বুধবার, ৯ জুন, ২০২১

চাল-বুড়ি / নির্মল হালদার

চাল- বুড়ি//

ভোরের আঁধার থাকতে থাকতেই
চলে আসে। বাজারে যে সমস্ত দোকানপাট আছে, তার বাইরেটা ঝাঁট দিতে থাকে বুড়ি।

দোকান তো খুলবে বেলা আটটার পর। তার আগে সাফ-- সুতরো করে রাখে। দোকানি যেন এসেই দেখতে পায়, তার দোকান দুয়ারটা
পরিষ্কার হয়ে আছে। দোকানির
মন ভালো হয়ে যাবেই। এই মন
ভালো করার কাজটা বুড়ি করে। প্রতিদিন।

বুড়ির স্বামী অকালে মারা গেছে।
ছেলেপুলে নেই। আত্মীয়রাও দেখভাল করে না। অল্প বয়সে লোকের বাড়িতে কাজ করতো।
এখন আর পেরে ওঠেনা। শুধুমাত্র
ঝাঁট দেবার কাজ করতে পারে।
এ কারণেই, বাজারের দিকে।

ভোরের আঁধারে।

চাল দোকানের বাইরে অনেক চাল পড়ে থাকে। গোটা চাল ভাঙ্গা চাল। ধুলো চাল। ময়লা চাল।
ঝাঁট দিয়ে দিয়ে বুড়ি আঁচলে বাঁধে। এ জন্যই অন্ধকার থাকতে-থাকতে চলে আসা। যেটুকু চাল পাওয়া যায়, সেটুকুই লাভ।

সমস্ত চাল জড়ো করে বুড়ি
একটা থলিতে রাখে। তারপর সেই থলি শিব মন্দিরে লুকিয়ে রাখে।
ঘরে ফেরার সময় নিয়ে যাওয়া।

দোকানিরা জানে, দোকান দুয়ার
কে ঝাঁট দেয়। তাই তারা বুড়িকে
দু চার পয়সা দিতে কার্পণ্য করেনা।
তাকে সবাই চাল--বুড়ি বললেও
সে মিষ্টি দোকানেও ঝাঁট দিয়ে থাকে। কিন্তু মিষ্টি দোকান থেকে কোনোদিনই মিষ্টি নেয় না।
কে মিষ্টি খাবে!
পয়সা নিলে নুন-তেলটা হবে।

একদিন বন্ধ মনোহারী দোকানের বাইরে দু-তিন প্যাকেট সাবান পেয়ে যায় বুড়ি। দোকান খুলতেই
দোকানিকে ফেরত দেয় । দোকানি তাকে পাঁচ টাকা দিয়েছিল।
আরেকদিন দেখে একটা ছিঁচকে চোর একটা চাল দোকানের তালা ভাঙছে। বুড়ি এমন চিৎকার করে
কুকুরের দল তেড়ে আসে। চোর পালিয়ে যায়।
বুড়ি দোকানির ঘরে গিয়ে তালা ভাঙার গল্প বলে আসে। তৎক্ষণাৎ তারা দোকানে এসে নতুন তালা লাগিয়ে দেয়।
সেই চালদোকানি সেদিন বুড়িকে দিয়েছিল দু কেজি চাল।

এই বুড়ি বেলার দিকে ঘরে যায়। চান করার আগে
চাল বাছে। ধুলো ময়লা পরিষ্কার করে। কাঠকুটো জ্বালিয়ে উনুন ধরায়। রান্না করে।
এই বুড়ির আজ চালের থলি মন্দির থেকে উধাও।
কে নিয়ে গেল? কে নিয়ে গেল?

থলি রেখে সে গিয়েছিল চাল দোকানেই। যদি দু চার মুঠো চাল পরিষ্কার চাল দোকানি দেয়।

চাল দেবে কিন্তু বেলা হলে।
দোকানি বলে, আগে ভালো করে বৈনি--বাটা করতে দে। পরে আসবি------

বুড়ি মন্দিরে যায়।

আজ তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে যাবে।
শরীরটা ভালো লাগছেনা। কিন্তু চালের থলিটা নেই। বুড়ি চিৎকার করে। কোথাও খুঁজে পায়না। সে চিৎকার করতে করতে কাঁদে।
কে আমার মত হতভাগির চাল
চুরি করে নিয়ে গেলি রে-----
কে?

লোক জড়ো হয়। নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি করে। কিন্তু কেউই বুড়িকে এক কেজি চাল কিনে দেবার জন্য তৎপর হয় না। বুড়ি
কেঁদেই চলে। ইনিয়ে বিনিয়ে
কেঁদে চলে।

শিব মন্দিরের চাতালে মাথা ঠুকতে থাকে। বলে, ও বাবা শিব আমি আজ কি খাব বলো?
তুমি খুঁজে দাও আমার চালের থলি। খুঁজে দাও বাবা------
তোমার পূজা করবো আমি।
খুঁজে দাও। তোমার কাছেই তো প্রতিদিন থলি রেখে কত কাজ করি। কোনোদিন চুরি হলো না।
আজ কে নিয়ে গেল?
কোন্ চোর আমার কপাল ভাঙলো?
বাবাগো-------কি হবে আমার?

কাঁদতে কাঁদতে বুড়ির চোখ ফুলে যাচ্ছে। সে এই অবস্থায় দেখতে পেলো, শিব মন্দিরের সিঁড়িতে
তার চালের থলিটা পড়ে আছে।
ফাঁকা।

বুড়ির কাছে আজ পৃথিবীটা ফাঁকা লাগছে। মনে হচ্ছে, এক কালে সব গেছে তার। এ কালেও কী সব যাবে?

গতর খাটিয়েও লোক কী তাকে বাঁচতে দেবে না?
বুড়ি জোরে জোরে কাঁদতে থাকে।



----২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----৭---৬---২০২১
----নির্মল হালদার




ভাষা / নির্মল হালদার

ভাষা

-------------------


----আরে না না কোথাও যাচ্ছি না। গেছলাম ফিরে এসেছি।
----কোথায় গেছলেন? কোথায়?
-----পাহাড়ের সঙ্গে দেখা করতে গেছলাম। অনেকদিন যাওয়া হয়নি। যাব যাব করেও যাওয়া হয়ে উঠছিল না। অবশেষে আজ
দেখা করে এলাম।
----পাহাড় আছে কেমন?
ওর চূড়াটি অক্ষত আছে তো?
----হ্যাঁ।
----শুনেছিলাম একবার নাকি
চূড়াটি হেলে পড়ছিল ঝড়ের তান্ডবে। এক পাখি এসে পাখা দিয়ে আটকে দেয়। চূড়াটি রক্ষা পায়।
-----এই গল্প আমিও শুনেছি।
আপাতত ভালোই তো আছে মনে হলো। যদিও পাহাড়ের গায়ে যে সমস্ত গাছপালা ছিল, এখন অর্ধেক নেই। তাই, একটু ন্যাড়া ন্যাড়া লাগছিল।

দুই বন্ধুর এই গল্পের মাঝে ভাষা এসে দাঁড়ায়। ভাষা বলতে চায়-----পাহাড়িয়া গ্রামে আমাদের সবারই ঘর হলে চমৎকার হয়। অথবা পাহাড় যদি
এসে তাদের সঙ্গে বসবাস করে।

দুই বন্ধু ভাষার কথা শুনে হাসাহাসি করে। তারা বলে, এত প্রেম রাখবি কোথায়? আমাদের সঙ্গেই তোর প্রেম জমে উঠলো না। পাহাড়ের সঙ্গে জমবে?

ভাষা সরে দাঁড়ালো।

সে অন্বয়কে নিয়ে পথ চলতে চেয়েছিল। অন্বয় চলে গেল উত্তরবঙ্গ। চাকরি নিয়ে। তারপর থেকেই ভাষা শুধু মন খারাপ করে। মন খারাপের রঙ কালো না নীল?

ভাষা হাঁটতে থাকে।

দূর থেকে দেখা যায় পাহাড়ের চূড়া। গোধূলির রঙে মোহময় লাগছে। তার মনে হলো, ওই গোধূলির রঙে সে সেজে উঠবে।
মনে হতেই, এই আমলকির মাঠে
আধো আধো আলোয় সে খুলতে লাগলো তার পোশাক। জনশূন্য এই মাঠে কয়েকটি গাছ ছাড়া
তাকে কেউ দেখছে না। সে সম্পূর্ণ খুলে ফেলে হাঁটতে থাকে পাহাড়ের দিকে। যেনবা পাহাড়ের চূড়ায় রাখা আছে গোধূলির যাবতীয় রঙ।

সেই রঙে সেজে উঠবে ভাষা।

ঘরে ফিরছিল গাই গরুর দল। ভাষাকে দেখে তারা থমকে যায়।
তাদের মনে হয়, ভাষা কোনো দেবী।
মানবীর নগ্ন রূপ আগে কখনো দেখেনি তারা। তারা তাদের বিস্ময় ও অনুভূতি থেকে ভাষার প্রতি নত হয়ে ওঠে।
কয়েকটা গাছ ভাষাকে বলে, দ্রুত যাও-------রঙ ফুরিয়ে আসছে।
আজকের মত ফুরিয়ে যাবে।
তুমি চলো। তোমার মত সেজে উঠবে আজ। আমরা আছি তোমার সঙ্গে।

ভাষা দেখতে পেলো, একদল লোক আসছে হইহই করে। সবাই শুনেছে, গ্রামে নাকি অপদেবতার আবির্ভাব হয়েছে। তাই তারা, আগুন জ্বালিয়ে অপদেবতাকে পুড়িয়ে মারবে।

কাছে আসতে না আসতেই, ভিড়ের লোক আর নেই। কোথায় গেল? কি ভয় কার ভয়ে চলে গেল? যদিও ভাষার কোনো ভয়
করছিল না। সে জানে, যে পাহাড়ে যায় গোধূলির কাছে যায়, তার কাছে কোনো লজ্জা মান ভয় থাকতে নেই।

সে প্রথমে পাহাড় তলায় শুরু করল নাচতে। কেননা, তার নগ্ন নৃত্য পাহাড়কে অর্ঘ্য হিসেবে নিবেদন করবে।

পাহাড় স্তব্ধ হয়েও আজ আনন্দিত। মনে হচ্ছে, এখনই খুশির বৃষ্টি নামবে।



-----২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
-----৬----৬----২০২১
-----নির্মল হালদার




জানলা / নির্মল হালদার

জানলা

---------------------------
একটা জানলা চাই।
দরজা যেমন আছে থাক। দরজা বন্ধ থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু একটা জানলা চাই।


জানলা ছাড়া কিছুই দেখা যাবে না। রোদ্দুর যে আসছে, জানলা ছাড়া কে দেখাবে! বৃষ্টি যে আসছে
জানলা ছাড়া কে দেখাবে!

বিহু বলে, ওই যে ছাদে নানা রঙের
জামাকাপড় মেলা আছে, জানলাই তো আমাকে দেখায়।
জানলাই তো দেখিয়েছিল, সেই মেয়েটিকে যে পুতুল নিয়ে খেলা করে। বিকেলবেলা।
বিহু বলে, যে ঘরে জানলা নেই
আমার মনে হয় সেই ঘরে হৃদয়টা নেই।
আমি একবার এক আত্মীয়র বাড়িতে গেছি, আমাকে থাকতে হবে একটা রাত। কিন্তু সেই আত্মীয়দের বলতে পারছিনা,
আমার ঘরে জানলা চাই।

বিহু যখন জানলার কথা বলে
তখন তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মনে হয়, জানালা দিয়েই সে পৃথিবীর সমস্ত কিছু দেখবে।


শীতের দিনেও বিহুর ঘরের জানলা বন্ধ থাকে না। সে সব সময় জানলা দিয়ে আলো-বাতাস অন্ধকার দেখে। দেখে, অনেক দূর থেকে এক পথিক আসছে। যার পায়ে লেগে আছে প্রাচীনকালের ধুলো। দূর থেকেও বিহু বলে দিতে পারে ধুলোর রঙ কি। দূর থেকেও
বিহু বলে দিতে পারে, মেয়েটির চোখে কেন জল।

বিহুর বন্ধুনী শালিক তাকে রসিকতার সঙ্গে বলেছিল, ফুলসজ্জার দিন জানলা খুলে রাখবি তুই। কি মজা।
বিহু ধ্যাৎ বলে অন্য দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর বলেছিল, জানলাটা আছে বলেই, হেমন্ত শীত বসন্ত টের পাই। আমরা থাকি তো ঘিঞ্জি শহরে। কোলাহল ছাড়া যার কোন প্রকৃতি নেই। তাই
জানলাটা আছে বলে, দেখতে পাই, রাস্তার ধুলোয় খেলছে এক ন্যাংটো শিশু।

সেই সেদিন বিহু ন্যাংটো শিশুর কাছে পৌছে গেছলো। কিনে দিয়েছিল একটা পাউরুটি। কোলেও নিয়েছিল।
এই বিহু জানলা থেকে রাস্তা দেখতে দেখতে বর্ষা দেখতে পায়।
গুন গুন করে ওঠে তার মন। তার ইচ্ছে করে তার বন্ধুনীরা কেউ একজন এসে তাকে রবীন্দ্রনাথের গান শোনাবে।

কেউ আসে না।

সেই মুহূর্তের মধ্যে চলে যায় এক জঙ্গলে। যেখানে এক হরিণ শাবক খুঁজে বেড়াচ্ছে তার মাকে।
বিহু হরিণ শাবককে কোলে নিয়ে
খুঁজে বেড়ায় হারিয়ে যাওয়া মাকে। তখন মনে হয়, সত্যি সত্যি জানলা আমাকে কতকিছু দেয়।

বিহুর ঘর দোতলায়।
জানলা দিয়েই
মেঘ ধরতে পারে। তার মনে হয়,
মেঘ মানেইতো চিঠি। তার মা তাকে লিখেছে। মা কেন যে দূর দেশে চাকরি করতে গেল।
বিহুর খুব মন খারাপ করে। বাবাও চাকরি করে দূর এক গ্রামে।
মা-বাবা দুজনেই মাসে একবার বাড়িতে আসে। সারা মাস বিহু আর দিনুদা বাড়িতে।

বিহুর কলেজ শেষ হয়ে গেছে।
ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলেও
সে নিয়মিত ক্লাস করে না। সে
জানলা থেকে দেখে , দূরে এক কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়ার সঙ্গে কথা বলছে।

কী কথা?

বিহু কান পাতে। শুনতে পায়,
রাধাচূড়া বলছে, গতরাত্রে ঘুম হয়নি তার। কৃষ্ণচূড়া বলছে, এসো আমার কাঁধে মাথা রেখে
ঘুমিয়ে যাও।

বিহু দেখতে পায়, আবর্জনার স্তূপ থেকে কুকুর ও শুয়োর একইসঙ্গে আহার খুঁজছে।

সে কি ডাকতে পারে না তাদের?

বিহুর বাবা বলেছিলেন, বাড়িতে
নতুন রঙ করাবেন। বিহু জানিয়েছিল, তার ঘরে রঙ করলে করতে পারো------জানলায় রঙ করা চলবে না। তার বাবাকে কারণটা জানায়নি। কারণ শুধু তার কাছে,
রঙ করলে, যদি কিছুই না দেখা যায়।

মা বিহু কে চিঠি না লিখলেও
মেঘ এলেই মায়ের চিঠি পড়ে।
মা লেখে-------
বিহু
আশা করি তুমি ভালো আছো।
আমি এই রবিবার বাড়ি যাচ্ছি না।
অফিসের কাজে আটকে যাব।
তোমার বাবা যাবেন। তিনি তোমাকে দিয়ে আসবেন টাকা।

তুমি দিনুদার কথা শুনবে। খাওয়া-দাওয়া করবে নিয়ম মত।

মা কিন্তু কেমন আছে কোনো চিঠিতেই লেখেনা। বিহু জানে,
মায়েরা ভালো থাকে সবসময়।
তাই বোধ হয়, মা তাকে জানলা সহ একটা ঘর দিয়েছে।

এই জানলা--চোখ বিহু পেয়েছে হাসপাতাল থেকে। সে যখন
ক্লাস টেনে পড়ে তার হয়েছিল কঠিন অসুখ। দিনের পর দিন
চলছে চিকিৎসা, অথচ সুস্থ হয়ে উঠছে না। তখন এক সিস্টার
তার বেড সরিয়ে জানলার কাছে করে দিয়েছিলেন। কি আশ্চর্য, কয়েকদিন পর থেকেই বিহু সুস্থতার দিকে যায়। সে প্রথম হাসপাতালের জানলা থেকে দেখে
হাতির পিঠে উঠে আসছে এক বন্ধু। যে বিহুর সঙ্গে কথা বলতেই আসছে। যে জানে, বিহু এই এক মাস ধরে কারো সঙ্গেই কথা বলতে পারেনি।

হাসপাতালের জানলা থেকেই সে দেখেছিল, বট চারার কিরণ। সে দেখেছিল, ফুলের রেণু। সে পেয়েছিল পাকা কুসুমের গন্ধ। সে পেয়েছিল, পায়ের শব্দ।

হ্যাঁ হ্যাঁ-------পায়ের শব্দ। যে শব্দগুলি বিহুর সঙ্গে কথা বলতে আসে। যে শব্দগুলি বিহুর কুশল রচনা করে।

সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে বিহু
মায়ের কাছে আবদার করেছিল,
একটা জানলা।
সেই আবদারের জানলা এখন দিকে দিকে। সর্বত্র। বিহু দেখতে পায়, তার বন্ধুনী শালিক হাতের পাতায় গমের দানা রেখে পায়রাকে খাওয়াচ্ছে।সেও পায়রাদের সঙ্গে একটি একটি করে গম খুঁটছে।

আহারে--------



-----২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----৪---৬---২০২১
-----নির্মল হালদার




গাছবাড়ি / নির্মল হালদার

গাছবাড়ি


জষ্টি মাসের গরম। খুব বিরক্তিকর। এত জ্বালাতন করে যে ঘুম হয় না একদম।

আজ সকাল থেকেই প্যাচপেচে গরম। ঘাম গড়িয়ে পড়ছে গা থেকে। নিজেকে অস্থির লাগছে।
মন বসছে না কিছুতেই।

ঘরময় দৌড়ে বেড়াচ্ছে ছাতিম।

হঠাৎ আয়নার দিকে চোখ গেল ছাতিমের। সামনে গিয়ে আয়নায় মুখ দেখে বুঝতে পারলো, মুখে
রাগের চিহ্ন।

না,কোনো রাগের চিহ্ন থাকবে না।
রাগ বা ক্রোধ এলেই হিংসা আসে।
হিংসা ক্ষতিকর। সে মনে মনে স্থির করলো, আজ থেকে ঘরে নিয়ে আসবে নানান গাছ। গাছ যদি ঘরে থাকে, কোনো ক্রোধ ঢুকতে পারবে না মনে। গাছের শক্তি আছে, মনকে শান্ত করার মত। গাছের শক্তি আছে, মনকে শীতল করার মত।

ঘরের ভেতরে গাছ। ফুল ফলের গাছ। ঘরের ভেতরেই গাছের সঙ্গে সহবাস।

আজ যখন ছাতিম বাজারে পুঁই শাক কিনছিল,তার মনে হয়েছিল,
শাকসবজির চাষ ঘরে করলে, মন সবুজ হয়ে থাকে। সে টাটকা সবুজ দেখবে বলেই, প্রতিদিন সবজি বাজারে ঘুরে বেড়ায়। প্রতিদিন শাক সবজির সঙ্গে কথা বলে। সবজি বিক্রেতাদের সঙ্গে আলাপ জমায়। হয়ত বা সে শুশনি শাক কিনবেনা, তবুও
যে শুশনি শাক বিক্রি করছে, তার সঙ্গে আলাপ করে গল্প করে। একটি মাত্র কারণ, সে শুশনি শাক দেখবে।

যেকোনো সবুজ চোখের শুশ্রূষা।

ছাতিম আজ প্রথমেই বটগাছ নিয়ে এলো। তারপর কুসুম। শাল
পিয়াল। কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়াও নিয়ে এলো। আর জায়গা নেই। সে আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে চেষ্টা করতে থাকে, চারটে দেয়াল কে
যদি ঠেলতে ঠেলতে একটু সরানো যায়, জায়গা অনেকটা পাওয়া যাবে। গাছের জায়গা হবে অবশ্যই।

ছাতিম বট গাছের তলায় খানিক ছায়া জড়িয়ে শুয়ে পড়লো। সে ধীর স্থির হয়ে ঘর থেকেই এক বন্ধু ভোরাইকে ডাকে।

কোনো ডাক শুনতে পায় না কেউ।
চারদিক তো বন্ধ। ছাতিমের মনের অবস্থা দেখে কৃষ্ণচূড়া বলে, অস্থির হয়োনা। দেখবে, সন্ধ্যে হলেই আসবে তিতলি। সন্ধ্যে হলেই আসবে কোজাগরী। আজ সন্ধ্যে হলেই আসবে জোনাকিরা।

এখন তুমি দরজা খোলো। অন্ধকার হয়ে গেছে। প্রতিদিনের মত নতুন নতুন আলোয় বিকশিত তারা তোমার সঙ্গে কথা বলবে।

ছাতিম প্রশ্ন করে, কি কথা?
কৃষ্ণচূড়া বলে, তা আমি জানবো কি করে! তবে জানি কথা বলবে।

ছাতিম দরজা খুলে দেখে কোজাগরীর হাতে এক গোছা
ধূপ জ্বলছে। ধূপের ধোঁয়া ও গন্ধে
ছাতিম কোজাগরীর কপালে চুম্বন আঁকে। বলে, এই সন্ধ্যায় তোকে আর ধন্যবাদ দিলাম না।
চল্, প্রতিটি গাছের তলায় একটা করে ধূপ গেঁথে দিই।চল্, আমরা আজ সারারাত গাছের সঙ্গে কাটাবো।
এই তুই আমাকে প্রতিদিন একটা করে গাছ উপহার দিস। আমি
গাছের সৌন্দর্য নিয়ে সুস্থ ও সুন্দর থাকবো।

কোজাগরী জানতে চায়, কি কি গাছ তোর পছন্দ আমাকে বল -----আমি নিশ্চয়ই জোগাড় করবো। তার আগে তোকে কথা দিতে হবে তুই আর অযথা ঘুরে বেড়াবি না। তুই দেখিস নি তোর চেহারাটা কত খারাপ হয়ে গেছে।
কোজাগরী আরো বলে, আমাদের সব বাড়ি গাছবাড়ি হয়ে উঠবে। এরকম স্বপ্নের দিকে আমাদের যাওয়া।

আয়------দুজনের দুঃখ-বেদনা গুলি, রাগ অভিমান গুলি গাছের পাতায় মুছে নিই।

আয়------কান পেতে শুনি
শিকড়ের স্বর।

ছাতিম বলে, জঙ্গল তৈরি করতে
আমরা পারলাম না। কিন্তু ঘরে ঘরে, ঘরের ভিতরে বাইরে গাছ রাখতেই পারি।

গাছের কাছ থেকে শিখবো, উদারতা ও ধৈর্য। গাছের কাছ থেকে শিখবো, ক্ষমা।

ছাতিম ও কোজাগরীর সঙ্গে
আজ ছুটে বেড়ায় জোনাকিরা।



----১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----৩---৬---২০২১
----নির্মল হালদার




পায়ের শব্দ / নির্মল হালদার

পায়ের শব্দ

নির্মল হালদার


আজকের দুপুর টা খুব খারাপ কাটছে আমার। একটা কাক এসেছিল। ফিরিয়ে দিয়েছি।
কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না।

একটা পায়রাও এলো।
ফিরিয়ে দিয়েছি। কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না।

এই অবধি ডাইরিতে লিখে রঙ্গন
উঠে দাঁড়ায়। জল তেষ্টা পাচ্ছে।
গতকাল সন্ধের মত।

সিঁড়িতে পায়ের শব্দ । আসা যাওয়া করছিল বারবার। অথচ কেউ নেই। কেউ এসে দাঁড়িয়ে একবারও বলছিল না, এইতো এসে গেছি।
সে একবার ঘরের ভিতরে ঢুকে
দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। মনে করছিল, যদি কেউ এসে দরজায় টোকা দেয়? যদি ডাকে?

কিছুই কিছু হচ্ছিল না।

সে রাগে বিরক্তিতে নিজেই সিঁড়িতে ওঠানামা করে। পাশাপাশি আরো একজনের পায়ের শব্দ রঙ্গন শুনতে পেয়ে ভয় পেয়ে যায়।

কার এই পায়ের শব্দ?

পায়ের শব্দ আছে অথচ মানুষটি নেই। কী হচ্ছে?
গতকালের সেই ঘটনা থেকে রঙ্গনের ঘুম হয়নি সারারাত। দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লেও
রঙ্গন শুনতে পায়, কেউ আসছে।

কে আসছে?

করোতোয়া আর আসবে না কোনোদিন।
সম্পর্কটা একেবারেই চুকেবুকে গেছে।সেও তো অনেকদিন হয়ে গেল। রঙ্গন শুনেছিল, করোতোয়া
কারো সঙ্গেই বেশিদিন সম্পর্ক রাখতে পারেনা। তার স্বভাবে আছে, নতুন নতুন বন্ধু পাতানো।
নতুন নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পথ চলা। রঙ্গনের পক্ষে যা সম্ভব নয়।
সে তার পুরনো সাইকেলটাকে এখনো ত্যাগ করতে পারেনি। লাল গামছাটা ছিঁড়ে গেলেও
যত্ন করে রেখে দিয়েছে। তো এই
রঙ্গনের করোতোয়ার সম্পর্কে
অনুভূতিগুলো থেকে গেছে বলেই,
সে মাঝে মধ্যে বিষণ্ণ হয়ে পড়ে।

তখনই চেষ্টা করে ডাইরি লিখতে।

গতকাল লিখেছিল সকাল দিকে।
যখন মেঘ এসেছিল তার সঙ্গে কথা বলতে। অথচ একটা কথাও বলতে পারেনি।

মেঘ কী বলছিল?
এই একটা বাক্যের পর থেমে গিয়েছিল সে।

কখনো কখনো রঙ্গনের ঘরের চারটে দেয়াল তার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে প্রকাশ করে। দেয়ালগুলো নড়ে চড়ে ওঠে। রঙ্গন টের পেয়েই, বাইরে চলে যায়। ছাদে পায়চারি করে।

করোতোয়ার সঙ্গে এই ছাদেই পায়চারি করতে করতে গল্প করেছে। দুজনে একই সঙ্গে আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা চেনার চেষ্টা করেছে। অন্ধকারে ছাদে শুয়েও পড়েছে দুজন।

এই মুহূর্তে জোর গলায় রঙ্গন
একটা হাঁক দেয়: করোতোয়া-----
ইমলি--------

রঙ্গন করোতোয়াকে ইমলি নামেই
আদর করতো। আদরের ধরনটা এইরকম, রঙ্গন করোতোয়ার পিঠে চিমটি কাটতো শুধু। আর
করোতোয়া কেবল বলতো, এই ছাড়ো বলছি ছাড়ো--------

ছেড়েতো দিতেই হলো বরাবরের জন্য। এখন আবার সিঁড়ির শব্দটা আসছে। এই ভর দুপুরে।

শব্দটা কি করতে চায়?
কাকে আক্রমণ করতে চায়?
শব্দটা থেকে কোনো প্রেমের অনুভূতি জেগে উঠছে না। শব্দটা থেকে কোনো আলো উঠে আসছে না। তবে কেন তবে কেন এই সিঁড়ির শব্দ?

রঙ্গন ডাইরিতে লিখলো-------
যদি শব্দটাকে উপরের দিকে
পাঠানো যায়। কেমন হবে?
যদি শব্দটাকে উপর থেকে উপরে
পাঠানো যায়। কেমন হবে? হয়তো দেখা যাবে এই সিঁড়িটাই আকাশে ওঠার সিঁড়ি। হয়তো দেখা যাবে, এই সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
কথা বলা যাচ্ছে সূর্য তারার সঙ্গে।

সেদিন করোতোয়া আসবেই।
একমাত্র তাঁর কাছে। কেননা, রঙ্গনকে সে বলেছিল, একটা সূর্য লকেট কিনে দেবার জন্য। রঙ্গন যদি সত্যি সত্যি একটা সূর্য করোতোয়াকে উপহার দিতে পারে?

রঙ্গন মনে মনে স্থির করে, আজ
সন্ধে বেলা পায়ের শব্দ এলেই, তাকে আকাশের দিকে যেতে অনুরোধ করবে।

আকাশটা তখন আকাশে থাকবে তো?



----১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----২---৬---২০২১
-----নির্মল হালদার




লকডাউন / নির্মল হালদার


লকডাউন//

কালী মন্দির থেকে হরিমন্দির
এই পাড়াতে। প্রতিদিন কোনো না কোনো মন্দিরে পূজারীদের ভিড় লেগে থাকে।

পূজার দ্রব্য সামগ্রীর দোকানও আছে দেদার। নিত্য পূজার জন্য
সারি সারি ফুলের পসরা।
বেল পাতা থেকে পদ্ম ফুল দুববো ঘাস
সবই পাওয়া যায়। বিক্রি করে প্রধানত মহিলারা।
এরা আসে লাগদা রামনগর ধবঘাটা থেকে। ভোরবেলা। এই ফুল ওয়ালি মহিলাদের স্বামীরা
আগে বাজনা বাজাতো। এখন কদর নেই। এখন সমস্ত জায়গায় ডিজে।
সম্প্রদায় হিসেবে এরা ডোম। এদের পদবী কালিন্দী। কেউ কেউ বাদ্যকর লেখে। আগে এরা বাঁশের কাজ করতো। ঝুড়ি ঝাঁটা তৈরি করতো। বাঁশের দাম বেড়ে যেতে সেই বৃত্তিও চলে গেছে।
বর্তমানে এই পুরুষরা বা ফুল ওয়ালিদের স্বামীরা এতটাই অলস বা অকর্মণ্য যে দিনরাত বাংলা খেয়ে পড়ে থাকে। তাই , মহিলাদের ঘরের বাইরে আসতে হয়েছে রোজগারের জন্য।

ফুল বিক্রি করতে গেলেও পুঁজি লাগে। এখন আবার গাঁদা ফুলের বারো মাস চাষ। অনেকেই গ্রামের
দিকে ফুলের চাষ করে। শহর বাজারে এসে এই ফুল ওয়ালিদের কাছে বিক্রি।

গাঁদা ফুল ১০০/টাকা কে জি।

দু কে জি ফুল কিনে যে বিক্রি করবে তার উপায় নেই। ফুল ওয়ালাও ধারে বিক্রি করে না।
ফুল কত টাকা আর বিক্রি হয়
কত লাভ হয় যে পুঁজি হবে ফুল ওয়ালিদের।

ভবানী বলছিল, আমরা শাগে--মাড়ে থাকি।ঝুপড়িতে থাকি হামদের কে দিবেক পুঁজি।
লকের বাগান থেকে বাড়ি থেকে
ফুল চুরিও করি। তা বাদে বিক্রি বাটা। সোভ দিন সমান নাই বিকায় ফুল।সোভ দিনত লক্ষ্মী বার লয়।
রবিবার ত মাছি তাড়াই।

ভবানীর গলায় দুঃখ দারিদ্রের সুর। যেন বা ফুলে পাতায় শিশিরের মতো লেগে আছে। যেন বা দিন আনি দিন খাই------
সংসারে নাই----নাই------নাই। নাই।
ফুলের রঙ ফুলের সুষমা
ভবানীদের দারিদ্র ঘুচাতে পারে না।

ভবানীরা কী দরিদ্র নাকি দারিদ্র্য রেখার নিচে এদের বসবাস?

আজ রবিবার ।

বেলা বাড়ছে চিড়বিড়িয়ে।
ফুল কেনার লোক নেই। তারপরে আবার লকডাউন চলছে। বিশেষ লোকজন বাইরে আসছে না।
বেলা১০ টার মধ্যে দোকান বাজার বন্ধ হয়ে যাবে। রেখাকে
ছুটতে হবে চালের দোকানে। কিন্তু
ফুল বিক্রি হয়েছে মাত্র ২০টাকা।
আর ৩০ টাকা পাবে কোথায়?
২কে জি চাল লাগবেই।

২ কেজি মোটা চালের দাম ৫০ টাকা। রেখা কালিন্দী বা ডোম বুড়ি ছোটন হালদারের দোকান দিকে ছুটলো। চাল কিনতেই হবে। মাড়ে--জলে বাঁচাতেই হবে বেটাবিটিদের।
২০টাকা মাত্র আছে শুনে ছোটন বলে,নাই হবেক বুড়ি। নাই দিব চাল। আর আমি ধারে নাই বিকি।
বুড়ি তত অনুনয় বিনয় করে-----
তুই না দিলে আজ উপাস দিয়ে মরবো
শুন বেটা-------তকে রোজ
ফুল এনে দিব।কিনতে নাই হবেক।তাও হামকে চাল দে।
বাঁচারে বাঁচা--------- হামদের



-----১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----১---৬---২০২১
-----নির্মল হালদার




কবিতা / নির্মল হালদার




কবিতা
৯১.
সূর্যের কিরণ ফুল-ফলের কিরণে এসে
আরও রঙিন। আরও প্রেম। আরও তাপ।

উত্তাপ-উত্তেজনায় আমিও আছি।
আমার আত্মায় এসে লাগে সূর্যের সুবাস।


৯২.
যে কোন গাছের নিঃশ্বাস থেকে
আমি রচনা করি আমার নিসর্গ
আমার স্বপ্ন সন্ততি

আমার সংসার

হাঁড়ি নেই হাঁড়ির ভাত আছে। উনুন নেই, উনুনের গল্প আছে। আর আছে ঘাম।

যে কোন গাছের ঘাম মাটিতে পড়লেই,
এক একটি গাছ।

আমার আগামী।


----১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----১---৬---২০২১


৯৩.
শুকনো উনুন

সূর্য এসে সেঁধিয়ে গেলে
আগুন জ্বলবে

রান্না করবে কী?

এসো, হাঁড়ি বসাই

যেখানে যতটুকু দিন রাত্রি আছে
হাঁড়িতে দিই। ফুটতে ফুটতে
তেল- হলুদের আহ্লাদ

সংসারের স্বাদ।

ভাবে--অভাবে আত্মীয়তা।


৯৪.
কাকের ডাক পায়রার ডাক
এক হয়ে একটা পথ। যে পথে
আমার যাওয়া নেই। যে পথে
বিরহ পড়ে থাকে ধূলার মত।

কে বিরহী?

মেঘ এসে দিয়ে গেছে বৃষ্টি
আমাকেই একা। আমি বৃষ্টিকে পড়ছি
গোপন চিঠির মত

অমলিন একা।


-----১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
-----২---৬----২০২১


৯৫.
ভিখারির কাছ থেকে ভিক্ষা নিয়ে
আমিও ভিখারি। আমি যাই, ভিখারিদের কাছে।
আরও ভিখারিদের কাছে।

আমার ভিক্ষার সৌন্দর্য আমারই রূপ

শেষ নাই।


৯৬.
মন কি সহজ কথা,
মন কি সহজ রূপ,
মৌমাছি এসে খুঁজলেই পেয়ে যাবে?

আমিও পাইনি মৌমাছির খোঁজ

আমার সঙ্গে মধু চোর কথা বললেও,
মনচোরের সঙ্গেও আমার কথা,
আমার নীরবতা

আমি পাইনি পদ্মবনের খোঁজ

মনেও পড়েছে, আমার মনের জীর্ণতা।


-----১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
-----৩----৬----২০২১


৯৭.
নির্জন আনন্দের মতো নির্জন আমলকি
বনে বনে। একাকী। সকলের সঙ্গে থেকেও
বনে বনে। একাকী। এই একাকীত্ব বুকে রেখে
আমিও বনের একটি পথ

রাখালকে খুঁজছি।


৯৮.
একটি পোকার প্রসব বেদনা এলে,
আরেকটি পোকা শুনতে পায়।
গাছেরা শুনতে পায় গাছের প্রসব বেদনা। আনন্দ-বেদনা এই,
রামধনু উঠলে আমি শব্দ শুনতে পাই।

আমি যাই, রামধনুর দিকে।

সাত রঙের মালা কে গাঁথলো? কে পরবে
সাত রঙের মালা। আমার বুকেতো মালা নেই
শুধু মালার দাগ

আমি লুকাই না।


-----২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
-----৪----৬---২০২১



৯৯.
একটা গোটা মানুষ গোটা ভাত খায়।
একটা ভাঙ্গা মানুষও গোটা ভাত খায়।
গোটা ভাতের গোটা আলোয়
গোটা মানুষ ভাঙ্গা মানুষ একই রাস্তায়।

ঘরের চালা ভাঙাচোরা হলেও
ঘরের রাস্তা ভাঙাচোরা হলেও
গোটা চালের খোঁজে মানুষ দৌড়োয়।
মানুষ খোঁজে গোটা চালের গৌরব।

মানুষ যে দাঁড়াবে গোটা এক দেশে।


----২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----৫---৬----২০২১


১০০.
পাকা আমের রঙ গড়িয়ে পড়লে
নিজেকে সুন্দর লাগে। মনে হয়, যে যেখানে আছে সবাই সুন্দর।
সকলের সৌন্দর্য উপভোগ করছে মাটি।

আমাদের ধরিত্রী।

আবহমান মাটির কান্না শুনি বা না শুনি
মাটিতেই ফলেছে আম। আমার চোখের জল শুকিয়ে ওঠার আগে
মাটিতেই ফলেছে আম। আমি চেয়ে থাকি

আমি চেয়ে আছি।


১০১.
পথ হারিয়ে গরুটা চলে গেছে ধানচাটানি।

ধানচাটানি পাহাড়ের ওপারে।
কে ফেরাবে গরুকে? তুইও ফিরে আসিস নি আমার কাছে। তুই যে কোথায় আছিস
বাতাসও বলতে পারেনা।

গরুটা ফিরবে তো? বাছুরটা হামলে উঠছে।


----২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----৭---৬---২০২১


১০২.
কাকের মুখে খবর নেই, তুই কোথায় আছিস

কাককেও বলিহারি, লোকের ঘরের এঁঠো কাঁটা আমার উঠোনে ফেলে যায়। শুধু তোর খবরটাই
ফেলে যায় না।

পাখিও পালক ফেলে যায়, পালকের কোমলতাও ফেলে যায়
শুধু তোর উষ্ণতা ফেলে যায় না।

আমি আমার হাড়ে ফুঁ দিই, বেজে ওঠে না।


১০৩.
কে এসে বলবে,
তোকে দেখা গেছে শালিকের বাসায়?
আমি তবে খড়কুটো মুখে যাবো তোর কাছে।

তোর কাছেই তো আমার ঠাঁই

তোর পায়ের তলার মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে
তোকে করবো নিরাকার।


------২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
-----৮---৬---২০২১
-----নির্মল হালদার







সোমবার, ৩১ মে, ২০২১

মাঠ// নির্মল হালদার

মাঠ//


১.
বাবার হাত ধরে ছেলে শহরের গলি থেকে গলি হাঁক দিয়ে চলেছে: একটা মাঠ দেবে গো মাঠ
একটা মাঠ দেবে গো মাঠ--------

একবার বাবা হাঁক দিলে একবার
ছেলে হাঁক দিতে থাকে: একটা মাঠ দেবে গো মাঠ------
একটা মাঠ দেবে গো মাঠ------?

হাটবাজারের মানুষ, পথ চলতি মানুষ, উঁকিঝুঁকি মারা মানুষ
কৌতুহলের সঙ্গে শুনতে থাকে,
বাবা ও ছেলের হাঁক।

সবারই প্রশ্ন: মাঠ আবার কী?
মাঠের জন্য ফেরিওয়ালার মত
হাঁক দিলেই কি মাঠ পাওয়া যাবে?
এরা কি পাগল?

বাবা ও ছেলে একসঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
বসে যায় সবজি বাজারে। যেখানে
নিত্য কোলাহল। বেচাকেনা। কেনাবেচা।

বাবা ও ছেলে হাঁক দিতে থাকে :
একটা মাঠ দেবে গো মাঠ?
বাজারিরা ঘুরেফিরে বাবা ও ছেলেকে দেখে। নিজেদের মধ্যে কানাকানি করে: একইসঙ্গে বাপ বেটা পাগল হয়ে গেছে। কেউ কেউ পাগল মনে করে, পয়সা ছুঁড়ে দিয়ে যায়। অনেকেই হাসাহাসি করে। খুব কৌতুহলী যারা কাছে এসে জানতে চায়, তোমরা কি বলতে চাও, সঠিক আমাদের বলবে? তোমরা কোথা থেকে এসেছো? কত দূরে বাড়ি?

কেউ কেউ বলে ভিক্ষার এই নতুন ধরণ দেখে অবাক লাগছে ভাই।

বাবা ও ছেলে চুপ থাকে।

ছেলেটির নাম বাগান। ফুলের মতোই সে সুন্দর। বাঁ চোখের নিচে
কাটা দাগ। তাকে আরো সুন্দর করেছে।
সে প্রতিদিন ব্যাংকের মাঠে খেলা করে আরো বন্ধুদের সঙ্গে। কখনো ক্রিকেট। কখনো ফুটবল। কখনো শুধুই দৌড়ঝাঁপ। এই মাঠেই কিছুটা হাওয়া বয়। চার পাশেই তো ঘর বাড়ি। বাজার হাট। দোকানপাট। সব সময় থিকথিক করছে ভিড়।
দম বন্ধ হয়ে আসে। এখন আবার
স্কুল বন্ধ। রায় দেড় বছর হয়ে গেল স্কুল বন্ধ হয়ে আছে। চলছে
লকডাউন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এই বাজার হাট ছেড়ে আর কোন্ মাঠে যাবে খেলাধুলো করতে? এই একটাই তো মাঠ। ছোট্ট মাঠ। ছেলেরা
দুহাত খুলে দিয়ে দৌড়োয়। নিজেদের মধ্যে মারপিট করে।

সে এক অনাবিল আনন্দ।


হঠাৎ করে কোনো কোনোদিন
প্রজাপতি এসে ফড়িং এসে ছেলেদের সঙ্গে খেলা করে। রঙ ছড়ায়।

সেই উদার মাঠ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেল। কোনো প্রোমোটার সমস্তটাই কিনে নিয়েছে। শপিং মল হবে।
তার আগে কাজ শুরুর আগে, মাঠের চারদিক বন্ধ করে দেওয়া হলো। কেউ যেন ঢুকতে না পারে।

ছেলেরা চাওয়া চায়ি করে।
কোথায় যাবে তারা? আর তো কোনো মাঠ নেই।

মাঠ নেই।

বাগানের মত অনেকেই দুঃখ কষ্ট চেপে বাড়িতে বন্দি হতে থাকে।

বাগান একদিন তাদের গলিতে
ক্রিকেট খেলতে গিয়েছিল। কলোনির লোকজনের বাধা পেয়ে
সে আশাও ছাড়তে হয়েছে তাকে।

বাগানের বাবা ছেলের যন্ত্রণা অনুভব করে এই রকম একটি প্রতিবাদে শহরের অলিতে গলিত
রাস্তায় রাস্তায় হাঁক দিয়ে যায়: একটা মাঠ দেবে গো মাঠ-------?

সেই ব্যাংকের মাঠে ছেলেরা নেই বলে হাওয়া স্তব্ধ হয়ে গেছে। সেই ব্যাংকের মাঠে প্রজাপতি আর আসে না। ফড়িং আর আসে না।

কেবল ট্রাক ট্রাক ইঁট-বালি--সিমেন্ট। ছড়।পাথর।


বাগান একা একা দূর থেকে দেখে। আর বুঝতে পারে, তার চোখের কোনে কি একটা চিকচিক করছে।



-----১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
-----৩১----৫----২০২১
-----নির্মল হালদার



২.
বাবার হাত ধরে ছেলে শহরের গলি থেকে গলি হাঁক দিয়ে চলেছে: একটা মাঠ দেবে গো মাঠ
একটা মাঠ দেবে গো মাঠ--------

একবার বাবা হাঁক দিলে একবার
ছেলে হাঁক দিতে থাকে: একটা মাঠ দেবে গো মাঠ------
একটা মাঠ দেবে গো মাঠ------?

হাটবাজারের মানুষ, পথ চলতি মানুষ, উঁকিঝুঁকি মারা মানুষ
কৌতুহলের সঙ্গে শুনতে থাকে,
বাবা ও ছেলের হাঁক।

সবারই প্রশ্ন: মাঠ আবার কী?
মাঠের জন্য ফেরিওয়ালার মত
হাঁক দিলেই কি মাঠ পাওয়া যাবে?
এরা কি পাগল?

বাবা ও ছেলে একসঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
বসে যায় সবজি বাজারে। যেখানে
নিত্য কোলাহল। বেচাকেনা। কেনাবেচা।

বাবা ও ছেলে হাঁক দিতে থাকে :
একটা মাঠ দেবে গো মাঠ?
বাজারিরা ঘুরেফিরে বাবা ও ছেলেকে দেখে। নিজেদের মধ্যে কানাকানি করে: একইসঙ্গে বাপ বেটা পাগল হয়ে গেছে। কেউ কেউ পাগল মনে করে, পয়সা ছুঁড়ে দিয়ে যায়। অনেকেই হাসাহাসি করে। খুব কৌতুহলী যারা কাছে এসে জানতে চায়, তোমরা কি বলতে চাও, সঠিক আমাদের বলবে? তোমরা কোথা থেকে এসেছো? কত দূরে বাড়ি?

কেউ কেউ বলে ভিক্ষার এই নতুন ধরণ দেখে অবাক লাগছে ভাই।

বাবা ও ছেলে চুপ থাকে।

ছেলেটির নাম বাগান। ফুলের মতোই সে সুন্দর। বাঁ চোখের নিচে
কাটা দাগ। তাকে আরো সুন্দর করেছে।
সে প্রতিদিন ব্যাংকের মাঠে খেলা করে আরো বন্ধুদের সঙ্গে। কখনো ক্রিকেট। কখনো ফুটবল। কখনো শুধুই দৌড়ঝাঁপ। এই মাঠেই কিছুটা হাওয়া বয়। চার পাশেই তো ঘর বাড়ি। বাজার হাট। দোকানপাট। সব সময় থিকথিক করছে ভিড়।
দম বন্ধ হয়ে আসে। এখন আবার
স্কুল বন্ধ। প্রায় দেড় বছর হয়ে গেল স্কুল বন্ধ হয়ে আছে। চলছে
লকডাউন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এই বাজার হাট ছেড়ে আর কোন্ মাঠে যাবে খেলাধুলো করতে? এই একটাই তো মাঠ। ছোট্ট মাঠ। ছেলেরা
দুহাত খুলে দিয়ে দৌড়োয়। নিজেদের মধ্যে মারপিট করে।

সে এক অনাবিল আনন্দ।


হঠাৎ করে কোনো কোনোদিন
প্রজাপতি এসে ফড়িং এসে ছেলেদের সঙ্গে খেলা করে। রঙ ছড়ায়।

সেই উদার মাঠ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেল। কোনো প্রোমোটার সমস্তটাই কিনে নিয়েছে। শপিং মল হবে।
তার আগে কাজ শুরুর আগে, মাঠের চারদিক বন্ধ করে দেওয়া হলো। কেউ যেন ঢুকতে না পারে।

ছেলেরা চাওয়া চায়ি করে।
কোথায় যাবে তারা? আর তো কোনো মাঠ নেই।

মাঠ নেই।

বাগানের মত অনেকেই দুঃখ কষ্ট চেপে বাড়িতে বন্দি হতে থাকে।

বাগান একদিন তাদের গলিতে
ক্রিকেট খেলতে গিয়েছিল। কলোনির লোকজনের বাধা পেয়ে
সে আশাও ছাড়তে হয়েছে তাকে।

বাগানের বাবা ছেলের যন্ত্রণা অনুভব করে এই রকম একটি প্রতিবাদে শহরের অলিতে গলিত
রাস্তায় রাস্তায় হাঁক দিয়ে যায়: একটা মাঠ দেবে গো মাঠ-------?

সেই ব্যাংকের মাঠে ছেলেরা নেই বলে হাওয়া স্তব্ধ হয়ে গেছে। সেই ব্যাংকের মাঠে প্রজাপতি আর আসে না। ফড়িং আর আসে না।

কেবল ট্রাক ট্রাক ইঁট-বালি--সিমেন্ট। ছড়।পাথর।


বাগান একা একা দূর থেকে দেখে। আর বুঝতে পারে, তার চোখের কোনে কি একটা চিকচিক করছে।



-----১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
-----৩১----৫----২০২১
-----নির্মল হালদার







কবর বাড়ি// নির্মল হালদার

কবর বাড়ি//
----------------------

এখানে এসে দেখা যে হবেই ভাবতে পারেনি কিরাত। একটা কবরে বসে তার বন্ধু হরি বিড়ি টানছে।

----কিরে তুই এখানে?
----আমিতো এখানে রোজ আসি
----আমিও তো আসি। দেখতে পাই না তো।
---কি করে দেখবি, আমি তো মাঝেমধ্যে কবরের ভিতরে চলে যাই, যে শুয়ে আছে ভিতরে তার সঙ্গে দু-একটা কথা বলে আসি।
বিড়িও দিয়ে আসি।
---কি আবোল তাবোল বকছিস?
-----তোর কাছে আবোল-তাবোল মনে হতে পারে, ইয়ার্কি মনে হতে পারে, আমার কাছে নয়।
যা সত্যি তাই বললাম।
----কবরের ভিতরে যাওয়া যায়?
----যায়রে যায়। যাব বললেই যাওয়া যায়। এজন্যে মায়া টান থাকতে হয়। এজন্যে কবরের
দরজা জানতে হয়।
-----তুই কি দরজা জানিস?
আমাকে দেখাবি?
----না। সবাইকে দেখানো যাবে না।
যার কোন টান ভালোবাসা নেই, সে কি করে যেতে পারে! টান ভালোবাসা থাকলে, দরজা আপনা আপনি খুলে যায়।

কিরাত বিচলিত বোধ করে। সে চিন্তা করে, এ কি সম্ভব নাকি হরি
কল্পনাতে যায় কবরের ভিতরে? সে আর কোনো কথায় বলতে পারেনা। সেও হরির কাছে একটা বিড়ি চেয়ে ধরিয়ে ফেলে। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে হরির কাছে জানতে চায়-----------হ্যাঁরে
কবরের ভিতরে যে শুয়ে আছে সে তো মৃত ব্যক্তি। তোর সঙ্গে বিড়ি খায়?
-----খায় খায়
বিড়ি দিয়েও আসতে হয়। ভেতরে
তেষ্টা বেশি।
----জল তেষ্টা পায় না ওদের?
হরি বলে তাকে কোনদিনই জলের কথা বলেনি। কোনোদিন খাবার খুঁজলো না তার কাছে। কেবল
চারপাশের খবর শুনতে চায়। নতুন করে ভালোবাসার কথা বলতে চায়। বলে, খুব ভালবাসতে ইচ্ছে করছে রে------না কোনো মেয়েকে নয়, শিশুকে।
হরি নাকি হাসতে হাসতে বলেছিল একদিন, আমি তোমাকে কবরের মাটি থেকে পুতুল বানিয়ে দেবো। তুমি যত পারবে ভালবেসো।

মৃত ব্যক্তি হরির সঙ্গে উপরে উঠে আসতে চায়। দেখতে চায়, চারপাশ কেমন বদলে গেছে। এবং তাদের বাড়িটার কাছে গিয়ে
উঁকি দিয়ে আসবে একবার।
হরি মানা করে।

সন্ধের অন্ধকার পার হয়ে রাত্রির অন্ধকার আসছে। কবর বাড়ির অশথ গাছে ডেকে ওঠে রাতচরা
পাখি। কিরাত আকাশের দিকে মুখ তুলে হরিকে বলে, মেঘ আসছে রে--------।
-----আসুক না কি আর হবে
আমি কবরের ভিতরে চলে যাব।
একটুও ভিজবো না। বৃষ্টিকে থোড়াই কেয়ার করি।
-----তো ভাই কবরের দরজাটা
আমাকে দেখিয়ে দে না! আমি একটু ঘুরে আসবো।
-----না তা আমি পারবো না।
তুই যদি নিজে কোনোদিন দরজা খুঁজে পাস, সেদিন নিজেই যেতে পারবি। একা একাই যেতে পারবি।
আমাকে তো কেউ দরজা দেখিয়ে দেয় নি। আমি তো নিজেই খুঁজে পেয়েছি। তুইও হয়তো পাবি। এজন্যে একটা মন লাগে। সেই মন
এখন তোর নেই।
-----কিন্তু কবে খুঁজে পাবো দরজা?
------তা আমি কি করে বলবো।
------আচ্ছা আচ্ছা--------আচ্ছা
আজ আমার সামনেই কবরের ভিতরে যেতে পারবি? আমার সামনে আবার আসতে পারবি?
-----না আমি কারোর সামনেথেকে যাইনা। সব সময় একা গেছি। একা এসেছি।
এবার সন্দেহ হয় কিরাতের। হরি বোধহয় বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলছে। সে বসেছিল কবরের উপরে। উঠে পড়লো। ঘুরে ঘুরে
দেখতে লাগলো, অন্ধকারেই দুচোখ দিয়ে দেখতে লাগলো, যদি
কবরের দরজাটা দেখতে পায়।
যে কবরের উপরে হরি বসে আছে, তার পিছন দিকে একটা গর্ত। কিরাতের মনে হলো, এই বুঝি দরজার মুখ। সে গর্তের মধ্যে
পা ঠুকে ঠুকে হরি কে জিজ্ঞেস করে, হ্যাঁরে এই কি দরজা শুরু?

হরি হেসে ওঠে জোর।

মেঘ ডাকতে শুরু করে। দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি। বিদ্যুতের ঝলক। বিদ্যুতের আলোয় দেখা যায়
অশথ তলায় দাঁড়িয়ে আছে
এক যুবক। তার মাথায় ঝাঁকড়া চুল। পরনে জিন্স। খালি গা। সে একা একা হাসছে। নিঃশব্দ।

-----১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
-----৩০----৫----২০২১
-----নির্মল হালদার





কবিতা




কবিতা// নির্মল হালদার


৮৬.
প্রতিদিন নক্ষত্রের জন্ম

আমি যাই নক্ষত্রের দেশে

আমি চাইবো জন্মের কান্না
আমার কোলে রাখি,
আমার সন্তানের মতো,
আমারই স্নেহে।

প্রতিদিন নক্ষত্রের জন্ম।

প্রতিদিন কান্নার তাপ
আমাকে আলোকিত করে।


----১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮২
-----২৮----৫----২০২১



৮৭.
নুন কম পড়লেও
মানুষ কম পড়ে নাই
মানুষের খিদে-তেষ্টা কম পড়ে নাই

খিদে তেষ্টা কাটারির কোপ
যার গায়ে পড়ে
সেইতো চিৎকার করে

তুমি শোনো বা না শোনো
চিৎকার হচ্ছেই
তুমি শোনো বা না শোনো
চিৎকার উঠছেই উড়াকলের দিকে

হুড়মুড় করে চিবোবে সবাই
উড়াকলের আওয়াজ।


-----১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----২৯---৫---২০২১



৮৮.
আমার সকল ত্রুটির পরেও
আমার সঙ্গে দেখা করে চন্দ্র-সূর্য।
কি সহজ কি সাবলীল,
প্রতিদিন সৌহার্দ্য স্থাপন। প্রতিদিন সুন্দরতা।

আমি দেখতে পাই আতার অন্তর।

আমার কাদা মনে শাদা লাগে

আমি দেখতে পাই তারার গৌরব।


-----১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----৩০----৫---২০২১



৮৯.
সম্পর্ক আকাশ হলে সম্পর্ক নীল
সম্পর্ক গভীর।
সম্পর্ক সূর্য তারা হলে সম্পর্ক আলো অন্ধকার
সম্পর্ক দিন ও রাত্রি

সম্পর্ক সম্পূর্ণ করতেই নিসর্গের নিঃশ্বাস।



৯০.
দিনের শুরুতে সম্পর্কের সাতরঙ কিরণ ছড়ায়

আমিও সাত রঙের পিপাসায়
আমিও আম গাছ হই জাম গাছ হই
আমিও বট হই অশথ হই
আমিও সম্পর্কের সঙ্গে সম্পর্ক

আমিও চাল ফুটলে ফ্যান চাই

ধান কুটলে চাল।


----১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
-----৩১---৫---২০২১
----নির্মল হালদার





শুক্রবার, ২৮ মে, ২০২১

কবি নির্মল হালদারের বিভিন্ন সময়ের ছবি


































































টালোবাসা

টালোবাসা// নির্মল হালদার

দর্পণের খুব মন খারাপ।
বৃষ্টি শুরু হলেই তার মন খারাপ তীব্র হয়ে ওঠে। সে মনমরা হয়ে
শুয়ে থাকে কেবল।
একটু আগেই তার মা বিকেলের চা দিতে এসেছিল। ফিরিয়ে দিল সে। দুপুরেও ভাতে হাত দিয়েছিল মাত্র। মা বলছিল, দিপু কি হয়েছে তোর? শরীর খারাপ লাগছে?
সে না না করে। তার মা পাল্টা প্রশ্ন করে, তাহলে খাওয়া-দাওয়া করছিস না কেন? চা--টাও খেলি না যে-----?

দর্পণ কিছু না বলে, একটা খাতা টেনে নেয়। আঁকিবুকি করে। তারপর লিখে ফেলে কয়েকটা নাম-------দীঘি শর্বরী তুতুল
ছো অবিন। নামগুলো কেটেও ফেলে সে।
একটা আকাশ আঁকার চেষ্টা করে। কিন্তু কোনভাবেই ধরা দিচ্ছে না আকাশ। দর্পণ ঘরের জানলা খুলে আকাশ খোঁজে।

আজ আর কোথায় আকাশ! থৈ থৈ করছে মেঘ। কালো হয়ে আছে মেঘ। বইছে ঝোড়ো হাওয়া। বৃষ্টি চলছে।
দর্পণ জানলা থেকে হাত বাড়িয়ে
বৃষ্টি ধরার চেষ্টা করে। সঙ্গে সঙ্গে
তার আঁজলাতে এসে দাঁড়ায়, অচেনা এক মেয়ে। সে দর্পণের কাছে জানতে চায়, বলো আমাকে কি বলবে?
দর্পণ হতচকিত হয়ে বলে, না না
কিছু বলতে চাই না। কেবল গলা নামিয়ে জানতে চায়, তুমি কে?

মেয়েটি হাসে।

মেয়েটির হাসিতে দর্পণের ডান হাত কাঁপতে থাকে। তার মনে হয় মেয়েটি এবার হাত থেকে পড়ে যাবে। একদম মাটিতে।
তখন?

দর্পণের ভয় করে।

সে বলে, তুমি ঘরের ভেতরে চলে এসো-------। মেয়েটি আবার হেসে ওঠে। এবার দর্পণের বুক কাঁপতে থাকে। বোধহয় মেয়েটি বিপদ একটা করবেই।

তখন?

দর্পণ তার ডান হাতের আঙ্গুল দিয়ে মেয়েটির পা ছোঁয়ার চেষ্টা করে। আঙুল পৌঁছতে পারেনা।
সে বলে, তুমি যদি ঘরে না আসো
পড়ে যাবে। চলে এসো---------
দুজনে বৃষ্টির গল্প করবো। মেয়েটি বলে, বৃষ্টির গল্প নয়------সোঁদা
মাটির গল্প করতে চাই।
তুমি তো দোতলার ঘরে বসে কোনো রূপ রস গন্ধ কিছুই পারছ না------আমি সেই রূপ রস গন্ধ
তোমাকে দিতে চাই।
দর্পণ বলে, তার সঙ্গে আর কিছু?
মেয়েটি বলে, বলো কি চাইছো?

ভালোবাসা-------দর্পণের কাছ থেকে ভালবাসা শব্দটি শুনে মেয়েটি দুহাত বাড়িয়ে তার গলা ধরে। সে শিউরে ওঠে। মেয়েটি বলে, ভালোবাসা তো নেই----
টালোবাসা আছে-------তুমি কি নিতে চাও?

দর্পণ চুপচাপ থাকে।

তার মুখে বৃষ্টির ঝাপটা এসে লাগছে। হাতে জল। আর কিছু নেই। সে সম্বিৎ ফিরে হাতের জল
চোখে নেয়। দেখে, তার দু চোখে জল।
সে নিজের কাছে নিজে লজ্জিত হয়। সে বিড়বিড় করে, আমার চোখে জল কেন? চোখের জল কেন?
দর্পণ আরেকটা জানলা খুলে দেয়। দেখতে পায় বৃষ্টির অন্ধকারে মেয়েটি একা একা
হেঁটে চলেছে।
তার মনে হলো, নিচে গিয়ে মেয়েটিকে ঘরে নিয়ে আসা। কিন্তু তার অস্থির মন সেই কাজ থেকে তাকে বিরত করলো। কারণ,
কাউকে ডেকে এনে কারোর কাছে
আর ভালোবাসার কথা বলবে না।

ভালোবাসা বড় সংক্রামক।

ভালোবাসার বদলে টালোবাসা নিয়েই থাকতে চায় সে।

টালোবাসাই বা কি?

-----নির্মল হালদার
----২৬----৫---২০২১



কবিতা




কবিতা / নির্মল হালদার


৭১.
হঠাৎ একটা গিরগিটি কী করতে এখানে?

বৈশাখের কচি পাতায় কাঁপন লাগে

মানুষ ও কাঁপছে
ঘরে ফেরার রাস্তা আছে
অথচ ঘরে ফিরতে পারে না।

আমিই বা কার কাছে ফিরবো?
আন্তরিকতার কাছে ফিরতে ফিরতে
অন্তর যদি শুকিয়ে ওঠে?

উই ঢিবি কী আমাকে দেবে ঠাঁই?


৭২.
ইঁট পুড়ছে

ইঁটের পর ইঁট পুড়ছে

আমার পেটের আগুন নিয়ে জ্বলছে ইঁট ভাটা

আর কোথাও আগুন নেই
আমার পেটেই শুধু আগুন

আমার পেটের আগুন নিয়ে জ্বলছে ইঁট ভাটা

ইঁটের পর ইঁট সাজিয়ে একতল বহুতল

আমার শুধু ভাত নেই ছাত নেই।


----১লা জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----১৬----৫----২০২১


৭৩.
পাতার শিরা উপশিরা থেকে হাওয়া এসে
আমার শিরা উপশিরায়। আমি হাওয়ার ভিতরে
নৌকা বাইছি। আমি মাঝি না হয়েও
মাঝির ভূমিকায়--------
পান্তা ফুরাবার আগে
নুন সংগ্রহ করছি।

নুনের মতো অমূল্য আর তো কিছু নাই।



৭৪.
আড়ালে চলে গেছে ঢেঁকি।
ধান কুটতে চাল করতে ঢেঁকিতে আর পা পড়ে না।
সেই কঠিন ও কোমল পায়ের অপেক্ষা করছি।
যদি পা গুলি দেখতে পাই, যদি
পায়ে লেগে থাকে মাটি-------

আমি প্রণতি করবো।

আদ্যিকালের পায়ে ধরা আছে
রাস্তার পর রাস্তা

আমার ঘরে ফেরার রাস্তা।


-----২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
-----১৭----৫----২০২১


৭৫.
প্রকৃতি থেকে ছিটকে এসে
এইতো পাঁকে পড়েছি।
কি পাঁক কি পাঁক,পা ঢুকে পড়েছে

অন্ধকারে।

এই অন্ধকার আমারই, আমারই নির্মাণ

আমারই প্রয়াসে রচিত
আমার ধ্বংস
আমি যে কোথায় নিয়ে যাবো

কতদূর?


----৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
-----১৮---৫---২০২১

৭৬.
তৃষ্ণা কি তৃষ্ণা কোথায় থাকে
তরমুজের কাছে দাঁড়ালেই, তরমুজের কালো বীজ
আমাকে বলবে।

জমিতে গড়াগড়ি যায় অসংখ্য তরমুজ
চলো যাই-------

অনেকতো বেড়ানো হলো জনারণ্যে, নির্জনতায়
এবার না হয় তরমুজের কাছে

তরমুজের জলে।


----৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----১৮---৫----২০২১


৭৭.
মাটির কি দোষ
মাটির গভীরে গেল না? দাঁড়িয়ে আছে ধূলায়
ছোট্ট একটি বীজ

আমি কী বীজের ভিতরে যাবো?

আমি তো জলের ভিতরে গেছি মূল খুঁজতে

আমি তো খুঁজে পেয়েছি জলের মুখশ্রী।


-----৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----১৯---৫---২০২১



৭৮.
নদীর মূল কেটে দিয়ে আমাকে বলছো,
জল খাও।
গাছের মূল কেটে দিয়ে আমাকে বলছো,
ফল খাও।

আমার খিদে তেষ্টা তুমি চিনলে না।

তুমি চিনলে না আমাকেও
আমি হাততালি দিতে দিতে হাতের ঘর্ষনে
আগুন জ্বালতে জানি

তোমাকে পোড়াবো।



-----৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
-----২১----৫----২০২১


৭৯.
পানকৌড়ি ডুবছে উঠছে
ছায়া ফেলছে পানা ফুলের সবুজ
হাওয়া এলে দুলে উঠছে জল
এপার ওপার মেঘ ভাসে।

লাশ ভাসছে নদীতে।

কার নদী? কার লাশ?
মৃতদেহ একবারও বলছে না একটি ও ঠিকানা
বেহুলা নেই

লজ্জাতে মুখ লুকায় আমার আকাশ।


----৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----২২----৫----২০২১



৮০.
হাওয়া, আমাকে জাগাও

যেভাবে জেগে আছে রাস্তা
যেভাবে জেগে আছে বৃক্ষ লতাপাতা
যেভাবে জেগে আছে পথিকের দিন ও রাত্রি
আমাকে জাগাও।

আমারই দোষে আমি সঞ্চয় করি ধন সম্পদ।
ভুলে যাই, আমের বোঁটায় থিকথিক করছে জীবন

মৌমাছির মন।


-----৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----২৩---৫----২০২১



৮১.
থরে থরে মেঘ
আকাশের মত থালায়
আমি বজ্র--বিদ্যুৎ মাখামাখি করে দু'মুঠো সাজাই

ধুলোমাটি সাজিয়েছি।

ডাল-ভাত সাজিয়েছি। পংক্তি ভোজনে
এসেছে সবাই। সবারই এক রা:
খাই খাই

খাই খাই

আমি খিদের নিশান ওড়াই।


----১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----২৫----৫---২০২১



৮২.
থরে থরে মেঘ
আকাশের মত থালায়
আমি বজ্র--বিদ্যুৎ মাখামাখি করে দু'মুঠো সাজাই

ধুলোমাটি সাজিয়েছি।

ডাল-ভাত সাজিয়েছি। পংক্তি ভোজনে
এসেছে সবাই। সবারই এক রা:
খাই খাই

খাই খাই

আমি খিদের নিশান ওড়াই।


----১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----২৫----৫---২০২১



৮৩.
হালের গরু নেই

ট্রাক্টর ভাড়া ঘন্টায় ন'শ টাকা

অফলা জমিতে কে নামবে?
সূর্য তো নেমেই আছে, মাটিও ফাটছে খুব

মেঘ আসছে

বলরামের লাঙ্গল কোথায়?

-----১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
-----২৬---৫---২০২১



৮৪.
পাখি এসে দাঁড়াতেই মাটির তাপ কোমল হয়ে ওঠে।

পাখির ডানার ছোঁয়াতে আকাশও কোমল

আমিও আকাশবিহারী
মেঘের কোমলতায় বৃষ্টির উষ্ণতা পেয়েছি

বৃষ্টি আর কিছুই না মাটির জাতক।


----১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----২৬----৫----২০২১



৮৫.
নদী দেখলে হবে না
মাথায় বেঁধে আগলাতে হবে।
পাহাড় দেখলে হবে না
হাতের তালুতে আগলাতে হবে।

যেভাবে চুরি হয়ে যাচ্ছে নদী
শুধু পড়ে থাকবে হাড়ের গুঁড়ো।
যেভাবে চুরি হয়ে যাচ্ছে পাহাড়
শুধু পড়ে থাকবে ধুলো।

নদী আমার শিরা উপশিরা।

পাহাড় তো পাহারাদার

মনুষ্যত্বের।


-----১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----২৭----৫----২০২১
-----নির্মল হালদার





সোমবার, ১৭ মে, ২০২১

লকডাউন / নির্মল হালদার

লকডাউন// এক

সুবোধ বাঁধ ধারে যেতে ভয় পাচ্ছে। যদি পুলিশ ধরে।
যে গাঁয়ে কোনো কালেই পুলিশ দেখা যেত না, সেখানে এখন
পুলিশ এসে ঘোষণা করে যাচ্ছে,
বাড়ির বাইরে কেউ ঘোরাফেরা করবেন না। অন্যথায় জরিমানা হতে পারে।

বাঁধতো যেতেই হবে।

সকাল সন্ধ্যা দুবার। তাদের তো আর পায়খানা নেই। এখন পায়খানা করতে বসলে, পুলিশ যদি ধরে? এই সব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে সুবোধ বাঁধের দিকে হাঁটতে থাকে।

নতুন করে এসেছে, করোনা ভাইরাস।ই বার ত গাঁয়ে গাঁয়ে
নিউমোনিয়া। টাইফয়েড। ইনফ্লুয়েঞ্জা। একদম গেবে গেছে।
হেলথ সেন্টারে ডাক্তার নেই। নার্স নেই। এমন কি ওষুধ পর্যন্ত নেই।

বড় বিপদে পড়েছে গাঁয়ের মানুষ।

শহরেও নাকি ডাক্তার পাওয়া যাচ্ছে না। কি করবে সুবোধরা?
১৫ দিনের লকডাউন। কামকাজ বন্ধ হয়ে গেছে। ঘরে যেটুকু চাল আছে, সেদ্ধ করে দুবেলা। কালকে শেষ হয়ে গেছে আলু। আজ অনিলের ঘর থেকে ভেন্ডি এসেছিল। তাই ভাতের সঙ্গে সেদ্ধ করে খাওয়া হয়েছে।

কাল যদি নুনের পয়সা না থাকে?

লকডাউন যদি বাড়ে ধুলা মাটি খেয়ে থাকতে হবে। দিন মজুরদের কথা কে আর চিন্তা করে! ভোটের সময় বাবুরা সব বড় বড় কথা বলে যায়। তারপর পাঁচ বছর আর দেখা নাই। 
ইবার মনে হয় ঘাসের বিচ খেতে হবে। ত মাঠে ত ঘাস নাই। জুটছে নাই গরু ছাগলের।

বাবুদের এত বড় বড় কথা, তারা কি পারে নাই, ভাইরাস আটকাতে?

সন্ধ্যা হয়ে আসছে, অস্বস্তি নিয়ে ভয় নিয়ে সুবোধ বাঁধে পৌঁছে দেখে, গাছে গাছে আঁধার। অস্পষ্ট হয়ে গেছে বাঁধের জল। পায়খানা করে জলের কাছে যাওয়া যাবে তো? সুবোধের ভয়ডর থেকে
আকাশে দেখা গেল একটি দুটি তারা।

-----১লা জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
-----১৬----৫-----২০২১
----নির্মল হালদার





লকডাউন// দুই

ছড়রা স্টেশনেই থাকে এই কয়েকটি পরিবার। ভিখারি পরিবার। প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে
একটি কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে
এদের বসবাস।

প্যাসেঞ্জারদের কাছেই এই ভিখারির দল হাত পাতে। আর
দু মুঠো চাল ভিক্ষা করতে ছড়রা 
গাঁয়ের ভিতর দিকে যয়।

কোনো কোনো ঘর থেকে 
চালের সঙ্গে আলুও দিয়ে থাকে।
ওরা খুশি হয়।
একদিন বলরাম ওর বউকে বলছিল ফিসফিস করে, হ্যাঁগো
নুন চাইলে হয় না? বউ মুখ ঝামটা দিয়ে বলরামের মুখ বন্ধ করে।

এই বলরামের পরিবার আরেক গাঁ থেকে ভাগ্য অন্বেষণে গ্রাম শহর ঘুরতে ঘুরতে এই ছড়রা স্টেশনেই শেষ অব্দি গেড়ে বসেছে।

মাথায় ছাদ নেই। শুধু গাছতলা।

শুধু বলরামের পরিবার নয়, আরো কয়েকটি পরিবার। ট্রেনের প্যাসেঞ্জারদের কাছ থেকে যেদিন যেটুকু পায়, চলে যায় এদের।

এরা সুখ জানে না। দুঃখ জানেনা।
এদের কাছে কেবল অভাব। এরা
ভোটাধিকারের বাইরে। তাই, রাজনৈতিক দলগুলি এদের কাছে এসে দাঁড়ায় না।

এদের কাছে স্বেচ্ছাসেবী দল নেই।

এদের মাথায় তেল নেই। পরনের জামা কাপড় ছেঁড়া। ময়লা।
এরা কখনো কখনো এক মালগাড়ির ড্রাইভার এর কাছ থেকে 50 টাকা করে পায়। সেই 
ড্রাইভার একবার এদের দিয়েছিল
কয়েকটা কম্বল।

বলরামের দল দুই হাত তুলে আশীর্বাদ করেছিল।

ভাগ্যিস কেউ বলেনি, ভিখারির আবার আশীর্বাদ!

এই ভিখারির দল হঠাৎ শুনলো,
নতুন করে শুনলো, ট্রেন আর আসবেনা। দু-একটা প্যাসেঞ্জার চললেও দাঁড়াবে না এই স্টেশনে।

কারণ, লকডাউন ঘোষণা হয়ে গেছে। ভিখারিদের মনে হলো,
তাদের মাথায় বাজ পড়লো আরেকবার। গতবছর লকডাউনের সময় কি কষ্টে যে কেটেছে। অনেকদিন তেঁতুল পাতা
চিবিয়ে দিন কাটিয়েছে। মনে আছে তাদের, ছড়রার এক ঘরে
সজনে পাতা খুঁজতে গিয়ে ছিল।
সেদ্ধ করে খাবে। কিন্তু ওদের শুনতে হয়েছিল, ধুর ধুর---------।
ওরা অপমানে , লজ্জায় ফিরে এসেছিল গাছ তলায়।

ভিখারিদের ও অপমান লাগে।
লাগেনা?

এবারে কি হবে? কারা দেবে পয়সা? ছড়রার মানুষ ভিক্ষা
দেবে তো?

ট্রেনের প্যাসেঞ্জারদের ওঠানামা থাকবে না। কি করবে বলরামরা?

দু-তিনদিন পার হয়ে যাওয়ার পর
বলরাম তার বউকে নিয়ে পুরুলিয়া শহরে এসেছে। বউয়ের কোলে ছোট্ট শিশু।

শিশু কি ভিখারী হয়?

কোলের শিশু কি ভিখারী হয়? 

শহরের এক গলিতে এসে দাঁড়িয়ে থাকা এক লোকের কাছে বলরামের বউ হাত পাতে। লোকটি সঙ্গে সঙ্গে বলে, এখন আবার কিসের ভিক্ষা---------
লকডাউন চলছে তো----------

----২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----১৭---৫---২০২১
-----নির্মল হালদার





লক ডাউন// তিন

সকাল ৭ টা থেকে ১০টা। বেলা ১০টা থেকে বিকেল ৫টা।কোনো কোনো দোকান বেলা ১২টা থেকে 
বেলা ৩টে।

খিদের তো নির্দিষ্ট কোন সময় নেই। হোটেল তো সব সময়ের জন্য বন্ধ। কি করবে রাস্তার গরু? রাস্তার কুকুর?

হোটেলের এঁঠো কচি শাল পাতা
চিবানোর সুযোগ নেই গরুদের।
শাল পাতা চেটে খাওয়ার সুযোগ নেই কুকুরদের।কি করবে এই সব
প্রাণীরা?


মন্দিরের চাতালে বসে এক বৃদ্ধা মহিলা মাস্ক সেলাই করছে।
ছুঁচ- সুতো পেলো কোথায়? মাস্ক
কেনার জন্য পয়সা নেই যখন, তখন ছুঁচ--সুতো পেলো কোথায়?
এই বৃদ্ধা মহিলার আহার জুটছে কী?

যেটুকু বাজার খোলা আছে এখন
শুধু ছুটোছুটি। গায়ে গা ধাক্কা। যেনবা বাজার হাট বন্ধ হয়ে গেলে, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে!

কিন্তু গরু কুকুর শুয়োর এরা খাবে কোথায়? এরা যাবে কোথায়?

একটি পঙ্গু লোক হাতে ভর দিয়ে চলেছে রাস্তায়। দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই। সারা শরীরে জীর্ণতা।
কোথাও কোথাও থেমে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও বাজারিদের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে।

এই মানুষটি থাকে কোথায়?
এই মানুষটির কেউ আছে?
ঘর আছে?
কে দেয় দু মুঠো?

মানুষটার হাতে একটি কালচে স্টিলের গ্লাস। মাঝেমাঝেই গ্লাস ঠুকে ঠুকে রাস্তায় চলেছে।

কারোর কাছে কিছু চাইছে না।

মানুষটি কি জানে, লকডাউন কাকে বলে?

দশটা বেজে পার হয়ে গেছে, মিষ্টির দোকানের শাটার খুলছে এবার। মানুষটি এক মিষ্টির দোকানের কাছে এসে, গ্লাস দেখিয়ে বলে, একটু জল দিবে বাবু জল?


দোকানের মালিক মুখ ঝামটা দিয়ে বলে, এই দোকান খুলছি,
তুই কে রে লাট সাহেব জল খুঁজতে চলে এলি? যা ভাগ------

ভাগ্-----------।

-----৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
-----২১---৫----২০২১
-----নির্মল হালদার





লকডাউন// চার

পুলিশ আসছে-----পুলিশ আসছে
একটা রব উঠলো বাজারে।
তড়িঘড়ি সবজি বিক্রেতারা গোছাতে শুরু করলো। পুলিশ এসে পড়লে, পিঠে পড়বে লাঠি।
যেটুকু সবজি আছে ফেলেও দেবে।
রাধি মাহাতান কমলা মুদি এসেছে দূর গাঁ থেকে। ভোরবেলা। জলদি জলদি বিক্রি করে ফিরে যাবে ঘরে।

৫ কিমি রাস্তা হেঁটে এসেছে। যাওয়ার সময় টোটো তে যাওয়া।
সেও ভাগ্য ভালো থাকলে পাওয়া যায়। বেলা নটার মধ্যে বেচাকেনা
হয়ে গেলে ভালো। কিন্তু আজ
খদ্দের নেই। কমলার দুটো কুমড়ার বিক্রি হয়েছে একটা। আরেকটা কাটা অবস্থায় পড়ে আছে। বিক্রি না হলে, ঘরে নিয়ে যাওয়া মানে ইঁদুরে খাবে। রাধি
বুড়ি নিয়ে এসেছিল এক কেজি বেগুন। যদি ১০টা টাকাও হয়। সেও পড়ে আছে২৫০র মত। আর আছে গাঁয়ের জমি থেকে তুলে নিয়ে আসা গিমা শাক। কেউ
ভুলেও দেখছে না।

রাধি বুড়ি ও কমলার চোখেমুখে
চিন্তার রেখা।

খদ্দেররা ছুটছে।

একজন তো একটা লাউ ------দু কেজির মত হবে------১০ টাকায়
এক খদ্দের কে দিয়ে দিলো। অথবা বলা যায়, দিয়ে দিতে বাধ্য হলো।

পুলিশ এলেই সব লুটপাট হয়ে যাবে। 

এক জেলেনি ১কে জি মাছ অর্ধেক দামে বিক্রি করে ঝুড়ি মাথায় ঘরের দিকে। সে মনে মনে
হায় হায় করছে। মনে মনে বলছে,
ই লকডাউন কবকে শেষ হবেক?
কবকে? কম দামে বিনা লাভে ই ভাবে বিকলে পুঁজি পাটা শেষাবেক।

পুলিশ পুলিশ

রব উঠছে আবার।

দৌড়োদৌড়ি শুরু হয়ে গেল। দোকানের ঝাঁপ বন্ধ হতে থাকলো। চা-ওয়ালা কোনভাবে
সমস্ত গুটিয়ে দৌড়াচ্ছে।
পুলিশ এসে পড়লে কোনো কিছুই আস্ত থাকবে না।

মুখে মাস্ক হাতে বাজারের ব্যাগ
একটা লোক এ সময় এসে বলে,
পালা পালা------পুলিশ চলে এসেছে।

কে যে বললো মুখে মাস্ক থাকার জন্য কাউকেই চেনা যাচ্ছে না।

রাস্তায় শুয়ে থাকা গাই গরু এবং কুকুর নির্বিকার। তাদের ছুঁতে পাচ্ছে না কোনো ভাইরাস। যে ভাইরাসের কারণে আইনকানুন।


খিদে কী আইন-কানুন মানবে?
নাকি মানা যায়?

তেলেভাজার দোকানে এক খদ্দের দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চপে কামড় দেয়। তখনই পুলিশ এসে
তার পিছনে মৃদু আঘাত করে। লাঠিতে। বলে----বাড়িতে গিয়ে খেতে পারিস না? দোকানিকে বলে, উনানে কী জল ঢালবো?
 কটা বাজছে দেখেছো?

পুলিশকে দেখে মুহুর্তের মধ্যে বাজার ফাঁকা। কমলা ও রাধি বুড়ি ঝুড়িতে সাজাচ্ছে বাকি সবজি। পুলিশ এসে রাধি বুড়ির
গিমা শাক যেটুকু ছিল লাঠিতে উঠিয়ে রাস্তাতে ফেলে দেয়।

বুড়ির বুক কাঁপতে থাকে।

ভোরের আঁধার থাকতে-থাকতে
তুলেছিল শাক। যদি কটা পয়সা হয়, ঘরের কাম কাজে লাগবে।
সেও গেল।
সে কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে বলে, হ্যাঁ বাবারা ই কটা শাগ
ফেলে দিয়ে কি লাভ হলো তোদের?

-----১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
----২৫---৫---২০২১
----নির্মল হালদার




রবিবার, ১৬ মে, ২০২১

কবিতা






৬৬.
পাথর যদি তার দিকে ছুটে যায়
আমি বলবো,এই আমার দেশ।
পাথর যদি আমার দিকে ছুটে আসে
আমি বলবো, এই আমার দেশ

কে কার দিকে থাকবে আর

নদীও চুরি হয়ে যায়
পাহাড় ও পাথর হয়ে যায়
কে কার সঙ্গে থাকবো আর
কে কার উপশম

ধ্বসে  পড়ছে বৃক্ষ চূড়ার আলো।



৬৭.
আমারই অন্তরে তুমি আমার অন্তর
একইসঙ্গে একই রঙে
আমরা দুজন।

তুমি যা দেখাও আমি দেখি
আমি যা দেখাই তুমি তাই দেখো
আমরা অখন্ড

আকাশের মত

আলো-আঁধারে সম্পৃক্ত

আমরা একই সঙ্গে একটি হৃদয়

মাটির বাঁশি বাজাই।


------২৬ বৈশাখ ১৪২৮
-----১০----৫-----২০২১


৬৮.
মাটি ও আকাশের সংযোগে যে তাপ ওঠে
তার নাম প্রেম। সেই প্রেমের আকাঙ্ক্ষায় সাহসী হয়ে
তোমাকে চাই।

তুমি অসীম হয়েও বাসা বাঁধো।
তোমার পূব নেই পশ্চিম নেই, চারদিকেই দুয়ার।
আমি কি দাঁড়াবো না? আমিও পাখির ঠোঁট থেকে
পড়ে যাওয়া একটি বীজ

জন্ম-জন্মান্তরের বীজ।



-----২৭ বৈশাখ ১৪২৮
----১১----৫----২০২১


৬৯.
স্পর্শ পাবার লোভে
আকাশ ঝুঁকে পড়েছে আমার কাঁধের কাছে।
কী আছে আমার? আছে তো শুধু
একটা দেশ
স্বপ্ন আর স্বপ্ন হীনতায়, আর্তনাদে

হাহাকারে, কান্নায়

তুলসী থানের মাটিও ক্ষয়ে যায়।

আমার অন্তর আমার দেশ
কী দেবে আর কি দিতে পারে!
আমার শরীর আমার দেশ
কী দেবে আর কী দিতে পারে!

আকাশকে ফিরিয়ে দিই আরেক আকাশে।


-----২৮ বৈশাখ ১৪২৮
----১২---৫---২০২১


৭০.
ধূপের আগুন খিদের আগুন

ছোট ছোট খিদের আগুন

তার রূপ রস গন্ধ পুড়তে পুড়তে
বড় খিদে জাগায়।
আমাকেও জাগায়, আমি চিৎকার করি:
খেতে দে
খেতে দে

আমি আলো খাই বাতাস খাই

আমি মাটি কামড়াই

আমি মাখি ধূপের ছাই।


----৩০ বৈশাখ ১৪২৮
-----১৪----৫----২০২১
-----নির্মল হালদার






ছবি : সন্দীপ কুমার

কবি নির্মল হালদারের বিভিন্ন সময়ের ছবি

পড়ুন "ঘর গেরস্থের শিল্প"

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ