সোমবার, ২৭ জুন, ২০২২

চন্দন গাছের হাওয়া



চন্দন গাছের হাওয়া
-------------------------

"স্বাগত বিদায় "
এই বাড়িতে থাকবো?
"স্বাগত বিদায় "কবি বুদ্ধদেব বসুর বাড়ি। শান্তিনিকেতন পূর্ব পল্লীতে।
এই বাড়িতে থাকলে আমার পুণ্য।

এই বাড়িতেই থাকে আমাদের বাবলিদি। প্রভাতদা।

বুদ্ধদেব বসু নিজের বাসগৃহের পাশেই একটা মাটির ঘর করেছিলেন। সেই ঘরেই বাবলিদি ও প্রভাতদার সুরের রচনা।

৮০---৮২ সাল থেকে আমার শান্তিনিকেতন আসা যাওয়া।

ভালোবাসার টানে যাওয়া।

মাথা গুঁজবো কোথায়?

আছেই তো বাবলিদি প্রভাতদার স্বাগত বিদায়।
তখন স্বাগত বিদায় আমাদের অনেকের কাছেই বাবলিদি প্রভাতদার বাড়ি।

মনে মনে শান্তি পাই।

বাবলিদি তখন সঙ্গীত ভবনের ছাত্রী। এক শিক্ষিত তরুণী।
কবি কালীকৃষ্ণ গুহর ভাষাতে বলতে পারি, বাবলিদির মধ্যে কোনো দেখানেপনা ছিল না। অত্যন্ত মার্জিত। শিক্ষিত। এবং রবীন্দ্র সঙ্গীতের বিশুদ্ধ ধারার এক শিল্পী।

বাবলি সাহা মঞ্চসফল গানের দিকে যাননি কখনো।

বাবলিদি নীলিমা সেনের ছাত্রী।

এই বাবলিদি আমাদের বন্ধু। কাছের মানুষ। মনে আছে, বাবলিদি সব সময়  আতপ চাল  অথবা গোবিন্দভোগ চালের ভাত রান্না করতেন।

মনের সুখে গ্রহণ করেছি। বলতে পারি, খেয়েছি অন্নভোগ।
আমি শান্তিনিকেতন গেলেই, একরাম চলে আসতো তার বাড়ি থেকে। ক'টা দিন গান ও কবিতায় আমাদের কেটে যেত।

প্রভাতদা আপাদমস্তক সুভদ্র মানুষ। তার কবিতার মতোই সুন্দর। মৃদুভাষী। শান্ত।
আমাদের বন্ধু। বাবলিদি ও প্রভাতদা দুজনেই
আমাদের সময়ের অনেকের বন্ধু। বাবলিদির গানের অনুরাগী ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। আরো অনেক বিখ্যাত মানুষ। অনেক চিত্রকর।

কবি উৎপল কুমার বসুর কাছেও শুনেছি বাবলিদির সুখ্যাতি। প্রকাশদা, মানে প্রকাশ কর্মকার বাবলিদির ভক্ত ছিলেন। 

বাবলিদি রীতিমতো সুন্দরীও ছিলেন। এবং শাল গাছের মতো ঋজু।
আজও সেই সৌন্দর্য  প্রভাতদা ও আনন্দীকে আগলে রাখে। প্রেম ও ভালোবাসায়।

বাবলিদি ও প্রভাতদার সিউড়ির বাড়িতেও আমি হঠাৎ হঠাৎ চলে গেছি। তখন তো সারা বাংলায় আমি ছুটে বেড়াই। বিশেষ করে
মাসে একবার যাবই সিউড়ি। স্বপনকান্তিও চলে আসতো আড্ডা দেবার জন্য।

অনেক রাত অবধি অনেক কথা। কবিতা। এবং বাবলিদির গান। কখনো খালি গলায়। কখনো তানপুরা নিয়ে।

বাবলিদি আমাদের পুরুলিয়ার অনুষ্ঠানেও গান গেয়ে গেছেন। তখন কালীদা সব সময় বলতেন, বাবলির গান থাকলে আর কিছু লাগে না।

একবার বসন্ত উৎসবে বাবলিদির সঙ্গে শান্তিদেব ঘোষের বাড়িতে গেলাম। তিনি তখন প্রতিবছর বসন্ত উৎসবের সময় নিজের বাড়িতে একটি গানের অনুষ্ঠান করতেন।

সঙ্গীত ভবনের ছাত্রী হিসেবে বাবলিদির অন্যরকম একটা পরিচিতি ছিল। সহজেই অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিদের বাড়িতে যাতায়াত ছিল।

আমি সেই প্রথম শান্তিদেব ঘোষের গান সামনাসামনি শুনেছি। বসন্ত উৎসবের ভিড়েও বাবলিদের জন্য মঞ্চের কাছাকাছি বসে অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ আমার ছিল।

দিন পার হয়ে যায়। 

পলাশ ফুল আসে পলাশ ফুল চলে যায়। আবারো চাঁদ ওঠে---বাবলিদি পূর্বপল্লীর খোলা বারান্দায় গাইছেন--------
ও আমার চাঁদের আলো-------

তখন আমার এক বন্ধু ছিল স্বরূপ হালদার। তাকে নিয়ে আমি শান্তিনিকেতন অনেকবার গেছি। সেও ছিল বাবলিদির গানের চরম ভক্ত। 

স্বরূপের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। বাবলিদি ও প্রভাতদার সঙ্গে কমবেশি যোগাযোগ। এখনো।

অভি যখন দৈনিক কাগজের কাজে প্রথম সিউড়ি থেকেই শুরু করলো, তখন আমি একটাই ঠিকানা দিয়েছিলাম-----
বাবলিদি ও প্রভাতদা।
অভিকে বলেছিলাম, বিপদে-আপদে মনে রাখিস এই দম্পতিকে। এরা সবসময় সহযোগিতা করবে।
রামকুমার যখন ওই একই কাজে
সিউড়িতে গেল, তাকেও বলেছিলাম , বাবলিদি প্রভাতদার কথা।
আসলে ওরা তো একটা আশ্রয়।
এক নির্ভরতাও।

রবীন্দ্রনাথের গানের মতোই এক সুর। যে সুরের ধারায় আশ্রয় থাকে। আলো থাকে। ভালোবাসা থাকে। সেই ভালোবাসা আজ অভিমন্যু মাহাত ও রামকুমার আচার্য ভুলে গেলে তাদের দুর্ভাগ্য।

আমি দেখিয়ে ছিলাম, দেখো ভাই ভালোবাসা কাকে বলে।

বাবলিদি প্রতিবছর অভিকে ভাই ফোঁটা দিয়েছে। রামের কপালেও পড়েছে বাবলিদির চন্দনের ফোঁটা।

চন্দনের গন্ধ বাবলিদির কাছ থেকে পাই। যেন বা এক নারী  তার অন্তর থেকে উজাড় করে দিচ্ছে  চন্দন গাছের হাওয়া। এই মানুষই আমাদের দিয়ে যায় লবঙ্গ এলাচের  ছায়া।

কখনো কখনো মনে হয়েছে, বাবলিদি হলো, শাল গাছের ফুল। যে ফুল ফুটলেই আদিবাসীদের উৎসব। শাহরুল।

সৌন্দর্যের প্রধানতম সংজ্ঞা।

দিন যায়।

তারপরও বাবলিদি তানপুরা থেকে ধুলো উড়িয়ে গান গাইছেন।

সামনে নীরব প্রভাতদা। আনন্দীও আছে।

আমি দরজা ফাঁক করে দেখতে পাই। কোনো শব্দ করি না। যে কোনো শব্দ নদীর সুরের ধারাকে আঘাত করে।

আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি।

অনন্তকালের নক্ষত্রেরা নিঃশব্দে নেমে আসে বাবলিদির গান শুনতে।


-----১২ আষাঢ় ১৪২৯
-----২৭----৬--২০২২
------নির্মল হালদার














ছবি : সংগৃহীত







রবিবার, ২৬ জুন, ২০২২

গেম ও কার্টুন



গেম ও কার্টুন 
-----------------

চু কিৎ কিৎ আছে?
চোর-পুলিশ খেলা আছে?
তির--ডাং আছে?
হা --ডু--ডু আছে?

এই যে সাইকেলের টায়ার নিয়ে
শিশুরা খেলা করছে, এ খেলাও কি দেখা যায় আর? কাপড়ের পুঁটলিতে লাথি মারছে শিশুরা,
আর কি দেখা যায়?

ক্রিকেটের এই সরগরম দিনেও
গাছের ডাল নিয়ে ইঁটের টুকরো নিয়ে ক্রিকেট খেলাও কি দেখা যায়?

নিজেদের মধ্যে রঙ্গরসিকতা করে
ছদ্ম মারপিটের দৃশ্য কি দেখা যায়? এক শিশু আরেক শিশুর পিছনে ছুটে যাচ্ছে , কি কারণে
ছুটে যাচ্ছে?
আমরা না জানলেও মনে হয়েছে,
শিশুদের পায়ের দাপাদাপিতে বসুমতীর বুকে তাপ তৈরি হয়। বসুমতী খুশি হয়ে ওঠে।

লাফঝাঁপ দৌড়োদৌড়ি নেই নেই।

এক শিশু আরেক শিশুর মাথার চুল টেনে দৌড়ে চলে গেল, এই যে মজা ,এও যে এক মজার খেলা, নেই নেই। কোথাও নেই।

শুধু মোবাইল গেম।

কোলে ছাগলছানা নিয়ে যে বালিকা ফুর্তি পেয়েছে মনে
সেই মন কোথায় পাবো আর?

একসঙ্গে গোল হয়ে গল্প করছে ছেলেমেয়েরা, এ ছবিও দেখা যায় না। ঘুম থেকে উঠেই মোবাইল।

শুধু বালি নিয়েও খেলা ছিল।

কিল-চড়--ঘুঁষি ছিল।

রবারের ফাটা বল নিয়ে কাড়াকাড়ি। তার বদলে ছোট ছোট দুটি ভাই বাবার মোবাইল কাড়াকাড়ি করে।

মোবাইল গেম।

আধুনিক প্রযুক্তি কালের সর্ববৃহৎ আবিষ্কার। সারা পৃথিবী জুড়ে মোবাইল গেম। লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকার খেলা।
এই খেলার দিকে শিশুমনকে ঠেলে দিয়ে বাণিজ্য আর বাণিজ্য।

শিশুমনের সবুজ ধ্বংস করো।

মোবাইলে কার্টুন দেখতে দিয়ে
মা গেল ঘরের কাজ করতে।
শিশু তো মজে যাবেই। শিশু তো
কার্টুন নেশায় ডুবে যাবেই।

সব, সবকিছু কেড়ে নেওয়া হবে।

শিশুদের হাতে দেওয়া হচ্ছে পিস্তল বন্দুক। শিশুদের কাছে
রাখা হচ্ছে প্রতিযোগিতা।

প্লাস্টিক খেলনার তলায় চাপা পড়ছে কাঠের পুতুল। এও তো পুরনো খবর। শিশুদের কাছে নেই, রাঁধাবাড়া খেলা।
আর নেই বালির ভাত। ঘাসের তরকারি। খোলামকুচির মাছ।
আছে শুধু প্লাস্টিকের যাবতীয় মনভোলানো খেলনা।।

পুকুর অথবা নদীতে সাঁতার নেই।
আছে সুইমিংপুল।
সুইমিং পুল কতজন যেতে পারে?

ইংলিশ মিডিয়াম কতজন যেতে পারে?

অনলাইন পরীক্ষা। সন্তানের কাছে এনে দিতে হয়েছে স্মার্ট ফোন।

আর আন স্মার্টরা রসাতলে যাক।
লেবার হোক। তার বাবা লেবার
তার দাদু লেবার। তার মা ঠাকুমাও লেবারের কাজ করে।

ইঁটভাটা তো আছে।

শিশু শ্রমিক আছে। রাষ্ট্রকে সুরক্ষিত রাখার জন্য পুলিশ মিলিটারি যেমন দরকার, তেমনি দরকার শ্রমিক শ্রেণী। সঙ্গে শিশু শ্রমিকও।

চায়ের দোকানে চায়ের গ্লাস ধুতে ধুতে ঘুমিয়ে পড়বে আমাদের শিশু। দেবদূত।

এই দেবদূতদের ডানা ছেঁটে দিয়েছে রাষ্ট্রব্যবস্থা।

ধুলোখেলা নেই। ধুলোমাটি খেলাও নেই।
শুধু মন খারাপ।


--------১১ আষাঢ় ১৪২৯
-------২৬----৬-----২০২২
------নির্মল হালদার










ছবি : অভিজিৎ মাজী

















শনিবার, ২৫ জুন, ২০২২

প্রকৃতির তন্ময়তা



প্রকৃতির তন্ময়তা
----------------------

প্রকৃতি তন্ময় হয়েই থাকে তার রঙ রূপ ও রসে। প্রকৃতির তন্ময়তার কাছে আমার প্রবেশ নেই। তার তন্ময়তা ভেঙ্গে ফেলবো এরকম ক্ষমতাও নেই।

আমি অন্য একজনের তন্ময়তাকে চিনি। যে পুলিশের চাকরি করতে করতেও  তার সুরে কথায় গানে তন্ময়  হয়েই থাকে ।সম্প্রতিকালে
" রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত " ছবিতে আমাদের তন্ময়, তন্ময় সরকার গানের কথা লিখেছে। সুরও করেছে।

 এই তন্ময় তার গানের মতোই সুরের মতোই শান্ত প্রকৃতির। যা তার আচরণেও প্রকাশ পেয়ে থাকে।

২০০০ সালের পর এই কয়েক বছর আগে বোলপুর শান্তিনিকেতনে দেখা হলো তার সঙ্গে। সে তখন বোলপুরে পুলিশ বিভাগে উচ্চপদস্থ অফিসার।

বন্ধুদের এক আড্ডায় সেই আমার কাছে এসে বললো-------চিনতে পারছেন?

না, চিনতে পারিনি।

কি করে চিনবো?

২০০০ সালে তন্ময় অনিন্দ্য আর শুভময় তাদের গানের দল--- " দুনিয়াশা " কে নিয়ে এসেছিল খড়িদুয়ারা কুমারী গ্রামের সৃজন উৎসবে।

সৃজন উৎসবের কর্ণধার সৈকত রক্ষিত তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। সৃজন উৎসব শেষে তন্ময়রা তিন বন্ধু ফেরার সময়
আমার ডেরাতেই কাটিয়েছিল একটা রাত। তার আগে সান্ধ্য আড্ডায় তাদের তিন বন্ধুর গান আমাদের মুগ্ধ করেছিল খুব। সেই প্রথম তাদের কাছেই শুনেছিলাম------

ভালো আছি ভালো থেকো
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো।।


দিন কেটে যায়।

আর কোনো যোগাযোগ কিংবা সুখ-দুঃখ বিনিময় তন্ময়ের সঙ্গে আমার ছিলনা।

সে নিশ্চয়ই তখন জীবিকা ও জীবনকে  উন্নততর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য লড়াই করছিল। ধারণা করতে পারি।

সে চাকরি পেয়ে পুরুলিয়াতে এসেও কাজ করে গেছে। তার কাছেই শুনেছি। তখন সে আমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি।

কারণটা কি, তন্ময় বলবে না নিশ্চয়ই। তবে সে এখন নিয়মিত যোগাযোগ রাখে। আমি প্রতিদিন দুপুরের সময় তাকে হোয়াটসঅ্যাপে জানতে চাই-----
খেয়েছো তো?
সে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে উত্তর দেয়। শত ব্যস্ততার মধ্যেও আমার ফোন ধরে। কথা বলে।

সে যখন বোলপুরে আমি তখন শান্তিনিকেতনের পটভূমিতে একটি উপন্যাস লিখছিলাম। হোয়াটসঅ্যাপে।

ধারাবাহিক।

দু-চার জন বন্ধুকেও পাঠিয়েছি। তার মধ্যে তন্ময় একজন পাঠক।
সে আমাকে উৎসাহ জুগিয়েছে খুব। তারপর তো সেই লেখা মাঝপথে বন্ধ করে দিলাম। তো
এই সেদিনও  সে আমাকে বলছিল, লেখাটা শেষ করুন।

একটা কথা বলে রাখি, শান্তিনিকেতন বিষয়ে আমি কোনো কিছু কল্পিত লেখা লিখে থাকলে, তাকে পাঠাই। এবং সে শান্তিনিকেতন বিষয় হলেই, উদ্দীপ্ত হয়ে  আমাকে উত্তর দেয়।

এই সময়টা বিচ্ছিন্নতার। কেউ কারো সঙ্গেই জড়িয়ে থাকছে না। বেঁধে বেঁধে রাখার চেষ্টা করলেও
কেউ আর পছন্দ করছে না বন্ধন।
একলা বেঁচে থাকার এইযে নানান 
প্রয়াস দেখা যাচ্ছে এই সময়ে, তখন এই সময়কে  তুড়ি মেরে  উড়িয়ে তন্ময় অনেককে নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা অন্তত করে।

আমি জানি।

আমি জানি তার পাগলামো। তার আবেগ। তার কবিতা। যদিও তার কাছে কবিতা চাইলেই শুনতে পাই------লেখা নেই দাদা।

আমি শুনতে চাই না। তাগাদা দি।
চাপ দি। তারপর হয়তো একটি কবিতা।

আমাদের উত্তম মাহাতর ওয়েব ম্যাগাজিন "অরন্ধন "এ কয়েকবার লিখেছে কবিতা। গদ্য।

তন্ময় তার সাহিত্য কর্মেও নম্র।
আমি শুনতে পাই, তার নিচু গলায় সে বলছে, তার না বলা কথা।

আপাদমস্তক প্রেমিক যারা, তারা তো এরকমই হয়। যেকোনো ভালোবাসা  এক  পাহাড়ী ঝরনা।
লুকিয়ে থাকে। নিকটে গেলে গোপন বেদনার ধারায় আমাকে ভিজিয়ে দেয়।

আমি ঝর্ণা থেকে নুড়ি কুড়াই।
হৃৎপিণ্ডের টুকরো টুকরো নুড়ি।
নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে রক্তের দেখা পাই।

আলো দেখতে পাই।

আমি বিষণ্ণ হয়ে পড়ি। তখন তন্ময়ের মত এক প্রেমিকের কাছে এবং তার সুরের কাছে গিয়ে আসন পাততে ইচ্ছে করে। মনে হয়, গল্প করি।

সেই গল্পে পাহাড়-নদী জঙ্গল তো থাকবেই। থাকবেই, এক উড়ে যাওয়া মেঘ।

প্রেমিকার শাড়ির মতো অথবা
গরিব-দুখিনী মায়ের শাড়ির মতো।

তন্ময় সেই শাড়িতে বুনন করে
বেদনা বিরহ। কান্না।


-------১০ আষাঢ় ১৪২৯
-------২৫----৬----২০২২
-------নির্মল হালদার








ছবি : সংগৃহীত
















শুক্রবার, ২৪ জুন, ২০২২

আমার বিশ্বকর্মা



আমার বিশ্বকর্মা
--------------------

আগে দূর থেকে দেখতাম।
লম্বা লম্বা পা ফেলে দ্রুত হাঁটছে।
এই যুবক কে? কাদের বাড়ির ছেলে?
ও দত্ত বাড়ির ছেলে? কার ছেলে?

অনেক অনেক পরে জেনেছি, ছেলেটির নাম ছোটকা। পোশাকি নাম ------বিজয় দত্ত।

এই লাবণ্যময় যুবকের নাম বিজয় কেন হলো? অর্জুন হলে চমৎকার লাগতো। দেখে তো মনে হয়, কাঁধে তুলতে পারবে তীর ধনুক।

যেকোনো সংকটের সমাধান এই
যুবক করতে পারার ক্ষমতা রাখে।
আমার এইসব সাত-পাঁচ  কল্পনার মধ্যে সে একদিন হাজির হলো আমার কাছে।

আমার ঘরের বিদ্যুৎ কাজ করছে না। তাকে ডেকে নিয়ে এসেছে আমার ভাইপো রাজা।তো সে যন্ত্রপাতি নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে জ্বলে উঠল আলো।

আমার মনে হলো, এই আমার বিশ্বকর্মা। আমার পাড়ার ছেলে।

ক্রমশ বিশ্বকর্মা অথবা ছোটকা আমার বন্ধু হয়ে গেল। তার সঙ্গে আমি বিনিময় করি আমার সুখ দুঃখ। আমিও জেনে যাই, সে অল্প বয়সেই তার বাবাকে হারিয়েছে। তারপর সংকট আর সংকট। যদিও তার এক দিদির বিয়ে তার বাবা দিয়ে গেছলো। বর্তমানে তারা দুই ভাই সংসারটাকে টেনে নিয়ে চলেছে।
বড় ভাই টিউশনি করে। আপাদমস্তক সৎ ও সুন্দর ছেলে।
বাংলাতে মাস্টার ডিগ্রী করার পরেও কোনো চাকরি নেই।

এই বাংলায় কারই বা আছে?

ছোটকা পাড়াতেই ক্যাবেল লাইনে
অপারেটরের চাকরি করে। এবং চাকরি করতে করতেই মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ।
তারপর স্নাতক স্তরেও উত্তীর্ণ।

পাড়ার যে কোনো বিপদে-আপদে
ছোটকার উপস্থিতি অনিবার্য। সে সব ছেড়ে ছুটে আসে।

আমাদের বাড়িতে আলো ও পাখার যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা গেলে, ছোটকার কাছে ফোন ছুটে যায়।
সেও আসে।

আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি।

তার আচরণেও একটা স্বস্তি ও শান্তির আভাস দেখতে পাই। আমি তাকে যেকোনো ভ্রমণের সঙ্গী করতে প্রস্তাব রাখি। যেমন,
রঞ্জন। সে তার সপ্রতিভতায় যেকোনো রকম বিপদকে বা সমস্যাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়।

মুশকিল হলো, রঞ্জন ও ছোটকা দুজনেই কাজে যুক্ত। আর বাপির তো কোনো ছুটি নেই। কার সঙ্গে যাবো বেড়াতে?

অবিনকে সবসময় পাওয়া যায় না।

শুধু তাদের সঙ্গ পেলেই আমার ভ্রমণ হয়ে থাকে।

টিভির সঙ্গে আমার তেমন বন্ধুতা নেই। সারাদিনে এক-দুবার খুলে থাকি। কখনো কোনো দিন দেখতে পাই, ছবি আসছে না।

ছোটকাকে ফোন।

কিন্তু সে ফোন ধরছেনা। আমি অস্থির হয়ে উঠি। ফোনের পরে ফোন করি। কোনো সাড়াশব্দ নেই। তারপর হঠাৎ আমার ঘরে এসে দেখা দেয়। আমার মনে হয়, বিশ্বকর্মার দয়া হলো।

সে সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রায় সময় আসা-যাওয়া করে। কবিতার প্রতিও তার অনুরাগ আড়াল করে না। ফেসবুক বা স্ট্যাটাসে সে দিয়ে থাকে কোনো অজানা অচেনা কবির কবিতা।

ছোটকার একটি সংবেদনশীল মন
আছে। কিন্তু তার নিজেরই এত সমস্যা যে মনকে লুকিয়ে রাখতে হয়। একটা ভদ্রস্থ চাকরি একটা ভদ্রস্থ ঠিকানা বা বাড়ি না থাকার জন্য সে অশান্তিতে থাকে।

আমি তার কাছের মানুষ বলেই
এইসব মনে হয়। মনে হয়, এই তরুণদের  বাঁচাবে কারা? কারা দেখাবে দিশা?

এই সমস্ত তরুণ যারা হাতে হাতে
কাজ শিখেছে । যে কাজ কারিগরি শিক্ষাও এক রকমের।
তাদের কেন দেওয়া হবে না উপযুক্ত কাজ? উপযুক্ত সম্মান?

হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ বেকার এই দেশে। এবং এই দেশেরই এক অংশে ছোটকার মত এক তরুণ যখন কালো মুখ করে  সকালটাকে দেখে  তখন এই প্রভাতে ছাদে ওড়া পায়রার মুখও কালো হয়ে যায়।

আমি তাকে কোনো দিক নির্দেশ করতে পারিনা। আমার হাতে নেই‌ কোনো ক্ষমতা। অথচ সে আমাকে মাঝেমধ্যে বলে------একটা ভাল কাজ জুটিয়ে দাও না।

আমি তার কাছে মনে মনে মার্জনা চেয়ে বলে থাকি-----আমাকে লজ্জা দিস না।

তুই একটা খেজুর গাছের তলায় দাঁড়ালেও কিছু পাবি। কিন্তু আমার কাছে যে নেই কিছু নেই।

শুধু ভালবাসা আছে।

আমার ভালবাসার যদি জোর থাকে ছোটকাকে একদিন পায়ের তলায় পোক্ত জমি দেবে নিশ্চয়ই।

সে তো আমার বিশ্বকর্মা। তার
দু' হাতের কাজের জন্য  সে চাইবেনা চার হাত। শুধু চাইবে প্রতিদিন একমুঠো ভাত।

দুবেলার নিশ্চিন্তি।

ভাতের গরম গরম ধোঁয়াও আশীর্বাদ।


-------৯ আষাঢ় ১৪২৯
------২৪-----৬----২০২২
-------নির্মল হালদার









ছবি : সংগৃহীত




















কবি নির্মল হালদারের বিভিন্ন সময়ের ছবি

পড়ুন "ঘর গেরস্থের শিল্প"

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ