শনিবার, ৭ আগস্ট, ২০২১

জন্মদিন যখন প্রিয় কবির


আমাদের প্রিয় কবি নির্মল হালদারের জন্মদিন। এক নজর দেখে নেওয়া ফেসবুকের পাতায়।
____________________________________________



আজ প্রিয় কবি নির্মলদার জন্মদিন।  নির্মলদা আজ শুধু পুরুলিয়ার নন সারা বাংলার প্রিয় মানুষ।  আপনার উন্নত শির আকাশ স্পর্শ করলেও পা আপনার পুরুলিয়ার মাটিতেই থাকুক এই কামনা করি।  শুভ জন্মদিনের শ্রদ্ধা ভালোবাসা  শুভেচ্ছা জানাই।  ভালো থাকুন নির্মলদা,  আরও লিখুন,  আমরা প্রাণিত হই।




_______________________________________________

আলাপ ছিল না।পরিচয় ছিল না।শুধু নাম শুনেছি বহু মানুষের কাছে। ওর কবিতার সঙ্গেও আগে এতটা পরিচয় ছিল না। নির্মল হালদার। বাংলার বিশিষ্ট কবি। উন্নাসিক ছন্নছাড়া আবোল তাবোল জীবন। কবিতার জন্য আর শুধু কবিতাকে সঙ্গে নিয়ে একটা আস্ত গোটা জীবনযাপন। সবজি বিক্রেতা, বহুরূপী, কৃষক, শ্রমিক, রাস্তার ভিখারি-- এরা সবাই কথা বলে কবির কবিতায়। অতিমারীর এই সময়ে তাদের জীবনযাত্রা নিয়ে, দুর্দশা নিয়ে, অসহায়তা নিয়ে, কবির মন জমাট বাঁধে কালো মেঘের মতো। পরক্ষণেই বৃষ্টিপাত।
এখন তো আবার ভিশন ছটফটে। কোথাও গেলে স্থির হয়ে বসে থাকতে পারে না। জামা ধরে টেনে বসিয়ে রাখতে হয়। নির্মল দা কে নিয়ে অনেকের ভালো লাগা, না লাগা আগেও শুনেছি। কাছে এসে দেখলাম আসলে মানুষটা অন্যরকম। পাঁচজনের সঙ্গে মেলে না। নিজে যেচে উপহার পেতে যেমন ভালোবাসে তার থেকে বেশি উজার করে দিতে আবেগতাড়িত হয়ে পড়ে। নিজের কিছু রাখে না। সেই না থাকাতেই যেন ভীষণ আনন্দ তার। অদ্ভুত মানুষ!! আমার কলেজ জীবনে এটাও শুনেছিলাম- পুরুলিয়ায় একজন কবি আছেন যার বাড়ির দরজায় কোন তালা পড়ে না। সব সময় খোলা থাকে। তারপরে হঠাৎ করেই কোন একদিন পরিচয় হলো। দিন আর মনে নেই। পরিচয় থেকে ভালোবাসা। আত্মীয়তা। ভাইফোঁটার দিন দুজনের কাছে নিয়ম করে ফোঁটা  নিতে বেরিয়ে পড়ে। একজন নাচনী শিল্পী পস্তুদি। অন্যজন রুমা। রুমা গুহ নিয়োগী। বেঁচে থাক আত্মীয়তা। ভালো থেকো নির্মলদা। জন্মদিনের অনেক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানাই।





_________________________________________________


কবির কাছে রেখে এলাম
জন্মদিনের ডোর
ভালোবাসায় অপরিসীম
শ্রাবণ দিনের ভোর

শুভ জন্মদিন কবি নির্মল হালদার। আমাদের প্রিয় নির্মলদা।


_________________________________________________





________________________________________________



________________________________________________

আজ ২১ শ্রাবণ ১৪২৮/৭ অগাস্ট ২০২১ কবি নির্মল হালদারের জন্মদিন। সেই উপলক্ষে আমরা, তাঁর বন্ধুরা আগামীকাল ২২ শ্রাবণ/৮ অগাস্ট রোববার সন্ধ্যেবেলা জন্মদিন উদযাপন করবো নির্মলদার বাড়িতেই। হবে কবিতা পাঠ। আপনারাও আসুন। আমন্ত্রণ জানাই সকলকেই।



______________________________________________

নির্মলদার জন্মদিন
--------------------------
পৃথিবী পাক খায়
বছর পাক খায়
আমাদের কবিতায় থাকাগুলো
পাক খেতে খেতে

নির্মলদার ঘরে এসে
হুমড়ি খেয়ে পড়ে একদিন

সেদিন হৈ হৈ উৎসব
সেদিন থৈ থৈ কবিতা

সেদিন আমাদের সবার জন্মদিন

সেদিন বাংলা কবিতার জন্মদিন
বাংলার মাটির কবিতার জন্মদিন

কবি নির্মল হালদারের জন্মদিন




উত্তম, নির্মলদার জন্মদিনে শুভেচ্ছা ও একটি কবিতা পাঠালাম ৷ কাল পাঠ করবে এই অনুরোধ ৷ আমি যেতে পারছিনা ৷

                                                             মুজিবর




শুক্রবার, ৬ আগস্ট, ২০২১

সারাংশ / নির্মল হালদার

সারাংশ / নির্মল হালদার



আমি আজ সারাংশকে খুঁজছিলাম। আমি আজ সারাদিন সারাংশকে খুঁজছিলাম।সে বলেছিল ------- প্রতিটি ঘর আমার ঘর। যেকোনো ঘরে আমি ঢুকে যেতে পারি।

এই তো একটা ঘর থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরে এলাম। এই তো ওই হলুদ ঘর থেকেও ফিরে এসেছি। ওই শাদা ঘর থেকে ফিরে এসেছি। সমস্ত ঘর আমাকে বলে, আমাকে চেনে না কেউ। সমস্ত ঘর আমাকে বলে, মগের মুলুক পেয়েছেন? ঢুকে পড়লেই হলো? কোথাও কোথাও শুনতে হলো, ঘরে ঢুকলেই গলা ধাক্কা খেতে হবে।

এইরকম একটা ঘরে বলেছিলাম, হ্যাঁ হ্যাঁ চলে যাচ্ছি। তার আগে আমাকে এক গ্লাস জল দিন। না--- জল পাইনি।

আজ সারাদিন সারাংশকে খুঁজছি। সে বলেছিল, গ্রামে শহরে আমার ঘর আছে। যেকোনো ঘর
আমার ঘর।

ঘর?

একটা আশ্রয়। আত্মীয়তার স্বাদ।
যৌথতার আলো অন্ধকার।

না।
কোনো আশ্রয় নেই।
না।
যৌথতা নেই।
না।
আত্মীয়তার আস্বাদ নেই।


সারাংশ কোথায় দেখেছে ঘর? সারাংশ কোথায় দেখেছে আশ্রয়ের আলো ছায়া?

কাল মনে হয়েছিল, ওই যে নীল রঙের বাড়ি। ওই বাড়িতে যাবো। সাধ হয়েছিল, দুটি ডাল ভাত খাবো।
সেই বাড়ির দরজার কাছে গিয়ে দেখলাম, দরজা খুললো। দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আমি হতাশ না হয়ে সারাংশর উদ্দেশ্যে একটা হাসি হেসে উঠলাম। এবং এই হাসির পরেও সারাংশকে আমি খুঁজে চলেছি।

সারাংশ কেন বলেছিল, প্রতিটি ঘর আমার ঘর। প্রতিটি মানুষ আমার আত্মীয় বন্ধু?

সেদিন পথচলতি একজনকে বললাম, চলুন চা খাই। তিনি বললেন, অন্য কাজ আছে। আর অচেনা মানুষের সঙ্গে তিনি চা খাবেন কেন? সেদিন চা দোকানের দিকে চেয়ে এক চা পিপাসুকে বললাম, এক কাপ চা খাওয়াবেন? তিনি বললেন, আপনাকে চিনি না জানিনা। চা খেতে খুঁজছেন? আমি হাসতে হাসতে চা দোকান থেকে বাইরে এসে পেয়ারা বিক্রেতাকে বললাম, একটা পেয়ারা দেবে? বিক্রেতা পয়সা চাইলেন।

পয়সা?

পয়সা আমি চিনতে চাই না।
আমার পকেটে পয়সা নেই।
আমি বললাম না সে কথা। আমি চুপচাপ রাস্তায় রাস্তায় বন্ধু খুঁজতে খুঁজতে এলোমেলো হয়ে পড়ছি।
আমার পিপাসা দীর্ঘ হয়ে উঠছে।

মিষ্টির দোকানে গিয়ে জল চাইলাম। এক গ্লাস জলের দাম এক টাকা। আমার পকেটে পয়সা নেই। আমাকে খুঁজতেই হবে সারাংশ কোথায়? আমাকে খুঁজতেই হবে সারাংশ সত্য না মিথ্যে?

সারাংশ তো সত্যই।
হাত পা আছে। চোখ নাক কান আছে। আর একটা মানুষের যা যা থাকা দরকার, সমস্তই আছে।

সারাংশ মানুষ।

এবার বুঝতে হবে, সত্যি মানুষ না মিথ্যে মানুষ?
এবার বুঝতে হবে, সত্য কি? মিথ্যা কি?

আমি বিচলিত হয়ে পড়ছি।
আমি ঘেমে উঠছি। আমার খিদে নেই। শুধু জল তেষ্টা।
সারাংশকে আজ পেতেই হবে।
তার সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হয়। আজ কেন হবে না?

ওই ঝুপড়িতে ঢুকে পড়বো।
আমাকে ফেরাবে না নিশ্চয়ই।
আমি একটু জিরোতে চাই।

ঢুকতে যাবো যেই, এক বালক এসে বললো, এখন কেউ নেই। আপনি আসবেন না।

সারাংশ সারাংশ
চিৎকার করতে ইচ্ছে করলো।

আপনারা কেউ সারাংশকে দেখেছেন? ঠোঁটে একটা কাটা দাগ আছে। সব সময় শাদা পাজামা পাঞ্জাবী পরে। হঠাৎ হঠাৎ রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে ওঠে।
আপনারা দেখেছেন তাকে?

কে যেন ডাকছে আমাকে।
চারদিক তাকিয়ে দেখি, কেউ নেই। কেউ নেই। আবার শুনতে পাই, আমাকে কেউ ডাকছে।

রাস্তায় শুধু দাঁড়িয়ে আছে একটা নিম গাছ। 
তবে কী সেই ডাকছে আমাকে?

আমি সাড়া দিলে সারাংশকে খুঁজে পাবো না।

----২০ শ্রাবণ ১৪২৮
----৬---৮---২০২১
-----নির্মল হালদার




বৃহস্পতিবার, ৫ আগস্ট, ২০২১

জন্মদিনের গন্ধ / নির্মল হালদার

জন্মদিনের গন্ধ / নির্মল হালদার



অনেকদিন পর বাবা ঘরে ফিরেছে। মায়ের জন্য নিয়ে এসেছে একটা ফুলন পাড় শাড়ি। মা আরও চেয়েছিল, একটা টিনের বাক্স। ফুল আঁকা। সেও নিয়ে এসেছে বাবা। মায়ের জন্য গন্ধতেলও নিয়ে এসেছে। সবকিছু দেখেও মা গদগজ করছিল, ছেলেমেয়েদের জন্য বাবা কিছুই আনেনি।

ছেলেমেয়েরা বাবার পোঁটলা পুঁটলি খুলে খুলে দেখছিল। তবে আমার জন্য নিয়ে এসেছে একটা চাকা। কাঠের। হাতে পেয়েই আমি চাকাটা চালিয়ে নিয়েছি। বেশ সুন্দর। ধুলা কেটে কেটে এগিয়ে যায়।

বাবা বলছিল, ও দেশে আবার গেলে আমার জন্য নতুন একটা জামা এনে দেবে। আর দিদিদের জন্য শাড়ি। কাজ ফুরিয়ে গেছলো বলে,তেমন কিছু টাকা পায়নি। নইলে, ও দেশের মন্ডা নিয়ে আসতো।পাপড়ি নিয়ে আসতো। খুব ভালো খেতে।

যা পেয়েছি তাতেই আমি খুশি। দিদিরা অবশ্য মুখভার করছিল। তাদের কপালে কিছুই জুটলো না। বাবা হাসতে হাসতে বলে, দাঁড়া এখান থেকেই তোদের জন্য নতুন কাপড় এনে দেবো।

অনেকদিন পর আমি বাবাকে পেয়েছি বলে, বাবার পিছু ছাড়ছি না। বাবা যেখানেই যায় সঙ্গে আমি। মা বারণ করে। বলে----তোর বাবা কাজে যাচ্ছে। কাজ খুঁজতে ও যাচ্ছে। তুই সঙ্গে যাবি কেন? তুই ঘরে আয়।
আমি শুনি না। বাবার সঙ্গে থাকলে, বাবা এটা সেটা কিনে দেয়। সেদিন তো দু' পয়সার কুল কিনে দিলো। তারপরেই দু পয়সার নিমকি--বোঁদে।

বোঁদে খেয়ে বোঁদের রস বাবার কামিজে মুছে দিলাম। বাবা হাসলো। বাবার এক বন্ধুর বাড়িতে আমাকে চা-ও দিয়েছিল। যদিও আমি চা খেতে খুব একটা অভ্যস্ত নই। কিন্তু খেয়ে দিলাম। বাবা ও বললো, খেয়ে নিতে।

বাবা অনেকদিন পর এসেছে বলে, আমাদের ভাইবোনদের লেখাপড়া লাটে উঠেছে। বাড়িতে সব সময় খুশি খুশি ভাব। কাল বাড়িতে মাছ হয়েছিল। পোরশু ডিম হয়েছিল। আমি আধটা ডিম পেয়েই অনেকটা ভাত খেয়ে ফেলেছিলাম। কাল মাছের কাঁটা বেছে দিয়েছিল মেজদি। কাঁটাতে আমার খুব ভয়। একবার গলায় লেগে বিপদ হয়েছিল। আরেকবার মায়ের কোলে থাকতে-থাকতে চোখ উল্টে দিয়েছিলাম। সবার কান্নাকাটি। ভাবছিল, আমি মরে গেছি।

আমি এখন অনেক বড় হয়ে গেছি। পাড়ার স্কুলে যাই। বারো মাস সকালে স্কুল। আমি আঁধার থাকতেই উঠে পড়ি। আর উঠেই কাঁদতে থাকি। মাকে বলি, স্কুলে যাবো না। মা-ও বলে, ঠিক আছে যেতে হবে না। তুই এখন ঘুমো। আমি আবার ঘুমোবো না। স্কুলেই যাবো।

বাবা এসেছে বলে, সত্যি সত্যি আমি এখন স্কুলে যাচ্ছি না।

বাবা ভোরে ওঠে। মা বলছিল, গ্রাম থেকে যে সমস্ত ঝুড়ি ঝুড়ি চাল আসে , বাবা লোকের জন্য কিনে দেয়। এজন্য পয়সা পেয়ে থাকে। ও দেশ থেকে বাবা তেমন কোনো টাকা পয়সা আনতে পারেনি। তাই বাড়িতে এসে কিছু কাজকর্ম করার চেষ্টা। নইলে যে সংসার চলবে না।

দিদিরা ঠোঙা করলেও চাল ডালের দাম ওঠে না। ভাবে অভাবেও বাবার মুখে হাসি থাকে। কখনোই আমাদের ভাইবোনদের ধমক দেয় না। বিশেষ করে আমি ভাইবোনদের মধ্যে ছোট বলে, মা-বাবার কাছ থেকে আস্কারা পেয়ে থাকি। সবার কাছ থেকেই আদর  পেয়ে থাকি। এ কারণেই, চোর-পুলিশ খেলতে আমার বাধা নেই। এবং খেলতে খেলতে সন্ধে হয়ে যায়।

খেলা শেষে ঘরে এসেই ঘুমিয়ে পড়ি। বাবা ও মা আমাকে ঘুম থেকে তুলে খেতে বলে। আজ বলছিল, কাল বাদে পোরশু আমার জন্মদিন। ন'টা তরকারি পায়েস করার মতো সামর্থ্য নেই। শুধু কালী মন্দিরে পুজো দিয়ে আসবে মা।

তারপরেই, মায়ের চোখে জল। দুধ কিনতেও পয়সা লাগবে। বাবা বললো, দুঃখ করোনা। একদিন
ভগবান মুখ তুলে চাইবে। দেখো। হাসি ফুটবে সবার মুখে। আমার মেয়েদের ঠোঙা করতেও হবে না।

আমি ঘুম চোখেই শুনে ফেলেছি আমার জন্মদিনের কথা। গেল বার মা আমাকে কপালে চন্দন দিয়ে খেতে দিয়েছিল। বাবা ছিলনা। তবে চিঠি লিখেছিল একটা মাকে। মা পড়তে পারে না বলে বড়দা পড়ে শুনিয়ে ছিল। চিঠিটা ছিল এই রকম---------ছোট বউ এই শ্রাবণ মাসে ঘর যেতে পারলাম না। এদিকে বর্ষা খুব।
পুরুলিয়াতে জল হচ্ছে কী?

দত্তবাবু বলছিলেন, একেবারে পুজোর সময় যেতে। তাই হয়তো যাবো। ততদিন তোমরা ভালো থেকো। আর এমাসে গোরার জন্মদিনটা পালন করবে। তার জন্য আমার আশীর্বাদ রইলো।

চিঠিটা শুনতে শুনতে মা কেঁদেছিলো খুব। বলছিল, গোরা বাপের সঙ্গ পেলো না তেমন।

এ বছর তো বাবাকে পেয়েছি। মাকে বলবো, জন্মদিনে
বাবা আর আমি একসঙ্গে খাবো।

মা বলছিল, কিছু করি বা না করি পায়েস একটু রাঁধতেই হবে। জন্মদিনে পায়েসটা শুভ। বাবা বললো, তুমি চিন্তা করোনা আমি এক পুয়া আতপ চাল এনে
দেবো।

আমি আজ থেকেই পায়েসের গন্ধ পাচ্ছি।



-----১৯ শ্রাবণ ১৪২৮
-----৫---৮---২০২১
-----নির্মল হালদার









বুধবার, ৪ আগস্ট, ২০২১

আমি যখন মডেল / নির্মল হালদার
















































ছবি : আলোকচিত্রী সন্দীপ কুমার

মডেল : কবি নির্মল হালদার



আমি যখন মডেল / নির্মল হালদার



আমি যখন মডেল হয়ে উঠলাম ফটোগ্রাফার সন্দীপ কুমারের কাছে তখন আমিও একজন শিল্পী। অথবা সৃজনশীল একজন হয়ে উঠেছি। হয়েওছি। কেননা, সৃজনশীল না হলে আলোকচিত্রীর মনকে বুঝে উঠতে পারবোনা। আলোকচিত্রী যেহেতু ক্যামেরা দিয়ে একটি ছবি আঁকবেন, তখন আমাকে আমার মেধা ও মনন থেকে স্থির হতে হবে। আমার হৃদয় দিয়ে বুঝতে হবে, তিনি কি চাইছেন। পারস্পরিক ভালোবাসা থেকেই, একটি যৌথ সৃষ্টি হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রেও আমি যখন মডেল আমাকে সচেতন হয়ে স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে আলোকচিত্রীকে সহযোগিতা করে যেতে হবে। তাই সন্দীপ যখন চাইলেন, শালুক ভরা দীঘিতে আমাকে নামাতে। আমি গামছা পরে নেমে গেলাম। তারপর লাল শালুকের মাঝে আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। সন্দীপের ক্যামেরা ছবি এঁকে চললো একটার পর একটা ।

আলোকচিত্রী চাইছেন, আমাকে বিরাট এক ওজন দাঁড়িতে বসিয়ে ছবি তুলবেন। এখানে আমি যদি
কিন্তু কিন্তু করি, তাহলে আলোকচিত্রী তার লক্ষ্যের ছবিটি পাবেননা। আমি রাজি হয়ে গেলাম। কারণ,
আমি মডেল। আমিও একজন সৃজনশীল।

আলোকচিত্রীও মডেলের যৌথতার ফসল হয়ে উঠবে একটি ছবি। কিংবা ফটোগ্রাফ। এ কথা বা ভাবনা দুজনের মাথাতেই রাখতে হবে। তবেই প্রকৃত একটি ছবি। সৃষ্টি হবে।

সন্দীপ যখন বললেন, নদীর উপরে যে পাথর সেখানে আমাকে শুয়ে পড়তে হবে। আমি শুয়ে পড়লাম। তার মানে আমার মনকে আমি শুইয়ে দিলাম ক্যামেরার সামনে। ক্যামেরা তার চোখ দিয়ে যেমন ইচ্ছে যেদিক দিয়ে ইচ্ছে ছবি তুলে যাবে।

আমি বলতে চাই, আলোকচিত্রীর সঙ্গে মডেলের বোঝাপড়া থাকা চাই। আমাদের ক্ষেত্রেও মুখে মুখে বোঝাপড়া ছিল না বটে, তবে মনে মনে ছিল। আর ছিল বলেই, সন্দীপ যখন যা বলেছেন, আমি চুপ করে শুনেছি।

একবার এক পাহাড়ের কাছে গিয়ে আমাকে বললেন, ছোট ছোট পাথরে উঠে যেতে। শুয়ে পড়তেও বললেন। আমি কোনো ভাবেই "না" করিনি। আমাকে আরো বললেন, অবিনের কাঁধে উঠে পড়তে। অবিন কাঁধে নিয়ে হেঁটেও যাবে। আমি ভয়ে অস্থির। কিন্তু ভয় করলে চলবে না। আমি জয় মা বলে অবিনের কাঁধে উঠে পড়লাম। অবিন হেঁটে চলেছে। আমার বুক দুরু দুরু। সন্দীপের ক্যামেরা চলছে। না চললে, আমার সৃজনশীলতা ভেঙ্গে পড়বে। আমাকে তাই সৃষ্টিশীল মন নিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে। আমি বলতে চাই, আমি মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনয় করছি। কেবল আমার মুখে সংলাপ নেই। পরিচালক যা চাইছেন, আমাকে করে যেতে হচ্ছে।

মুখটা এদিকে হবে না ওদিকে,মাথা কতটা ঝুঁকে থাকবে, আমাকে শুনে যেতে হচ্ছে। কোনো নির্দেশ অমান্য করা যাবে না। ভুল করলেই দর্শকরা ঢিল ছুঁড়বে।

ওই ভাঙ্গা ঘরটাতে ঢুকে পড়ুন-----সন্দীপ আমাকে নির্দেশ করলেন। রাস্তার ধারে ঘর। ভেঙ্গে পড়া ঘর। ঝুলকালিতে ভর্তি। ঘরের মেঝেতে গোবর। কাদামাটি। সেই ঘরের জানালা থেকে আমাকে মুখ বাড়াতে হবে। সন্দীপ বাইরে থেকে ছবিটা তুলবেন। আমি রাজি। একবারও বললাম না, আর পারছি না ভাই।

আলোকচিত্রী অথবা নির্দেশক যখন ক্লান্তির কথা বলছেন না, আমাকেও বলা চলবে না। আমি মডেল হলেও আমিও শিল্পী।

আমাকে ক্যানভাসে রেখে চিত্রকর রঙ ঢালছেন। আমাকে নড়াচড়া করা চলবে না। কেন না, আমাকে নিয়ে চিত্রকর পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করছেন।

আমাকেও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। হেরে গেলে পিছিয়ে পড়লে চলবে না। তো একটি ফটোগ্রাফের ক্ষেত্রে যদি ফটোগ্রাফার মডেল নিয়ে কাজ করেন, মডেলকে অবশ্যই ক্যামেরার সামনে স্বতঃস্ফূর্ত হতে হবে। ভালোবেসে।

একটা জায়গায় অনেক মদের বোতল। মদের বোতল গুলি মাটিতে ছড়িয়ে সন্দীপ আমাকে নির্দেশ দিলেন, তার মাঝে শুয়ে পড়তে। আমি কোনো দ্বিধা না করে শুয়ে পড়েছি।

যে ছবি দেখে পরে অনেকে নাক উঁচু করেছেন। যদিও আমার কোনো শুচিবাই ছিল না। মদ্যপান করবো আর ছবি তুলতে আপত্তি? এরকম মধ্যবিত্ত সুলভ আমার মন নয়। এই কারণেই সন্দীপের ক্যামেরার সামনে মডেল হতে পেরেছি।

আমার মনে হয়েছে, মডেল কোনো পুতুল নয়। মডেল, একজন সৃজনশীল মানুষ। ক্যামেরাম্যান ও মডেলের যৌথ ভাবনা থেকেই ছবি উঠে আসে। সৌন্দর্যের কাছে। মানুষের কাছে।


আমি যে মডেল হতে পেরেছি, এ আমার প্রাপ্তি। আমি যে ক্যামেরার মুখোমুখি হয়ে, ভয় না করে, সংকোচ না করে,জড়তা না রেখে সন্দীপকে একটার পর একটা ছবি দিয়েছি, এ আমার এক জীবনের আলোক প্রাপ্তি। এখানে তাই সন্দীপকেও বলতে চাই, আমার কুর্নিশ গ্রহণ করুণ।

অনেক ছবি। অনেক ঘটনা। অজস্র অভিজ্ঞতা। শেষে একটা গল্প বলতেই হবে, বর্ষা চলছে। সন্দীপ আমাকে নিয়ে মানবাজার। ছবি তুলতে। তো ঘুরতে ঘুরতে
একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি। সন্দীপ দেখতে পেয়েছেন একটি বড়ো কচু পাতায় একটি নিঃশব্দ শামুক। আমাকে নির্দেশ করলেন, কচু পাতার উপরে শামুকের কাছে আমার মুখটিকে হাঁ করতে হবে।

আমি সঙ্গে সঙ্গে তার কথা মান্য করলাম। শামুকের প্রাণের সঙ্গে আমার জীবন এক হয়ে একটি ছবি হয়ে উঠলো। শাদাকালো।

এই ভাবে চলতে চলতে সন্দীপ আমার বন্ধু। আমিও বন্ধু হতে পেরেছি তার কাছে।

একবার এক জায়গায় আমার মুখে সিগারেট। তখন সন্দীপের সঙ্গে আলাপ ছিল না। সিগারেটে টান দিতে দিতেই পরিচয় । তিনি ততক্ষণে ছবি তুলে চলেছেন।

আমার সিগারেট শেষ। সন্দীপ একটার পর একটা সিগারেট আমাকে দিয়ে যাচ্ছেন। কারণ, সিগারেটের ধোঁয়ার সঙ্গে আমার মুখ তিনি চাইছেন।

সেই প্রথম আলাপেও আমি সন্দীপের সৃষ্টিশীল মন পড়তে পেরেছিলাম।

----১৮ শ্রাবণ ১৪২৮
-----৪---৮----২০২১
-----নির্মল হালদার









মঙ্গলবার, ৩ আগস্ট, ২০২১

কবিতা / নির্মল হালদার

কবিতা / নির্মল হালদার



১৭০.
ধানতো হয় চালের জোগান কে দেবে?

এক মুঠি চালও ফুটতে পারে হাঁড়িতে।
আমাকে ভালোবাসতেই পারে ভাতের গন্ধ।

ভাত যে প্রতিদিনের আলো
প্রতিদিনের ছন্দ
আমার ছোট রাস্তাগুলি বড় হয়ে যায়।
আমি রাস্তার দু'ধারে লাগাই,
মানুষের চারা,যদি অনেক রাস্তা ঘুরেও
দেখতে পাই, সফল একটি মানব জন্ম।



১৭১.
যত যাই করি
মনে হয়, কিছুই তো হলো না।
এইতো ধ্বসে গেল পাহাড়----
কই, কাঁধে কি নিয়ে এসেছি আরেকটা পাহাড়?
এইতো শুকিয়ে ওঠে নদীমুখ
কই, মাথায় কি নিয়ে এসেছি আরেকটা নদী?

কেবলই হা--হুতাশ, হাহাকার

মানুষ থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়
কই, জোড়া লাগাতে পারি?
কই আর হতে পারি একটি গাছের চারা?


----১০ শ্রাবণ ১৪২৮
----২৭---৭---২০২১


১৭২.
যে কোনো ঘরেই একটা বট গাছের প্রয়োজন।
যে কোনো ঘরেই বট গাছের মতো অভিভাবক।
বটগাছ থাকলেই, সলতে পাকানোর মত
একটা মন পাবো। পিদিমের মত হৃদয়।

হৃদয় তো নীরব। শোনেনা মিছে কলরব।



-----১১ শ্রাবণ ১৪২৮
----২৮---২৮----৭----২০২১



১৭৩.
ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার পরও বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়ার পরও
রাস্তায় রাস্তায় খুঁজে বেড়াই আমারই প্রাণ-----
আমার উন্মাদ প্রাণ----মানুষের স্রোতে খুঁজেছিল নদী,
নদীর স্রোতে খুঁজেছিল মানুষ।

মানুষ আর মানুষ
ধুলাকে করে সোনা, ঘরকে করে বাহির।
মেঘে মেঘে খুঁজে বেড়ায় মৎস্যকুমারীর মুখ,
বৃষ্টির আগুন থেকে হৃদয়ের ঘ্রাণ

হে আমার উন্মাদ প্রাণ,
যেখানেই থাকো জাগো জাগো
আমার একলা ঘরের বিজন কোণে আমাকে জ্বালাও
আমাকে করো সুরের তরঙ্গ।



১২ শ্রাবণ ১৪২৮
২৯/৭/২০২১



১৭৪.
যেকোনো একটা মুখ আমারই মুখ
আমারই কৈশোর আমারই যৌবন
আমারই বিষণ্ন মুখ আমারই উজ্জ্বলতা।

আমি রেখে যাই সকল মুখের কাছে
মাছধরা মানুষের ধৈর্য ও অপেক্ষা।
আমি রেখে যাই সকল মুখের কাছে
ধান রোয়া হাতের শুশ্রূষা ও সুন্দরতা।

যেকোনো একটা মুখ চেয়ে আছে
আমারই ভাঙ্গা গড়ার দিকে।
যেকোনো একটা মুখ চেয়ে আছে
আমার পথ চলার দিকে।

সকল মুখের কাছে আমি হাত বাড়িয়ে আছি।



----১৩ শ্রাবণ ১৪২৮
----৩০----৭----২০২১



১৭৫.
বৃষ্টি শেষের হাওয়া কি খুঁজছে কাকে খুঁজছে?

উঠোনে শ্যাওলা জমেছে। পিছল হয়েছে খুব।
পা ফেলতে হবে সাবধানে।
ও হাওয়া, আমার হাত ধরো।
কুশল জেনে নাও। আজ আমরা একসঙ্গে যাবো
সূর্যের পথে

সূর্য আমার সখা, আমার প্রতিদিনের সৌন্দর্য।




১৭৬.
কাল বৃষ্টি হয়েছে খুব।
বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। ভেঙেছে মাটির ঘর।
ভেসে গেছে সবজির চারা। ভেঙ্গে গেছে
ধান ক্ষেতের আল।

এত জল এত জল
ভেসে ভেসে আসছে মাছ। মাছ ধরছেও
ছেলে ছোকরার দল।আজ
মেঘ ছেঁড়া আলো এসে আমার মুখে।

আমি রোদের মুখ খুঁজি।

রোদে রোদেই খুঁজে পাবো রৌদ্রের প্রবাহ।



-----১৪ শ্রাবণ ১৪২৮
-----৩১---৭----২০২১



১৭৭.
কী থাকবে কী থাকবেনা
আমার জানার কথা নয়, আমি দেখবো
কলসি কাঁখে চলে যায় এক রমণী।
গরুর গলায় ঘণ্টাধ্বনি।
নদী ঘাটে শুকায় ধীবরের জাল।
ঝরে পড়ছে বাবলা ফুলের হলুদ।

কী থাকবে কী থাকবেনা
আমার বলার কথা নয়, আমি দেখবো
মাথায় ঘাসের বোঝা।
ঝোপঝাড়ে প্রজাপতির পাখা।
শান্ত ধুলোবালি।
পাথর ফুঁড়ে আগাছা।

কী থাকবে কী থাকবেনা
আমার শোনার কথা নয়, আমি দেখবো
বাতাস উড়ছে বাতাসেই।
একটি শিশুর হেঁটে যাওয়া।
মেঘ নামছে মাঠে।
ছুটে আসছে একটা মোষ।

আমার নীরব চেয়ে থাকার মাঝে কাঁপছে আকাশ।



১৭৮.
চোখের জল শুকিয়ে গেলেও
অন্তরের কান্না? আমাকে জাগিয়ে আমার বুকে জেগে আছে। আর আমার বুক
সমুদ্রের চেয়ে মহৎ। কেবলই ঢেউ ওঠে
ঝিনুক ওঠে।

ঝিনুকে লুকানো মুক্তার চেয়েও অমূল্য

আমার মন।



----১৫ শ্রাবণ ১৪২৮
----১---৮---২০২১



১৭৯.
যা বলিনি কখনো বলতে চাই,
বাবার হাত ধরে ছেলে মেলায় যাচ্ছে
হইহই করছে রঙ

যা বলিনি কখনো বলতে চাই,
নাগরদোলায় হাসির হল্লা
পাঁপড় ভাজার গন্ধ

যা বলিনি কখনো বলতে চাই,
হাওয়াই লাড্ডু উড়ছে
উজ্জ্বল মুখ

যা বলিনি কখনো বলতে চাই,
শুয়ে আছে কাঠের পুতুল
শুয়ে আছে কাঠের চাকা

যা বলিনি কখনো বলতে চাই,
মেলার পিছনে স্তব্ধ এক গাছ
অন্ধকার এক গাছ

যা বলিনি কখনো বলতে চাই,
গাছ তলায় গুমরে ওঠা কান্না
মায়ের কোলে শিশু

আকাশ ভরা সূর্য তারার আদর



১৮০.
ঘুমিয়ে যাওয়ার আগে পেঁচা জ্বাললো চোখ

আর অন্ধকার নেই। কথা বলছে গাছ,
নীরব। একাকী। চাঁদ--তারা শোনে।
আমিও শুনতে শুনতে পৃথিবীকে
কাছে পাই


আমার পৃথিবী আমার প্রকৃতি

আমারই কন্যা।



----১৬ শ্রাবণ ১৪২৮
----২----৮----২০২১
----নির্মল হালদার










একটি গল্পের কেলেঙ্কারি / নির্মল হালদার

একটি গল্পের কেলেঙ্কারি / নির্মল হালদার



পাশের বাড়ির ছাদে শাড়ি ঝুলছে। ব্লাউজ ঝুলছে। সায়া ঝুলছে। এ বাড়ির ছাদ থেকে অলিভ ডাকছে -----কুরচি----কুরচি-------।

কে সাড়া দেবে?

ও বাড়ির ছাদে শাড়ি ঝুলছে। ব্লাউজ ঝুলছে। সায়া ঝুলছে।ঝুলতে ঝুলতে কেঁপে উঠছে হাওয়ায় হাওয়ায়।অলিভ ডাকছে-----কুরচি----কুরচি-----।

কে সাড়া দেবে? রঙিন সায়া ব্লাউজ শাড়ি ঝুলছে।রাস্তাতেও অলিভ পিছন থেকে ডেকে ওঠে------কুরচি----কুরচি---।

কে সাড়া দেবে?

সাইকেল নিয়ে যেতে যেতে একবার একটি মেয়ের ওড়না গা থেকে তুলে নিয়েছিল সে। মনে করেছিল কুরচি। একা একা হাঁটছে। সে ওড়নাটা তুলে নিয়ে
চমকে দিতে চেয়েছিল। কুরচি ছিল না। ছিল অন্য একটি মেয়ে। সে চেঁচামেচি করতেই, রাস্তার লোকজন অলিভকে কিলচড় দেয়। ক্ষমা চাইতে বলে মেয়েটির কাছে।

এই অলিভকে চিনি আনতে বললে নুন নিয়ে আসে।আলু আনতে বললে বেগুন নিয়ে আসে। মা-বাবার চিন্তা খুব। অলিভ আর ছোট নেই। অথচ সে বারবার ভুল করে।

রাস্তায় আরেকবার কুরচি মনে করে একটি মেয়ের পিঠে কিল মেরেছিল অলিভ। এখানেও একই ঘটনা। মেয়েটি চিৎকার করে। অলিভ নিজের ভুল বুঝতে পেরে সাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়।

কলেজের ক্লাসে সে অন্য মেয়ের চুল টেনে দেয়। তারপর ভুল বুঝতে পেরে------কিছু মনে করিস না ভাই। আমি কুরচি মনে করেছিলাম।

অলিভের মা একবার তাকে খুচরো করতে পাঠিয়েছিলেন বাজারে। সে ৫০০টাকা খুচরোর বদলে নিয়ে এসেছিল ১০০০টাকা। তার মা তৎক্ষণাৎ বাকি টাকাটা ফেরৎ দেওয়া করিয়েছিলেন। অলিভ কখনোই
টাকা পয়সা গুনে দেখে না।

২০০টাকার নোট ৫০টাকার নোট বলে অলিভ দোকানদারকে দিয়ে দেয়। দোকানদার বাকি টাকা ফেরত দিতে এলে অলিভ জানতে চায়-----কিসের টাকা?

সে বারবার তাই ঝুলতে থাকা সায়া শাড়ি ব্লাউজ কে ডাকে-----কুরচি------কুরচি-----কুরচি-----।

কে সাড়া দেবে?

অলিভ একবার ওদের বাড়ির ছাদ থেকেও বাড়ির ছাদে লাফাতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিল। আহত হয়েছিল। ছোট ছাদ ছিল বলে রক্ষা পেয়েছিল। খুব জোর।

কুরচি অলিভের সঙ্গে কথাই বলেনা। দুজনের বাড়ি পাশাপাশি হলেও দুজন একই বয়সের হলেও কোনো সম্পর্ক নেই।

দুটো বাড়িতেও কোনো সম্পর্ক নেই। কি বিবাদে কি হয়েছিল দুজনেই জানে না। শুধু জানে দু'জন দু'জনের সঙ্গে কথা বললে, তাদের দুটো বাড়ি অশান্তি করবে।
কুরচি কখনোই অলিভের সঙ্গে কথা বলে না। কেবল অলিভের তরফ থেকে কুরচির প্রতি আকর্ষণ। কাজ করে। অলিভ ছাদ থেকে যে কুরচিকে ডাকে সবাই জানে।কুরচি তাই ছাদে না--ওঠার চেষ্টা করে। অলিভ যদিও রাস্তাতেও ডাকে। কেউ সাড়া দেয়না। একবার মুখোমুখি কুরচির কাছে জানতে চেয়েছিল------তোর কাছে আমি কি দোষ করেছি বলতো? আমি তো তোর কোনো ক্ষতি করিনি। শুধু কথা বলতে চেয়েছি। শুধু কথা। কিন্তু তুই মুখ ফিরিয়ে মুখ ঘুরিয়ে চলে যাস।
কুরচির দুটো হাত ধরে অলিভ কেঁদে ফেলেছিল। কুরচি তাকে ঠেলা মেরে ফেলে দেয়। পড়ে গিয়ে অলিভের কপালে লাগে। সে যখন উঠে দাঁড়ায় তখন কুরচি চলে গেছে। 

অলিভের সারা গায়ে ধুলো বালি। চারদিক থেকে লোক দেখছে তাকে। সে নিচু মুখ করে বাড়ির দিকে চলে যায়।


অলিভ জানতো আজ কুরচির জন্মদিন। সে একটা দামি সুগন্ধি কিনে সঙ্গে ফুল তাদের বাড়ির দরজার কাছে রেখে এলো। সঙ্গে একটা চিঠিও। চিঠিতে লিখেছে--------
কুরচি, 
জন্মদিনের শেষ নেই। জন্মদিন চলতেই থাকে। তবু তোর জন্মদিনের এই বিশেষ দিনটিতে তোকে দিয়ে গেলাম আমার স্পর্শ। তুই ছুঁলেই আমার ভালো লাগবে। তুই ভাল থাক।


------১৬ শ্রাবণ ১৪২৮
-----২---৮----২০২১
-----নির্মল হালদার






শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০২১

হাতি ও পালক / নির্মল হালদার

হাতি ও পালক / নির্মল হালদার



হাতিরা এসেছে পালককে খুঁজতে। তাকে দেখাবে দলমা পাহাড়। হাতিদের ডেরা দলমা পাহাড়েই।

কোথাও পালককে দেখা যাচ্ছে না। সে এই এখুনি ধুলো খেলা খেলছিল। তারপর কোথায় যে
লুকিয়েছে তার মা--ও খুঁজে পায় না। হাতিরা খুঁজে খুঁজে হয়রান। আজ পালককে নিয়ে যেতেই হবে।তাকে দেখাতেই হবে পাহাড় কেমন হয়।

শুধু কি পাহাড়? পাহাড়ের সঙ্গে জঙ্গলও আছে।
হনুমান আছে অনেক। হাতিদের সঙ্গে খুব ভাব। কখনো কখনো হাতির পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ায় জঙ্গলে।

একটা হস্তি শাবক ছটফট করছে পালকের জন্য। সে পালকের সঙ্গে খেলবে। পালক কোথায়?

সে  হাঁসের সঙ্গে পুকুর দেখতে গেছে। এই বর্ষায়   পুকুরে দেদার জল। পালক  হাঁসের সঙ্গে সাঁতার 
শিখবে।

হাতিরা পুকুরে গিয়েও দেখতে পেল না। কে যেন বললো,পালক ঘুমোচ্ছে।হাতিরা তার মায়ের কাছে এসে জানতে পারলো, ঘুম ভাঙতেই পালক চলে গেছে কলা বনে। সে হাতিদের কলা খাওয়াবে। 

হাতিরা খুশি হয়ে পালকদের ঘরের কাছে বসে রইল। তখন একটা পিঁপড়ে এসে  হাতিদের বলে-----তার বাড়ি কাঁসাইয়ের ওপারে। কিন্তু নদী পার হয়ে যেতে পারছে না। হাতিরা যদি পার করে দেয়, পিঁপড়ে  উপকৃত হবে।

এখন কাঁসাইয়ে খুব জল। হাতিদের দল থেকে একটা হাতি পিঁপড়েকে পিঠে নিয়ে নদী পার করতে গেল।পালক কোথায়? কখন আসবে?

হাতিরা অস্থির হয়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায় আরো। তারা কলা বনে যাব বলছিল। তখন পালকের মা এসে বলে, তোমরা বোসো------ একটু দুধ খাও। হাতিরা দুধের বদলে জল খাবে, জানিয়ে দিতেই পালকের মা
হাতিদের কাছে জল এনে দেয়।

পালকও এসে গেছে।তার সঙ্গে কয়েক কাঁদি কলা।হাতিদের খুব আনন্দ। তারা কলা ভোজন করে পালককে বলে ------চলো এবার পাহাড় দেখতে। পালকের মা বলে, আগে ওদের ইস্কুল থেকে ঘুরে এসো।আজ ওর ড্রয়িং পরীক্ষা আছে। হয়তো ওকে হাতি আঁকতে বলবে। তোমরা সঙ্গে থাকলে কাছে থাকলে  তোমাদের দেখে দেখে আঁকতে পারবে।

হাতির পিঠে উঠে পালক ইস্কুলে যায়।

----১৪ শ্রাবণ ১৪২৮
----৩১---৭---২০২১
----নির্মল হালদার







গোঠে / নির্মল হালদার

গোঠে / নির্মল হালদার



-----কুথা থিকে এলিরে? তকে তো কনদিন নাই দেখি।
কুথায় ছিলি? কার সাথে আসেছিস? একা একাই যদি আসেছিস,তবে হামার গরু গিলার সাথেই চরে বেড়া।
আর কি বলবো তোকে? যা উদকে। ঘাস আছে দেদার।

বলরামের গোঠে আজ একটা গাধা। কোত্থেকে এসেছে, কিভাবে এসেছে, বলরামের জানার কথা নয়। সে দেখছে, গরুর দল থেকে দূরে দাঁড়িয়ে আছে গাধা।

গরু ও গাধা দুজনেই নিরীহ। তবে গাধা খুব বোকা। এই যে এসে পড়েছে এখানে হয়তো কোনো মালিক তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। হয়তো বোঝা আর টানতে পারছে না। বলরাম ভাবতে ভাবতে গাছ তলায় শুয়ে পড়লো।

মেঘ ও রোদের খেলা চলছে। সকাল থেকে বৃষ্টি হয়েছিল। আপাতত বৃষ্টিটা নেই। এ জন্যেই বলরাম মাঠে আসতে পেরেছে।

বলরামের মনে পড়লো, জল খাওয়াতে হবে গরুদের।সে উঠে পড়ে  সব গরুকে ডাকে। ডাক দিলো গাধাকেও ------আয়রে আয় চল্-------জল খাবি চল্-------।

মাঠের সামনেই একটা বাঁধ। বারোমাস জল না থাকলেও এই বর্ষাতে টইটম্বুর । বলরামেরও ভখাছে।সে আর কি খাবে!সে প্যান্টের পকেট থেকে খৈনির প্যাকেট বের করে বাঁ হাতে খৈনি ডলতে থাকে।আর নিজের পেটকে সান্ত্বনা দেয়-------ডাঁরারে ডাঁড়া------ বেলা পড়লেই ঘরকে যাবো। আগু গরুগিলাকে দেখতে দে-------। গরু গিলাইত হামকে ভাত দেয়।তবেই ন হামি টিকে আছি। গাধাটা বাঁধের দিকে গেলেও একা একা। সে হয়তো ভয় পাচ্ছে গরুর শিঙকে। যেহেতু গরু ও গাধা একই সম্প্রদায়ের নয় বলে, গাধার তরফ থেকে একটা দূরত্ব। বলরাম বুঝতে পারে গাধার মনের অবস্থা। সে বলে, ভয় নাইরে ভয় নাই-----হামার গরু তকে নাই ঢুঁসাবেক। যা জল খাবি যা।

গাধার মুখ শুকনো হয়ে আছে।

গাই গরুর দল হইহই করে জলে নেমে জল খায়। একটু দূর থেকে গাধা দেখে। গরুরা জল থেকে উঠে পড়ার পর গাধা নামে। বলরাম চেয়ে চেয়ে দেখে।

বৃষ্টি হচ্ছে বলে মাঠে মাঠে ঘাসের ছড়াছড়ি। কোথাও কোথাও জমে আছে জল। ফড়িঙ উড়ছে।পোকামাকড়ের নিঃশব্দ চলাফেরা।

সূর্য আস্তে আস্তে ঢলে পড়ছে। গাই গরুর দল নিয়ে বলরামের সময় এসে গেছে ঘরে ফেরার। সে এইবার ভাবছে , গাধাটাকে কোথায় রেখে যাবে।   কোনো গোয়ালেতো ঢুকিয়ে দিলে হবেনা। মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই গাধাটার প্রতি বলরামের মায়া জন্মে গেছে। তার ভাবনা ,কি করবে সে।গাধাটাকে ছেড়ে যেতেও পাচ্ছে না। দলছুট হয়ে এসেছে নাকি মালিক তাড়িয়ে দিয়েছে কে জানে। বলরাম লক্ষ্য করে, গাই গরুর দল ঘরের রাস্তায় চলে গেলেও গাধাটা একা দাঁড়িয়ে আছে। সে আর কিছু না ভেবে গাধাটাকে বলে-----তুই চল্ আমার সাথে। তকে কার সাথে কুথায় রাখবো পরে ভাবা যাবে। এখন তুই চল্। হামার সাথেই চল্------

-----১২ শ্রাবণ ১৪২৮
----২৯----৭---২০২১
----নির্মল হালদার








শুক্রবার, ৩০ জুলাই, ২০২১

একটা কাপ / নির্মল হালদার


একটা কাপ / নির্মল হালদার




আমি সারাদিনে তিন কাপ চা খাই। যদিও আমার আছে ৫০ টা কাপ। বিভিন্ন রকমের কাপ। নানান জায়গা থেকে সংগ্রহ করেছি। কিন্তু সব কাপে চা খাওয়া হয় না। সকালের কাপ নির্দিষ্ট হয়ে আছে। বিকেলেও তাই। বেলা ১১টার পরে আরেক কাপ চা খেলেও কাপের অদল বদল ঘটে না। আখরের এই গল্প শুনে আমার দেখতে ইচ্ছে করলো, কাপের   চেহারা। কেননা, আমি আখরের কাছে মাঝে মধ্যেই চলে আসি। আমারও মনে হয়, নানা রকমের কাপের সঙ্গে আমার পরিচয় হোক। যখন আখর চা আনতে যায়, তখন সাধ হয়, আমি কাপটাকে পছন্দ করে পাঠাই। আমি বলার আগে দেখার আগে কাপ চলে যায় নিচে। চায়ের কাছে।

আমি মনে মনে হতাশ হয়ে কাপের রূপ আঁকতে থাকি। সোমবার থেকে রোববার , সপ্তাহের ৭টা দিন একেকটা কাপে একেক দিন চা খাই। কোনোদিন এক কাপ চায়ে মেঘ ভাসতে থাকে। আমি মেঘের গন্ধে
বুঁদ হয়ে  ঢলে পড়ি।এত নেশা যে উঠতে পারিনা। কোনোদিন  চায়ের কাপে কেবল আকাশ। নির্মল আকাশ। আমাকে ডাকে। আমি কাছে যাই না। শুধু আকাশের দেয়ালে ছবি টাঙাই।

একেকদিন  কাপের  গায়ে প্রজাপতির রঙ ছড়াই। যদি
প্রজাপতি আসে আরো , আমি সারা ঘরে প্রজাপতির সঙ্গে উড়বো।

একদিন এক কাপ চায়ে লবঙ্গের গাছ দেখতে পেলাম। লবঙ্গের গন্ধে  আমি ছুটোছুটি করলাম লবঙ্গ জঙ্গলে। তারপরেই দেখতে পেয়েছি এলাচের গাছ। আমি চা বাগানেও ছুটে গেছি।

আখর আমাকে আনমনা দেখে জানতে চায়----- আমার কি হলো? কারণ, আমি চায়ে চুমুক দেবার সময় একদম চুপচাপ থাকি। আজ একটা কাপ দেখেছি আখরের আলমারিতে। আমার মন খুব টানছিল কাপটার দিকে। তাকে  বলার ইচ্ছে হয়েছিল, ওই কাপে আমার চা চাই। বলতে পারিনি।

কীই বা বলতে পারি ? ফাটা কাপে চা দিলেও তো আমি খাই। স্টিলের গ্লাসে চা দিলেও তো আমি খাই।

আমার পছন্দ কি , কি নয় বাকিদের জানবার কথা কি? আমি তো শাল পাতায় ভাত চাই। কে দেবে?
অথবা পদ্মপাতায় মুড়ে কেউ খাবার দিলে আমার খুব ভালো লাগবে। আখর বলছিল, সে এক সেট তামার কাপ প্লেট নিয়ে আসবে। আমার খুব খুশি খুশি লাগছিল। একদিন না একদিন ওই তামার কাপে আমি চা খাবো।

আমারতো কেনার ক্ষমতা নেই। কেবল দেখার শক্তিটুকু আছে। দেখার মন টুকু আছে। অহল্যাকে বলেছিলাম, তুমি আমাকে কোনো কিছু উপহার দিলে বই অথবা কাপ। যদিও সে আজ অব্দি কোনো উপহার দেয় নি। একবার শুধু ক্যাডবেরি খাইয়েছিল।

সেদিন রাস্তার ধারে একটা দোকানের সামনে থমকে গেলাম। কাঁচের শো--কেসে সাজানো আছে বিভিন্ন রকমের কাপ। একজোড়া আমার পছন্দ হলো।

কেনার টাকা নেই। আখর কে বললাম-----সে যদি কিনে ফেলে আমি কাপটাকে দেখতে পাবো। কাপটাতে চা পেতেও পারি।

আপাতত আখরেরও  টাকা নেই। সে কিনতে পারবে না। 

আমার এই কাপ  বিলাসিতার মধ্যে  আমার চরিত্র
ধরা পড়ে। কত কত মানুষের ভাঙাচোরা থালা। তাদের দিকে আমি কী তাকাই?

আখর ও আমি প্রায় একই মেজাজের বলে, আমরা একইসঙ্গে  প্রতিদিন আড্ডা দিয়ে থাকি। আমরা দুজনেই চায়ের দোকান দিকে না --যাওয়ার চেষ্টা করি।
চায়ের দোকানের গ্লাস কিম্বা কাপ আমাদের পছন্দের বাইরে। নোংরাও হয়। আখর বলছিল, সে  ঢোকরার দুর্গা সংগ্রহ করবে। আর আমি মনে মনে বলছিলাম, কাপ সংগ্রহ করবো। কাপেই তো ঠোঁট ছোঁয়ানো রায়।
এক কাপ চায়ে দুজনের ঠোঁট। দুই দিক থেকে। আহা! কি মধুর দৃশ্য। এই দৃশ্য আমি রচনা করতে চাই।

আসলে,কোনো দৃশ্য আমি লিখতে পারি না। একবার ভেবেছিলাম টাকা আঁকতে পারলে টাকা আসবে।  অনেক অনেক টাকা। তখন যা ইচ্ছে কিনতে পারবো।

পরে জেনেছি, টাকার ছবি সবচেয়ে কঠিন। টাকা জটিল ও কঠিন বলেই, টাকা আঁকতে যাওয়া বোকামি।

খুব ক্লান্ত লাগছে এখন। জৈষ্ঠ্য মাসের দুপুর। রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ঘেমে নেয়ে গেছি।

আখর আমার সঙ্গে ছিল। সে অনেক আগেই বাড়ি ফিরে গেছে। অহল্যাকে ডেকেছিলাম। সে বাড়ির বাইরে এই গরমে কোথাও যাবেনা। আমাদের পাগলামির সঙ্গে সে নেই।

চারদিকে বাড়িঘর দোকানপাট। গাছতলা কোথায় গাছতলা? দেখতে পেলাম হাড় জিরজিরে একটা গাছের নিচে এক ভিখারি পরিবার। দোমড়ানো মোচড়ানো থালা বাটিতে ভাত খাচ্ছে।

এই ভাতের গন্ধের কাছে আমি একটু জিরোবো।

-----১৩ শ্রাবণ ১৪২৮
----৩০----৭----২০২১
-----নির্মল হালদার










বুধবার, ২৮ জুলাই, ২০২১

বাঁশি / নির্মল হালদার

বাঁশি / নির্মল হালদার
__________________


লিখন বাঁশিটার দিকে তাকিয়ে থাকে। সে মনে করে, বাঁশিটা একমাত্র মনসংযোগের উপাদান।

আজ সারা দিন মনটা উড়ু উড়ু। কোনো বিষয়ে মন দিতে পাচ্ছেনা। তখনই তার মনে পড়লো,বাঁশিটা টাঙানো আছে দেয়ালে। চেয়ে থাকলে মন শান্ত হবে। মন স্থির হবে। মন স্থির না হলে, সে যেতে পারবে না সোনাঝুরির কাছে। কাল রাতে বেদম তর্ক হয়েছে তার সঙ্গে। তর্কের কারণ তুচ্ছ একটা বিষয়ে। ধুলোর রঙ কী? প্রশ্নটা ছিল লিখনের। সোনাঝুরি প্রথমে বলেছিল -----জানি না। পরে আরও বলেছিল---- প্রশ্নটা ইন্টারভিউর মত। উত্তর দিতে পারবো না। জটিল প্রশ্ন। ধুলো কালো হয়ে থাকে। ধূসর হয়ে থাকে। কিন্তু কখনোই লাল নয়। লিখন বলেছিল----- যেকোনো একটা বলতে হবে। সঠিক বললে সম্পর্ক থাকবে। ভুল বললে, কাল থেকে তোর সঙ্গে আমি নেই। সোনাঝুরি রেগেমেগে লিখনের জামার বোতাম ছিঁড়ে দিয়ে বলেছিল -----সামান্য একটা বিষয় উত্তর দিতে না পারলে, সম্পর্ক থাকবে না? তার মানে তুই সম্পর্ক কী বুঝিস না। কিংবা বলতে পারি, আমাদের কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। লিখনের উত্তর ছিল-----হ্যাঁ আমাদের কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। গড়ে উঠলে ধুলোর রঙ কী, তুই বলতে পারতিস। তখন সোনাঝুরি পাল্টা প্রশ্ন করে, আকাশের রঙ কি বলতে পারবি?
তুই এখুনি বলবি, আকাশের রঙ নীল। আর আমি বলবো লাল। মানবি তো?

রঙ নিয়ে দুজনের তর্ক চলতেই থাকে। কেউ কারোর কাছে নত হবে না। শেষে লিখন সোনাঝুরির মাথার চুল টেনে মাথাটাকে ঠুকে দেয় দেয়ালে। রক্ত দেখা যায়।

আড্ডাতে আরো বন্ধুরা অবাক হয়ে দু'জনকেই চুপ করতে বলে। সোনাঝুরি আর কিছু না বলে বাড়ির দিকে চলে যায়।

লিখন রাত্রিতে আর ঘুমোতে পারে না। সামান্য একটা বিষয় নিয়ে মাথা গরম করা উচিত ছিল না। পরে সে ভেবে দেখেছে, এবারেও এস এস সি তে তার হলোনা। সেই হতাশা থেকেই বোধহয়, সোনাঝুরির সঙ্গে বাকবিতন্ডা। ঝগড়াও বলা যায়।

আজ সকালে উঠে সে চা--ও খেলো না। কেবল ভাবছে কখন দেখা হবে সোনাঝুরির সঙ্গে। দেখা হলেই, মার্জনা চেয়ে নেবে।

একেকবার ভাবছে, কেন মার্জনা চাইবে? সোনাঝুরির সঙ্গে তার ক্ষমা চাওয়ার মত সম্পর্ক নয়। তর্ক-বিতর্ক হতেই পারে, তা আবার আপনা আপনি মিটেও যায়। অকারণ দীর্ঘায়িত করে, মন কষাকষি করে কী লাভ!

সাতসতেরো ভাবতে ভাবতে লিখনের মন আরো অশান্ত হয়ে উঠছে ।সে তাই বাঁশিটার দিকে তাকিয়ে আছে। সে জানে বাঁশির নীরব রূপ তাকে সহযোগিতা করবে। এর আগেও অনেকবার বাঁশি তাকে শান্ত করেছে। 

বাঁশি চুপচাপ থেকেও প্রতিটি মুহূর্ত একটা সুর প্রবাহিত করে ঘরের মধ্যে। লিখন শুধু দেখতে পায়। শুনতেও পায় সুরের তরঙ্গ।

সে মনে মনে বাঁশির ভেতরে শুয়েও থাকে। তার ঘুম আসে। স্বপ্ন আসে। বাঁশি তার একান্ত আপন। একান্ত প্রিয়।

সেই কবে সংক্রান্তির মেলা থেকে বাঁশিটাকে নিয়ে এসেছিল । এখনো তার সঙ্গেই আছে। এই এখন যেমন বাঁশিটা বলছে-----"বাঁশির ভিতর দিয়ে হাওয়া বয়ে যায় সারাদিন। লিখন, তোমার ভেতর দিয়েও সোনাঝুরি বয়ে যাচ্ছে। সে তোমার সঙ্গেই আছে।
তোমার সঙ্গেই থাকবে।"

লিখন বাঁশির পরিপূর্ণ কথা শুনে ঠিক করে, সে এবার থেকে বৃথা তর্ক করবে না। মাথা গরম করবে না। প্রেম একবারই আসে। তাকে ধরে রাখতেও হয়। আর বাঁশি প্রেমের এক নিঃশব্দ রূপ। সেই আজ তাকে রক্ষা করেছে।

লিখন বাঁশিকে নিয়েই সোনাঝুরির দিকে যায়।

----১১ শ্রাবণ ১৪২৮
----২৮---৭---২০২১
----নির্মল হালদার











কবি নির্মল হালদারের বিভিন্ন সময়ের ছবি

পড়ুন "ঘর গেরস্থের শিল্প"

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ