দেখেছে আশ্রয়ের আলো ছায়া?

কাল মনে হয়েছিল, ওই যে নীল রঙের বাড়ি। ওই বাড়িতে যাবো। সাধ হয়েছিল, দুটি ডাল ভাত খাবো।
সেই বাড়ির দরজার কাছে গিয়ে দেখলাম, দরজা খুললো। দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আমি হতাশ না হয়ে সারাংশর উদ্দেশ্যে একটা হাসি হেসে উঠলাম। এবং এই হাসির পরেও সারাংশকে আমি খুঁজে চলেছি।

সারাংশ কেন বলেছিল, প্রতিটি ঘর আমার ঘর। প্রতিটি মানুষ আমার আত্মীয় বন্ধু?

সেদিন পথচলতি একজনকে বললাম, চলুন চা খাই। তিনি বললেন, অন্য কাজ আছে। আর অচেনা মানুষের সঙ্গে তিনি চা খাবেন কেন? সেদিন চা দোকানের দিকে চেয়ে এক চা পিপাসুকে বললাম, এক কাপ চা খাওয়াবেন? তিনি বললেন, আপনাকে চিনি না জানিনা। চা খেতে খুঁজছেন? আমি হাসতে হাসতে চা দোকান থেকে বাইরে এসে পেয়ারা বিক্রেতাকে বললাম, একটা পেয়ারা দেবে? বিক্রেতা পয়সা চাইলেন।

পয়সা?

পয়সা আমি চিনতে চাই না।
আমার পকেটে পয়সা নেই।
আমি বললাম না সে কথা। আমি চুপচাপ রাস্তায় রাস্তায় বন্ধু খুঁজতে খুঁজতে এলোমেলো হয়ে পড়ছি।
আমার পিপাসা দীর্ঘ হয়ে উঠছে।

মিষ্টির দোকানে গিয়ে জল চাইলাম। এক গ্লাস জলের দাম এক টাকা। আমার পকেটে পয়সা নেই। আমাকে খুঁজতেই হবে সারাংশ কোথায়? আমাকে খুঁজতেই হবে সারাংশ সত্য না মিথ্যে?

সারাংশ তো সত্যই।
হাত পা আছে। চোখ নাক কান আছে। আর একটা মানুষের যা যা থাকা দরকার, সমস্তই আছে।

সারাংশ মানুষ।

এবার বুঝতে হবে, সত্যি মানুষ না মিথ্যে মানুষ?
এবার বুঝতে হবে, সত্য কি? মিথ্যা কি?

আমি বিচলিত হয়ে পড়ছি।
আমি ঘেমে উঠছি। আমার খিদে নেই। শুধু জল তেষ্টা।
সারাংশকে আজ পেতেই হবে।
তার সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হয়। আজ কেন হবে না?

ওই ঝুপড়িতে ঢুকে পড়বো।
আমাকে ফেরাবে না নিশ্চয়ই।
আমি একটু জিরোতে চাই।

ঢুকতে যাবো যেই, এক বালক এসে বললো, এখন কেউ নেই। আপনি আসবেন না।

সারাংশ সারাংশ
চিৎকার করতে ইচ্ছে করলো।

আপনারা কেউ সারাংশকে দেখেছেন? ঠোঁটে একটা কাটা দাগ আছে। সব সময় শাদা পাজামা পাঞ্জাবী পরে। হঠাৎ হঠাৎ রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে ওঠে।
আপনারা দেখেছেন তাকে?

কে যেন ডাকছে আমাকে।
চারদিক তাকিয়ে দেখি, কেউ নেই। কেউ নেই। আবার শুনতে পাই, আমাকে কেউ ডাকছে।

রাস্তায় শুধু দাঁড়িয়ে আছে একটা নিম গাছ। 
তবে কী সেই ডাকছে আমাকে?

আমি সাড়া দিলে সারাংশকে খুঁজে পাবো না।

----২০ শ্রাবণ ১৪২৮
----৬---৮---২০২১
-----নির্মল হালদার




বৃহস্পতিবার, ৫ আগস্ট, ২০২১

জন্মদিনের গন্ধ / নির্মল হালদার

জন্মদিনের গন্ধ / নির্মল হালদার



অনেকদিন পর বাবা ঘরে ফিরেছে। মায়ের জন্য নিয়ে এসেছে একটা ফুলন পাড় শাড়ি। মা আরও চেয়েছিল, একটা টিনের বাক্স। ফুল আঁকা। সেও নিয়ে এসেছে বাবা। মায়ের জন্য গন্ধতেলও নিয়ে এসেছে। সবকিছু দেখেও মা গদগজ করছিল, ছেলেমেয়েদের জন্য বাবা কিছুই আনেনি।

ছেলেমেয়েরা বাবার পোঁটলা পুঁটলি খুলে খুলে দেখছিল। তবে আমার জন্য নিয়ে এসেছে একটা চাকা। কাঠের। হাতে পেয়েই আমি চাকাটা চালিয়ে নিয়েছি। বেশ সুন্দর। ধুলা কেটে কেটে এগিয়ে যায়।

বাবা বলছিল, ও দেশে আবার গেলে আমার জন্য নতুন একটা জামা এনে দেবে। আর দিদিদের জন্য শাড়ি। কাজ ফুরিয়ে গেছলো বলে,তেমন কিছু টাকা পায়নি। নইলে, ও দেশের মন্ডা নিয়ে আসতো।পাপড়ি নিয়ে আসতো। খুব ভালো খেতে।

যা পেয়েছি তাতেই আমি খুশি। দিদিরা অবশ্য মুখভার করছিল। তাদের কপালে কিছুই জুটলো না। বাবা হাসতে হাসতে বলে, দাঁড়া এখান থেকেই তোদের জন্য নতুন কাপড় এনে দেবো।

অনেকদিন পর আমি বাবাকে পেয়েছি বলে, বাবার পিছু ছাড়ছি না। বাবা যেখানেই যায় সঙ্গে আমি। মা বারণ করে। বলে----তোর বাবা কাজে যাচ্ছে। কাজ খুঁজতে ও যাচ্ছে। তুই সঙ্গে যাবি কেন? তুই ঘরে আয়।
আমি শুনি না। বাবার সঙ্গে থাকলে, বাবা এটা সেটা কিনে দেয়। সেদিন তো দু' পয়সার কুল কিনে দিলো। তারপরেই দু পয়সার নিমকি--বোঁদে।

বোঁদে খেয়ে বোঁদের রস বাবার কামিজে মুছে দিলাম। বাবা হাসলো। বাবার এক বন্ধুর বাড়িতে আমাকে চা-ও দিয়েছিল। যদিও আমি চা খেতে খুব একটা অভ্যস্ত নই। কিন্তু খেয়ে দিলাম। বাবা ও বললো, খেয়ে নিতে।

বাবা অনেকদিন পর এসেছে বলে, আমাদের ভাইবোনদের লেখাপড়া লাটে উঠেছে। বাড়িতে সব সময় খুশি খুশি ভাব। কাল বাড়িতে মাছ হয়েছিল। পোরশু ডিম হয়েছিল। আমি আধটা ডিম পেয়েই অনেকটা ভাত খেয়ে ফেলেছিলাম। কাল মাছের কাঁটা বেছে দিয়েছিল মেজদি। কাঁটাতে আমার খুব ভয়। একবার গলায় লেগে বিপদ হয়েছিল। আরেকবার মায়ের কোলে থাকতে-থাকতে চোখ উল্টে দিয়েছিলাম। সবার কান্নাকাটি। ভাবছিল, আমি মরে গেছি।

আমি এখন অনেক বড় হয়ে গেছি। পাড়ার স্কুলে যাই। বারো মাস সকালে স্কুল। আমি আঁধার থাকতেই উঠে পড়ি। আর উঠেই কাঁদতে থাকি। মাকে বলি, স্কুলে যাবো না। মা-ও বলে, ঠিক আছে যেতে হবে না। তুই এখন ঘুমো। আমি আবার ঘুমোবো না। স্কুলেই যাবো।

বাবা এসেছে বলে, সত্যি সত্যি আমি এখন স্কুলে যাচ্ছি না।

বাবা ভোরে ওঠে। মা বলছিল, গ্রাম থেকে যে সমস্ত ঝুড়ি ঝুড়ি চাল আসে , বাবা লোকের জন্য কিনে দেয়। এজন্য পয়সা পেয়ে থাকে। ও দেশ থেকে বাবা তেমন কোনো টাকা পয়সা আনতে পারেনি। তাই বাড়িতে এসে কিছু কাজকর্ম করার চেষ্টা। নইলে যে সংসার চলবে না।

দিদিরা ঠোঙা করলেও চাল ডালের দাম ওঠে না। ভাবে অভাবেও বাবার মুখে হাসি থাকে। কখনোই আমাদের ভাইবোনদের ধমক দেয় না। বিশেষ করে আমি ভাইবোনদের মধ্যে ছোট বলে, মা-বাবার কাছ থেকে আস্কারা পেয়ে থাকি। সবার কাছ থেকেই আদর  পেয়ে থাকি। এ কারণেই, চোর-পুলিশ খেলতে আমার বাধা নেই। এবং খেলতে খেলতে সন্ধে হয়ে যায়।

খেলা শেষে ঘরে এসেই ঘুমিয়ে পড়ি। বাবা ও মা আমাকে ঘুম থেকে তুলে খেতে বলে। আজ বলছিল, কাল বাদে পোরশু আমার জন্মদিন। ন'টা তরকারি পায়েস করার মতো সামর্থ্য নেই। শুধু কালী মন্দিরে পুজো দিয়ে আসবে মা।

তারপরেই, মায়ের চোখে জল। দুধ কিনতেও পয়সা লাগবে। বাবা বললো, দুঃখ করোনা। একদিন
ভগবান মুখ তুলে চাইবে। দেখো। হাসি ফুটবে সবার মুখে। আমার মেয়েদের ঠোঙা করতেও হবে না।

আমি ঘুম চোখেই শুনে ফেলেছি আমার জন্মদিনের কথা। গেল বার মা আমাকে কপালে চন্দন দিয়ে খেতে দিয়েছিল। বাবা ছিলনা। তবে চিঠি লিখেছিল একটা মাকে। মা পড়তে পারে না বলে বড়দা পড়ে শুনিয়ে ছিল। চিঠিটা ছিল এই রকম---------ছোট বউ এই শ্রাবণ মাসে ঘর যেতে পারলাম না। এদিকে বর্ষা খুব।
পুরুলিয়াতে জল হচ্ছে কী?

দত্তবাবু বলছিলেন, একেবারে পুজোর সময় যেতে। তাই হয়তো যাবো। ততদিন তোমরা ভালো থেকো। আর এমাসে গোরার জন্মদিনটা পালন করবে। তার জন্য আমার আশীর্বাদ রইলো।

চিঠিটা শুনতে শুনতে মা কেঁদেছিলো খুব। বলছিল, গোরা বাপের সঙ্গ পেলো না তেমন।

এ বছর তো বাবাকে পেয়েছি। মাকে বলবো, জন্মদিনে
বাবা আর আমি একসঙ্গে খাবো।

মা বলছিল, কিছু করি বা না করি পায়েস একটু রাঁধতেই হবে। জন্মদিনে পায়েসটা শুভ। বাবা বললো, তুমি চিন্তা করোনা আমি এক পুয়া আতপ চাল এনে
দেবো।

আমি আজ থেকেই পায়েসের গন্ধ পাচ্ছি।



-----১৯ শ্রাবণ ১৪২৮
-----৫---৮---২০২১
-----নির্মল হালদার









বুধবার, ৪ আগস্ট, ২০২১

আমি যখন মডেল / নির্মল হালদার
















































ছবি : আলোকচিত্রী সন্দীপ কুমার

মডেল : কবি নির্মল হালদার



আমি যখন মডেল / নির্মল হালদার



আমি যখন মডেল হয়ে উঠলাম ফটোগ্রাফার সন্দীপ কুমারের কাছে তখন আমিও একজন শিল্পী। অথবা সৃজনশীল একজন হয়ে উঠেছি। হয়েওছি। কেননা, সৃজনশীল না হলে আলোকচিত্রীর মনকে বুঝে উঠতে পারবোনা। আলোকচিত্রী যেহেতু ক্যামেরা দিয়ে একটি ছবি আঁকবেন, তখন আমাকে আমার মেধা ও মনন থেকে স্থির হতে হবে। আমার হৃদয় দিয়ে বুঝতে হবে, তিনি কি চাইছেন। পারস্পরিক ভালোবাসা থেকেই, একটি যৌথ সৃষ্টি হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রেও আমি যখন মডেল আমাকে সচেতন হয়ে স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে আলোকচিত্রীকে সহযোগিতা করে যেতে হবে। তাই সন্দীপ যখন চাইলেন, শালুক ভরা দীঘিতে আমাকে নামাতে। আমি গামছা পরে নেমে গেলাম। তারপর লাল শালুকের মাঝে আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। সন্দীপের ক্যামেরা ছবি এঁকে চললো একটার পর একটা ।

আলোকচিত্রী চাইছেন, আমাকে বিরাট এক ওজন দাঁড়িতে বসিয়ে ছবি তুলবেন। এখানে আমি যদি
কিন্তু কিন্তু করি, তাহলে আলোকচিত্রী তার লক্ষ্যের ছবিটি পাবেননা। আমি রাজি হয়ে গেলাম। কারণ,
আমি মডেল। আমিও একজন সৃজনশীল।

আলোকচিত্রীও মডেলের যৌথতার ফসল হয়ে উঠবে একটি ছবি। কিংবা ফটোগ্রাফ। এ কথা বা ভাবনা দুজনের মাথাতেই রাখতে হবে। তবেই প্রকৃত একটি ছবি। সৃষ্টি হবে।

সন্দীপ যখন বললেন, নদীর উপরে যে পাথর সেখানে আমাকে শুয়ে পড়তে হবে। আমি শুয়ে পড়লাম। তার মানে আমার মনকে আমি শুইয়ে দিলাম ক্যামেরার সামনে। ক্যামেরা তার চোখ দিয়ে যেমন ইচ্ছে যেদিক দিয়ে ইচ্ছে ছবি তুলে যাবে।

আমি বলতে চাই, আলোকচিত্রীর সঙ্গে মডেলের বোঝাপড়া থাকা চাই। আমাদের ক্ষেত্রেও মুখে মুখে বোঝাপড়া ছিল না বটে, তবে মনে মনে ছিল। আর ছিল বলেই, সন্দীপ যখন যা বলেছেন, আমি চুপ করে শুনেছি।

একবার এক পাহাড়ের কাছে গিয়ে আমাকে বললেন, ছোট ছোট পাথরে উঠে যেতে। শুয়ে পড়তেও বললেন। আমি কোনো ভাবেই "না" করিনি। আমাকে আরো বললেন, অবিনের কাঁধে উঠে পড়তে। অবিন কাঁধে নিয়ে হেঁটেও যাবে। আমি ভয়ে অস্থির। কিন্তু ভয় করলে চলবে না। আমি জয় মা বলে অবিনের কাঁধে উঠে পড়লাম। অবিন হেঁটে চলেছে। আমার বুক দুরু দুরু। সন্দীপের ক্যামেরা চলছে। না চললে, আমার সৃজনশীলতা ভেঙ্গে পড়বে। আমাকে তাই সৃষ্টিশীল মন নিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে। আমি বলতে চাই, আমি মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনয় করছি। কেবল আমার মুখে সংলাপ নেই। পরিচালক যা চাইছেন, আমাকে করে যেতে হচ্ছে।

মুখটা এদিকে হবে না ওদিকে,মাথা কতটা ঝুঁকে থাকবে, আমাকে শুনে যেতে হচ্ছে। কোনো নির্দেশ অমান্য করা যাবে না। ভুল করলেই দর্শকরা ঢিল ছুঁড়বে।

ওই ভাঙ্গা ঘরটাতে ঢুকে পড়ুন-----সন্দীপ আমাকে নির্দেশ করলেন। রাস্তার ধারে ঘর। ভেঙ্গে পড়া ঘর। ঝুলকালিতে ভর্তি। ঘরের মেঝেতে গোবর। কাদামাটি। সেই ঘরের জানালা থেকে আমাকে মুখ বাড়াতে হবে। সন্দীপ বাইরে থেকে ছবিটা তুলবেন। আমি রাজি। একবারও বললাম না, আর পারছি না ভাই।

আলোকচিত্রী অথবা নির্দেশক যখন ক্লান্তির কথা বলছেন না, আমাকেও বলা চলবে না। আমি মডেল হলেও আমিও শিল্পী।

আমাকে ক্যানভাসে রেখে চিত্রকর রঙ ঢালছেন। আমাকে নড়াচড়া করা চলবে না। কেন না, আমাকে নিয়ে চিত্রকর পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করছেন।

আমাকেও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। হেরে গেলে পিছিয়ে পড়লে চলবে না। তো একটি ফটোগ্রাফের ক্ষেত্রে যদি ফটোগ্রাফার মডেল নিয়ে কাজ করেন, মডেলকে অবশ্যই ক্যামেরার সামনে স্বতঃস্ফূর্ত হতে হবে। ভালোবেসে।

একটা জায়গায় অনেক মদের বোতল। মদের বোতল গুলি মাটিতে ছড়িয়ে সন্দীপ আমাকে নির্দেশ দিলেন, তার মাঝে শুয়ে পড়তে। আমি কোনো দ্বিধা না করে শুয়ে পড়েছি।

যে ছবি দেখে পরে অনেকে নাক উঁচু করেছেন। যদিও আমার কোনো শুচিবাই ছিল না। মদ্যপান করবো আর ছবি তুলতে আপত্তি? এরকম মধ্যবিত্ত সুলভ আমার মন নয়। এই কারণেই সন্দীপের ক্যামেরার সামনে মডেল হতে পেরেছি।

আমার মনে হয়েছে, মডেল কোনো পুতুল নয়। মডেল, একজন সৃজনশীল মানুষ। ক্যামেরাম্যান ও মডেলের যৌথ ভাবনা থেকেই ছবি উঠে আসে। সৌন্দর্যের কাছে। মানুষের কাছে।


আমি যে মডেল হতে পেরেছি, এ আমার প্রাপ্তি। আমি যে ক্যামেরার মুখোমুখি হয়ে, ভয় না করে, সংকোচ না করে,জড়তা না রেখে সন্দীপকে একটার পর একটা ছবি দিয়েছি, এ আমার এক জীবনের আলোক প্রাপ্তি। এখানে তাই সন্দীপকেও বলতে চাই, আমার কুর্নিশ গ্রহণ করুণ।

অনেক ছবি। অনেক ঘটনা। অজস্র অভিজ্ঞতা। শেষে একটা গল্প বলতেই হবে, বর্ষা চলছে। সন্দীপ আমাকে নিয়ে মানবাজার। ছবি তুলতে। তো ঘুরতে ঘুরতে
একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি। সন্দীপ দেখতে পেয়েছেন একটি বড়ো কচু পাতায় একটি নিঃশব্দ শামুক। আমাকে নির্দেশ করলেন, কচু পাতার উপরে শামুকের কাছে আমার মুখটিকে হাঁ করতে হবে।

আমি সঙ্গে সঙ্গে তার কথা মান্য করলাম। শামুকের প্রাণের সঙ্গে আমার জীবন এক হয়ে একটি ছবি হয়ে উঠলো। শাদাকালো।

এই ভাবে চলতে চলতে সন্দীপ আমার বন্ধু। আমিও বন্ধু হতে পেরেছি তার কাছে।

একবার এক জায়গায় আমার মুখে সিগারেট। তখন সন্দীপের সঙ্গে আলাপ ছিল না। সিগারেটে টান দিতে দিতেই পরিচয় । তিনি ততক্ষণে ছবি তুলে চলেছেন।

আমার সিগারেট শেষ। সন্দীপ একটার পর একটা সিগারেট আমাকে দিয়ে যাচ্ছেন। কারণ, সিগারেটের ধোঁয়ার সঙ্গে আমার মুখ তিনি চাইছেন।

সেই প্রথম আলাপেও আমি সন্দীপের সৃষ্টিশীল মন পড়তে পেরেছিলাম।

----১৮ শ্রাবণ ১৪২৮
-----৪---৮----২০২১
-----নির্মল হালদার









কবি নির্মল হালদারের বিভিন্ন সময়ের ছবি

পড়ুন "ঘর গেরস্থের শিল্প"

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ