রবিবার, ২৪ জুলাই, ২০২২

লবঙ্গ লতায় জড়িয়ে




লবঙ্গ লতায় জড়িয়ে
--------------------------

সে তখন ছিল লাহিড়ী। অনির্বাণ লাহিড়ী।
এক রূপবান যুবক। প্রেসিডেন্সির ছাত্র।

আমার সঙ্গে খুব মাখোমাখো সম্পর্ক ছিল না। সম্পর্কটা হলো অনেক পরে ৮০ র দশকে। গৌতম বসুর মাধ্যমে।

অনির্বাণের সঙ্গে চেনা জানা ছিল আলাপ ছিল এটুকুই। কাছাকাছি যাইনি কখনো। ওর সম্পর্কে প্রসুনদের কাছ থেকে গল্প শুনেছি। নানা রঙের।

অনির্বাণ আমাকে একবার গল্পের ছলে একটা কথা বলেছিল--------আলোর চর্চা করতে হয়। আলোর চর্চা না করলে, অন্তরের অন্ধকার দূর করা যাবে না।

আমি আর পাল্টা কোনো প্রশ্ন করিনি। কিন্তু তার কথাটা মনে আছে। আর মনে আছে বলেই, আমিও অনেককে বলে থাকি,
আলোর চর্চা করো।

আলো এক কঠিন বিষয়। আলোর দিকে যাওয়া আরো কঠিন। অনির্বাণ কতটা পেরেছে আমার জানা নেই।

আমার সঙ্গে দেখা নেই দীর্ঘ দীর্ঘদিন। যোগাযোগ নেই। ফলে বলতেও পারবো না, তার আলোর অভিমুখ কতটা সহজ হলো।

আলো যদি তার অন্তরে স্থাপিত হয়ে থাকে আমি সেই আলোর কাছে নতজানু হতে চাই।

নতজানু হয়েছি কৃষকের কাছে।
যে ফসলের আলো থেকে মানুষের
ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টা করে।

অনির্বাণ আমার অনেক খিদে মিটিয়েছে। যেমন বাকি অনেক বন্ধুই আমার খিদে মেটায়।

ভালোবাসা থেকে ভালোবাসা আমার কাছে বর্ষিত হয়েছে।
প্রশ্রয় পেয়েছি বন্ধুদের কাছ থেকেই। এবং সমর্থন পেয়েছি কবিতা লেখার।

গৌতম বসু অনির্বাণ কালীদা আমাকে যথেষ্ট ভালোবেসে আমার কবিতার পাশে থেকেছেন।

অনির্বাণ গৌতম পার্থদার সৌজন্যে সীতা কাব্য পুস্তিকাটি প্রকাশের পর , অনির্বাণ নিজের উদ্যোগে মৃত্যুঞ্জয় কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করেছিল। তারপরেই, তমোঘ্ন।

তমোঘ্ন আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পরে  কলকাতা বইমেলায় সমস্ত কপি পুড়ে ছাই হয়ে গেল। আমারই চোখের সামনে।

মনে আছে, আমি মুষড়ে পড়েছিলাম। এবং কাউকে কিছু না-বলে মেলা থেকে বেরিয়ে সোজা দেবাশিস চন্দের বাড়ি। জোকা। 

সারা মেলার মাঠ জুড়ে অদ্রিশ আমাকে খুঁজে ছিল।

অনির্বাণের আফসোস ছিল, বইটা কাউকে দেওয়া গেল না।

আমাকে গড়ে তুলতে কালীদা গৌতম বসুর  একটা প্রয়াস ছিল। সঙ্গে ছিল অনির্বাণের।

আমার জীবনে এই তিনজনের ভূমিকা আকাশ সমান। বানান থেকে বাক্য থেকে এবং চরিত্র বিষয়ে আমাকে সব সময় পরামর্শ।

অনির্বাণ পরের দিকে আমাকে বলেছিল আঙ্গিক পাল্টাতে। আঙ্গিক আবার কি? আমি তাকে প্রশ্ন করিনি। 
অনেক সময় অনেকের কাছেই আমার প্রশ্ন থাকে। প্রশ্ন করিও। কোথাও কোথাও প্রশ্ন করতে গেলে সংশয় জাগে। আমার প্রশ্নটা সঠিক হচ্ছে তো?

কালীদা ও গৌতম বসুকে ভয় না করলেও কখনো কখনো অনির্বাণকে ভয় পেয়েছি। তবে এটাও ঠিক অনির্বানের কাছ থেকে প্রশ্রয় পেয়েছি অনেক।
শুধু তার কাছ থেকে নয় তার মায়ের কাছ থেকেও স্নেহের প্রশ্রয়।

আমি দক্ষিণেশ্বর দেখিনি বলে,
মাসিমা আমাকে একবার নিয়ে গেছলেন। অপাবৃতা আমাকে গীতবিতান উপহার দিয়েছিল।

চমৎকার কবিতা লিখতো সে।

কেমন আছে অপাবৃতা?

অনির্বাণের মনে আছে কিনা জানি না, তার ধর্মতলার স্টেট ব্যাংক অফিসে হঠাৎ হঠাৎ চলে গেছি। আড্ডা হয়েছে। তার বাড়িতে তো অবাধ যাতায়াত ছিল আমার।

প্রসূনদের বাগবাজারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গৌতম বসুর কাছে। বেলগাছিয়া। তারপর অনির্বাণ।

তখন তো কবিতা ছাড়া মাথায় কিছু ঘুরতো না। যে বন্ধুর কাছেই যাই, কবিতা আর কবিতা। আমার নিজের বেকারত্ব নিয়ে
ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো চিন্তা করিনি কখনো। অন্তত সে সময়।

অনির্বাণ কবি হলেও সে একজন কাব্য আলোচক। তত্ত্বজ্ঞানে সে গভীরও খুব। দেশ-বিদেশের কবিতা বিষয়ে আমাকে গল্প শুনিয়েছে।

আমার কাছে শোনানোর মত কিছু নেই। তাই, অনির্বাণের কবিতা নিয়ে কোনো কিছু বলা সম্ভব নয়।
কারোর কবিতা নিয়েই বলতে আমি অক্ষম। বরং বলে রাখি, অনির্বানের বিয়েতে আমি ছিলাম।

অনির্বাণ যখন স্থির করলো, পদবী বর্জন করবে অনেকের মধ্যে আমিও সমর্থন করেছিলাম।
যদিও আমি নিজে আমার পদবীতেই আছি এখনো।

সে লাহিড়ি থেকে ধরিত্রী পুত্র হলো। সে একা নয়। তার বোনও বর্জন করেছিল পদবী।

সেও এক বিপ্লব বৈকি।

পরবর্তীকালে দেখা গেল অনেক কবি পদবী ব্যবহার করেন না। আমার মনে হয়, অনির্বাণের সেই ধারাকে অনেকেই বহন করছেন আজ।

আমার সমস্ত বন্ধুর সঙ্গেই চিঠি বিনিময় হয়েছে। অনির্বাণও আমাকে লিখেছে চিঠি। নিয়মিত। আজও সেই চিঠির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে তাকে জিজ্ঞেস করতাম : আলো বিষয়ে তোমার বক্তব্য আমাকে বলো।

দেখা তো হয় না। যদি চিঠি পত্রের মাধ্যমে জানা যেতো----আলোর দিকে আমিও যেতে চাই। আলো নিয়ে আমার এক রকম আচ্ছন্নতা আছে। যেমন, ঘুম পেলেও ঘুমোতে চাই না। কারণ, ঘুমোলেই অন্ধকার। কথা বলা যাবে না। আকাশ ও মাটি দেখা যাবে না।

কিন্তু আমার মনে হয়, অনির্বাণের কাছে আলোর অর্থ আরো কোনো কিছু। যেখানে আমি প্রবেশ করতে পারবো কিনা সন্দেহ। আলো শুধু একটি বিন্দু নয়। অথবা আলো শুধু সূর্য নয় চন্দ্র নয়। বরং আলো এক শিশুর হাসি।

অনির্বাণ কি বলবে জানি না। তার কাছে নিশ্চয়ই আলো বিষয়ে কোনো তত্ত্ব আছে।

তত্ত্ব বাদ দিয়ে আমার একটি গল্প এখানে বলে রাখছি-----এক সবজি বিক্রেতা মহিলাকে প্রতিদিন আমি কিছু না কিছু জলখাবার দিয়ে থাকি । আজ দিতে ভুলে গেছলাম। যখন মনে পড়ছে, তখন বেলা হয়ে গেছে ঢের। তবুও আমি এক প্যাকেট বিস্কুট নিয়ে তার জায়গার কাছে ছুটে গেলাম। দেখতে পেলাম, আছে এখনো।

আমি স্বস্তি পেলাম।
তার হাতে বিস্কুট প্যাকেটটি দিয়ে
আমার তৃপ্তি হলো।

অনির্বাণ, একে তুমি কি বলবে?

-------------------------------------------------------

অনির্বাণ,
আমার এই লেখা মনে হচ্ছে স্মৃতিকথাও হলো না। স্মৃতিরা সব হারিয়ে গেছে।  আর তুমি তো জানো, কাব্য আলোচনাতেও আমি অপারগ।

এই লেখা আমাদের বন্ধুতার উদযাপন। যেখানে দাঁড়িয়ে আছে হরিতকী বহেড়া আমলকি। যেখানে ছড়ানো হচ্ছে, তেজপাতার গন্ধ। আর লবঙ্গ লতায় জড়িয়ে আমাদের বন্ধুতা সৃজন করে যায়-----আলোবাসা।


-------৭ শ্রাবণ ১৪২৯
------২৪----৭----২০২২
-------নির্মল হালদার








ছবি : সংগৃহীত



















শনিবার, ২৩ জুলাই, ২০২২

নির্মাণ শিল্প



নির্মাণ শিল্প
---------------

ইঁট-বালি-সিমেন্ট। লোহার ছড়।
রাজমিস্ত্রি। দিনমজুর।
সকাল ১১ টা থেকে বিকেল ৫ টা অবধি কর্মব্যস্ততা।
কাজ চলতে চলতেই গুটকা--বিড়ি--খৈনি। রসিকতা।

মহিলা শ্রমিক মাথায় ইঁট চাপিয়ে আসছে। 
দুজন শ্রমিক দুই কাঁধে লোহার ছড় নিয়ে আসছে।

ঝুড়ি ঝাঁটা। বাঁশ। কাঠের বোঝা।
এক জায়গাতে জড়ো হয়ে আছে। গাঁইতি কোদালও আছে।

প্রধান রাজমিস্ত্রি হাঁক দিয়ে উঠলো-----কুথা গেলি রে গদাধর? কাজটা জলদি জলদি না তুললে, খাবি কখন?
তখনই মহিলা শ্রমিকের মাথা থেকে মেঝেতে পড়লো ইঁট।

শব্দ হলো।

লোহার ছড়ে তার বাঁধছে দু'জন। একজন আরেকজনের কাছে চুন চাইছে----- খৈনি টিপবে।

ওই দিকে একজন সিমেন্টের সঙ্গে বালি মিশিয়ে তৈরি করছে মশলা।

বাড়িটা লম্বা চওড়ায় বড় হবে।

শ্রমিকদের ঘাম ঝরবে অনেক।
শুধু কি আর ঘাম? ঘাম রক্ত মিলেমিশে একটা বাড়ি।

নির্মাণ।

এক মহিলা শ্রমিক প্রধান রাজমিস্ত্রির উদ্দেশ্যে বলে------
সূর্যি তো মাথার উপরে। ওহে 
অনিল দাদা ইবার টিফিন বাটি খুলবো?

অনিল দাদা কোনো জবাব না দিয়ে টিউকলে হাত ধুতে গেল। তার মানে, সবাই একসঙ্গে এবার খাওয়া দাওয়া করবে।

যে যার টিফিন বাটি খুলে বসে পড়লো মেঝেতে।

এক মহিলা শ্রমিক এক পুরুষ শ্রমিককে কি একটা তরকারি তুলে দেয় তার বাটিতে। পুরুষ শ্রমিক বলে---টুকু চিকেন নিয়ে আসবি তবে ন-----। ভেন্ডি ভাজা আর ভাত রোজ রোজ কি ভাল্লাগে ?
আরেক পুরুষ শ্রমিক কথার সঙ্গে কথা চাপায়-------হামার ভাতে তো রোজেই আলু চখা। 
তখন আরেক শ্রমিক বলে-----
বউদের দোষ নাই। ভোরে উঠে
কৎনা কাজ করবেক?

খাওয়া-দাওয়ার মাঝে সারা গায়ে সিমেন্ট মাখা এক যুবক এসে জানতে চায়------সিমেন্ট এসেছে কুথায় রাখবেক?

একটা বাড়ি তৈরি করতে করতে 
একটা পরিবার গড়ে ওঠে। কেউ যদি পেঁড়রা থেকে এসে থাকে কাজ করতে, আরেকজন এসেছে চিপিদা থেকে‌। কুশটাঁড় একজন এলে আর একজন এসেছে ডুমুরশোল থেকে।

দশটা গাঁয়ের শ্রমিক কয়েক মাস ধরে একটি পরিবার। সুখ দুঃখের বিনিময়। হাসিঠাট্টা বিনিময়।
কেউ একজন বললো---আজ
ঠিকাদার টাকা দিলে ভাটিতে ঢুকবো ভাই।
তাকে সমর্থন জানিয়ে আরেক জন বললো----হামিও খাবো। বহুৎদিন খাই নাই।

টিফিনের পর দু' একজন গামছা পেতে শুয়ে পড়েছে। কেউ কেউ ইঁটে মাথা রেখে মেঝেতে লম্বালম্বি।

মহিলা শ্রমিকরা গোল হয়ে একদিকে গল্প করছে। চুল আঁচড়ায় একজন। আর একজন
মাথা থেকে উকুন তুলে তুলে মেরে যাচ্ছে নখের ডগায়।

রোদের তেজ নামছে।

কাজও শুরু হয়ে গেল।

রাজমিস্ত্রির হাতে কর্ণিক। 
চারদিকে শব্দ। দু'চারটে কথাবার্তা।

প্রধান রাজমিস্ত্রি বলে ওঠে-----
বালিটা চালতে হবে। আরেকজন শ্রমিক বলে-----সিমেন্ট কম পড়ছে বালিতে। এখনো জানলি নাই কত সিমেন্টে কত বালি লাগে!

তুই নতুনেই রয়ে যাবি নকি?
কাজ না শিখলে খেতে পাবি নাই।

এক শ্রমিক বিড়িতে আগুন দিতে দিতে বলে উঠলো-----আজ গোপালপুরের হাট। সবজি কটা লিতেই হবেক।

কাজ করতে করতেই নিজেদের কথা। নিজেদের সংসারের ছবিও ফুটে ওঠে।
এক মহিলা শ্রমিক বলে----লাতনিটার জন্য চানাচুর লিব। ঠিকাদার পয়সা দিবেক ত
অনিলদা?

একটি কম বয়সি মহিলা শ্রমিকের মন পড়ে আছে তার ছ'মাসের শিশুর জন্য। শাশুড়ির কাছে রেখে এসেছে। শাশুড়ি আবার বুড়ি মানুষ। কি করছে কে জানে! 
তার এক ছোট জা আছে,সে দুধ দিবেক ত?


-------৬ শ্রাবণ ১৪২৯
-------২৩---৭----২০২২
-------নির্মল হালদার


















ছবি : কল্পোত্তম



















শুক্রবার, ২২ জুলাই, ২০২২

ফুটিফাটা মাটির দীর্ঘশ্বাস




ফুটিফাটা মাটির দীর্ঘশ্বাস
--------------------------------

গৌতম
অনেক অনেক দিন আপনার সঙ্গে কথা হয়নি। ফোন করলেই শুনতে পাই, বন্ধ আছে।
সাধারণত আপনি এরকম করেন না। যখনই ফোন করেছি ওপার থেকে শুনতে পেয়েছি------
স্যার বলুন?

আমিও আপনাকে "স্যার "
সম্মোধন করেছি ফোনে। আমাদের বন্ধুত্বের কাছে
এই "স্যার "শব্দটি নিখাদ ভালোবাসার।

আপনার ভালোবাসা নিয়ে বন্ধুত্ব নিয়ে আজ অনেক কিছুই বলতে ইচ্ছে করছে।

আপনার সময় আছে শুনবেন?

আপনি তো সব সময় ব্যস্ত আপনার অফিস নিয়ে সংসার নিয়ে লেখাপড়া নিয়ে। আমি তার একদম উল্টো। কিসুই করি না।

বাংলাবাজারে আমার একটা সুনাম আছে আমি পড়াশোনা করি না। কি আর করবো বলুন?
ছোটবেলা থেকে এখনো একই রকম রয়ে গেলাম।

পড়াশোনা করি না বলে, আমাদের সমসাময়িক এক কবি আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন আমি মঙ্গলাচরণ পড়েছি কিনা?

আমি তার প্রশ্নে নীরব ছিলাম।

স্যার, আজ একটা কথা বলি আপনাকে, আপনি নিশ্চয় জানেন, আমাদের দেশে একসময় মুখে মুখে গান রচনা হয়েছে।
আমাদের পুরুলিয়াতেও গরু চরাতে চরাতে  বাগালরা মুখে মুখে সৃষ্টি করে গেছে ঝুমুরের পদ।

আমি সেই রকমও কিছু নই।

মায়ের পেট থেকে পড়ে মাটি যেমন দেখেছি তেমনি দেখেছি আকাশ। সেই আকাশে তারা দেখতে দেখতে আমার অক্ষর পরিচয়।

স্যার, এ কি আমার দোষ?

আপাতত দোষ গুণের কথা বাদ দিন। আমি জানতে চাই, আপনি কেমন আছেন?

আপনাদের বাড়িতে এখনো কি সেই পিয়ানোটা বাজে?

মনে পড়ে, প্রথম আপনার বাড়িতে যাচ্ছি। সন্ধের অন্ধকার। ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই একটা পিয়ানো ‌।

যা আমি বাংলা সিনেমাতেই দেখেছি। আগে। সেই যন্ত্রশিল্পটি আপনার ঘরে দেখে জানতে চাইলাম-----কে বাজায়?

আমার যতদূর মনে পড়ছে, আপনি বলেছিলেন , আপনার মা।

আমার মনে হয়েছিল, আমাদের ঘরে 
একটা হারমোনিয়ামও বাজে না।

স্যার, কিছু মনে করবেন না
আপনার চেহারা পোশাক-আশাক
আপনার আচরণ আপনার বাড়ি
সবকিছুতেই আভিজাত্যের ছাপ।
অথচ আমার মত গ্রামের মানুষের সঙ্গে আপনি খুবই সহজ।

সুন্দর বললেও ক্ষতি নেই।

তখনো ব্যাংকের চাকরিতে প্রবেশ করেননি। একটা সিগারেট কোম্পানিতে আছেন।

আপনার মনে আছে, কফি হাউস থেকে বেরিয়ে আমরা যখন প্রেসিডেন্সির সিঁড়িতে আড্ডা মারছি, আপনি আপনার অফিস থেকে দেরি করে আসতেন আড্ডায়। এবং আপনাকে দেখে সবাই একসঙ্গে বলে উঠতাম----
এবার সিগারেট পাওয়া যাবে।

তখন তো আমাদের বন্ধুরা প্রায় সবাই বেকার। কারোর কাছে সিগারেটের পয়সাও থাকতো না। তখন আপনিও বেশ সিগারেট খেতেন।

আপনার মনে না থাকতেই পারে,
আপনার প্রথম কবিতার বই---
" অন্নপূর্ণা ও শুভকাল " আপনার হাত থেকে পাইনি।

বইমেলার মাঠে পার্থদা আমাকে দিয়েছিলেন। তারপর পুরুলিয়া ফিরে বই সম্পর্কে দু' এক কথা লিখে আপনাকে চিঠি লিখেছিলাম।

তার অনেক পরে আলাপ। মুখোমুখি।

ইদানিং আমরা মুখোমুখি না হতে পেরে, ফোনে কথা বলি। কখনো খুব গভীর কথা। কখনো রসিকতা।
আপনার সঙ্গে কখনোই কোনো বিষয়ে আমার বিতর্ক হয়নি। তার কারণটা বোধ হয়, কী বিষয় নিয়ে বিতর্ক করবো?

কোনো বিষয় তো আমার জানা নেই। একবার শুধু আপনাকে বলেছিলাম-----পৃথিবীতে একমাত্র শ্রেষ্ঠ কবিতার বই-----গীতবিতান।

আপনি  না মেনে কোনো একটি
বিদেশি বইয়ের কথা উল্লেখ করেছিলেন।
কি বইয়ের কথা উল্লেখ করেছিলেন, আজ আর মনে নেই।

আমার স্মৃতি খুব দুর্বল।
তারই মধ্যে দু-একটা কথা বলি,
আমি দেখেছি, আপনার মধ্যে কোনো হতাশা নেই। আমি একবার বলছিলাম, কি যে চারদিকে লেখা হচ্ছে, আমার ভালো লাগছে না।
আপনি বলেছিলেন, এ তো সব সময় হয়ে থাকে। হতাশ হওয়ার কিছু নেই। গ্রাম বাংলায় অনেক তরুণ অনেক ভালো লিখছেন।

আমাদের বন্ধুদের মধ্যে আপনি সব সময় গ্রাম বাংলার দিকে লক্ষ্য রাখতেন, কোথায় কি লেখা হচ্ছে। কে কেমন লিখছে।

তাদের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ ছিল। নৈকট্য ছিল। আপনি অনেক তরুণের বই নিয়ে কোথাও কোথাও লিখেওছেন।

আপনার মনে পড়ে স্যার------
আপনার বেলগাছিয়ার বাড়িতে
খাওয়া-দাওয়ার পর আপনি আমার কবিতা শুনতে চাইতেন। কবিতা পর্ব শেষ হলে আপনি আমাকে বলতেন, এবার আপনি শুয়ে পড়ুন।

আর আপনি?

ঘরের আলো নিভিয়ে আপনার পড়ার টেবিলের আলো জ্বালিয়ে আপনি পড়তে বসতেন। টেবিলে থাকতো এক কাপ কফি।

কফি কেন?

আমি এ সমস্ত বিষয়ে অনভিজ্ঞ।
আপনি জানিয়েছিলেন, কফি খেলে ঘুম আসে না।

তখনো আপনার সঙ্গে শম্পা বিবাহ বন্ধনে জড়িয়ে পড়েন নি। তখনো মাসিমা মেসোমশাই।

মাসিমার সঙ্গে কথা বললেও মেসোমশাইয়ের সঙ্গে আমার কোনোদিনই কথা হয়নি। তিনি খুব রাশভারি মানুষ ছিলেন।

আচ্ছা স্যার বলতে পারবেন,
আপনার সঙ্গে আমার কেন বন্ধুত্ব হলো? যদিও আজ আর এই প্রশ্নের কোনো অর্থ নেই। তবে এখানে একটা কথা বলে দিতে চাই, আপনি না থাকলে অনির্বাণ না থাকলে, আমার "সীতা" কাব্য পুস্তিকাটি আলোর মুখ দেখতো না।।

এই বইটি  থেকেই আমার পরিচিতি।

তাহলে বলা যেতেই পারে, আপনি আর অনির্বাণ আমাকে আবিষ্কার করলেন।
তারপর তো আমার অনেক কবিতার বইয়ের পান্ডুলিপি আপনি তৈরি করে দিয়েছেন। আমি এ বিষয়ে আপনার উপর নির্ভর করতাম।

আপনাকে চিঠিও লিখেছি অনেক। আপনিও জবাব দিয়েছেন সব সময় পোস্ট কার্ডে।
আপনার ক্ষুদে ক্ষুদে অক্ষরগুলি
নাকছাবির মতো জ্বলজ্বল করতো।

পড়তে বা বুঝতে কোনো সমস্যাই হতো না।
আসলে, আপনি মানুষটাও সমস্যা করেননি কখনো। বরং কারোর সমস্যা হলে পাশে দাঁড়িয়েছেন।

৮০ র দশকের শেষে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। অপারেশনের দিন আপনি একা পুরুলিয়াতে এসে হাজির।

সন্ধেবেলা আমার জ্ঞান ফিরতেই আমি খোঁজ করছি, গৌতম কোথায়? গৌতম?

গৌতম ---স্যার
দিন চলে যায়। দিন আসে।
আমাকে এক কবি বললেন----এসময়ে একমাত্র ধ্রুপদী কবি গৌতম বসু।

আমি তাকে বলেছিলাম, আমি ধ্রুপদী জানি না। আধুনিকতা জানিনা। উত্তর আধুনিকতাও জানি না। অতি সম্প্রতি কালের উত্তর উত্তর আধুনিকতাও জানি না। আমি জানি, গৌতম বসু একজন কবি।

হাসবেন না স্যার। আমি এ কথা বলতে পেরেছিলাম। কোনো কবিকে কোনো একটি শব্দে চিহ্নিত করা কিংবা দেগে দেওয়ার বিপক্ষে আমি।

সুভাষ মুখোপাধ্যায় মানেই পদাতিক কবি , বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মানেই বিপ্লবী কবি আমি এ সমস্তর বিরোধী ‌।

এই কাজগুলো শুধু মিডিয়া করে না, ছোট কাগজের জগতও করে থাকে। ভুল প্রচার ও সংকীর্ণতা ক্ষতি বৈ লাভ করে না।

আপনি যে আমাকে কত বই উপহার দিয়েছেন, আপনি নিজেই জানেন না। আমি দিয়েছি গ্রামীণ হাট থেকে সংগ্রহ করা একটি কাঠের চিরুনি। একবার।

লোক জীবনের  শিল্পকলা ছিল আপনার খুব প্রিয়।
একবার আপনাকে ঢোকরা শিল্প উপহার দিতেই আপনি আমাকে বলেছিলেন, আমাদের দেশের শিল্প আমরা চিনতে পারিনি। ব্রিটিশরা এসে চিনিয়ে দিয়ে গেছে।

আপনার পড়াশোনার বহর এতটাই। আমি শুধু ছোটোখাটো রয়ে গেলাম আপনাদের কাছে।

ছোটোখাটো বললে কম বলা হয়
আমি ধুলিকণাও নই। আমার সতীর্থরা অনেকেই আমার বন্ধু। যারা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

বলতে পারি, আমি একজন বন্ধুজীবী।

স্যার, এ বছর তো বর্ষা এলোনা এখনো। খরা হলে আমরা কি চুপচাপ ঘরে বসে থাকবো?

আপনি কি আমার সঙ্গে যাবেন গ্রাম বাংলার মাঠে মাঠে? ফুটিফাটা মাটির দীর্ঘশ্বাস শুনতে শুনতে উচ্চারণ করতে পারবো কি, শুভকাল ?

কোথায় আছি কোন্ কালে আছি আপনি জানেন। শিরদাঁড়া কতটা বেঁকে গেছে আপনি তাও জানেন।

আপনি জানেন, বাংলা কবিতার শিরদাঁড়া  কোথায় কোথায় বিক্রি হয়ে গেছে।

 আপনার ডালহৌসির অফিসের শিগগির যাব। আমাকে একটু সময় দেবেন। কয়েকটা কবিতা শুনিয়ে আসবো। আবারো আবারো দেখতে পাচ্ছি-------

আমাদের চোখের জল লোহা হয়ে গেছে।

স্যার, এ আমার হতাশা নয়।
আমার অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি।
নীতি-নৈতিকতা আদর্শ মূল্যবোধ
সব হারিয়ে ফেলেছি।

আমার এই বকবকানি আজকের মত থামিয়ে রাখছি।
আপনি ভালো থাকবেন  রাজেশ্বরীদের বাড়িতে।


-----৫ শ্রাবণ ১৪২৯
------২২----৭----২০২২
------নির্মল হালদার


গৌতম বসু 

জন্ম : ১৩ মে ১৯৫৫
মৃত্যু : ১৮ জুন ২০২১
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : 
অন্নপূর্ণা ও শুভকাল ১৯৮১
অতিশয় তৃণাঙ্কুর পথে ১৯৯১
রসাতল ২০০১
নয়নপথগামী ২০০৭
স্বর্ণগরুড়চূড়া ২০১৩
মঞ্জুশ্রী ২০১৫
জরাবর্গ ২০১৮
সুকুমারীকে না বলা কথা ২০১৯
লয় ২০২১
জরাবর্গ ( পরিবর্ধিত সংস্করণ) ২০২২
কবিতাসংগ্রহ ২০১৫

গদ্যের বই
গদ্যসংগ্রহ ২০১৯

অনুবাদ
গিল্গামেশ কাব্য ২০২০

সাক্ষাৎকার 
সাক্ষাৎকারসংগ্রহ ( গৌতম মণ্ডল সম্পাদিত) ২০২২

সম্পাদিত গ্রন্থ
শ্রেষ্ঠ কবিতা দেবদাস আচার্য 
সঞ্জয় ভট্টাচার্যের কবিতা  
স্মরণী ও সরণি : সঞ্জয় ভট্টাচার্যের ডায়েরি
নির্বাচিত পত্রাবলী ( সটীক) 
সাক্ষাৎকারসংগ্রহ বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়








ছবি সৌজন্যে : গৌতম মন্ডল


















বৃহস্পতিবার, ২১ জুলাই, ২০২২

পার্থদা, দূরের সন্ধ্যা




পার্থদা, দূরের সন্ধ্যা
-------------------------

যৌবনের দিনগুলিতে গৌ চৌয়ের
হাওড়ার কইপুকুর লেনে আমার একটা জায়গা ছিল।

পুরুলিয়া থেকে গেলেই সোজা গৌতমের বাড়ি।

হাওড়া স্টেশন থেকেও কাছে।

তখন তো কবিতা আর কবিতা।
তখন তো কবিতায় ফুটছি। শুধু কি ফুটছি? পুড়ছিও। এবং পুড়তে পুড়তে ইচ্ছে করছে 
যতসব পুরাতন আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলি।

কলকাতা যাই কবিতার টানে।
বন্ধুদের টানে। বন্ধুদের ঘর আমারও ঘর হয়ে ওঠে।

গৌতমকে বললাম, আজ তোকে দেখিয়ে দিতেই হবে 
কে পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল?

কলকাতা থেকে দূরে থাকলেও
লেখালেখির শুরু থেকেই, আমাদের কাছে পৌঁছে যেতো
নতুন বই নতুন পত্রিকা।

আমরা পেয়ে গেছলাম পার্থপ্রতিম
কাঞ্জিলালের "দেবী "কবিতার বইটি। পেয়ে গেছলাম অমিতাভ গুপ্তর " আলো "। তারপরেই রণজিৎ দাশের " আমাদের লাজুক কবিতা "।

কলকাতা থেকে অনেক দূরে থাকলেও কবিতা সংবাদও আমাদের কাছে এসে পড়তো ঠিক ঠিক। কোনো কোনো বই নিয়ে
পাগলামিও করেছি। যেমন পার্থদার " দেবী "বইটি নিয়ে আমার সৈকত কল্লোল ও অশোকের মধ্যে তুমুল আলোচনা।

তখন আমাদের যা বয়স  এবং কবিতা পাঠেরও যা অভিজ্ঞতা, দেবী বইটি  সম্পূর্ণভাবে আমাদের বোধগম্য হয়নি।

কিন্তু কিছু একটা আছে যেন, ধরতে পারছি না।

গৌতমের সঙ্গে কফি হাউসে উঠছি। তাকে ছোট ছেলের মত একইভাবে বলে যাচ্ছি, পার্থ প্রতিম কাঞ্জিলালকে দেখিয়ে দিবি।

উঠেই, কফি হাউসের দরজা থেকেই গৌতম আমাকে দেখিয়ে দিলো----ওই যে দেখছিস ওই টেবিলে দু' তিনজনের সঙ্গে বসে আছে, সেই পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল।

রোগা ছিপছিপে এই মানুষটি পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল ! 
ইনি দেবী লিখেছেন?

গৌতম আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলো।

সেদিন টেবিলে আর কে কে ছিল
আজ আর মনে নেই। মনে আছে
আমি খুব নীরব ছিলাম। এক মুগ্ধতা নিয়ে গৌতমের সঙ্গে তার বাড়িতে ফিরে এসেছিলাম।


চন্দ্র সূর্যের যাওয়া আসা চলে।

আমাদেরও বয়স বাড়ে। 

পার্থদার সঙ্গে আমার নৈকট্য তৈরি হয়। ঘনিষ্ঠতা হয়। কফি হাউসে দেখা হলে, পকেট থেকে কবিতা বের করে কবিতা  শোনাই।
পার্থদা তখনই আমার একটি কবিতা পড়তে পড়তে স্পেসের কথা বলেছিলেন।

তখন আমি কবিতায় স্পেসের ব্যবহার একদমই জানতাম না।

পার্থদা কবি হিসেবে যে উচ্চমানের সেই উচ্চতার মূল্য তিনি পাননি। 

আমার সঙ্গে একবার আমাদের সময়ের এক কবির বিতর্ক হয়েছিল ফোনে। আমি বলেছিলাম, বাংলা কবিতায় পার্থ প্রতিম কাঞ্জিলাল এক বিরাট পর্বত। তিনি আমার কথা নাকচ  করে বলেছিলেন, না। পার্থর চেয়েও বড় কবি অমুক এক কবি।

যে কবির কথা বলেছিলেন তিনি আলোক বৃত্তের তৈরি করা এক আলোক স্তম্ভ।

আমি আজও মানতে রাজি নই।

পার্থদা তো শুধু কবি ছিলেন না। তিনি আবিষ্কারও করেছিলেন অনেক কবি। পার্থদার কাছ থেকেই প্রথম পাই গৌতম বসুর অন্নপূর্ণা ও শুভকাল। হেমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নশ্বর অলীক যাতায়াত। মল্লিকা সেনগুপ্তের
চল্লিশ চাঁদের আয়ু। ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যাচ্ছে
আমার প্রথম ও দ্বিতীয় বই প্রকাশিত হয়ে গেছে। তারপর
ঘনিষ্ঠ হই গৌতম বসু ও অনির্বাণ লাহিড়ীর সঙ্গে।

এক সকালে গৌতম বসু আমাকে ধরে নিয়ে গেলেন অনির্বাণের কাছে। আমাকে বলা হলো কবিতা পড়তে। আমার কবিতা শুনে তাদের উচ্ছ্বাস।

আজও মনে পড়ে।

তখনই অনির্বাণ ও গৌতম স্থির করলেন , আমার একটি এক ফর্মার বই করবেন। এবং দায়িত্ব দেবেন তারা পার্থদাকে।

হ্যাঁ, সেই বইয়ের প্রকাশক ছিলেন
পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল।

পার্থদা আমার কবিতা পছন্দ করতেন না করতেন না, তার সঙ্গে মেলামেশা করতে করতেও আমি স্পষ্ট করে কখনো বুঝতে পারিনি।

তবে আমার এক বন্ধু তরুণ কবি বন্ধু  সজল রায় তার নিজ উদ্যোগে আমার একটি কবিতার বই প্রকাশ করেছিল।

বইটি হলো , " অন্ন যাত্রা "।

যা আমি পার্থদার কাছে ডাকযোগে পাঠিয়েছিলাম।
তার তখন প্রায় শরীর খারাপ হয়।
আমি ফোন করে জানতে চেয়েছিলাম বইটি সম্পর্কে তার মতামত। তিনি বলেছিলেন-----
তোমার এই বইটি বাংলা কবিতায় একটি মাইলস্টোন।

মনে আছে কালীদাও প্রশংসা করেছিলেন।

বন্ধুরা মাফ করবেন, অনেক নিজের কথা বলে ফেলছি।

হাত দেখাচ্ছি পার্থদাকে। কফি হাউসের টেবিলে। তিনি তো তন্ত্র মন্ত্রেও বিশ্বাস করতেন। তার কাছে সে বিষয়ে কখনো কখনো দু'চারটে কথা শুনেছি।

তার সঙ্গে আমার কোনোদিন কোনো বিষয়ে বিরোধ হয়নি। তার কারণ হলো, পার্থদা বলতেন আমি শুনতাম। এও ঠিক , পার্থদার সঙ্গে আমি কোনোদিন একা একা আড্ডা দিইনি।

আমি তো সবসময়ই কারো না কারো সঙ্গে। হয়তোবা প্রসূন। হয়তোবা প্রবুদ্ধ প্রসূন। হয়তো বা অমিতাভ অনির্বাণ। কিম্বা গৌতম বসুর সঙ্গে আমি। আর তখন আড্ডা মানেই তো মধ্যমণি পার্থদা।

কফি হাউস থেকে বেরিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজের মাঠে। আরো এক আড্ডা। উৎপলদা আসতেন।

আমরা বন্ধুরা তো ছিলামই।

হ্যাঁ একরামও থাকতো।

একরামের সঙ্গে পার্থদার ঘনিষ্ঠতাও ছিল দেখবার মত।
তখনই একরামের কাছ থেকে পার্থদা বিষয়ে অনেক গল্প শুনেছি।

শঙ্খবাবুর শ্যামবাজারের বাড়িতেও দাঁতে নোখ কাটতে কাটতে মধ্যমণি হয়ে পার্থদার গল্প শুনেছি। রবিবারের কত কত সকাল।

পার্থদার চলে যাওয়ার সময় হয়নি। তার চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়েছে, বাংলা কবিতার অনেক অনেক ক্ষতি হয়ে গেল।

যেকোনো রাস্তা থেকে একটি বটগাছের পতন হলে, তার ছায়ারও পতন হয়। এখানে আমি বলবো, পার্থদা অকালে চলে গেলেও তার ছায়া চলে যায়নি।
চলে যাবে না।

প্রচারিত কিংবা আলোচিত ছায়া
চলে যেতেই পারে। কেননা, সেই ছায়ার শীতলতা অথবা উষ্ণতা থাকে না কোথাও। বরং বলা যায় প্রচারিত ও আলোচিত ছায়া 
ঔদ্ধত্যের প্রসারতা বাড়িয়ে চলে।

অমাবস্যা পূর্ণিমা আসে। তিথি নক্ষত্রের  কথা আসে। পার্থদার কথাও আসে।

আসবেও।

যতদিন বাংলা ভাষা ও বাংলা কবিতা থাকবে।


-------৪ শ্রাবণ ১৪২৯
------২১----৭----২০২২
------নির্মল হালদার


জন্ম :১৯৪৯ মৃত্যু : ২০২০







ছবি : সংগৃহীত
















কবি নির্মল হালদারের বিভিন্ন সময়ের ছবি

পড়ুন "ঘর গেরস্থের শিল্প"

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ