বুধবার, ১৪ জুলাই, ২০২১

আঙিনা / নির্মল হালদার

আঙিনা / নির্মল হালদার




আঙিনা বাড়ি থেকে বেরোতেই দেখতে পায় ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে। সকালের দিকে কালী মন্দিরের কাছে ছেলেটা দাঁড়িয়ে ছিল। কত আর বয়স হবে। খুব জোর ১২/১৩। কিশোর বলা যায়। ছেলেটা ভিখিরি নয়, চেহারা দেখলে বোঝা যায়। চোখেমুখে উজ্জ্বলতাও আছে। শুধু কাপড় জামা মলিন।

ছেলেটা তাদের বাড়ির সামনে কেন? প্রশ্নটা মনে আসতেই, আঙিনা ছেলেটাকে কাছে ডাকে। জিজ্ঞেস করে------কি নাম তোর? বাড়ি কোথায়? ছেলেটা চুপচাপ থাকে। আঙিনা আবার জানতে চায় ------ তোর নামটা বল? কোথায় থাকিস? প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ছেলেটা বলে-------আমার খিদে পেয়েছে।

আঙিনা এবার কি করবে কোথায় নিয়ে যাবে ? সে বেশি কিছু চিন্তাভাবনা না করে একটা মিষ্টির দোকানে ছেলেটাকে নিয়ে যায়। বলে------কি খাবি বল? যা খুশি খেতে পারিস। ছেলেটা বলে----- আমি মিষ্টি খাবো না। তাহলে কি খাবি? আমি ভাত খাবো, ভাত।


বিকেল হয়ে আসছে। হোটলে কি ভাত পাওয়া যাবে?
আঙিনা ছেলেটার হাত ধরে বলে ----- চল্ দেখি ভাত পাবো কিনা।

না ভাত নেই। আঙিনা এবার ছেলেটাকে বলে----রুটি খেতে তোর অসুবিধে হবে? ছেলেটা ঘাড় হেলিয়ে হ্যাঁ করে। আঙিনা সমস্যায় পড়লো। বাড়িতে গিয়ে দুটি ভাত ফুটিয়ে দিলেই হয়। এই কাজটা করতে হলে, আজ আর টিউশনি হবে না।

আঙিনার রোজগার বলতে টিউশনির টাকা। তার বাবা যেটুকু পেনশন পেয়ে থাকেন, সংসার চলে না। ভাই বেকার। মা অসুস্থ।

না হোক টিউশন। ছেলেটাকে আজ ভাত খাওয়াতেই হবে। আঙিনার মাথায় চেপে গেছে জেদ। আঙিনা বলে-----আচ্ছা চল তবে, আমাদের বাড়িতেই তোকে ভাত খাওয়াবো। তার আগে তোকে বলতে হবে তোর নাম? কোথায় থাকিস? পড়াশোনা করিস?

ছেলেটা কিছুই বলে না। ছেলেটার মনে পড়ে শুধু, তার মা তাকে ছেড়ে চলে গেছে। অন্য এক লোকের সঙ্গে। মা চলে যাওয়ার পর বাবাও চলে গেছে অন্য এক মহিলাকে নিয়ে। সে স্কুলেও যেতো। মা বাবা চলে যাওয়ার পর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। তাদের ঝুপড়ি ঘরে অন্য একটা পরিবার ঢুকে পড়েছে। তারা বলছিল তাকে, ভিক্ষা করতে।

ছেলেটা হাত পাততেই পারে না। মা বাবা চলে যাওয়ার পর ছেলেটা প্রায় বোবা হয়ে গেছে।

খাবারের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে, মিষ্টির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে, ছেলেটাকে ভিখারি ভেবে, কেউ কেউ তার হাতে খাবার দিয়ে যায়। আজ কি জানি কেন, ছেলেটা আঙিনাকে দেখে মনে করেছে , এই মাসিটার কাছে ভাত পাবেই পাবে। তাই সে কালী মন্দির থেকে অনুসরণ করে দেখে গেছে আঙিনাদের বাড়ি।

আঙিনা ভাতের সঙ্গে আলু সেদ্ধ করে দিয়েছিল। ছেলেটা তৃপ্তির সঙ্গে খেয়ে ঘুমিয়ে গেছে। খাওয়ার আগে আঙিনা তাকে স্নান করতে বলেছিল। ছেলেটাও লক্ষ্মী ছেলের মত স্নান করেছে। আঙিনা চাইছিল, পরিষ্কার কাপড় জামা পরাতে। কিন্তু পাবে কোথায়? আরেকটা চিন্তা মাথায় এসেছে তার, ছেলেটা ঘুম থেকে উঠে কোথায় যাবে? কিছুই যে বলছে না।


সন্ধে  হয়ে গেছে। ছেলেটা ঘুমোচ্ছে এখনো। তার মুখের দিকে চেয়ে আঙিনার মনে মায়া জাগলো। সে কি করে বলবে ----- তুই ভাত চাইছিলি, ভাত খাইয়েছি ------এবার চলে যা তুই। কি করে বলবে?

আঙিনা জানলাটা খুলে দেয়। অন্ধকারেও পাহাড়টা যেন তাকে বলছে ------ ভয় করিসনে ------ তোর সঙ্গে আমি আছি।

ছেলেটা ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে------মা মা আমাকে মেরো না। আমি ইস্কুল যাবো ঠিক। দেখবে, আমি এবার পাশ করবো।

আঙিনা ছেলেটার কণ্ঠস্বর পেয়েই, বিছানার কাছে এসে তাকে ডেকে ওঠায়। জানতে চায় কি হলো ? ছেলেটা ঘুম চোখে উঠে আঙিনাকে জড়িয়ে বলে -----
আমাকে তাড়িয়ে দিও না।

------২৯আষাঢ়১৪২৮
------১৪---৭----২০২১
-----নির্মল হালদার











মঙ্গলবার, ১৩ জুলাই, ২০২১

সম্পর্ক / নির্মল হালদার

সম্পর্ক / নির্মল হালদার




কাঠবিড়ালিটা এসেই চলে গেল।

কাছাকাছি কোনো গাছ নেই যে গাছে উঠবে। কেবল ছাদের এই দেয়াল থেকে ওই দেয়াল অথবা ছাদের মেঝেতে খুঁজে বেড়াচ্ছে কোনো খাদ্য। আমার মনে হলো, মুড়ি দিলে এখুনি খাবে। আমি সাত-তাড়াতাড়ি দু'চার মুঠো মুড়ি ছড়িয়ে দিলাম ছাদে। সে দেখেই চলে গেল অন্যদিকে। পড়ে রইলো মুড়ি।

আমার ঘরে একটিও ফল নেই। কোনো ফলের সঙ্গে আমার ভাব ভালোবাসা নেই। তবে আম জাম কে আমি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। পছন্দ করে পেয়ারা। কিন্তু
কোনো ফল আমি খাই না।

আমার মনে হলো, কাঠবিড়ালিকে ভাতের নিমন্ত্রণ করলে ভালো লাগতো আমার। একসঙ্গে খেতে বসে গল্প করা যেতো। কাঠবিড়ালি ভাত না খেলে, তাকে
দুধ --মুড়ি দিতাম।

এখন মনে হচ্ছে, কাঠবিড়ালির ঘর আমার চেনা উচিত ছিল। তাহলে যে কোনোদিন গিয়ে তাকে নিমন্ত্রণ করা যায়। ঘরটা কোথায়? কত দূরে?

আজ বৃষ্টির পরে রোদ উঠেছে। মেঘমুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ায় পাখিরা। হাঁস কি আছে ওদের সঙ্গে? বক?

একদিন এক বকের কাছে মাছের গল্প শুনছিলাম। সে বলছিল------পুঁটি মাছ পেয়েছিল একদিন। নদী থেকে। ঠোঁট থেকে ফেলে দিতে হয়েছিল। কেননা, পুঁটি খুব ছোট। এইতো সবে সে জন্মেছে। আরো কিছুদিন সাঁতার কাটুক, তারপর না হয় বকের খাদ্য হবে।

বক ছেড়ে দিয়েছিল। পুঁটিও মনের আনন্দে অন্যান্য মাছের সঙ্গে খেলে বেড়াচ্ছে। হাঁসের কাছেও গল্প শুনেছি। সে বলেছিল------জলের পোকারা খুব চালাক হয়ে থাকে। সহজে ধরা দিতে চায় না। রোজ রোজ পাওয়া যায় না গেঁড়ি--গুগলি। অনেকদিন তাই হাঁসেদের পেট ভরে না।

কে আর হাঁসকে দুধ দিচ্ছে। জল মেশানো দুধও দিচ্ছে না।

আমাকেই বা কে দিচ্ছে চিঁড়ে ভাজা? 

কাঠবিড়ালিটা এসেছে আবার। একবার আমার দিকে চেয়ে চলে গেল। হয়তো আমার উপস্থিতির জন্য মুড়ি খেতে সাহস করছে না।

আমি নিচে নেমে এলাম। একটু পরে গিয়ে দেখি, মুড়ি নেই।

এবার থেকে সকালে ও দুপুরে কাঠবিড়ালির জন্য ছাদে মুড়ি রেখে আসবো। সবাইকে বাঁচতে হবে। ভালো থাকতে হবে।

এই পৃথিবী একা কারোর জন্য নয়। এই পৃথিবী সকলের। সকলেই নিজের মত করে বাঁচবে। কারো সঙ্গে কারোর কোনো বিবাদ নেই। বিবাদ থাকবে না। 

একটি তারা  আকাশ থেকে নেমে পাখির কপালে টিপ হতে পারে। একটি তারা আকাশ থেকে নেমে কারোর বুকে আলো হতে পারে। অথবা গলার হারে লকেট।


ভুল করে নয় যেকোনো দিন একটি হরিণ আমার ঘরে এসে জানতে চাইবে, আমি কেমন আছি। ভুল করে নয় যেকোনো দিন একটি পেঁচা দিনের বেলাতেই
আমার কাছে এসে জানতে চাইবে, আমি কেমন আছি।

কুশল জানার জন্য দিনরাত্রি বলে কিছু নেই। কুকুরের দল আমার বন্ধু দল। কি দিন কি রাত আমার দুয়ারে থাকে।

সকাল আর দুপুরে মুড়ি দিতে দিতে কাঠবিড়ালির সঙ্গে আমার সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। সে নিয়মিত আসে। আমার সঙ্গে বেশিরভাগ দিন দেখা হয় না। তবে দেখেছি তার জন্য রেখে দেওয়া মুড়ি খেয়ে গেছে সে।

একদিন মুড়ির সঙ্গে বিস্কুট ভেঙ্গে দিয়েছিলাম। স্বাদ পাল্টাবে।

দু'দিন ধরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে। ছাদে জমে যাচ্ছে জল। এই জল ফেলা যাবে না। কোনো পাত্রে তুলে রাখতে হবে। তাই, ইঁট-পাথর মাটি দিয়ে জলকে আটকাবার চেষ্টা করছি। হঠাৎ দেখি, কাঠবিড়ালি নিয়ে আসছে ছোট ছোট পাথর। আমাকে সহযোগিতা করার জন্য।

আর কোনো জড়তা নেই তার। সে দিব্যি আমার হাতে তুলে দিচ্ছে ইঁটের টুকরো। মাটি। বাঁধতে পারবো জল। কাজে লাগাতে পারবো জল।

বাঁধতে পেরেছি কাঠবিড়ালির সঙ্গে আমার সম্পর্ক।

-----২৮আষাঢ়১৪২৮
-----১৩----৭---২০২১
-----নির্মল হালদার






সোমবার, ১২ জুলাই, ২০২১

হাতের লেখা / নির্মল হালদার

হাতের লেখা / নির্মল হালদার






বৃষ্টির সুবাস আসছে। সঙ্গে আছে কারোর গায়ের গন্ধ।গন্ধটা চেনা চেনা লাগছে। কার গায়ের গন্ধ? ইরার কি?

ইরা ছিল পাড়ার মেয়ে। কেবল বলতো-------আমাকে বৃষ্টি এনে দে------আমাকে বৃষ্টি এনে দে। আমার খুব গরম করছে। অনিকেত তাকে বলতো ,আমি তো এসে গেছি আর বৃষ্টির কি দরকার! তুই মনে কর তুই ভিজে
উঠছিস। মনে আছে অনিকেতের, সেদিন ছাদে উঠেছিল। শ্রাবনের দিন। রোদ্দুর ছিল খুব। সঙ্গে গরমের তীব্রতা। ইরা অনিকেতকে কাছে পেয়ে মুখে মুখ ঘষতে ঘষতে বললো------আমাকে বৃষ্টি এনে দে ----আমাকে বৃষ্টি এনে দে-----তারপর শুরু করলো কাঁদতে। এত কান্না এত চোখের জল বৃষ্টি এসে মিলে মিশে গেল। দুজনেই ভিজতে ভিজতে শুরু করলো গান -------- শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে --------

সেই গান শুনতে পেয়ে বৃষ্টি আর ধরে না। ইরার মাও চলে এসেছিলেন ছাদে। বলেছিলেন----- সম্পর্কটা তোরা কোথায় নিয়ে যাবি? দুজন দুজনকে বিশ্বাস করিস তো? একটা কথা শুনে রাখ----সম্পর্ক শক্ত হয়  বিশ্বাসের উপরে।

ইরা ও অনিকেত  মুখ নিচু করে ছিল। কিছুই বলতে পারেনি। কিছুক্ষণ পর তারা নেমে গেছলো নিচে।

দুজন একই পাড়ায় থাকে বলে, ঘন ঘন দেখা হয়। কেউ কাউকে একদিন না দেখে থাকতে পারে না।
অনিকেত কাছে এলেই, ইরা হাত বাড়িয়ে দেয়। বলে -----আমার হাতে কিছু একটা লেখ। একেক দিন অনিকেত কি লিখবে কিছুই খুঁজে পায় না। রোজ রোজ তো লেখা যায় না-----ভালোবাসি ভালোবাসি।

একদিন লিখেছিল------- ভালোবাসি ভালোবাসি---- ও আমার সর্বনাশী। ইরা ছদ্ম রাগ দেখিয়ে বলেছিলো ---কিরে আমি সর্বনাশী? তুই তাহলে আমার সর্বনাশা। 

তারপরেই দুজনের হাসি। যে হাসি থেকেও একটা গন্ধ আসে। মন কেমন করা গন্ধ। বিষণ্ণতা।


ইরা একদিন অনিকেতের হাতে লিখেছিল------ তুই বড় রঙিণ আমার। তুই বড় নবীন আমার। সেই নবীনতা খুব তাড়াতাড়ি  বিচ্ছেদে পরিণত হলো।বিয়ে হয়ে গেল ইরার। যেহেতু বেকার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবে না মেয়ের বাবা। অনিকেত তাই বলেছিল ------ হাতের লেখা সব মুছে গেছে। আমি বুঝতে পারছি, তোর বুকে কিছুই লিখে উঠতে পারিনি। আমার দুর্ভাগ্য।

অনিকেত নিজেই নিজের হাতে প্রতিদিন লেখে ----- দূরত্বই প্রেম। নৈকট্য নিরাশার। কিংবা,হে বিরহী ধুলাতে গড়াতে গড়াতে ধূলি হও। পথ খুঁজে পাবে। প্রেম খুঁজে পাবে।

নিজেই তারপর মুছে দেয়। কেউ কেউ হঠাৎ দেখতে পেলে বলে-----কিরে  হাতে উল্কি নাকি? কেউ কেউ তার হাত টেনে দেখতে চায়,কি লেখা আছে।

একবার লিখল সে------সুন্দরের সঙ্গে দেখা করতে নেই। সুন্দর বড় স্বার্থপর। ইদানিং সে গাছের কাছে দাঁড়িয়ে পাতায় পাতায় লেখে মনের কথা মনের রঙে। একটুও দাগ পড়ে না।

বিয়ের পর ইরার সঙ্গে একবার দেখা হয়েছিল। দুজন দুজনের সঙ্গে কথা বলেনি। অনিকেত ভেবেছিলো, ইরার হাত টেনে বলবে-----চল  এবার বৃষ্টি আনতে যাই। আমার খুব গরম করছে। কিন্তু বলেনি। একবার যে পর হয়ে যায় সে কি আর নতুন করে নতুন হয়ে আপন হতে পারে?

অনিকেত এই কাল রাতে হাতের শিরা কেটে রক্তে রক্তে দেওয়ালে লিখেছে------জীবন ও মরণের সীমানা ছাড়ায়ে/বন্ধু হে আমার/রয়েছো দাঁড়ায়ে------

আমার মনে হলো, আকাশের শিরা-উপশিরা থেকে টপ টপ করে রক্ত ঝরছে।

-----২৭ আষাঢ় ১৪২৮
-----রথযাত্রা
-----১২----৭----২০২১
-----নির্মল হালদার











শনিবার, ১০ জুলাই, ২০২১

কথা / নির্মল হালদার

কথা / নির্মল হালদার




আজ একটা চেয়ার কে সামনে নিয়ে এসে বললাম ----- তুমি চুপচাপ থাকো। আমি যা বলবো তুমি শুনবে শুধু।

কি বলবো বলো তো?

এখুনি বলবো,শাদা অপরাজিতা আমার ভালো লাগে না। লাল জবা ছাড়া হলুদ জবা আমার ভালো লাগে না। হলুদ পলাশ ভালো লাগেনা।

চেয়ারটা একটু নড়েচড়ে উঠলো। মনে হচ্ছে, বলতে চাইছে কিছু। সে যদি বলে-----আমার পছন্দ অপছন্দ নিয়ে কারোর কোনো যায় আসে না। তাহলে? তাহলে আর কি-----আমি আমার কথা বলে যাবো। শীতের গাঁদা ফুল এখন বারো মাস পাওয়া যায়। আমার ভালো লাগেনা। গাঁদা ছিল শীতের ফুল। তাকে যদি বৈশাখেও দেখতে পাই, আকর্ষণ বোধ করি না। তো কি হয়েছে? চেয়ারে বসে আমার বড়দা বলে।আরে দাদা হঠাৎ? আমিতো ডাকিনি। কখন এলো কোত্থেকে এলো? এই দাদাকে আমার ভয় করে। মাথা তুলে কথা বলতেই পারবো না। দাদা বলে ------যা বলবি আমাকে বল----চেয়ারকে বলতে বলতে তুই নিজে কাঠ হয়ে যাবি। আবেগটা থাকবে না। আরে বাবা, সামনে মানুষ না থাকলে, আবেগ থাকে? কথা আসবেই না। আমি না হয়, তোর কাছে জানতে চাইবো, আজ তুই কি খেয়েছিস? মাছ এসেছিল বাড়িতে? না আসেনি ---- আমি উত্তর দিই। তাহলে কি দিয়ে ভাত খেলি?

আমি এবার কিছু না বলে, চলে গেলাম নিচে। একতলায়। ফাঁকা ঘর। অন্ধকার। একটা কাঠের চৌকি পড়ে আছে শুধু। তাকেই বললাম, একটু শান্ত হয়ে শোনো আমি কি বলতে চাই। মাথার পাখা দুলে উঠলো। মনে হচ্ছে, আমার সব কথা সে শুনবে।

প্রথম কথা, অপরাজিতা নীল না হলে আমি গ্রহণ করতে অক্ষম। অপরাজিতার সঙ্গে শরতের নীল আকাশের একটা সম্পর্ক আছে। শাদা হলে সেই সম্পর্কটা খুঁজে পাই না।আর জবা রক্ত জবা না হলে, নিবেদন করবো কি? গাঁদা শীতের শিশিরে ভেজা না হলে, অনুভব কেমন করে করবো শীতের তীব্রতা?

ঘরের আলো জ্বলে উঠলো। বড়দা এসে ঢুকে পড়েছে নিচের তলায়। এখন কোনো কথা বলছে না। কথা বন্ধ হয়ে গেল আমার।

কি ব্যাপার? দাদা এখানেও কেন এলো? কি ব্যাপার? কথাই বা বলছে না কেন? আমি আরো বেশী ভয় পেয়ে বেরিয়ে গেলাম।

কোথায় যাবো? চিন্তা ভাবনা করতে করতে দাঁড়িয়ে আছি। সামনে এসে দাঁড়ালো ফুল্লরা। সে বলে---চলো যাই এই বর্ষাতে মাছ ধরবো।

ফুল্লরা কেন? সে তো কবেই হারিয়ে গেছে। নতুন করে সম্পর্ক স্থাপন, বিশ্বাস অর্জন আর কি হবে? সে অবশ্য পরে ভাবা যাবে। এখন তার সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে। তাকে বলতেই পারি, কলকে ফুলের রঙ নীল হলে আমরা কি আকর্ষণ বোধ করবো? অথবা জারুল লাল হলে কেমন লাগবে? পদ্ম ফুল কালো হলেও ভালো লাগবে না।

ফুল্লরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সে জেনে গেছে, মাছ ধরা কাজে আমার উৎসাহ নেই। সে অতনুকে বলতে পারে। অতনু টিকিট কেটে মাছ ধরতে যায়। সে প্রকৃত নেশাড়ু। আমার নেশা কথা বলা। অথচ কথা বলার লোক নেই। মনে হচ্ছে, ফুল্লরা আমার কোনো কথা শুনবে না। সে চলে গেল। আমি আবার উপর তলার ঘরে গেলাম। চেয়ারটা নেই, দেখে আমি অবাক। কোথায় গেল?

আমি এবার একটা টেবিল নিয়ে এলাম। তাকেও একই কথা, আমি যা বলবো তুমি শুনবে। কোনো প্রশ্ন চলবে না। টেবিলটাও নড়েচড়ে উঠলো। তা একটু নড়াচড়া করুক। আমার কথা হলো, মানুষ যদি বোবা হয়ে যায়? আমিও বোবা হয়ে যাবো? হাঁফিয়ে উঠবো নিশ্চয়ই। কেননা, কথাই তো থাকে। কেবলমাত্র কথাই তো রয়ে যায়। মানুষকে তো ভাব প্রকাশ করতেই হবে। গান করতেই হবে। বোবা হলে কালা হয়ে যাবে। তখন শুনতে পাবে না মেঘের ডাক। মেঘের ডাক যে খুবই মধুর।

নূপুরের ধ্বনিও খুবই মধুর। সেই সমস্ত মধুর ডাক শুনতে মানুষকে বোবা হলে চলবে না।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে প্রতিবাদও করতে হয়। কণ্ঠস্বর উঁচু করতে হয়। মানুষকে বোবা হলে চলবে না।

দাদা আবার চলে এসেছে উপরে। কিরে তোর কথা শেষ হলো? আমি এবার জড়োসড়ো । কি বলবো কি বলবো না, ভেবে অস্থির।

দেখলাম, টেবিলটা আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছে ঘরের বাইরে। আমার কথা ফুরোয়নি। দাদা বসে পড়েছে
ঘরের মেঝেতে। আমার কাছে জানতে চায়-----আমি উপস্থিত কি করছি? চাকরি-বাকরি হলো না হবে? বিয়ে করবো কি করবো না? সবই সাংসারিক কথা। আমি শুনে গেলাম। একটারও উত্তর না দিয়ে আমি ছাদে। দাদা পিছন থেকে ডাকছে-----গোরা গোরা শুনে যা আজ রাত্রে আসছি আবার। তুই ঘরে থাকবি।

আমি ছাদে পায়চারি করতে করতে একটা ঘুড়িকে ধরেছি। সে ভোকাট্টা হয়ে গেছে। আমি এবার ঘুড়ির সঙ্গে উড়বো।

উড়ছি। কার হাতে লাটাই আছে জানি না। উড়ছি।উড়তে উড়তে ঢুকে পড়েছি নিচের তলার ঘরে। দেখছি,চৌকিতে শুয়ে আছে দাদা।

কি ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারছিনা। আমাকে ছাড়বে না আজ? আমি যে দাদার সঙ্গে কোনো কথা বলতে পারবোনা।

আমার যে কোনো কথা নেই দাদার সঙ্গে। দাদা তিন বছর হলো আমাকে ছেড়ে চলে গেছে ।

----২৫ আষাঢ় ১৪২৮
----১০----৭---২০২১
-----নির্মল হালদার







শুক্রবার, ৯ জুলাই, ২০২১

মুখোশ / নির্মল হালদার

মুখোশ / নির্মল হালদার




চড়িদা মুখোশের গ্রাম হিসেবে পরিচিত। পর্যটকরা বাঘমুন্ডি অযোধ্যা ঘুরতে এসে চড়িদা ঘুরে যায়‌ একবার। ছো--নাচের  মুখোশ  ঘর সাজানোর জন্য কিনেও নিয়ে যায়।
  
রোরো ফটোগ্রাফার। সে সারাবছরই প্রায় ছবি তুলে বেড়ায়।  ইতিমধ্যে সে অনেক পুরস্কার পেয়েছে। বিদেশেও তার ছবি সমাদৃত।

অযোধ্যা রোরোর প্রিয় জায়গা। সে মাঝেমধ্যেই ছবি তুলতে চলে আসে। এবার সঙ্গী হিসেবে নিয়ে এসেছে ডোডোকে। ডোডো ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসে।ফটোগ্রাফির কিছুই বোঝেনা। সে শুধু দেখে  পাহাড়ের দাঁড়িয়ে থাকা। ঝরনার নাচ। জঙ্গলের শোভা। মানুষের স্রোত।

রোরো খুঁজে বেড়ায় ছবির জন্য নতুন নতুন বিষয়। সে বলে, মুখোশতো  আছে অনেক। দুর্গার মুখোশ। লক্ষ্মী-সরস্বতীর মুখোশ। অসুরের মুখোশ। সিংহের মুখোশ। চড়িদা থেকে বিক্রি হয় দেদার। ছো---নাচের দলগুলি নিয়ে যায়।

আজ কিন্তু রোরো দেখছে, কোনো দোকানে কোনো  দুর্গার মুখোশ নেই। গণেশ কার্তিকের মুখোশ নেই। লক্ষ্মী-সরস্বতীর মুখোশ নেই। সিংহ ও অসুরের মুখোশ নেই। কেবলমাত্র মানুষের মুখোশ।

ছো---নাচের দল গুলি ফরমায়েশ করে গেছে। ইদানিং পুরাণের কদর নেই। তাই , সমাজ-সংসারের জটিলতা নিয়ে নাচের দলগুলি  পালা তৈরি করেছে। রোরো ভাবছে, মানুষের মুখোশ তৈরি করার কী দরকার? মানুষ তো মুখোশ পরেই আছে। ডোডো চড়িদায় এসে একটা গনেশের মুখোশ কেনার জন্য ভেবেও কিনতে পাচ্ছেনা। কারণ,কোনো গণেশ কার্তিক নেই। সে বিরক্তির সঙ্গে বলে উঠলো-------ধ্যাৎ।এখানে  ফালতু এসেছি। মানুষের মুখোশ নিয়ে কি হবে।

সে একটা দোকানে গিয়ে বলে------ দাদা , আমি আমার মাথাটা নামিয়ে যাচ্ছি। এইটে আমার মুখ ও মুখোশ। আপনারা বিক্রি করে দেবেন। আমি আমার
মাথা ছাড়াই মুখ ছাড়াই বাড়ি ফিরে যাচ্ছি।

দোকানদার ডোডোর দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে।

-----২৪আষাঢ়১৪২৮
-----৯----৭----২০২১
----নির্মল হালদার




বৃহস্পতিবার, ৮ জুলাই, ২০২১

শুধু অন্ন বস্ত্র বাসস্থান নয় / নির্মল হালদার

শুধু অন্ন বস্ত্র বাসস্থান নয় / নির্মল হালদার




রু বলছিল-----বাইরে কেন বর্ষা হয়? বর্ষা হবে ভেতরে। ঘরের মধ্যে। একঘর বর্ষা হলে, ঘরের মলিনতা ধুয়ে যায়। ঘরের মধ্যে কত কালিঝুলি । কত ধুলো-ময়লা। ঘরের মধ্যে বর্ষা হোক। সব ভিজে যাক। সব মলিনতা ধুয়ে যাক। পরের দিন একঘর রোদ এসে শুকনো করে যাবে। একঘর বর্ষা হোক।

রেহানা বললো-----বাইরে বৃষ্টি না হলে চাষবাস হবে না। তুই বল, বাইরে বৃষ্টি হোক ঘরেও হোক। একবার বাইরে হলে, আরেকবার হবে ঘরে। রু বলে ----- তোর কথার যুক্তি আছে। কিন্তু প্রকৃতি কি আমাদের কথা শুনবে? রেহানা হাসতে হাসতে বলে----- তা অবশ্যই ঠিক। তারপরও একটা কথা, তোর স্বপ্নের কি হবে? রু বলে-----আমার স্বপ্ন তো অনেক। তুই দেখেছিস নিশ্চয়ই, হাঁস ও মুরগি অনেক জায়গায় অনেক সময় একই সঙ্গে খেলা করে। আশ্চর্যের বিষয়, মুরগি কিন্তু জলে সাঁতার কাটে না। যদি একই সঙ্গে সাঁতার কাটতো ? হাঁসের সঙ্গে? রেহানা বলে------তোর অলীক কল্পনা। আমি শুনতে শুনতে পাগল হয়ে যাব। কাল যদি বলিস, গাছ থেকে মেঘ পাড়বো? পরশু যদি বলিস, ধান ফুলে মালা গাঁথবো? রু তখন জানায়----- না না আমি ঘোড়ার ডিম চাইবো না। আমি চাইছি না, সাপের পাঁচ পা। আমি শুধু আপাতত একঘর বর্ষা চাইছি।চাইলে হবে না------রেহানা বলে। রেহানা বলে ----- স্বপ্ন বা কল্পনার একটা সীমা আছে। তুই রু সীমানা ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছিস। আর তাই, তোর স্বপ্নেরা তোকে রোগা করে। কেননা, তোর স্বপ্নের মধ্যে কল্পনার মধ্যে কোনো পুষ্টি নেই। হয়তো দেখবো একদিন, তোর হাড়--পাঁজর।

এখন রু সাইকেল নিয়ে চুনারডি যাচ্ছে। বোঙাবাড়ি রামকৃষ্ণ মিশন থেকে সামনে। যেতে যেতে দেখছে লাগানো হচ্ছে ধান। যারা ধান রুইছে তাদের মাথায় প্লাস্টিকের চাদর। রঙিন। তারা ধান রুইতে রুইতে কথা বলছে নিজেদের মধ্যে। পাশের জমিতে দাঁড়িয়ে আছে এক হাল গরু।

গরু এত নিরীহ কেন? এই প্রশ্ন রুয়ের মনে আসতেই সে সাইকেলটি দাঁড় করিয়ে গরু দুটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। শুধু দাঁড়ালো। একটিও কথা বললো না।
আবার সে সাইকেলের কাছে।

চুনারডি। প্রভাস মাহাতর বাড়ি। প্রভাস অনেকদিন ধরে যেতে বলছে। যাবো যাবো করে যাওয়া হয়ে উঠছিল না। আজ সময় হয়েছে।

আকাশে মেঘ। যেকোনো সময় বৃষ্টি আসবে। প্রভাস বলেছিল, রুকে দেখাবে , ঘরের ভেতরে ধান রুইছে।এক ফোঁটা জল লাগবে না। ধান হবে দিব্যি।  

কতটা সত্যি দেখতে যাচ্ছে রু।

সেতো এও চাইছে, আকাশকে মাঝেমধ্যে ঘরের মধ্যে টাঙ্গিয়ে রাখতে।মেঘ এসে বাজনা বাজাবে। ফুটবে তারাও । অসংখ্য। সেতো এও চাইছে,  কোনো দিকেই মানুষের কোনো অভাব থাকবেনা। মানুষ যখন যা চাইবে, পেয়ে যাবে হাতের সামনে। শুধু অন্ন বস্ত্র বাসস্থান নয়, মানুষ যদি চায় সমুদ্রে সাইকেল চালাবে, চালাতে পারবে। মানুষ ইচ্ছে করলেই, আকাশ নামাবে নিচে। মাটিকে পাঠাবে উপরে। হ্যাঁ হ্যাঁ এরকমই হবে । স্বপ্ন শুধু নয়। কল্পনা শুধু নয়। মানুষ তার বাঁচার জন্য ভালো থাকার জন্য যখন খুশি যা খুশি চাইতে পারে।এতে কোনো দোষ নেই।

রুয়ের মনে পড়লো, প্রভাস বলেছিল-----তাদের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করতে। কিন্তু খাবেনা সে। সেতো এই বিশুদ্ধ বাতাস খেতে খেতে চলেছে। তার
সঙ্গে তার সাইকেলও হাওয়া খেয়ে চলেছে। দুজনেরই ভরে গেছে পেট।

রু আপন মনে হাসে। একবার সে হেসে উঠলো জোর। আর দেখতে পেলো সামনে এক মাঠ। খেলা করছে মাছেরা। সে সাইকেল দাঁড় করিয়ে নেমে গেল মাঠে। শুরু করলো খেলতে। খেলবে কি, তার সারা গায়ে উঠে যাচ্ছে মাছেরা।

সে যখন মাঠ থেকে উঠলো, সারা গায়ে বর্ষার কাদা। সে হাসছে। হাসতে হাসতে প্রভাসদের বাড়ি।

প্রভাস প্রভাস---- রু দূর থেকেই ডাকতে শুরু করে।
প্রভাস তাকে দেখে অবাক।

বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। প্রভাস রুকে ধরে ছাদবিহীন একটা ঘরে ঢুকিয়ে দেয়। বলে, বৃষ্টি পড়ছে। এই ঘরে তুমি তোমার কাদা ধুয়ে নাও।

রু নাচতে নাচতে বলে------এই তো আমার এক ঘর বর্ষা।



----২৩ আষাঢ় ১৪২৮
-----৮---৭---২০২১
-----নির্মল হালদার









বুধবার, ৭ জুলাই, ২০২১

তারার অঙ্ক / নির্মল হালদার

তারার অঙ্ক / নির্মল হালদার



কোন্ তারাটা চাই? ১ দেবো না ৭ দেবো বলো? তুমি ১১ নাম্বার তারাটাও নিতে পারো। খুব উজ্জ্বল। তারচেয়েও বেশি উজ্জ্বল ১৭ নাম্বার। তোমার যা ইচ্ছে নিতে পারো। আমি নামিয়ে দেবো এখুনি।

আদিম প্রতিদিন সন্ধে বেলা ছাদে উঠে একেকটি তারার নাম্বার দিয়ে থাকে। আজ যেমন ২১ নাম্বার। ২৯ নাম্বার। এবং আজও তার সঙ্গে আছে একজন। যাকে নিয়ে ছাদে উঠেছে সে।

একেকদিন একেকজন। সে শিশু হতে পারে। কিশোর হতে পারে। যুবক-যুবতী হতে পারে। অথবা কোনো বৃদ্ধ। তার ঠাকুমাকে নিয়েও উঠেছিল সে। ঠাকুমা বলেছিল------কোনো নাম্বার চাই না। তুই বাপধন আমাকে একটা তারার মালা দিতে পারিস।ঠাকুরকে পরাবো।

আদিম বলেছিল,মালাতো গাঁথা নেই।মালা গাঁথলে তোমাকে দেবো ঠাকুমা। এখন তারাফুল নিয়ে যাও।ঠাকুমা বলেছিল-------দরকার নেই। আমি আসছি বাবা।

আদিম আকাশের দিকে তাকিয়ে অঙ্ক করতে থাকে। এই ১২তার সঙ্গে ১৩ = ২৫। ৩১ টাও করতে হবে। নাম্বার দিতে হবে সবাইকে। যোগ করতে হবে। আমার অঙকে বিয়োগ নেই।

আজ এক কিশোরী আদিমের সঙ্গে ছাদে উঠেছে। সে চাইছে  ১০১ নাম্বার টি। আদিম জানালো ১০১ অবধি সে এখনো যায়নি। তবে একটু দাঁড়ালে ৫১ নাম্বারটি
দিতে পারে কিশোরীকে। আরো বলে------- ৫১ নাম্বারটি তাকে মানাবে ভালো।

আদিমের এই অঙ্ক  আদিমকে খুশি রাখে। সে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে। ঘুম না হলে, ঘরের সিলিঙের দিকে চেয়ে চেয়ে অঙ্ক কষতে থাকে। অথবা আঁকতে থাকে তারা।তারার উজ্জ্বল মুখ। তার কাছে একেকটি তারা একেকটি সংখ্যা। 

১ নাম্বার তারাটি সে কাউকে দেবে না। তাই সে ১ নাম্বারকে  মাথার ভেতরে লুকিয়ে রাখে সবসময়।
কেননা ১ থেকেই শুরু। ১দিয়ে দিলে অঙ্ক গুলিয়ে যাবে। ভুল হয়ে যাবে।

আদিমের আরেকটা অভ্যাস আছে,সে তারা থেকে সুগন্ধ বের করে ছড়িয়ে দেয়  সমস্ত জায়গায়। তখন হয়ত ফুল ফোটেনি। তখন মানুষ অবাক হয়ে যায় ------ কোত্থেকে আসছে এই সুগন্ধ?  

বৃষ্টি না হলেও কেউ কেউ সোঁদা গন্ধ পেয়ে থাকে। আদিম নিজেও সেই গন্ধে  মনে করে তারার দেশে নিশ্চয়ই মাটি আছে।

আজ সে একটি তারা নিজের হাতে নিয়ে আসবে। পরখ করবে মাটি আছে কি নেই। যেই তারাটি হাতে নিয়ে এলো দেখতে পেল সে, সম্পূর্ণ একটি মুখ। মাটির মুখ। তার নিজেরই মুখ।

আদিমের ভয় শুরু হলো। সে কী দেখছে? কাকে দেখছে? সে  কোনো দ্বিধা না করে, মাটির মুখটি দূরে ছুঁড়ে দিলো। আর মাটির মুখটিও শুরু করল হাসতে।



-----২২ আষাঢ় ১৪২৮
-----৭---৭---২০২১
------নির্মল হালদার





কবি নির্মল হালদারের বিভিন্ন সময়ের ছবি



























































মঙ্গলবার, ৬ জুলাই, ২০২১

পিঁপড়ের লাইন / নির্মল হালদার

পিঁপড়ের লাইন / নির্মল হালদার





পিঁপড়েরা লাইন দিয়ে চলেছে। পিঁপড়েদের পায়ের শব্দের দিকে চেয়ে আছে সূচনা।

কালো পিঁপড়ের দল লাইন দিয়ে চলেছে। একটা পিঁপড়ে দলছুট ছিল। সে দৌড়ে আসছে। ঢুকেও গেল লাইনে। সূচনা কেবল লাইনের বাইরে। একটার পর একটা পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। কোথাও কিছু হচ্ছে না। সে তাই, পিঁপড়ের লাইনে যাবে। যদি কিছু পাওয়া যায়।

পিঁপড়ের লাইন থেকে কোনোদিন কোনো ডাক পাবে না জেনেও সূচনা পিঁপড়ের লাইনে যাবে। দেখে আসতে চায়, কোথায় লুকানো আছে খাদ্য ভান্ডার। সে
একা একাই যাবে।

একটা চাকরি হলে সে প্রতিদিন পিঁপড়েদের জন্য চিনির দানা, মুড়ি ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে রাখবে।তাদের এই সঙ্ঘবদ্ধতা দেখার মত। শেখার মত।

মানুষতো সঙ্ঘবদ্ধ হতেই পারেনা। সঙ্ঘবদ্ধতার নামে ক্ষমতার দিকে চলে যায়। আর ক্ষমতা মানুষকে স্বৈরাচারী করে।

প্রেমও কি স্বৈরাচারী হয়? এই যে সূচনার উপরে ক্ষমতা দখল করতে চায় আতুর, সব সময় অধিকার ভোগ করতে চায়, প্রেমকে বলবো না স্বৈরাচারী?

সূচনা জানে, কোথাও কোনো উত্তর পাবে না সে। যে মেয়েরা অত্যাচারিত হয় তারা কখনোই বলবে না, পুরুষের ক্ষমতা দখলের কথা। স্বৈরাচারের কথা।

কি সব ভাবছে সে?

সূচনা তো আজ এই মুহূর্তে পিঁপড়ের লাইনে যাবে। পিঁপড়েদের সঙ্গে থাকা অনেক সুখের। ওইতো মেঘ আসছে। আকাশে আকাশে কাজল কালো মেঘ। বিদ্যুৎ রেখা। মেঘের গুরুগম্ভীর ডাক। এখুনি বৃষ্টি আসবে।

পিঁপড়েরা কোথায় যাবে তখন?

তার ঘরের মেঝে থেকে এখনো পিঁপড়েরা বাইরে যেতে পারেনি। তবে কি ঘরের মধ্যেই আছে, পিঁপড়েদের খাদ্যভান্ডার?

পিঁপড়েদের পায়ের শব্দের দিকে চেয়ে আছে সূচনা।

বৃষ্টি এলো। বৃষ্টির সঙ্গে নূপুরের ধ্বনি। বৃষ্টির সঙ্গে কে আসছে?

আতুরের পছন্দের ঋতু, প্রিয় ঋতু বর্ষা। বৃষ্টি এলেই, সে পাগলের মত নাচে। আজ কোথায় সে? তিন মাস আগে শেষ দেখা, তারপর আর যোগাযোগ নেই। কলেজের পুনর্মিলনীতে সূচনা রণোর সঙ্গে ক্যান্টিনে গিয়েছিল চা খেতে। রাগ হয়েছিল আতুরের। দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। সূচনা বলেছিল, আমি তোর সম্পত্তি নই।

সেই শেষ দেখা।

সূচনা ভেতরে ভেতরে কান্না চেপে রাখে। সে তো ভালবেসেছিল। সে তো সমর্পণ করেছিল। কিন্তু নিজের ব্যক্তিত্বকে দুহাতে বিলিয়ে দিতে পারেনি।

সে যাকগে এখন-----আপাতত সে পিঁপড়ের লাইনে যাবে। ঘর থেকে কতদূর যাবে তারা, আজ দেখবে সূচনা। কিন্তু এখন তো বৃষ্টি। এই বৃষ্টির মধ্যে কোথায় যাবে তারা?

নুপূর বাজছে। সূচনা দেখার চেষ্টা করে, নুপূর পরা পা কোথায় আছে? কোন্ বৃষ্টির মধ্যে লুকিয়ে আছে? নাকি বৃষ্টির বাইরে নুপুর বাজে? নুপূরের ধ্বনি বৃষ্টিতে এসে প্রবেশ করেছে----এও তো হতে পারে।

নুপূরের ধ্বনি কাছে আসে। দূরে চলে যায়। আবার কাছে আসে। দূরে চলে যায়।

সূচনার মনে হলো,তার পায়ে নুপূর বাজছে নাতো? সে নিজের দুটি পা লক্ষ্য করে। তখনই তার মনে পড়লো, সে অলংকার পছন্দ করেনা। তার কানে দুল নেই। হাতে চুড়ি নেই। সে হঠাৎ নুপূর পরবে কেন?

সে ঘরের বাইরে গিয়ে একবার বৃষ্টিতে ভিজলো।তার ভেজা পোশাক থেকে জল ঝরে ঝরে ঘরের মেঝেতে তৈরি করলো এক আলপনা। জলের আলপনা।

সূচনার চোখ পড়লো আবারো পিঁপড়েদের লাইনে। লাইন শেষ হচ্ছে না। কোথায় যে শুরু দেখতে পাচ্ছে না সে। বৃষ্টির মধ্যে কোথায় যাবে তারা?

এক ঝাঁক পিঁপড়ে।

চেয়ে থাকতে থাকতে সূচনার মনে হলো, পিঁপড়েদের পায়ে বাজছে নুপূর। এবং এই নুপূরের ধ্বনি কত যে মধুর, সে বলতে পারবে না কোথাও। সে শুধু কাঁদবে।



-----২১ আষাঢ় ১৪২৮
-----৬---৭---২০২১
-----নির্মল হালদার



সোমবার, ৫ জুলাই, ২০২১

তুলসী গাছ / নির্মল হালদার

তুলসী গাছ / নির্মল হালদার



স্কুলের জন্য যখন জমিটা পাওয়া গেল তখন দেখা গেছলো, একটা বেল গাছ, আরেকটা আমড়া গাছ আছে। স্কুল যারা তৈরি করেছিলেন , তাদের মধ্যে মনি বাবু বললেন, গাছ কেটে দিতে হবে। আরেকজন
ঘোষ বাবু রাজি হলেন না। উনি বললেন------ গাছগুলো আমাদের ক্ষতি করছে না। বরং স্কুলের ছেলেমেয়েরা এসে গাছে ওঠার অভ্যেস করবে। বেল খাবে। আমড়া খাবে। সেও ছোটদের কাছে আনন্দের বৈকি। তারপর থেকে গাছ দুটো থেকেই গেছে।ডালপালাও বেড়েছে তাদের। পাখিরাও আসে।

পাখিদের কলরবের সঙ্গে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের কলরব মিলেমিশে এক সুর তৈরি করে।


মনি বাবু এবং ঘোষ বাবুর প্রচেষ্টায় এই গ্রামে প্রথম প্রাইমারি স্কুল। প্রাইভেট। স্কুলের ছেলে মেয়েদের কাছ থেকে যেটুকু বেতন পাওয়া যায়, মনি বাবুরা ভাগ করে নেন।

আস্তে আস্তে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে। যেহেতু কাছাকাছি কোনো স্কুল নেই। স্কুলে নিয়োগ করতে হয়েছে আরো একজন দিদিমণিকে। দিদিমণি- আমলকি দত্ত।

দিদিমণি স্কুলটাকে নিজের মতো করে সাজাতে চান।
এরইমধ্যে স্কুল বাউন্ডারিতে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে ফুল ফল গাছ পাতা আঁকিয়েছেন। সুযোগ সময় পেলে, দিদিমণি ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে গান করতে বসে যান। যদি ছাত্র-ছাত্রীরা গান করতে পারে, যদি শেখে তারা সমৃদ্ধ হবে। স্কুলেও ছাত্র-ছাত্রীরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিবেশন করতে পারবে।

দিদিমণি মনি বাবুকে বলছিলেন, যদি স্কুলে আর্ট টিচার নিয়োগ করা যায়। গানের টিচার নিয়োগ করা যায়। মনি বাবু না করে দিয়েছেন। নতুন টিচার নিয়োগ করলেই, টাকা লাগবে। স্কুল ফান্ডে টাকা নেই। এই গ্রামে বেশিরভাগ মানুষ গরিব। বেতন বাড়ানো যাবে না। বাইরে থেকেও তেমন কোনো সাহায্য আসে না।

হতাশ হয়ে দিদিমণি একা একা চেষ্টা করে যান, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে নান্দনিক বোধ তৈরি করতে।
খেলাধুলো তো আছেই। সেইসঙ্গে গাছপালা চেনানো।তার নিজেরও গাছ চেনা হয়ে যায়। তিনি বুয়ান গাছ চিনতেন না। গ্রামের ছাত্র-ছাত্রীরা দিদিমণিকে বুয়ান গাছ চিনিয়ে দিয়েছে। জেনেছে এও,বুয়ান পাতা জ্বালিয়ে দিলে তার ধোঁয়ায়  মশারা পালিয়ে যায়।

দিদিমণি টিফিনের সময় ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে নিজেও
এক্কাদোক্কা খেলেন। মনি বাবু ও ঘোষ বাবু হাসাহাসি করলেও দিদিমণি গ্রাহ্য করেন না।

দিদিমণির বাড়িতে শুধু বাবা আর মা। তিনি তাই কখনো কখনো একজন বা দু'জন ছাত্রছাত্রীকে ঘরে নিয়ে আসেন। যারা খুবই দরিদ্র। স্কুলের বাইরে আর পড়াশোনা করতে পারে না। নিজের ঘরে নিয়ে এসে লেখাপড়া শেখান।

একেক হপ্তায় একেকজন। প্রতি হপ্তায় নতুন কেউ। সাধারণত একজনই থাকে। কখনো দু'জন। শনিবার আসে। সোমবার ছাত্র বা ছাত্রীকে নিয়ে দিদিমণি আবার স্কুলে।

দিদিমণির মা-বাবাও মেয়ের জন্য নিত্যনতুন ছেলে মেয়ে দেখতে পান। মনে করেন, তারা সমৃদ্ধ হয়ে উঠছেন। কচিকাঁচাদের মুখের আলোতে।

স্কুলে ২৬ জানুয়ারি পতাকা উঠলেও পঁচিশে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথের ছবিতে মালা। গান। এবং বাইশে শ্রাবণ গাছ লাগানো হবেই।

এবারেও গাছ লাগানোর জন্য মনি বাবু কিছু চারা বিশেষ করে ফুলের চারা লাগাবেন, স্কুলে বলেছেন। ঘোষ বাবুর খুব ইচ্ছে একটা আম গাছের। আর দিদিমনির? তিনি কিছু বলছেন না।

এরই মধ্যে একজন আঁকার টিচার পাওয়া গেছে। তিনি শুধু শনিবার এসে ছাত্রীদের আঁকা শেখাবেন।
বিনিময়ে কোনো দাবি নেই। মনি বাবুরা সবাই খুশি। এবার একজন নাচের শিক্ষক পেলে, ফুলে ফলে
ভরে উঠবে ।

বাইশে শ্রাবণের সকালবেলা ছাত্র-ছাত্রীরা বাড়ি থেকে
নানান গাছের চারা নিয়ে এসেছে। বেশিরভাগ গাছ বট--অশথ। কেউ কেউ আম জাম।

স্কুলের বাউন্ডারি তো বেশি বড় নয়। কত গাছ আর লাগানো যাবে। তাই মনি বাবুরা বললেন, গাছের চারা কেউ যেন না ফেলে। আমরা পাশের গ্রামের স্কুলে গাছ লাগিয়ে আসবো। কিছু কিছু গাছ রাস্তায় লাগানো হবে।

দিদিমণিকে দেখা গেল, একটি টব নিয়ে আসতে। ঘোষ বাবু মনি বাবুকে জিজ্ঞাসা করেন-----দিদিমণি  টবে কি গাছ নিয়ে আসছে বলুন তো? মনি বাবু বলেন, দেখুন কোনো ফুল গাছ হবে হয়তো।

দিদিমণি স্কুলে ঢুকতে দেখা গেল, একটি তুলসী গাছ। মনি বাবু ঘোষ বাবু এবং আঁকার মাস্টারমশাই উত্তম বাবু দেখে তো অবাক। একইসঙ্গে সবাই প্রশ্ন করেন------তুলসী গাছে কি হবে?

দিদিমণি বলেন, স্কুল বাউন্ডারির এক কোণে পড়ে থাকবে। সেদিন এক ছাত্র তুলসী গাছ চিনতে পারেনি। সেদিন থেকেই মনে হয়েছিল আমার, একটা তুলসী গাছ দরকার।

দিদিমণি হাসতে হাসতে আরো বলেন------তুলসীর হাওয়া ছোট ছোট হলেও খুব বিশুদ্ধ হাওয়া। তুলসী পাতাও খুব বিশুদ্ধ। সবাই জানেন।

মনি বাবুরা হাসতে হাসতে বলেন, আপনার যখন শখ হয়েছে, তুলসী গাছটাও আজ থেকে থাকুক আমাদের সঙ্গে।

দিদিমণি বলেন-----তুলসী গাছ ছোট হলেও একটা গাছ। আমাদের দিকে চেয়ে থাকবে সেও।


----২০আষাঢ়১৪২৮
----৫----৭----২০২১
----নির্মল হালদার



লোকটা / নির্মল হালদার

লোকটা / নির্মল হালদার



একটা দোকানের সামনে দাঁড়ালো। চেয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। তারপর চলেও গেল।

কুকুরগুলো শুয়েছিল রাস্তার ধারে। লোকটা কুকুর গুলোর দিকে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর চলেও গেল।

আস্তাকুড়ে একটা শুয়োর নিজের খাদ্য খুঁজছে। লোকটা চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর চলেও গেল।

একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাড়িটাকে দেখলো অনেকটা সময়। তারপর চলেও গেল।

লোকটা কে?

লোকটার মাথা ভর্তি চুল। পরিচ্ছন্ন পোশাক আশাক। তবে খালি পা।লোকটা কোথায় থাকে? কী নাম? কী করে? কারোর কারোর কৌতুহল হলেও লোকটার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করা হয় না।


লোকটা হঠাৎ হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। নিচু হয়ে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নেয়
একটা ছোট পাথর। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পাথরটাকে দেখে। ছুঁড়ে ফেলে।

কি দেখে লোকটা?

সন্ধ্যার আঁধারে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ব্ল্যাক বোর্ডে অঙ্ক করার মত আঙুল দিয়ে লোকটা  কি যেন করছিল।

আমার মনে হলো, যোগ-বিয়োগ করছে। আমার মনে হলো, একটি তারাকে আরেকটি তারার গা ঘেঁষে দাঁড় করিয়ে দিলো। আমার মনে হলো, লোকটা চাঁদকে যেন
আঙুল দিয়ে ঠেলছে। আমার মনে হলো, লোকটার সাহস আছে। সাধুবাদ জানাতেই হবে। কিন্তু লোকটার কাছাকাছি যাওয়ার মুরোদ আমার নেই।

একটা বিষয় লক্ষ্য করছি, লোকটার জলতেষ্টা নেই। খিদে নেই। আমি একবার চায়ের দোকান থেকে লোকটাকে ডাকছিলাম। আমার দিকে না তাকিয়ে লোকটা চলে গেল। আমি একবার  জানতে চাইছিলাম
দূরত্ব রেখেই জানতে চাইছিলাম, আপনার বাড়িটা কোথায়?

লোকটা দাঁড়ালো না।

দ্রুত হাঁটতে থাকে।  

আজ লোকটার জামার পকেট থেকে উঁকি দিচ্ছিলো, একটা কাগজ।

আমার মনে হলো, কারোর চিঠি। আবার এও মনে হলো, চিঠি কেন হবে? হয়তো বা শুধুমাত্র শাদা কাগজ। লোকটা চিঠি লিখবে হয়তোবা কাউকে।

কাকে চিঠি লিখবে?

কবিতা লিখবে না তো?

কবিতা লিখলেও আমি পড়ার সুযোগ পাবো না।
কে পড়বে সেই কবিতা?


আকাশে  আকাশে যা লেখা হয়ে আছে, আমি কি পড়তে পারি?

হঠাৎ দেখছি , লোকটা মাছের সামনে। মাছ ওয়ালা জানতে চাইছে বারবার, কি মাছ নেবেন বলুন। লোকটা চুপচাপ। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে লোকটা চলে গেল আলু পেঁয়াজের কাছে। দোকানদার জানতে চাইছে বারবার, কি চাই বলুন? লোকটা চুপচাপ। শান্ত ধীর।

আস্তে আস্তে চলে গেল।

এই লোকটাকে রাস্তার উপরে বসে থাকতে দেখলাম। বসে থাকতে এর আগে কখনো দেখিনি। মনে হলো লোকটা ক্লান্ত। মুখে যদিও কোনো ছাপ নেই। তবে মলিন লাগছে।

লোকটা ঘুমোয়তো?

রাস্তাঘাটের ভিড়ের মধ্যেই এক শিশুর কান্না শোনা গেল। চেয়ে দেখি, এক শিশু একা একা কাঁদছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে।

মা-বাবা কোথায়?

লক্ষ্য করি, লোকটা এগিয়ে আসছে শিশুর দিকে। লক্ষ্য করি, লোকটা শিশুটিকে কোলে তুলে নেয়। মুছিয়ে দেয় চোখের জল।

শুনতে পাই লোকটা বলছে, কাঁদে না সোনা-------চলো তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি মায়ের কাছে।


-----১৯ আষাঢ় ১৪২৮
-----৪---৭----২০২১
-----নির্মল হালদার





আমার গল্পের চরিত্র / নির্মল হালদার

আমার গল্পের চরিত্র / নির্মল হালদার




এই মুহূর্তে একটা বৃষ্টি চাই।একটি মেয়েকে চাই আমার গল্পের জন্য।বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে মেয়েটি চলে যাচ্ছে কোথাও।

অথচ বৃষ্টি নেই, মেয়েটিও নেই।

যে সমস্ত মেয়েদের আমি চিনি, তারা কেউ আমার গল্পের জন্য রাজি হবে না। তাই ভাবছিলাম, আমার মাকে ডাকলে কেমন হয়? মায়ের বয়সটা বেশি হলেও মানিয়ে যাবে। আমি বলব মানিয়ে নিতে। মা নিশ্চয়ই আমার বিষয়ে "না" করবে না।

মায়ের প্রেমিক কে হবে?

বাবাকে ডাকবো? নাকি অন্য কোনো পুরুষকে ডাকবো? চিন্তা হচ্ছে, অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে মা কথা বলবে?

এটাও ঠিক, আমার সংলাপ কেমন হবে? দৃশ্যপট কেমন হবে? তার উপরে নির্ভর করছে অনেকটাই। আগে তো প্রস্তাবটা মাকে দিই--------তারপর দেখা যাবে।

কিন্তু মা আছে কোথায়? বাবা আছে কোথায়? আমার সঙ্গে অনেক অনেক বছর দেখা হয়নি।

ওদের খোঁজ করবো কোথায়? কার কাছে?

এখন মনে হচ্ছে, আমার গল্পে ওরা মানানসই হবে।কেন না, ব্যক্তিগত জীবনে ওরা সফল জুটি। আমার গল্পেও ওই সফলতা আসবে নিশ্চয়ই।

ভাবছিলাম আরো অন্য একটা কথা, মায়ের হাতে মোবাইল দিলে ব্যবহার করতে পারবে? বাবার হাতে মোবাইল দিলে ব্যবহার করতে পারবে?

আমার গল্পতো আজকের। এবং এখনকার বাস্তবে মোবাইল নিশ্চিত। যদি ওরা হাতে না নেয়, যদি ব্যবহার করতে অস্বীকার করে, তখন না হয় মোবাইল বাদেই ওদের দেখাবো। যদি দু'একটা ইংরেজি শব্দ আসে? মা বাবা কি উচ্চারণ করতে পারবে?

আমার সংশয় কাটছে না।

আবার এই মুহূর্তে আমার গল্পের জন্য আমি মাকে ছাড়া কাউকে ভাবতে পারছি না। যদি আমার পুরনো মাকে গল্পে দেখাই? যদি আমার পুরনো বাবাকে গল্পে দেখাই? তাহলে অনেক সমস্যা কেটে যাবে।

ওরা পুরনো দিনের গল্পে ফিরে যাবে। পুরনো জীবনের কাছে ফিরে যাবে। আমার গল্পে সমস্যা থাকবে না।
মুস্কিল হচ্ছে, আমার গল্পের মাঝখানে মা যদি পান দোক্তা খোঁজে? কিন্তু বাবাকে তো ধুতি পরালে চলবে না। মাকেও শাদামাটা শাড়ি পরানো চলবে না। আমি বলবো, তোমরা পুরনো হয়েই থাকো শুধু পোশাকটা আজকের পরো। বাবাকে দেবো, পাঞ্জাবি পায়জামা। মাকে দেবো, তাঁতের শাড়ি।

দারুন লাগবে।

গল্পের বিষয়টা কি হবে?

নুন আনতে পান্তা ফুরানোর গল্প বলবো কি? নাকি বাবাকে করবো আদর্শ শিক্ষক? যিনি অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করেন না।

বৃষ্টিটা আসছে না যে।

বেশ চড়া রোদ। চিড়বিড় করছে আমার গা-হাত-পা। ঘাম নামছে। আমি আরেকবার স্নান করবো। বাথরুমে গল্পটা ভাবা যাবে।

মা বাবার খোঁজ করবো কখন?

যদি খোঁজ পাই আমি কাছে যেতে পারব তো? রাজি করাতে পারব তো? ওদের বলবো, আমি নাটক করছি না। অভিনয় করতে হবে না। কেবল আমার গল্পের নায়ক নায়িকা হয়ে তোমরা কথা বলবে।

বাবা যদি প্রশ্ন করে, নায়ক মানে কি? আমি কি উত্তর দেবো? মা যদি প্রশ্ন করে, নায়িকা মানে কি? কি উত্তর দেবো?


আমি সহজ করে বোঝাতে পারবো না, নায়ক নায়িকা কি। আমি সহজ করে বলতে পারবো না, আমার জীবনে তোমরা একমাত্র নায়ক নায়িকা। যারা চোখের জলের হাসিতে আমাকে মানুষ করেছো।


-----১৭আষাঢ়১৪২৮
-----২----৭----২০২১
-----নির্মল হালদার






ঘুঙুর / নির্মল হালদার

ঘুঙুর / নির্মল হালদার


গোপাল মোড় থেকে এগিয়ে গেলে বাঁ দিকের রাস্তা ধরে সোজা বেদিয়াদের গ্রাম। অনেকেই সাপুড়েদের গ্রাম বলে থাকে। প্রকৃত নাম-----লোহার সোল। এই
গ্রামের প্রায় সবাই সাপ ধরে। শহরে গিয়ে সাপ খেলা দেখিয়ে রুজি রোজগার করে। এরাও ভোটাধিকার পেয়েছে। এদেরও আছে আধার কার্ড। রেশন কার্ড।

এদের জমি জায়গা বলতে কিছু নেই। অধিকাংশ পুরুষ সাপ ধরে বেড়ায়। যদিও বর্তমানে সাপ খেলা দেখানো চলবে না আইন করে করা হচ্ছে। এ  সমস্ত খুঁটিনাটি ফাঁকফোকর জানতে ইচ্ছে করে না যোশিয়োর। সে আজ  একা একা হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের পর গ্রাম যাবে।

কী আছে গ্রামে? মুক্ত বাতাস নীল আকাশ? আর?আর কি আছে? সরল মানুষ আছে বৈকি। চাষবাস আছে বৈকি। এই তো আষাঢ়। ধান জমিতে লাঙ্গল দিচ্ছে চাষী। কোনো কোনো জমিতে  বীজ ফেলা হচ্ছে। কোথাও দেওয়া হচ্ছে গোবরের সার। 

বুয়ান  গাছের সারি জমির উপরে। তার পিছনে একটা তাল গাছ। এখন তো তাল পাকবে না। তাল শাঁস খাওয়ার জন্য ছেলেরা তাল পেড়ে গেছে। চিহ্ন পড়ে আছে তার।  

এইবার চাকিরবন। একটার পর একটা গ্রাম। গা লাগালাগি গ্রাম। পিঠে পিঠ ঠেকে আছে। যোশিয়োর পিঠেও কী কারো পিঠ লেগে আছে? যোশিয়োর ইচ্ছে ছিল পাহাড়ে পিঠ দিয়ে অপেক্ষা করবে কারোর জন্য। অথবা পাহাড়ের কাছে শিক্ষা চাইবে, অপেক্ষা কাকে বলে।

সেই সময়টা যোশিয়ো এক পাহাড়ি গ্রামে দিনের পর দিন কাটিয়েছে। চার্চ থেকে তাকে পাঠানো হয়েছিল আদিবাসীদের গ্রামে যীশুর ধর্ম প্রচার করতে। সে কিন্তু ধর্ম প্রচার করেনি। বরং তার মনে হয়েছে, কোনো ধর্ম কাউকে রক্ষা করে না। মানুষ তার নিজের মতো করে বাঁচবে। মানুষের ধর্ম একমাত্র ধর্ম বেঁচে থাকা। সেই বেঁচে থাকার কাছে  কোনো ধর্মগুরু নেই। ঈশ্বর নেই। যোশিয়ো তাই, ধর্ম প্রচার না করে শুধু মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতো। আর ঘরে এসে  শুয়ে শুয়ে বই পড়তো। বইয়ের মত নিঃস্বার্থ বন্ধু আর কেউ নেই। সে তাই শহরে গিয়ে বই সংগ্রহ করে নিয়ে আসতো।

চার্চের ফাদার সেই গ্রামে গিয়ে যোশিয়োকে খুঁজে পাননি। পরে জানতে পেরেছিলেন, সে নাকি এক আদিবাসী ঘরের উঠোনে ঘুমিয়ে আছে। আগের দিন আদিবাসীদের কোনো উৎসব ছিল। সে নিজের ঘরে না ফিরে রাত জেগে উৎসব দেখেছিল। পরের দিন তাই ঘুম। এ সমস্ত জেনে ফাদার যোশিয়োকে চার্চ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল।

চাকিরবনের  রাস্তার ধারে খাটিয়ায় শুয়ে আছে এক শিশু। যোশিয়োর মনে হলো, এখানেই দাঁড়ানো যাক। এই বাড়ি থেকেই এক গ্লাস জল চাইলে হয়। তার সঙ্গে কোনো জলের বোতল নেই।

চাকিরবন মূলতঃ  মাহাতদের গ্রাম। জীবিকা : প্রধানত চাষবাস। এখন অনেকেই শাকসবজির চাষ করছে। যেহেতু কাছেই নদী। কাঁসাই। পাশের  গ্রাম-----পিঁড়রা। কাঁসাই নদীর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে নদীর জলের অভাব নেই বলে, বারো মাস শাকসবজি হয়ে থাকে। চাষীরা শহরে যায় সবজি বিক্রি করতে।

যোশিয়োর ইচ্ছে হলো, নদীর দিকে যাবে। যেতে যেতে আলাপ হয়ে গেল মিলনের সঙ্গে। সে মনে করে  মিলন নাই বা থাকুক, মিলনের সঙ্গে দেখা হবেই। মিলন যাচ্ছে নদীতে স্নান করতে। সেও কি স্নান করবে?

স্নান তো নয় নদীতে অবগাহন। ডুব দিতে দিতে পেয়ে যাবে সোনা। তার আগেই সে পেয়ে গেল,একটি ঘুঙুর।কার পা থেকে খুলে গেছে? কে সে? সে কি বালিকা  না কোনো যুবতী? নাচ করে?

যোশিয়ো শুনেছে, নাচনিদের কথা। নাচনিদের  দুঃখ যন্ত্রণার কথা। সেই আদিবাসী গ্রামে একবার দেখেছিল নাচনি নাচ।

ঘুঙুরটি নিয়ে খোঁজ করতে ইচ্ছে করছে যোশিয়োর।যার ঘুঙুর তাকে ফেরত দিলে ভালো লাগবে তার। নদীর কাছে এসে তার মনে হলো, জলের উপরে নাচছে এক নর্তকী। জলে শব্দ করে করে  তাল দিচ্ছে যোশিয়ো। এবং তাল দিতে দিতে সে উঠে  যাচ্ছে উপরের দিকে। সঙ্গে নর্তকীও।

যার নাম পিঁড়রা চাকিরবন লোহার সোল। যারা এই বর্ষায় সবুজে সবুজ হয়ে আছে।


----১৬আষাঢ়১৪২৮
----১---৭---২০২১
---- নির্মল হালদার



পাতা পড়ার শব্দের মতো / নির্মল হালদার





পাতা পড়ার শব্দের মতো / নির্মল হালদার


মনে করেছিলাম বিছানা করে শুয়ে পড়বো। তারপর মনে পড়লো, সে আসবে। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের সমস্ত আলো জ্বেলে অপেক্ষা করতে শুরু করলাম।

রাত ১১টা বেজে গেল। ১২টা বেজেও পার হয়ে গেল।
সে কই? সে বলেছিল, হোমিওপ্যাথিক ওষুধ নিয়ে আসবে। হোমিওপ্যাথিক নাকি রোগের চিকিৎসা করে না। রুগীর চিকিৎসা করে। সে কই?

টিকটিকিটা যে কতবার দেয়াল বদল করলো। কত পোকার ওড়াউড়ি দেখলাম। রাত্রি আস্তে আস্তে রূপ বদল করছে। আমি ছাদে গেলাম। রাস্তার আলো জ্বলতে জ্বলতেও একা। দূরের সব বাড়িতে নিভু নিভু আলো। সেতো এলো না?

ছাদ থেকে নেমে গেলাম। ছাদে উঠলাম আবার। মনে হচ্ছে,একটা তারা আমার সঙ্গে কথা বলতে চায়। মন খুলে কথা বলতে চায়। সে অনেক কাল ধরে আকাশে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে গেছে। এবার একটু মাটির সঙ্গে সংযোগ স্হাপন করবে। আমি বললাম ,খুব ভালো কথা। আমি আছি তোমার সঙ্গে। এই কথা বলে,আমি নিচে নেমে এলাম। কিন্তু সে? সে কোথায়?কতদূরে?সেতো বলেছিল,আজ আমাকে শুধু একটি ঝরা পাতার ওড়াউড়ি দেখাবে। সেতো বলেছিল, রাত জেগে কথা বললে মানুষ নিরাময় হয়ে ওঠে।

আমি খুঁজে দেখেছি, কেউ নেই নিরাময়। কেউ নয় নিরাময়। আমি খুঁজে দেখেছি, অনাময় কেউ নেই। সে কী আসবে না?

আজ শুধু দরজা খোলা নেই, ঘরের যে মন সেও খোলা। সে কী আসবে না তবে? ৩ টে বেজে পার হয়ে গেছে। ছাদে উঠে আবার মনে হলো, একটা তারা আরেকটি তারার কাছাকাছি আসতে চাইছে। আমি কার কাছাকাছি আসবো? সে কী রাত্রিতে আসবে না তবে?

ঘরের আলো নেভাতে ইচ্ছে করছে না। দরজা বন্ধ করে শুতে ইচ্ছে করছে না। ক্রমশ আলো ফুটে উঠছে।কোথায় যাবো খুঁজতে? সে কি কোথাও আছে?

সে যে বলেছিল, আমাকে শোনাবে ফুল ফোটার শব্দ।
কই? কই সে? আমি কি অপেক্ষা করছি?

শিশির পড়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। পাতায় পাতায় শিশির। শিশিরে শিশিরে ভিজে উঠছে মাটি। শিশির পড়ার শব্দে মনে পড়লো সে আমাকে বলেছিল, একটি পাতা পড়া শব্দের মত আমি ভালবাসি তোমাকে। আমি আসবো একদিন।


-----১৫আষাঢ়১৪২৮
-----৩০---৬---২০২১
----নির্মল হালদার



আয়না / নির্মল হালদার

আয়না / নির্মল হালদার


আয়না একটা আছে। মুখ দেখে না।
চুল আঁচড়ায় না রোরো।
অনেকেই আছে সময়ে অসময়ে
আয়নার সামনে দাঁড়ায়। মুখ দেখে। মুখের খুঁটিনাটি দেখে।
ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে।

রোরো আয়নার কাছে যায় না।

সে বলে----মুখ দেখার কি আছে।
মুখতো মুখেই আছে। আমার মুখে তো নেই কোনো মুখোশ।

আমার মুখ আমারই।

এক একদিন শর্বরী বলে, আয়নাতে মুখটা দেখবি যা। কি হয়েছে দেখবি যা।
রোরো বলে, তুই তো আমার আয়না। তুই সামনে থাকলেই আমার মুখ দেখা হয়ে যায়। আমার আনন্দ আমার বিষাদ সব দেখা হয়ে যায়। আয়নার কোনো প্রয়োজন নেই।
---তাহলে ঘর থেকে আয়নাটা ফেলে দিবি।
---কেন ফেলবো কেন?
কতজন আসা-যাওয়া করে।
তারা মুখ দেখবে।
তুই কোনোদিন বলতেই পারিস,
ঘরটা ফেলে দে। সেদিন বলবো,
তুই প্রকৃত বন্ধু আমার। কেননা তুই বুঝেছিস, সম্পত্তি থাকে না।
----কি থাকে?
----প্রেম থাকে।
ভালবাসাবাসির চেয়ে অন্য কিছু আর বড় নয়। সম্পত্তি আজ আছে কাল নেই। প্রেম প্রতি মুহূর্তে। শিরায় শিরায়।
----তোর দার্শনিক কথাবার্তা শুনতে আজকাল আর ভালো লাগে না। তোর বয়েসটা কি বেড়ে গেল?
----বয়স তো মনে বাড়ে।
তোকেও তো বলেছি, তুই আমার সম্পত্তি না। তুই তোর মতো থাকবি। আমাকে ভালোবাসতে বাসতে অন্য কাউকেও ভালবাসতে পারিস। আমার কোনো আপত্তি নেই। বাধা নেই।
----আচ্ছা দেখি তাহলে
কাল থেকে একটা কাঠবিড়ালিকে
ভালোবাসবো। দেখবো তোর ভূমিকা।

রোরো চুপচাপ থাকে।

দুজন দু'দিকে চলে যায়।

আজ এই বিকেলে রোরোর ইচ্ছে করলো আয়নার সামনে দাঁড়াতে।
দেখলো, তার মুখের কোনো পরিবর্তন হয়নি। গালে একটা ব্রণ হয়েছে শুধু। এইখানে আয়না চমৎকার। সে দেখায়। নিজেকে দেখে না। আয়নার এই ভূমিকা
অসামান্য। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে শুধু। তার কোনো ক্লান্তি নেই। যে আসবে সামনে তাকেই দেখাবে তার রূপ। তার রাগ অনুরাগ,তার মান অভিমান সব দেখাবে। মুখে যে ছাপ পড়ে।
বিরহের ছাপও মুখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এবং আয়না তা দেখিয়ে দেয়।
আজ এ সবই মনে হলো রোরোর। সে আয়নার ধুলোবালি ঝেড়েমুছে তার জায়গায় রেখে দেয়।
তার বোন দয়িতা ডাকে-------দাদা তোর ফোন
এসেছে।
রোরোর কোনো মোবাইল নেই। তার ফোন এলে মায়ের ফোনে আসে। সে একদিন শর্বরীর সামনে পুকুরের জলে ছুড়ে ফেলে ছিল মোবাইলটা। কারণ,রোরো নাকি কোনো মেসেজের উত্তর দেয় না। এমনকি ফোন ধরে না পর্যন্ত। 
রোরো মনে করে, মেসেজের উত্তর দেওয়া যায় না। লেখা যায় না সবকিছু মোবাইলে। মুখোমুখি হলেই বলা যাবে সব। ফোন ধরে না, তার কারণ------ফোনে কোনো কথা বলতে ইচ্ছে করে না তার।
খুব জরুরী কিছু না হলে, রোরো
ফোন ধরে না। 
ফোন  রাখার তো দরকার নেই তোর। ফোনটা তবে ফেলেই দে।
শর্বরীর এই কথায় রোরো যে সত্যি সত্যি ফোনটা ফেলে দেবে ভাবতে পারেনি কেউ।

রোরোকে এই মোবাইলটা তার মা
জন্মদিনে দিয়েছিল।

কবে গেল তার জন্মদিন?

আষাঢ়ের ৬ তারিখ কি?

রোরো শুধু ভুলে যায়।

শর্বরী একবার জিজ্ঞেস করেছিল বল তো এটা কোন্ ঋতু?রোরো বলতে পারেনি। অথচ সে পরেছিল একটা সোয়েটার। শর্বরী হাসতে হাসতে বলেছিল, তোর মত পাগল কে নিয়ে পথ চলা দায়। তোর সঙ্গে সংসার করলে কি হবে আমার!
রোরো বলেছিল, আমার সঙ্গে সংসার করার কথা একদম ভাববিনা। ডুবে যাবি। তোকে বললে বিশ্বাস করবি না, আমি এক এক সময় আমার শরীরটাকে ভুলে যাই।
শর্বরী রোরোর মাথার চুল টেনে ধরেছিল। মুখটাকে দু'হাতে ধরে চুমু খেয়েছিল।

দু'জনের এই বন্ধুতা অন্যান্য বন্ধুদের কাছে ঈর্ষণীয়। কেননা শর্বরী ও রোরোর মধ্যে কোনো
ন্যাকামো নেই। দেখানেপনা নেই।
ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়েও আজও দুজনে সমান অন্তরঙ্গ। এই অন্তরঙ্গতা আসলে হৃদয় থেকে। তাই একদিন রোরো শর্বরীকে বললো------চল্ তোকে আজ একটা গিফট দেবো।
আমার তো আজ জন্মদিন নয়,
শর্বরী বলে। রোরো বলে, গিফট দেওয়ার জন্য জন্মদিন লাগে না।
উপহার ভালোবাসার প্রতীক। যে কোন সময় দেওয়া যায়। চল্-----

রোরো  খুব আধুনিক দুটো আয়না
কিনে ফেলে। আর শর্বরীর হাতে তুলে দেয়। বলে-----প্রতিদিন সকালে মুখ দেখবি তুই। আমাকে সামনে পেয়ে তুই তো মুখ দেখতে পাস না। তাই,এই উপহার। প্রতিদিনের জন্য।

শর্বরী রাগে-দুঃখে অভিমানে
আয়না দুটো নিয়ে দু'জনের পায়ের তলে ভেঙে ফেলে।


-----১৪ আষাঢ় ১৪২৮
----২৯---৬---২০২১
----নির্মল হালদার




কবি নির্মল হালদারের বিভিন্ন সময়ের ছবি

পড়ুন "ঘর গেরস্থের শিল্প"

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ